রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

Kobitar Alo June Edition 2026


 
প্রচ্ছদ ঋণঃ- নীলম সামন্ত



কবিতাভিত্তিক



কেদারা
শ্রাবণী গুপ্ত 

বসে ছিলে—
এখনও তেমনই আছে রাখা
কুশানে ছড়ানো চুল, নদী...
মাথার তেলের গন্ধ, প্রশ্বাসে 
এখনও, বাতাসে!


নেই-ঘুমের লেখা
দেবশ্রী দে

পাণ্ডুলিপি খুলে বসে আছি 

যন্ত্রণার মেঘ থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়েছে কথা
ছুঁয়ে দেখছি অযত্ন
অভিযোগ 

ছায়ার এপাশে যত
আলো রেখেছি তোমার বুকে
প্রশ্ন করেছিলে
            তুমি কি কাঁদছ 

নেই-ঘুম রাত ছাড়া আর কী চেয়েছি
মনে পড়ে বাংলা কবিতা?


মেয়েগাছ
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় 

এমন করে আগুনে হাত সেঁকতে নেই।

শাড়ির পাড়ে এ ভাবে কত আগুন জ্বলল।
কত নাভি ভিজে গেল জলে।
ভাসতে ভাসতে তারা গাছ হল, কাঠ হল।

কাঠের খুঁটি ঘরের মাঝখানে।
তাতে হেলান দিয়ে খেতে বসে ছয় জন।
কাকে বেশী খেতে দিলি রে তুই?

কাঠ পুড়ছে। শব্দ হচ্ছে। 
ছয় জন এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে ঘরের খুঁটি।
রেল স্টেশন, ব্রিজ, কলোনী আর আবাসনগুলোয়
তেতে উঠছে সম্পর্কের হাত...

একটা মেয়েগাছে হেলান দিয়ে বসার জন্য প্রলাপভিখারী
নান্দনিক জোছনায় জেগে থাকে সারা রাত।


এ কেমন বাউল
ইন্দ্রজিৎ ভট্টাচার্য 

নাম ধরে ডাকলে একবার, তার মুখের উপত্যকা রোদ্দুর হয়ে যায়
তখন তিতির এসে বাসা বানায় ভ্রু-পল্লবে
ইলশেগুড়ি ঘামে লজ্জা জমে নাকের ওপর
আর হিমেল হাওয়ায় শুকনো তিরতিরে ঠোঁটে কাঁপে অব্যক্ত অভিমান 

আমি দেখি
মাটি ও জ্যোৎস্নার সঙ্গমকালে যে পাখি স্বর্গে উড়ে যায় তার ডানার গন্ধে লেগে থাকা মন্দাকিনী, খোঁজে মৌতাত...
সমর্পনের বরণডালায় বিভোর হয়ে  কথাকলি 
নুপুর ফুরোয় না..নুপুর গড়িয়ে যায়.. গড়াতে গড়াতে নদীতে জোয়ার আসে

ষড়রিপু হাতে বৈঠা ধরতে গিয়ে দেখি বাউল আসে
শতাব্দির নৌকায় গোধুলী ভেসে যায়
একেই কি বলে...শীতের দোplতারা না মাঝির ভাওয়াইয়া? 
তবে এ বাউল তেমনটিও নয়।


দাম্পত্য 
সজ্জ্বল দত্ত

সূচনালগ্ন
---------------
হঠাৎ সুনামি-ঢেউ বিকেল ভাসিয়ে সাদা ফেনা, 
বৃষ্টি জমে কি ওই জলের পাহাড়চূড়ো আমাদের?
মেঘের ইচ্ছে সে পাহাড়কে সাক্ষী রাখা-- 
তাই ভাঙাঘর ছেঁড়াফুল মধুচন্দ্রিমা সংকেত

মধ্যপথ 
-------------
একটুখানি আসে, 
বাদবাকিটা বানাও, 
তাই নিয়ে এই কঠোর দাবি, গোটাজীবন মানাও? 

অন্ত্যমিল 
................
কবে যে নিথর যজ্ঞে আহুতি, পুড়ে গলে ফুটন্ত ছাই!
নিরাকার কোথাও আমরা দু'মুঠো ধুলোবালি 
হাওয়ায় সারাদিন পাশাপাশি উড়ে উড়ে ... 
একই আঙুল ছুঁয়ে আবার নিয়মে ফের জন্মপ্রার্থনায়...



