প্রচ্ছদ ঋণঃ- অদিতি সেনগুপ্ত
কবিতাভিত্তিক
অরিত্র দ্বিবেদী
রহিত ঘোষাল
অমিত চক্রবর্তী
সুশান্ত সেন
বৈশালী সেন
ভাস্কর সরকার
সম্মিলন
নিমাই জানা
অদিতি সেনগুপ্ত
মানিক পণ্ডিত
অনিলেশ গোস্বামী
দীপ্র দাসচৌধুরী
মাথার ওপরে ধরে কষ্টের ছাতা
ভেসে যায় দুই কূল-
অকাল স্রোতের টানে নীল জ্যোৎস্নায়!
অবসাদ? নাকি কিছু অলীক আকাঙ্খা?
ছোঁয়নি যা মগজের গোপন কুটির...
শুধু হৃদয় থেকে হৃদয় ছোঁয়াচে রোগের মতো
গভীর ব্যঞ্জনাময় উড়ান,
গলায় ফাঁস আর অতলে ডুবে যাওয়া
সময় জানে-
অকালে ঝরে যাওয়া ফুলের দাম।
কিন্তু বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য এখনও বোঝেনি
সে'সব অলিখিত দলিলের নিশীথযাপন
কারণ, রাতের ঝরা ফুলের হিসেব-
উঠোন রাখে না,
স্বচ্ছ সকালে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় অতীত
বাড়ির শুদ্ধিকরণের জন্য...
পিউলি মুখোপাধ্যায়
হাঁটার প্রান্তে রোজ শ্মশান জড়িয়ে ঘুম
ঘন্টা, দিন, মাস, কয়েকবছর… অবিরাম প্রবাহ
একটা দড়ি ঝুলিয়েছিলে ফ্যানের সঙ্গে
আগেই উড়িয়ে দিয়েছ আত্মার ভাঙা ভাঙা অংশ
অনুমোদনে স্বাক্ষরের অধিকার কেড়েছিল কেউ
ভীষণ কাছের বন্ধুত্ব পেরিয়ে অস্তিত্বে মিশে
তার নির্দোষ জীবনযাপনও অস্থির, প্রভাবের নেশায়
দুঃখে পাথর, মুড সুইং, শেষে পালিয়ে যাওয়া
হঠাৎ দূরভাষে বিনা মেঘে আতঙ্কের বৃষ্টি
কাছের এক ভাই বেছে নিয়েছে নির্বাসন জীবন থেকে
অবাক হাতে উপকরণ সরিয়ে
এলে চুল্লির সামনে
কল্পনায় নিজের দেহ ট্রে-র ওপর, যদি হতো সত্যি?
চারপাশে কান্নার শব্দে জট পাকাচ্ছে নিউরোন
যারা থেকে গেল, তাদের কি কিছু হারিয়েছে?
বাড়ির দিকে পা ফেলতে গিয়ে তুমি
ধূপকাঠি দিয়ে লিখলে নদীর পাড়ে, ‘প্রাপ্তি ছিনিয়ে নিতে হয়, অথবা আনন্দ… কষ্ট ভাসিয়ে রেখে গেলাম মূলমন্ত্র–
আত্মহত্যা-জ্বর মৃত্যু নয়, জীবন ঘামছে বিস্ময়ে’
পাশের গাছ থেকে হেসে উঠেছিল রুব্রাম লিলি!
আবৃত্তি
অমিত চক্রবর্তী
প্রতিটি অক্ষর মুখস্থ, ডিসেম্বরে বৃষ্টি আসে
প্রতিবার, সন্দেহ এবং সাবুদ হাতে
বৃষ্টি, ডবল মুখস্থ আমার,
কমা, দাঁড়ি, ঘামমার্ক
সবশুদ্ধ আমি বলতে পারি
তোমার স্যুইসাইড নোট
চোখবুজে, চোখখুলে, এবং
ঘুমে বা জাগ্রত বলতে পারি।
এবং জীবন্ত।
বেদনা
সুশান্ত সেন
এত মালা পরিও না আমার লাগছে
এত ধূপ জ্বালিও না শ্বাস নিতে কষ্ট
এত দূরে দূরে থেকো না সর্বক্ষণ।
তার থেকে দুদন্ড একটু কাছে বোস
একটু বাংলায় কথা বলো
বাংলায় গান গাও
বাংলা ভাষায় গেঁথে তোলো মালা
বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ধূপে
সারা পৃথিবী আমোদিত হোক।
একটু আমার ভাষা ভালবাস।
তোমরা জাননা
কি আমার মনোগত অভিলাষ
তোমরা আত্মহত্যা করোনা।
শয্যার আমি
বৈশালী সেন
ক্লান্ত
ক্লান্তি
ক্লেশ
বিচ্ছেদ
ভালোবাসার ভ্রুণে জন্ম নেওয়া
দিনগুলো মিশেছে
হাজারো দৃষ্টি রেখায়
জোনাকির আঁধার
আলোর মত
ক্ষীণ আশায়
রাত পরির শয্যা মাখামাখি,
রুদ্ধ দ্বারের ওপারে
শুনতে কি পাও
ক্লেদাক্ত ঘ্রাণের ধুকপুকুনি
সজ্জিত লাশকাটা ঘরে শয্যার আমি
চায়ের ভাঁড়
ভাস্কর সরকার
চায়ের ভাঁড়টা ভাঙেনি হঠাৎ —
শেষ চুমুকের আগেই তাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা হয়েছিল
মৃত্যু তার হয়নি
শুধু সবাই স্বাভাবিক ভিড় হয়ে
উদাসীন গান গেয়েছে
ফুঁকেছে সিগার —
আর এসব যত্রতত্র
সবচে নির্মম আত্মহত্যা...
সম্মিলন
শিশির আজম
১)
পূরবীকল্যাণ
আজ এতো আগে আগে সন্ধ্যা চলে এলো
আমি তো দুপুর ঠিকমতো দেখিইনি
কী তাড়াহুড়োয় বেরিয়েছি
সকালকে ভুল গেছি শুভকামনা জানাতে
উড়তে উড়তে কী অবলীলায় মাছিটা চায়ের কাপে
ডুবে গেল
ডুবে গেল
না কি আত্মহত্যা
টেবিলে যে সব সন্ধ্যা নিচু হয়ে বসে
দেখেছি সে-সন্ধ্যাদের কেউ নিজের থাকে না
হাইওয়েতে পুলিশের গাড়ির হুইসেল
একটা পিঁপড়ে চায়ছে আমার তর্জনি ছুঁয়ে উপরে উঠতে
উপরটা কোথায়
আমার নক্ষত্র আমি কাউকে দেবো না
২)
কে জানে মেয়েটি কেন আত্মহত্যা করেছিল
কেবল বাতাস ঘোরাফেরা করে
বস্তাভর্তি থাক থাক সাজানো মাংসপিন্ডের উজানে,
আর অস্থির স্বাধীন সূর্যরশ্মি।
ঘন বেগুনি আলো।
শহরের কোনের এই ঘর আত্মন্মোচনের সুযোগ পেয়ে যায়।
কিন্তু মারাত্মক শান্ত এই পরিবেশ অগণিত গ্রহের সমাহার
বিশাল বিশাল জলের দেয়াল
আর জলের বিন্দু বিন্তু আলোড়নও অমোচনীয় ক্ষতির নির্দেশক।
থাক পড়ে ঘোলাটে কাঁচের চসমা।
কার ক্ষমতা আছে দাও দেখি ওকে যন্ত্রণা যত পারো?
এখন ও পেয়েছে দ্বিধাহীন সত্যিকার চোখ
আর নদীবাহিত নির্জন দুটি হাত
যা অগ্রাহ্য করা অসম্ভব।
৩)
আপেল আর কতক্ষণ সহ্য করবে
কি রং
কি স্বাদ
তর্ক করছি
আকাঙ্ক্ষাহীন মরুপৃথিবীর রাজধানীতে
দোকানে ঝুড়ির ভিতর থেকে
ও
দেখছে আমাদের
অপেক্ষা করছে কখন নিজেকে ধুয়ে
সাফসুতরো হয়ে
হাজির হবে ডাইনিং টেবিলে
শিবালোক দাস
১
আত্মহত্যা বিষয়ক
উল্টোদিকে কেউ নেই
অথচ ভেসে যাচ্ছি কার বাস্তুদোষে ?
উপচে পড়েছে তৃণাঙ্কুর, তবুও নিভৃতে
মায়াপর্ব খেলে গেল দুই হাতে,
রক্তিম করিনি।
যদি একটু ছুঁয়ে দিতাম, দেখতাম দিকচক্র
ভুলে আজও তুলে নিচ্ছ ক্ষয়িষ্ণু পোষাক
যার মুখে ছুঁড়ে ফেলেছি যাবতীয় কাটাকুটি
তোমার স্বাদ ভুলে তারা অন্যত্র সরিয়ে
রেখেছে গোপন নুন…
২.
কথা বলি।
নীরব বৃক্ষের মতো শুধুমাত্র
ধ্রুব হতে যদি আবারো ফিরে
যেতে হয় অক্ষরের কাছে, ছিঁড়ে
নিও সকল প্রসব,
মুছে দিও বর্ষোন্মুখ ক্ষয়…
ভুলে যাব এই নক্ষত্র-ম্লান শরীরে
শূন্য হতে ছলাৎ-শব্দে বয়ে গেছে
যাবতীয় চাঁদ, বিরত জ্যোৎস্না পেরিয়ে !