ঈশ্বরের বাগান 
অমিতাভ দাস 

নিজেকে বলেছি লেখো, অবিরত লিখে চলো
হাঁটো,  ধীর পায়ে হাঁটতে থাকো...
আমাদের যেতে হবে ঈশ্বরের বাগানের দিকে
লিখতে হবে ক্ষমা আর করুণা নিরন্তর।
জানালার বাইরে সবুজ সোনাঝুরি গাছ
সে গাছে পাখির নিজস্ব বাসা
আগাছাও কম নেই
মানিপ্লান্ট, ঝুলে নেমেছে যেন দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ। 
পাখি ডাকে...ট্রেন চলে যায়...
মাঘমাসের পাখি, পরিযায়ী, ফল খায়...
নিজেকে বলেছি 'লেখো'। 
রোদের গভীর থেকে
গতজন্মের আলো উঠে আসে, ডাক পাঠায়
সুবর্ণরেখা নদী চোখে ভাসে, বিভূতিভূষণ 
হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে হবে লীলাময়
ঈশ্বরের বাগান, হাত ধরো।
তুমি আজ কেবল রামকৃষ্ণময়...


দগ্ধ বাতাসের পরিবার
জি কে নাথ


শিকড় নিয়ে ঢুকতে দেখি
ঘরের মধ্যে
হলদে ঘাসের মাঠ হয়েছে,
শ্বাসচ্যুত মাঠ বরাবর দূরে
ভেজানো দু পাল্লার বিদ্যুৎদরজা

ভেতরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে
এমন শব্দের
যাকে বলা হয়েছে
আমাদের কারোরই
স্বজন হারানোর দুঃখে আঁকবার মতো নিটোল !

ধীর বাদামি হয়ে শুকিয়ে যাওয়া
আবছা শোকের মতো
জীবন কি কখনো চেয়েছিলে ?

পড়ন্ত দিনের পিছন থেকে
কুড়িয়ে আনা বেদনার লাল দানার মতো
রাক্ষস দাঁতের চাঁদ দেখার নাম করে
চুরি করে নিলো কারা যেন
আমার শৈশব

ওদের
আমার ছায়া সমেত মৃত রোদ মুখে নিয়ে
সুপারি গাছ বেয়ে
নেমে যেতে দেখছি

গড়িয়ে নিচ্ছে শরীর
মেলা খোলা হাওয়ার গর্ভে
লুকোনো শ্মশান ছাইয়ের উপর
গোধূলিপ্রপাতরেখা

এভাবে দিনের পাঁজর পুড়িয়ে
মৃত্যুর এই যুদ্ধে
শুরু হয়েছে
জ্বলন্ত কঙ্কাল নাচ

বারুদ নয়
ইরানের পরমাণু বোমা ঠাসা
একেকটা শরীর এখন
আগুনের ভেতর উড়ে গেছে

দেখি
আমার মতো কত সহস্র
থেঁতলানো শৈশবের
পুড়ে যাওয়া ছায়া
ঘুড়ির অবশেষ নিয়ে
ভেসেছে মরুশতাব্দীর স্তব্ধতায়

আবছা রাতের পর রাত
হাওয়া ঢোকে বিস্ময়ে

অগ্নিদগ্ধ ফুসফুস হাওয়ায়
কে যে কার কাছে ঝোড়ো
বুঝতেই খসে পড়ে প্রাণ

প্রাণ খুলে
জলের শিরায়
পাতা ঘুরে ঘুরে ভাসে
সৌরঅক্ষরের ভেতর

জোনাকির মতো
মৃদু সবুজ আলো নিয়ে
তাকিয়ে আছি রক্তাক্ত

জমাট কালোর ভেতর
ডুবন্ত হাড়খচিত নক্ষত্রের শাদায় দেখি
বাস্তুভিটে জড়িয়ে
নিঃশব্দে পড়ে আছে বাবা

তবে
মাসিক সংসার হিসেবের খাতা
ফুরিয়ে গিয়েছে বলেই কি
সন্তানের কাছে ফিরতে
এত দেরি হচ্ছে ?