দুহাতে বেঁচে নেই কোনো মরশুম।
মুক্তগদ্য
বিষাক্ত আলজিব, ফাঁসির হ্যালোজেন, যুক্তাক্ষরের যানবাহন ও মর্গের এপিনেফ্রন চামড়ার মাকড়সা
নিমাই জানা
SKODA LAUNCHES টেরিফিক ভলিউম সূর্যের মারাত্মক আলোকবর্ষীয় ফাঁশুড়ে প্যাঁচ খাওয়ানো মস্তিষ্কের ট্রেনিয়াল মগজ মারাত্মক বিষের মতো বিছানার শ্যাওলা পড়া উনুন। দুই পা ফাঁক করে রাস্তার হলুদ হলুদ কুকুর জন্মান্তরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানের নন অর্গাজমিক আলজিভের কাছে, আত্মহত্যার মেয়াদ ঠিক ১৫ দিন, সাকুল্যান্ট শ্যাওলার মতো গ্যাঁজলে ওঠা এপিনেফ্রন ক্রোকোডাইল হার্ডকোর চকলেট, একস্ট্রা থিনড খ্রীষ্ট অব্দের মতো ভয়ানক ভয়ানক দানব পাঠ্যপুস্তক অপরা সাপেরা কিম্ভূত সোনোগ্রাফির উলঙ্গ বারকোড থেকে লেজ ঝুলিয়ে ধারালো ইঁদুরের মতো এন্টি কিউরেটর ফিউশন চাদর খুলে ঋষিদের নেটপ্যাক নির্ণেয়মান ক্ষুদ্রান্ত পুড়িয়ে হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়ে ধুয়ে ফেলছে রক্তাল্পতা ও বিশ্বস্ত ফাঁসির দড়ির নির্জন এক গ্লাসি চকচকে ও হড়হড়ে মারাত্মক কফি, আমি দানবের আত্মহত্যাকামীর চিৎকার শুনতে শুনতে নিজের বিছানা পরিষ্কার করি দুর্গন্ধের পাতলা বমি করি। নিপিল পিয়েনসিরিং মেনকাকে ডাকি দুর্গন্ধ পচে যাওয়া মাছের অসহিষ্ণু রক্তস্রাব দেখাবো বলে, পুরনো গিরিখাতের ঝুলে থাকা গলার নলির মতো রাতের মেধাবী রাক্ষসেরা নিজেদের অ্যান্টি রাপ্ট ব্লেড থেকে বের করে আনে জন্ম ও জবাইয়ের বিশুদ্ধ শুক্রাণু, শতভিষা মজুমদার ডট এআই কসমিক থার্মোকাটার ডট কম এক্স এক্স আইরোজ ফ্লেভার ক্যাভিটি আপলোড করতেই ফাঁসির দলিলের থেকেও আরো ভয়ানক কালপ্রিট যুক্তাক্ষরের যানবহন গুলো মেসোফিল অন্ধকার থেকে দাঁত খিঁচিয়ে ডাকছে আমার থার্মোস্টেটিক থাম্প্যাডের নষ্ট ঋষিদের মতোই, আমি ক্ষয় লাগা পাথরকুচিতে নামি পারদের হাড়গোড় চুষে খাই, আত্মহত্যায় নষ্ট সেরেবেলাম লাগাই ব্লেড পরিষ্কার করি, নিঃস্বার্থ ঈশ্বরের মাথা কাটা লাশ দেখে হি হি করে হাসি গর্ভপাতে বাধ্য করি নষ্ট হয়ে যাই চুম্বকের ওষুধ গিলে খাই পাপের পাহাড়ে ঢুকি সমুদ্র ফেনায় নামি নিজের বীতশোক বীজকে অস্বীকার করি কারণ গতকাল এন্টি প্রোডাক্টিভ বিষ খেয়ে মর্গে ছটফট করছে শববাড়ি গাড়ির নো আর্থ জোন ক্যানুনা দিয়ে ফিনকি রহস্যের ডার্মাটোলজিস্টটি আমাকে নিয়ে নর্তকের সঙ্গমে যাচ্ছিল লেবার রুমের পায়ুদার ছিঁড়ে ফেলে
পায়ের পাতা দিয়ে ব্ল্যাক স্পট ওয়ালা। কিম্ভুত গঙ্গোত্রী বইছিল জঘন্য ইউরেনাস অবধি, জীবাণু পূর্ণ রাতে বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছে তিনটা বিষাক্ত রৌরব গন্ধর্ব, কতোদিন নিজের কঙ্কালটাকে জিভ দিয়ে আবিষ্কার করিনি, নক্ষত্রবিহীন ষোড়শ জাহান্নামে আমার নর-পায়ুদ্বার জন্ম হবে আবার কিম্ভুত কিরীটির ধনুরাসনে, সুস্বাদু লাগছে ব্যক্তিগত পৌষ্টিকতন্ত্র।
জয়শ্রী দাস
রাতের ভেতর একটা মানুষ বসে থাকে—চুপচাপ, নিজের শব্দগুলোকে কাঁধে নিয়ে।
শহর তখনও জেগে, বাস চলে, আলো জ্বলে, কিন্তু তার ভেতরের জানালাগুলোএক এক করে নিভে যায়।
কেউ শেখায়নিব্যথারও ভাষা আছে, কেউ বলে না—ভেঙে পড়া মানে শেষ নয়।
সে ভাবে,যদি থেমে যাই, তবে কি কোলাহল থামবে? তবে কি বুকের ভেতরের ঝড়নামবে?
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, একটা ছোট্ট ভাবনা অন্ধকারে হাতড়ে উঠে আসে—“আরও একদিন।”
আরও একদিন মানে আরও একবার শ্বাস, আরও একবার সকাল, আরও একবার কারও চোখে চোখ রাখা।
হয়তো উত্তর নেই এখন, হয়তো বোঝা ভীষণ ভারী, তবু থেমে যাওয়ার আগে একটু দাঁড়ানো যায়।
কারণ যে জীবন আজ বোঝা, কাল সে-ই হতে পারে কারও ভরসা, নিজেরই।
কৌশিক সেন
-১-
যতটা বাতাস ছিল, তারও বেশি মনের অসুখ। তারও বেশি গান। স্পর্শ ও কুম্ভের আদানপ্রদান। যতটা বিষাদ ছিল মনে, তারও ঢের বেশি শোক, ঢের বেশি রাতের আকাশ। আরজন্মে নক্ষত্র নয়, একপাতা ঘুমের ওষুধ হবো তোমার বিষাদবিছানায়।
-২-
অবধুত এসো, নোলক পরিয়ে দাও বিরল প্রতিমায়। অগুরুগন্ধের যে ভার, বেঁধে দাও আমার শরীরে। ঘন হোক রাত, সীমারেখা মুছে গেলে তোমাকেই শীত ভাবি বহুকাল। ব্যাধির মুকুট রাখো অস্তমান সৌধশিখরে।
-৩-
এতো গান নয়, পানশালা। খোক্কোস ঢুকে পড়ে স্বপ্নের গভীরে। বাদাবনে শকুনমিছিল। হাওয়া দেয়। নিভু নিভু মোমবাতি ফের জ্বলে, নিভে যায়। বিছানা কি বাসুকিশয়ন! ফিরে যাও, কুশল বিনিময়ের পালা সাঙ্গ হোক তবে!
-৪-
অবধূত, ফাঁস ভেবে মালা পরাও গলায়! বিষ ভেবে শ্বেতচন্দনের অঙ্গরাগ। গ্রাসের গভীরে আঁকো রজ্জুকলস। এসো, বিষতির গেঁথে দাও দীঘল ছাতিতে। পালকে পালকে লেখো হননের আত্মকথন। এসো, ঝাঁপ দিই বিমর্ষ হর্ম্যচূড়া থেকে!
গল্পাণু
রূপকুমার হালদার
দুঃস্বপ্ন
শংকর ব্রহ্ম
অর্ক,
মেঘলা
কথামুখ
জন্ম এবং মৃত্যু দুটিই জীবনের
স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা। কিন্তু আত্মহনন ( suicide) স্বাভাবিক বা স্বতস্ফুর্ত ঘটনা
নয়। এটি সাধারণত তীব্র মানসিক যন্ত্রণা,হতাশা বা মানসিক ব্যাধির ফল। World Health
Organisation (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, আত্মহনন একটি বড় ধরণের জনস্বাস্থ্য সমস্যা
এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধযোগ্য। WHO এর একটি হিসাব বলছে পৃথিবীতে
প্রতিবছর ৭২০,০০০জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এদের ভেতর ৭৩ শতাংশ ঘটে নিম্ন
এবং মধ্য আয়ের দেশের কষ্টে থাকা মানুষেরা। গবেষণায় দেখা যায়,আত্মহননের সাথে প্রায়ই
যেসব বিষয়গুলো জড়িয়ে থাকে তার ভেতর বিষন্নতা (Depression), দ্বিধাবিভক্ত মানসিক
ব্যাধি (Bipolar Disorder),মাদকাসক্তি (Drug addiction),তীব্র মানসিক আঘাত বা
ট্রমা (trauma),দীর্ঘমেয়াদী চাপ (Long term stress),সম্পর্কের ভাঙন (Relationship
breakdown),সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social isolation) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আত্মহনন
প্রাকৃতিক মৃত্যু না,বরং এ মানসিক কষ্টের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। WHO ( world health
organisation) এবং IASP ( international association for suicide prevention)
সংগঠন প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহনন প্রতিরোধ দিবস পালন হয় থাকে। ২০২৫ এ “
changing the narrative on suiside ”...each life lost has profound
social emotional and economic consequences.. ইত্যাদি বক্তব্য হাজির করে ঠেকাতে
চেয়েছে এই অকালমৃত্যু বা আত্মহনন এবং আত্মসমীক্ষাও করেছে।
আত্মহনন প্রবণতা
আত্মহনন প্রবণতা (Suicidal
tendencies) একটি বহুমাত্রিক জটিল মনস্তাত্বিক, সামাজিক এবং বায়োলজিক্যাল বিষয়ও।
ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিস্তর গবেষণা রয়েছে এবং এই প্রবণতার কারণ , প্রভাব
নিয়েও খোঁজ-তালাশ হয়েছে অনেক। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ( Sigmund Freud) মানুষের মন এবং
সে নির্ভর গবেষণাগুলি প্রকাশ্যে আসবার পর অন্যান্য বিষয়ের ভিতর আত্মহনন সংশ্লিষ্ট
বিষয়ে বিশেষ রকমের সাড়া ফেলেছে। উনি মন্তব্য করেছেন- “পৃথিবীতে এমন একজনও মানুষ
পাওয়া যাবেনা যে আত্মহত্যার কথা একবারের জন্যও ভাবেনি”।
মনোবিশ্লেষক
ফ্রয়েড মহোদয় “Life instinct (Eros)” ও Death instinc t(Thanatos)” ধারণা