বর্ণচোরা_ও_কামের_বাদাম
সোমপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায়

কামের বাদাম ভাঙা সকালে কেঁপে ওঠে রেললাইন। যে পথ চলে গেছে চোখের বাইরে সেখানেই এক কুটিরে বাস করে কানাই। সারাদিন ধোঁয়া ওঠা গরমে আধসেদ্ধ মাংস। অন্তর পোড়া ফুরোনো বিকেলের কথা বলতে গেলে স্মৃতি বিভ্রান্ত করে। তারচেয়ে চাঁদের অপেক্ষা মনোরম।মনের ভেতর বাউল সুর। এমন অবস্থায় গুরু গোঁসাই সঙ্গ করলে বোধহয় ভেঙে যাবে বেড়া। 

লক্ষ্মীছাড়া এক জন্মান্ধ অর্ধেক চাঁদকে সেঁকতে সেঁকতে স্বপ্ন দেখে জঙ্ঘার মতো রেললাইন থেকে জেগে উঠেছে বসন্ত। হাতছানিতে পিঙ্গল সোহাগ।

বর্ণচোরা সময় এরপর ঘুরে যাবে ভাগ্য অন্বেষণে।



স্বাধীনতা 
সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায় 

তুমি বললে তুমি ফুটপাতে রাত কাটাও
খোলা আকাশের নিচে ,
'আমি কি স্বাধীন নই?'
আমি বললাম, আমিও তো  ফুটপাতের মানুষদের
মাড়িয়ে দিয়ে  চাকায়, বেকসুর খালাস পাই
'আমি কি স্বাধীন নই?'
তুমি বললে,  তুমি স্বেচ্ছাচারী
অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে রাতের বেলা হাসপাতালে
 দরজা খুলতে ব'ল
'তুমি কি স্বাধীন নও?'
আমি বললাম, আমি খুব ছাপোষা মানুষ 
ডাকলেই হাসপাতাল চলে আসে আমার ঘরে,
'আমি কি স্বাধীন নই?'

আর কত সংজ্ঞা তুমি ধারণ  করবে স্বাধীনতা?


থামা 
পিউলি মুখোপাধ্যায় 

সামরিক আধিপত্য গুটিয়ে ফেরার মুহূর্তে বৈশাখ 
শক্তি-প্রদর্শনের আশা ও আকাঙ্ক্ষা আঁকড়ে 

এই মৃত্যু-মিছিল এবং অশান্ত পৃথিবীতে হালখাতা 
অমসৃণ চাঁদ বেয়ে উজ্জ্বল জ্যোৎস্নার ফোঁটা 
উড়তে উড়তেই গিলতে তৈরি সাদা পায়রা
নিচে সৈনিকদের ঘরবাড়ি, মিঠাই, আতর 

ক্যালেন্ডারে দিন-রাতের হিসেব ছারখার 
কানে খবর, চোখ কার্তুজের মতো ভারী 
উত্তেজনায় রাগ, মারামারি
রাষ্ট্রশাসকরা ঘুমাচ্ছেন সশস্ত্র পাহারায়।
নববর্ষে নতুন পাঞ্জাবি, মুখে হিন্দি ও ইংরেজি 
কেউ জানে না 
যুদ্ধপ্রবণ জিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যেতে যেতে 
কোন ইশারায় থামবে এক লহমায়?


হালখাতা 
ভাস্কর সরকার 

বই প্রকাশের সময় প্রথম সাদা পাতাতে 
ফাঁকা রেখে দিয়েছিলাম 
নাম লিখতে চেয়েছিলাম মায়ের 
কেন যে পারিনি —
বাবার কাপড়ের দোকানে 
মাকে দেখতাম ঘোমটা দিয়ে ঢুকতো
হালখাতার সময়ে ডাবেতে স্বস্তিক -সিঁদুর চিহ্ন এঁকে দিতো কত আদরে 
সে কী ইয়া বড় করে গণশার আয়োজন
কত নাড়ু যত ভিড় 
কী যে তার রং আশ্চর্য করা গন্ধ !

একটা সাত পৃথিবী রূপের মতোন গন্ধ বের হচ্ছিল আমার সাদা পাতা দিয়ে...