দিয়েছিলেন। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান অত্মহননকে কোন “স্বাভাবিক মৃত্যু প্রবৃত্তি”
হিসেবে নয়,বরং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট হিসাবেই দেখে। গবেষণায় দেখা গেছে একজন
মানুষের আত্মহনন তার পরিবার,বন্ধু এমনকি সমাজের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব রেখে যায়।
সেখানে তীব্র শোক ও অপরাধ বোধ,দীর্ঘ মেয়াদী মানসিক আঘাত এবং পরিবারের অন্য
সদস্যদের সুস্থ থাকবার ঝুঁকি ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়।
ফ্রয়েডের
“Life instinct (Eros)” ও Death instinct( Thanatos)” ধারণায় দুটি ব্যাপার বিশেষ
উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় উনি দেখিয়েছেন যে মানুষের ভিতর দুটি সত্ত্বা পাশাপাশি
বিদ্যমান। বিশেষ ধরণের কোন ঘটনায় সে তার জীবন থেকে কাউকে সরিয়ে দেবে (murder)
নতুবা সে নিজেই জীবন থেকে সরে যাবে (suicide)। তাই suicide কে Thanatos বা মৃত্যু
প্রবৃত্তি হিসেবেই ধরতে হবে। ফলে মানুষের জীবন প্রবাহে এই দু’ধরণের ধারাই প্রবাহিত
হয়,হতেও থাকবে।
Thanatos বা মৃত্যু
প্রবৃত্তি
মানুষের
আচরণ তার পরিবেশ ও যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar
Disorder) মানসিক স্বাস্থ্য এবং
এই সমস্যা আত্মহনন প্রবণতা বৃদ্ধি সম্পর্কিত বিষয়। মানসিক অসুস্থতা বড় ধরণের
বিষন্নতা,উন্মাদনারা শেষঅব্দি আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে দেয়।
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা পর্যবেক্ষণ করে ফ্রয়েড ১৯২০ সালে ” Beyond the Pleasure
Princple” গ্রন্থে থ্যানাটোস বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। এটি জীবন
প্রবৃত্তি “ইরোস” এর বিপরীত,যা মানুষকে নির্জীব (inanimate) জড় (object) অবস্থায়
ফিরিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগায়। আত্মহত্যা এই প্রবৃত্তির চরম প্রকাশ, যেখানে
অবচেতন মনে ধ্বংসাত্মক আবেগ জমা হয়। যুদ্ধকে ফ্রয়েড দেখতেন Thanatos বা
মৃত্যু-ধ্বংস হিসেবে আবার একই সঙ্গে যুদ্ধোত্ত পুনর্গঠণকে Eros বা Life instinct
হিসেবে দেখেছেন।
আত্মহনন সম্পর্ক
মনস্তাত্বিক তত্ত্ব
আত্মহনন সম্পর্ক বহুমাত্রিক
দৃষ্টিকোণগুলির ভিতর সব চেয়ে বেশি এবং বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় মনস্তাত্বিক
তত্ত্ব (General Psychological Theory)। এর ভেতর উল্লেখযোগ্যভাবে ফ্রেডরিখ স্কিনার
এর ( Frederic Skinner) আচরণবাদ,কার্ল রজার্সের (Karl Rogers) আসল আমি ( real
self) এবং আদর্শ আমি ( ideal self) মধ্যে সামঞ্জস্যের উপর জোর দিয়েছেন
যা মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম অংশ এবং ভিত্তি। আর রয়েছে stress ও coping theory
এবং এ ব্যাপারে লাজারাস ও ফোকম্যান (Lazarus and Folkman)এর প্রবণতা সংশ্লিষ্ট
বিশ্লেষণগুলি। এনাদের মতামত অনুযায়ী মানুষ যখন বড় ধরণের মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়
আর মোকাবিলা করতে অক্ষম বা coping strategy ঠিক করে উঠতে পারেনা তখনই সে বা
তারা আত্মহননের চিন্তার কবলে পড়ে যায়।
এ
নিয়ে গ্রহণযোগ্য কারণসমূহের ভিতর অবদমিত আগ্রাসন,মৃত্যুর নীরব টান,জীবনশক্তির
বিকাশ ব্যাহতি (disruption) রয়েছে। ইগো অগ্রহণযোগ্য আক্রমণাত্মক ইচ্ছাকে অবচেতনে
দমন করে,যা থ্যানাটোসের সাথে মিলে আত্মঘাতী আচরণের রূপ নেয়। অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়াও
এই প্রবণতার মধ্যে পড়ে। মৃত্যুর নীরব টান (the silent pull of death) নিয়ে আলোচনার
অংশে মানুষের হিংসা আত্মনিপীড়ন ইত্যাদি প্রবৃত্তিরই ফসল এবং পরিবেশগত চাপে এসব
মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
আর
রয়েছে জীবনশক্তি বিকাশ ব্যাহতি বা disruption.। এ ধরণের হতাশা বা অসুস্থতায় জীবন
নিয়ে অনুভূতি ক্ষীণ হলে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ে, ফ্রয়েডের নিজের মৃত্যুর
ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মুখের ক্যানসারের (oral cancer)
সঙ্গে লড়াই করছিলেন। যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তাঁর চিকিৎসক বন্ধু ম্যাক্স শুরের
(Max Schur) মরফিনের দেওয়া একটি মারাত্মক ডোজ গ্রহণ করে ইচ্ছামৃত্যু বা( Assisted
Suicide) গ্রহণ করে প্রযাত হ’ন। ফ্রয়েডের এই ইচ্ছা মৃত্যু ( Euthanasia) চিকিৎসা
বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
সেরোটোনিন কি এবং এর প্রভাব
মানব
মস্তিষ্কে এবং শরীরে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার(
neuro transmiter) বা রাসায়নিক বর্তাবাহক,যা মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা, হজম এবং অনুভূতি
নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এ মূলত মস্তিষ্ক ও অন্ত্রে উৎপাদিত হয় ট্রিপটোফ্যান
(Tryptophan) নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে। প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপন্ন হয় অন্ত্র
(intestines) থেকে। বাকিা মস্তিষ্কে বিশেষ করে Raphe nuclei অঞ্চলে তৈরি হয়।একে
প্রায়শই “সুখের হরমোন” বা অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী রসায়ন হিসেবে গণ্যকরা হয়। এর
ভারসাম্যহীনতা উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ নিয়ে এখানে আর একটু
বিস্তৃত আলোচনা রাখছি।
মানসিক
স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত : মস্তিষ্কে সেরোটোনিন কমে গেলে বিষণ্ণতা
(depression),উদ্বেগ (anxiety),প্যানিক ডিজঅর্ডার (Panic disorder) এবং
ওসিডি (অবসসিভ ক্পলসিভ ডিসঅর্ডার) এর মতো মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিষয়টি মানুষের
স্বাস্থ্যের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শারীরিক
কার্যাবলী : এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ( হজম),রক্তজমাট বাঁধা,ক্ষত নিরাময়,হাড়ের
স্বাস্থ্য এবং যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
সেরোটোনিন
সিনড্রোম : শরীরে অত্যধিক সেরোটোনিন তৈরি হলে চাপ কমাতে বা মেজাজ ভালো রাখতে
সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে এবং “সেরোটোনিন সিনড্রোম” সৃষ্টি করে,যার ফলে
কাঁপুনি,ডায়েরিয়া,পেশীর অনমনীয়তা বা খিঁচুনির মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
উৎপাদন
ও নিয়ন্ত্রণ : এটি ট্রিপটোফ্যান নামক প্রোটিন থেকে তৈরি হয় এবং সাধারণত
সূর্যালোক,সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক ব্যায়াম সেরোটোনিন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য
করে।
প্রভাব
:
এর প্রভাবে মানসিক প্রতিক্রিয়ার ভেতর মন ভাল রাখা (Mood regulation),বিষন্নতা
কমানো reduce of depression) উদ্বেগ হ্রাস (Anxiety reduction),আত্মবিশ্বাস
ও প্রশান্তি বৃদ্ধি (increase of confidence and calmness),ঘুমের চক্র (
Sleep-wake cycle) নিয়ন্ত্রণ,হজম প্রক্রিয়ায় অন্ত্রর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা বমি
হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা,আঘাত পেলে রক্তনালীর সংকোচন (vasoconstriction)
ঘটিয়ে রক্তপাত কমাতে সাহায্য করা,ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করা,শরীরে এনার্জি
ব্যালান্স বজায় রাখা,যৌন ইচ্ছা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। এর পাশাপাশি ঝুঁকির ভিতর
অতিরিক্ত উত্তেজনা জ্বর,হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া পেশীতে কাঁপুনি,বিভ্রান্তি (এসব
সাধারণত ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় হতে পারে)
সিফিলিটিক মায়োজেম
সিফিলিটিক
মায়োজেম ক্রনিক রোগের একটা ভিত্তি এবং মানসিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। যদিও
সরাসরি কোন আধুনিক মনোরোগ নয়। কিন্তু এই রোগর শিকার ব্যক্তিদের সবসময় তিক্ততা
,অতৃপ্তি বুদ্ধির খর্বতা এবং আত্মহত্যার ইচ্ছা দেখা যায়। খুন বা আত্মবিনাশের