হালের হালখাতা 
কিংশুক চক্রবর্তী

হাল পায়নি পানি 
হিসেবে নিকেশ হারিয়ে গ্যাছে খাতায় 
অঝোর ধারায় 
     ভাসছি কবে থেকেই 
বানের জল ভেবেছিল কেউ 
শেকড় জানি - হাজার কত বছর
পাড় ভেঙেছি 
   এমন জলের ঢেউ 

আনছো আনো 
মিসাইল মিশেল চূড়ো 
মনুমেন্টও গুঁড়িয়ে যখন ধুলো 
পাওনা জেরের অঙ্ক কষা খাতায় 
হাত বদলের মাদল 
            যতই বাজুক 
মিষ্টি শেষের বৃষ্টিতে 
                   সেই বর্শা
ভরসা হয়ে 
পুরোনো ভুলগুলো


দিন
সুশান্ত সেন

দিন উড়ে যায়
ধরতে গিয়ে দেখা যায় 
বাস চলে গেল , হ্যান্ডেল ধরতে পারিনি
আচ্ছা বাসের হ্যান্ডেল আর বাসের হাতল কি একই অর্থ নিয়ে আসে।


নাহলে হ্যান্ডেল আর হাতলের ভেতর মিল খোঁজার চেষ্টায় বুচি'র মা খাল পাড় থেকে যাত্রা শুরু করে বালিগঞ্জের বহুতল বস্তিতে  ( বস্তি বলাতে মুখভার )
পৌঁছে গেল কি করে !


কাল মেয়ে জামাই আসবে  - না বলে কয়ে ছুটি করতে হবে , পরের দিন সকালে মুখনাড়া।
এই ভাবেই দিন উড়ে যায়
হাতল যায় ফসকে।


খোঁজ
বন্যা ব্যানার্জী

ডাকবাক্স থেকে গড়িয়ে নামছিল চিঠি।শব্দেরা এ ওর দিকে হীরের 
কুঁচি নাকছাবি।
আমি তার অপেক্ষায় বহুদিন!
শেষমেষ সাদা ইউনিফর্মের কালো লোকটি বাড়িয়ে দিল হাত। 
একগোছা পেইন কিলারের বুকে জন্মান্তরের ডাক। 
চিঠি হয়ে উড়ে যাচ্ছি ডাকবাক্স র ভেতর। হীরের কুঁচি নাকছাবি লিখে আনবো বলে।



ডুডু খেলা
চিরঞ্জীব হালদার

হাডুডু খেলা সম্পর্কিত কবিতা লেখা সহজ নয়।

প্রথমে এর ক্ষেত্রটিকে কল্পনায় ভাবুন। 
হিমালয়ের পাদদেশে হলে এর মৌতাত একরকম। আবার সাগরের কাছাকাছি কোন রিসর্টের  নির্বাচিত ক্ষেত্রে হলে বাৎসায়নকে রেফরি রাখতেই পারেন।
এখানে একদিকে কাঁঠাল গাছ আর অন্যপ্রান্তে কদম গাছের কম্বিনেশন  মন্দ হবেনা।

পাঠক নাও জানতে পারেন কদম পাতার বাঁশি কিভাবে বানাতে হয়।
সেরা খেলোয়াড় সেই হবেন যিনি চৌষট্টি পাতার নিদান শিরোধার্য করে হরিণীর ডাক নকল করতে পারেন।


মাছ নদীর উপজাতিরা 
চয়ন ভৌমিক

গতকাল রাতে আমি 
এক আশ্চর্য বদ্বীপের মালিক হয়েছি।

তার তিন পাশে নির্মল সমুদ্র।

পাড়ে সামান্য বালিয়াড়ির পরই
একটা খাঁড়ি সোজা চলে গেছে

অন্ধকারাচ্ছন্ন উপজাতিদের ডেরায়।

কত অচেনা পাখির ডাক, 
ম্যানগ্রোভ বন, আর পলি মাটির
আস্তরন সরিয়ে সরিয়ে, 
আমি ধীরে আমার নৌকাটি নিয়ে

যেই পৌঁছেছি তাদের গ্রামে 

অমনি কোথা থেকে একটা
তির এসে অবশ করে দিল আমায়

আর আমি এখনও সেখানেই
বন্দী হয়ে আছি এক হাঁটু 

পলির গভীরে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Kobitar Alo June Edition 2026

  প্রচ্ছদ ঋণঃ- নীলম সামন্ত