প্রবণতাও যথেষ্ট থাকে। ক্ষিপ্রতা হঠকারিতা ভীতি উৎকন্ঠা এদের তাড়া করে ফেরে আর
মানসিক বিভ্রান্তিতে ডুবে যায়। শরীরে বিকলাঙ্গতা, শুষ্ক হয়ে পড়া, অস্থিরতা এমনকি
ঝড়বৃষ্টিসহ ঝতু পরিবর্তনে এদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একান্ত নিজের পরিসরে এরা
নির্জনতা খুঁজে নেয় এবং আত্মহননের দিকে অগ্রসর হয়।
অন্যকোন প্রাণিদের ভিতর
আত্মহনন
কৌতুুহল
আছে যে মানুষ বাদে অন্যকোন প্রাণিদের ভিতর আত্মহনন প্রবণতা আছে কিনা। উত্তর হ’ল-
না নেই। অন্যান্য প্রাণিদের মধ্যে সত্যিকারের আত্মহত্যার প্রবণতা নেই যেমনটা
মানুষের মধ্যে দেখা যায়। সচেতনভাবে মৃত্যুর ইচ্ছা পরিকল্পিত একটা কাজ। তবে কিছু
প্রাণির আচরণ যেমন তিমি বা ডলফিনের সমুদ্রতীরে আটকে পড়া,লেমিংদের দলবেঁধে চলা বা
বন্দী ডলফিনের শ্বাসবন্ধ করে নেওয়া মানুষের আত্মহত্যার মতো মনে হলেও এগুলো
মূলত জৈবিক,পরিবেশগত বা সংস্থান সম্পর্কিত কারণে ঘটে। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে মানসিক চাপ
(কর্টিকল হরমমোনের বৃদ্ধি) বা অভিযোজনের অক্ষমতা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তুু এসব
সচেতন আত্মহত্যার মতো জটিল মানসিকতার প্রকাশ বলে প্রমাণিত নয়।
পশু
মনোরোগ বিদ্যা (animal psychopathology) অনুসারে প্রাণিরা মানুষের মতো উচ্চতর
স্ব-চেতনতা (self awareness) ছাড়াই টিকে আছে। আত্মহত্যার মৌলিিক শর্তের পরিবর্তে
প্রবৃ্ত্তিগত (instinctual) বা শিক্ষিত আচরণ (educated behaviour) অথবা সেরোটোনিন
সম্পর্কযুক্ত (serotonin related) হতাশার মতো নিউরোকেমিক্যল ( neurochemical)
প্রক্রিয়া প্রাণীদের মধ্যে আছে কিন্তু তা তার আত্মহত্যার পরিকল্পনায় রূপ
নিতে পারেনা।
আত্মহনন ও সামাজিক সংযুক্তি
সামাজিক
সংযুক্তি বিষয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ইমিল দুরখেইম (Emile Durkheim) তাঁর প্রখ্যাত গদ্য
“Suicide এ আত্মহননের প্রবণতার সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামাজিক ঐক্য
সংযোগের অভাবকে দায়ী করেছেন”। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের শিথিলতা বা বিচ্ছিন্নতাও
আত্মহননের প্রবণতা বাড়ায় বলে তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন।
সামাজিক-অর্থনৈতিক
( socio-economic) কারণও আত্মহত্যর অন্যতম উৎস। সমাজের দুর্বল অংশ, বা সমাজ
বিচ্ছিন্ন মানুষ বা আর্থিক সংকটে পড়ে যাওয়া মানুষ দীর্ঘ মেয়াদ অব্দি কষ্ট এবং
মানসিক চাপ বহন করে যেতে যেতে একটা সময় হেরে যায়,তখন সে নিজেকে জীবন থেকে
বিচ্ছিন্ন করে নেয়-আসলে, একেই আত্মহনন বলা হয়।
পূর্ব অনুচ্ছেদে আত্মহননের
প্রবণতার জন্য দায়ী সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ইমিল দুরখেইম
(Emile Durkheim) তাঁর গদ্যে মানুষের সামাজিক ঐক্য সংযোগের অভাবকে দায়ী করেছেন”।
সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের শিথিলতা বা বিচ্ছিন্নতা ও কতকগুলি বিষয়ের ভিতর পরিবেশগত
চাপও উল্লেখ করেছি। অন্যদিকে রাষ্ট্রের হাতে থাকা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সমানভবে
দায়ী। দারিদ্র্য,ঋণের চাপ,বেকারত্বের মতো বিষয়গুলিও আত্মহত্যার বড় কারণ। রাষ্ট্রের
অর্থনৈতিক নীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যর্থতাও এর অন্যতম কারণ। প্রতিদিন গতর
খাটিয়ে টিকে থাকা মানুষদের ভিতর, ফসলের দাম না পাওয়া ঋণ জর্জরিত গরীব চাষীদের ভিতর
এ প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে,আর গ্রামীণ এলাকায় এসব হামেশাই ঘটছে। পাশাপাশি সমাজিক
বৈষম্য, নির্যাতন,যৌন নির্যাতন,ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকার এবং রাষ্ট্রের ঔদাসিন্য বা
ব্যর্থতা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষের ওপর শোষণ এবং
অবিচার আত্মহননের প্রবণতাকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলেছে।
মানবাধিকার সংগঠন, WHO এর
ভূমিকা
জাতীয়
মানবাধিকার কমিশন (NHRC) ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়েছে।এই সংগঠন মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার
রক্ষায় কাজ করে এবং আত্মহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগও তদন্ত করে। এটি সরকারকে সুপারিশ
করে এবং সচেতনতা বাড়ানোর কাজে যুক্ত।এছাড়া বিভিন্ন এনজিও কাউন্সেলিং,হেল্পলাইন এবং
সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রোগ্রাম নিয়ে থাকে যা সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে।
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা WHO ভারতে আত্মহনন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
থাকে,বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং জাতীয় নীতি প্রনয়ণে সহায়তা,,সচেতনতা
বাড়ানো ইত্যাদির কাজে। সংগঠনটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল (NSPS) তৈরিতে
সহায়তা করেছে যা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো এবং ঝুঁকি চিহ্নিতকরণের ওপর জোর দিয়ে
থাকে। এরা সরকারের সঙ্গে মিলে Helpline, Counselling Programme, স্কুলভিত্তিক
কর্মসুচি নিয়ে সচেতনতার কাজ করতে থাকে। এবাদেও WHO মানসিক স্বাস্থ্য
সংশ্লিষ্ট গ্যাপ বিশ্লেষণ করে এবং Training Module প্রদান করে থকে,যাতে প্রাথমিক
স্বাস্থ্য কর্মীরা আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতার কাজে দক্ষ হয়। এটি ডেটা সংগ্রহ
এবং নীতি মূল্যায়ণে সহায়তা করে।
অন্যান্য
আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিতর UNICEF ভারতে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায়
কাজ করছে। স্কুল ভিত্তিক প্রোগ্রাম এবং অভিভাবকদের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর কাজও এদের
অন্যতম বিষয়। মানবাধিকার সংস্থা যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশন্যাল (Amnesty
International) মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এবং সরকারের
উপর চাপ সৃষ্টিও করে থাকে।
আত্মহনন প্রতিরোধ বা হ্রাস
ভারত
সরকার এবং মানবাধিকর সংগঠনগুলো আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
গ্রহণ করছে। জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল এবং সংশ্লিষ্ট আইন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ
যোগ্য। ২০২২ সালে প্রথম স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক জাতীয় কৌশল প্রকাশ
করেছে। এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের ভিতর আত্মহননের হার ১০ শতাংশ হ্রাস করা। একাজে
সার্ভেইল্যান্স বাড়ানো,জেলায় জেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু,পরিকল্পনা
গ্রহণ বা অপরাধ কমানোর চেষ্টা চলেছে।
একটা
সময় আত্মহনন প্রচেষ্টাকে অপরাধ হিসাবে রাষ্ট্র বিবেচনা করত কিন্তু ২০১৭ সালে আইন
সংশোধন করে একে অপরাধমুক্ত করেছে এবং পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান করেছে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জাতীয় টাস্কফোর্স
গঠিত হয়েছে যা পরামর্শ ও সচেতনতার জন্য ২০২৫ সালে একটি ওয়েবসাইটও চালু
করেছে। এছাড়া টেলি মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইনও চালু হয়েছে। তবু আত্মহত্যা
সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্যান্য যেকোন বিষয়ের ভিতর বহুমাত্রিক জটিল মনস্তাত্বিক, সামাজিক এবং
বায়োলজিক্যাল বিষয়। তাই এ নিয়ে নিবিড় চর্চা,জনসচেতনতা নির্মাণ
রাষ্ট্র-আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা উচিৎ।
___________________________________________________________________________
উৎস : 1. Question to various AI, overview relating
to critical
psychological angle of mind
2.
“Beyond the pleasure principles” by Sigmund
3.
Wiki : Emile Durkheim
4.
Wiki : Frederic Skinner
5.
wiki: Lazarus and Folkman
জি কে নাথ
মরিতে চাহিনা আমি
অনিলেশ গোস্বামী
হিমাদ্রি শেখর দাস

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন