মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

কবিতার আলো মাসিক ব্লগজিন - মার্চ, ২০২৬ সংখ্যা, বিষয় - আত্মহত্যা...?


                                                  প্রচ্ছদ ঋণ ঃ- অদিতি সেনগুপ্ত 
    



                      সূচিপত্র


                      কবিতাভিত্তিক 

                      দীপ্র দাসচৌধুরী

                      অরিত্র দ্বিবেদী

                      রহিত ঘোষাল

                      পিউলি মুখোপাধ্যায় 

                      অমিত চক্রবর্তী 

                      সুশান্ত সেন

                      বৈশালী সেন

                      ভাস্কর সরকার


                      সম্মিলন

                      শিশির আজম

                      শিবালোক দাস


                      মুক্তপদ্য

                      নিমাই জানা

                      জয়শ্রী দাস

                      কৌশিক সেন


                      গল্পাণু

                      রূপকুমার হালদার


                     ছোট গল্প

                      শঙ্কর ব্রহ্ম


                      চিঠি

                      অদিতি সেনগুপ্ত


                      আনুপূর্বিক 

                      মানিক পণ্ডিত 

                      জি কে নাথ

                      অনিলেশ গোস্বামী 

                      হিমাদ্রী শেখর দাস


-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

কবিতাভিত্তিক 

উঠোন

দীপ্র দাসচৌধুরী


অকাল শ্রাবণ মাখা বিভেদের ছাদ

মাথার ওপরে ধরে কষ্টের ছাতা

ভেসে যায় দুই কূল-

                    অকাল স্রোতের টানে নীল জ্যোৎস্নায়!


অবসাদ? নাকি কিছু অলীক আকাঙ্খা?

ছোঁয়নি যা মগজের গোপন কুটির...


শুধু হৃদয় থেকে হৃদয় ছোঁয়াচে রোগের মতো

গভীর ব্যঞ্জনাময় উড়ান,

গলায় ফাঁস আর অতলে ডুবে যাওয়া

সময় জানে-

            অকালে ঝরে যাওয়া ফুলের দাম।


কিন্তু বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য এখনও বোঝেনি

সে'সব অলিখিত দলিলের নিশীথযাপন

কারণ, রাতের ঝরা ফুলের হিসেব-

                                       উঠোন রাখে না,


স্বচ্ছ সকালে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় অতীত

বাড়ির শুদ্ধিকরণের জন্য...



এত প্রকাশ্য শিক্ষার প্রতিষ্ঠায়
আমিই অশিক্ষিত 

অরিত্র দ্বিবেদী 

আমি তো অবৈতনিক, মানহীন জান্তব
কী হবে আমার পরামর্শে?
হলাহল রাতের আকাশে
নেচে ওঠে দূরদর্শী জঙ্গলের দূত
লোমশ অষ্টপা মেলা, শাণিত অস্ত্রের নখ এসেছে বেরিয়ে
যোনিযন্ত্র খুলে রেখে চোখ ভরে খেলাচ্ছে বিদ্যুৎ

কাব্যিক মেঘের সূর্য, প্রজ্জ্বলন্ত অশনি সংকেত
দিগন্তে আগুন লাগে, ছাই নমস্কারে
তোমাদের সভ্য দেশে জেগে ওঠে জন্মঘাস পুঁজিবাদী স্পর্শে

আমি তো অবৈতনিক, মানহীন জান্তব 
কী হবে আমার পরামর্শে?


শেষ চিঠি

রহিত ঘোষাল

আমাকে ডাকছে,
খুব কাছ থেকে আসছে সেই ডাক,
বাড়ির একদিকে গোলাপের বাগান,
অন্যদিকে আম-লিচুর ঘন জঙ্গল,
আমি শুনতে পাই, আমাকে কেউ একটা ডাকছে,
মাকে বলেছি, মা বিশ্বাস করেনি,
পুকুরের ওদিকটায় পাকুড় গাছ—
দুপুরবেলায় বিষাদ জমে থাকে,
মনে হয় আত্মহত্যা করি,
উজানে ভেসে যাক দেহ,
তারপর যে পথ পড়ে থাকবে—
শিউরে ওঠে সুনসান চিরল বোবা সে পথ...


হাসি 

পিউলি মুখোপাধ্যায় 


হাঁটার প্রান্তে রোজ শ্মশান জড়িয়ে ঘুম 

ঘন্টা, দিন, মাস, কয়েকবছর… অবিরাম প্রবাহ 

একটা দড়ি ঝুলিয়েছিলে ফ্যানের সঙ্গে

আগেই উড়িয়ে দিয়েছ আত্মার ভাঙা ভাঙা অংশ 

অনুমোদনে স্বাক্ষরের অধিকার কেড়েছিল কেউ 

ভীষণ কাছের বন্ধুত্ব পেরিয়ে অস্তিত্বে মিশে 

তার নির্দোষ জীবনযাপনও অস্থির, প্রভাবের নেশায় 

দুঃখে পাথর, মুড সুইং, শেষে পালিয়ে যাওয়া 

হঠাৎ দূরভাষে বিনা মেঘে আতঙ্কের বৃষ্টি

কাছের এক ভাই বেছে নিয়েছে নির্বাসন জীবন থেকে 

অবাক হাতে উপকরণ সরিয়ে 

এলে চুল্লির সামনে 

কল্পনায় নিজের দেহ ট্রে-র ওপর, যদি হতো সত্যি?

চারপাশে কান্নার শব্দে জট পাকাচ্ছে নিউরোন 

যারা থেকে গেল, তাদের কি কিছু হারিয়েছে?


বাড়ির দিকে পা ফেলতে গিয়ে তুমি 

ধূপকাঠি দিয়ে লিখলে নদীর পাড়ে, ‘প্রাপ্তি ছিনিয়ে নিতে হয়, অথবা আনন্দ… কষ্ট ভাসিয়ে রেখে গেলাম মূলমন্ত্র– 

আত্মহত্যা-জ্বর মৃত্যু নয়, জীবন ঘামছে বিস্ময়ে’ 


পাশের গাছ থেকে হেসে উঠেছিল রুব্রাম লিলি!


আবৃত্তি

অমিত চক্রবর্তী


প্রতিটি অক্ষর মুখস্থ, ডিসেম্বরে বৃষ্টি আসে

প্রতিবার, সন্দেহ এবং সাবুদ হাতে

বৃষ্টি, ডবল মুখস্থ আমার,

কমা, দাঁড়ি, ঘামমার্ক

সবশুদ্ধ আমি বলতে পারি

তোমার স্যুইসাইড নোট

চোখবুজে, চোখখুলে, এবং

ঘুমে বা জাগ্রত বলতে পারি।

এবং জীবন্ত। 



বেদনা

সুশান্ত সেন


এত মালা পরিও না আমার লাগছে

এত ধূপ জ্বালিও না শ্বাস নিতে কষ্ট

এত দূরে দূরে থেকো না সর্বক্ষণ।


তার থেকে দুদন্ড একটু কাছে বোস

একটু বাংলায় কথা বলো 

বাংলায় গান গাও 

বাংলা ভাষায় গেঁথে তোলো মালা

বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ধূপে

সারা পৃথিবী আমোদিত হোক।

একটু আমার ভাষা ভালবাস।


তোমরা জাননা 

কি আমার মনোগত অভিলাষ 

তোমরা আত্মহত্যা করোনা।


শয্যার আমি 

বৈশালী সেন 


ক্লান্ত 

ক্লান্তি 

ক্লেশ 

বিচ্ছেদ 


ভালোবাসার ভ্রুণে জন্ম নেওয়া 

দিনগুলো মিশেছে 

হাজারো দৃষ্টি রেখায়


জোনাকির আঁধার 

আলোর মত  

ক্ষীণ আশায় 

      রাত পরির শয্যা মাখামাখি,


রুদ্ধ দ্বারের ওপারে 

শুনতে কি পাও 

ক্লেদাক্ত ঘ্রাণের ধুকপুকুনি 


সজ্জিত লাশকাটা ঘরে   শয্যার আমি

 

চায়ের ভাঁড়  

ভাস্কর সরকার


চায়ের ভাঁড়টা ভাঙেনি হঠাৎ —

শেষ চুমুকের আগেই তাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা হয়েছিল

মৃত্যু তার হয়নি

শুধু সবাই স্বাভাবিক ভিড় হয়ে 

উদাসীন গান গেয়েছে 

ফুঁকেছে সিগার —


আর এসব যত্রতত্র  

সবচে নির্মম আত্মহত্যা... 


 সম্মিলন


শিশির আজম

১)

পূরবীকল্যাণ


আজ এতো আগে আগে সন্ধ্যা চলে এলো

আমি তো দুপুর ঠিকমতো দেখিইনি


কী তাড়াহুড়োয় বেরিয়েছি

সকালকে ভুল গেছি শুভকামনা জানাতে


উড়তে উড়তে কী অবলীলায় মাছিটা চায়ের কাপে

ডুবে গেল


ডুবে গেল

না কি আত্মহত্যা


টেবিলে যে সব সন্ধ্যা নিচু হয়ে বসে

দেখেছি সে-সন্ধ্যাদের কেউ নিজের থাকে না


হাইওয়েতে পুলিশের গাড়ির হুইসেল

একটা পিঁপড়ে চায়ছে আমার তর্জনি ছুঁয়ে উপরে উঠতে


উপরটা কোথায়

আমার নক্ষত্র আমি কাউকে দেবো না


২)

কে জানে মেয়েটি কেন আত্মহত্যা করেছিল


লাশকাটা ঘরে পড়ে রয়েছে মেয়েটি, একা সত্তাহীন পৃথিবীর!

কেবল বাতাস ঘোরাফেরা করে

বস্তাভর্তি থাক থাক সাজানো মাংসপিন্ডের উজানে,

আর অস্থির স্বাধীন সূর্যরশ্মি।


ঘন বেগুনি আলো।

শহরের কোনের এই ঘর আত্মন্মোচনের সুযোগ পেয়ে যায়।


কিন্তু মারাত্মক শান্ত এই পরিবেশ অগণিত গ্রহের সমাহার

বিশাল বিশাল জলের দেয়াল

আর জলের বিন্দু বিন্তু আলোড়নও অমোচনীয় ক্ষতির নির্দেশক।


থাক পড়ে ঘোলাটে কাঁচের চসমা।

কার ক্ষমতা আছে দাও দেখি ওকে যন্ত্রণা যত পারো?


এখন ও পেয়েছে দ্বিধাহীন সত্যিকার চোখ

আর নদীবাহিত নির্জন দুটি হাত

যা অগ্রাহ্য করা অসম্ভব।


৩)

আপেল আর কতক্ষণ সহ্য করবে


কি রং

কি স্বাদ

তর্ক করছি

আকাঙ্ক্ষাহীন মরুপৃথিবীর রাজধানীতে


দোকানে ঝুড়ির ভিতর থেকে

দেখছে আমাদের


অপেক্ষা করছে কখন নিজেকে ধুয়ে

সাফসুতরো হয়ে

হাজির হবে ডাইনিং টেবিলে


শিবালোক দাস

আত্মহত্যা বিষয়ক 


উল্টোদিকে কেউ নেই

অথচ ভেসে যাচ্ছি কার বাস্তুদোষে ?


উপচে পড়েছে তৃণাঙ্কুর, তবুও নিভৃতে 

মায়াপর্ব খেলে গেল দুই হাতে,

রক্তিম করিনি।


যদি একটু ছুঁয়ে দিতাম, দেখতাম দিকচক্র 

ভুলে আজও তুলে নিচ্ছ ক্ষয়িষ্ণু পোষাক 

যার মুখে ছুঁড়ে ফেলেছি যাবতীয় কাটাকুটি


তোমার স্বাদ ভুলে তারা অন্যত্র সরিয়ে 

রেখেছে গোপন নুন…


২.

কথা বলি।

নীরব বৃক্ষের মতো শুধুমাত্র 

ধ্রুব হতে যদি আবারো ফিরে

যেতে হয় অক্ষরের কাছে, ছিঁড়ে

নিও সকল প্রসব,

মুছে দিও বর্ষোন্মুখ ক্ষয়…


ভুলে যাব এই নক্ষত্র-ম্লান শরীরে 

শূন্য হতে ছলাৎ-শব্দে বয়ে গেছে 

যাবতীয় চাঁদ, বিরত জ্যোৎস্না পেরিয়ে !


দুহাতে বেঁচে নেই কোনো‌ মরশুম।



মুক্তপদ্য


বিষাক্ত আলজিব, ফাঁসির হ্যালোজেন, যুক্তাক্ষরের যানবাহন ও মর্গের এপিনেফ্রন চামড়ার মাকড়সা

নিমাই জানা 


SKODA LAUNCHES টেরিফিক ভলিউম সূর্যের মারাত্মক আলোকবর্ষীয় ফাঁশুড়ে প্যাঁচ খাওয়ানো মস্তিষ্কের ট্রেনিয়াল মগজ মারাত্মক বিষের মতো বিছানার শ্যাওলা পড়া উনুন। দুই পা ফাঁক করে রাস্তার হলুদ হলুদ কুকুর জন্মান্তরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে শ্মশানের নন অর্গাজমিক আলজিভের কাছে, আত্মহত্যার মেয়াদ ঠিক ১৫ দিন, সাকুল্যান্ট শ্যাওলার মতো গ্যাঁজলে ওঠা এপিনেফ্রন ক্রোকোডাইল হার্ডকোর চকলেট, একস্ট্রা থিনড খ্রীষ্ট অব্দের মতো ভয়ানক ভয়ানক দানব পাঠ্যপুস্তক অপরা সাপেরা কিম্ভূত সোনোগ্রাফির উলঙ্গ বারকোড থেকে লেজ ঝুলিয়ে ধারালো ইঁদুরের মতো এন্টি কিউরেটর ফিউশন চাদর খুলে ঋষিদের নেটপ্যাক নির্ণেয়মান ক্ষুদ্রান্ত পুড়িয়ে হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়ে ধুয়ে ফেলছে রক্তাল্পতা ও বিশ্বস্ত ফাঁসির দড়ির নির্জন এক গ্লাসি চকচকে ও হড়হড়ে মারাত্মক কফি, আমি দানবের আত্মহত্যাকামীর চিৎকার শুনতে শুনতে নিজের বিছানা পরিষ্কার করি দুর্গন্ধের পাতলা বমি করি। নিপিল পিয়েনসিরিং মেনকাকে ডাকি দুর্গন্ধ পচে যাওয়া মাছের অসহিষ্ণু রক্তস্রাব দেখাবো বলে, পুরনো গিরিখাতের ঝুলে থাকা গলার নলির মতো রাতের মেধাবী রাক্ষসেরা নিজেদের অ্যান্টি রাপ্ট ব্লেড থেকে বের করে আনে জন্ম ও জবাইয়ের বিশুদ্ধ শুক্রাণু, শতভিষা মজুমদার ডট এআই কসমিক থার্মোকাটার ডট কম এক্স এক্স আইরোজ ফ্লেভার ক্যাভিটি আপলোড করতেই ফাঁসির দলিলের থেকেও আরো ভয়ানক কালপ্রিট যুক্তাক্ষরের যানবহন গুলো মেসোফিল অন্ধকার থেকে দাঁত খিঁচিয়ে ডাকছে আমার থার্মোস্টেটিক থাম্প্যাডের নষ্ট ঋষিদের মতোই, আমি ক্ষয় লাগা পাথরকুচিতে নামি পারদের হাড়গোড় চুষে খাই, আত্মহত্যায় নষ্ট সেরেবেলাম লাগাই ব্লেড পরিষ্কার করি, নিঃস্বার্থ ঈশ্বরের মাথা কাটা লাশ দেখে হি হি করে হাসি গর্ভপাতে বাধ্য করি নষ্ট হয়ে যাই চুম্বকের ওষুধ গিলে খাই পাপের পাহাড়ে ঢুকি সমুদ্র ফেনায় নামি নিজের বীতশোক বীজকে অস্বীকার করি কারণ গতকাল এন্টি প্রোডাক্টিভ বিষ খেয়ে মর্গে ছটফট করছে শববাড়ি গাড়ির নো আর্থ জোন ক্যানুনা দিয়ে ফিনকি রহস্যের ডার্মাটোলজিস্টটি আমাকে নিয়ে নর্তকের সঙ্গমে যাচ্ছিল লেবার রুমের পায়ুদার ছিঁড়ে ফেলে

পায়ের পাতা দিয়ে ব্ল্যাক স্পট ওয়ালা। কিম্ভুত গঙ্গোত্রী বইছিল জঘন্য ইউরেনাস অবধি, জীবাণু পূর্ণ রাতে বিস্কুট ডুবিয়ে খাচ্ছে তিনটা বিষাক্ত রৌরব গন্ধর্ব, কতোদিন নিজের কঙ্কালটাকে জিভ দিয়ে আবিষ্কার করিনি, নক্ষত্রবিহীন ষোড়শ জাহান্নামে আমার নর-পায়ুদ্বার জন্ম হবে আবার কিম্ভুত কিরীটির ধনুরাসনে, সুস্বাদু লাগছে ব্যক্তিগত পৌষ্টিকতন্ত্র।  


থেমে যাওয়ার আগে

জয়শ্রী দাস 


রাতের ভেতর একটা মানুষ বসে থাকে—চুপচাপ, নিজের শব্দগুলোকে কাঁধে নিয়ে।

শহর তখনও জেগে, বাস চলে, আলো জ্বলে, কিন্তু তার ভেতরের জানালাগুলোএক এক করে নিভে যায়।

কেউ শেখায়নিব্যথারও ভাষা আছে, কেউ বলে না—ভেঙে পড়া মানে শেষ নয়।

সে ভাবে,যদি থেমে যাই, তবে কি কোলাহল থামবে? তবে কি বুকের ভেতরের ঝড়নামবে?

কিন্তু অদ্ভুতভাবে, একটা ছোট্ট ভাবনা অন্ধকারে হাতড়ে উঠে আসে—“আরও একদিন।”

আরও একদিন মানে আরও একবার শ্বাস, আরও একবার সকাল, আরও একবার কারও চোখে চোখ রাখা।

হয়তো উত্তর নেই এখন, হয়তো বোঝা ভীষণ ভারী, তবু থেমে যাওয়ার আগে একটু দাঁড়ানো যায়।

কারণ যে জীবন আজ বোঝা, কাল সে-ই হতে পারে কারও ভরসা, নিজেরই।

 

শ্যামসমান

কৌশিক সেন

-১-

যতটা বাতাস ছিল, তারও বেশি মনের অসুখ। তারও বেশি গান। স্পর্শ ও কুম্ভের আদানপ্রদান। যতটা বিষাদ ছিল মনে, তারও ঢের বেশি শোক, ঢের বেশি রাতের আকাশ। আরজন্মে নক্ষত্র নয়, একপাতা ঘুমের ওষুধ হবো তোমার বিষাদবিছানায়।

-২-

অবধুত এসো, নোলক পরিয়ে দাও বিরল প্রতিমায়। অগুরুগন্ধের যে ভার, বেঁধে দাও আমার শরীরে। ঘন হোক রাত, সীমারেখা মুছে গেলে তোমাকেই শীত ভাবি বহুকাল। ব্যাধির মুকুট রাখো অস্তমান সৌধশিখরে।

-৩-

এতো গান নয়, পানশালা। খোক্কোস ঢুকে পড়ে স্বপ্নের গভীরে। বাদাবনে শকুনমিছিল। হাওয়া দেয়। নিভু নিভু মোমবাতি ফের জ্বলে, নিভে যায়। বিছানা কি বাসুকিশয়ন! ফিরে যাও, কুশল বিনিময়ের পালা সাঙ্গ হোক তবে!

-৪-

অবধূত, ফাঁস ভেবে মালা পরাও গলায়! বিষ ভেবে শ্বেতচন্দনের অঙ্গরাগ। গ্রাসের গভীরে আঁকো রজ্জুকলস। এসো, বিষতির গেঁথে দাও দীঘল ছাতিতে। পালকে পালকে লেখো হননের আত্মকথন। এসো, ঝাঁপ দিই বিমর্ষ হর্ম্যচূড়া থেকে!




গল্পাণু

টিকটিকির তিন ডাক 

রূপকুমার হালদার 


গ্রামের বাঁশবাগানের দিক থেকে একটা শেয়াল ডেকে উঠল। রাত দুটো। বাবাইয়ের ঘরের জানলাটা খোলা। দূরে কোথাও একটা সানাই বাজছে। সানাইয়ের সুর সাধারণত আনন্দের হয়, কিন্তু আজ বাবাইয়ের মনে হচ্ছে, ওটা সানাই নয়, ওটা আসলে কোনো এক মৃত আত্মার কান্নার শব্দ।
কাল রূপার বিয়ে। গ্রামের সবচেয়ে চঞ্চল, প্রাণবন্ত মেয়েটা কাল সকালে একটা সরকারি স্ট্যাম্প মারা কাগজে সই করে নিজের মৃত্যুতে সিলমোহর দেবে।

বাবাই আজ কাঁদছে না। ও শুধু ভাবছে, মানুষ কত সহজে আত্মহত্যা করতে পারে! বিষ খেয়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে মরাটা তো বড্ড সহজ। কিন্তু রোজ একটু একটু করে নিজের বিবেককে মেরে ফেলা, নিজের ভালোবাসাকে গলা টিপে ধরা—এটাই তো আসল আত্মহত্যা। আর রূপা ঠিক সেটাই করল! 

মনে পড়ে সেই শিবরাত্রির রাত? নির্জলা উপোস করে, ভিজে চুলে রূপা এসে বাবাইয়ের হাত ধরেছিল। বলেছিল, "মহাদেবের কাছে আজ শুধু তোকেই চেয়েছি। তুই ছাড়া আমার মুক্তি নেই।" দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার ঘাটে মা কালীর সামনে দাঁড়িয়ে যে মেয়েটা মানত করেছিল, সেই মেয়েটা আজ কোথায়?

সেদিন মাঝরাতে বাবাই আর রূপা যখন ফোনে ফিসফিস করে স্বপ্নের ঘর বানাচ্ছিল, তখন দেওয়ালের কোণ থেকে একটা টিকটিকি ডেকে উঠেছিল... 'টিক... টিক... টিক'।
রূপা খিলখিল করে হেসে বলেছিল, "শুনলি বাবাই? তিনবার ডাকল! আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। এটা ভগবানের ইশারা।"
বাবাই বিশ্বাস করেছিল। ও জানত না, এই দেশে ভগবানের ইশারার চেয়ে মাসের শেষের সরকারি পে-স্লিপের জোর অনেক বেশি! 

যেই মুহূর্তে একটা সরকারি চাকরি করা পাত্রের সম্বন্ধ এল, রূপার বাবা-মা—যারা সমাজের চোখে খুব 'ভদ্র'—তাঁরা আসলে দালাল হয়ে গেলেন। নিজের মেয়েকে নিলামে তুললেন। আর রূপা? যে মেয়েটা বাবাইয়ের ভাঙা ছাতার তলায় ভিজে বলেছিল "কোটি টাকার সুখ", সেও একটা নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের লোভে নিজেকে বেচে দিল! 
বাবাই আজ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, কাল যখন রূপা লাল বেনারসি পরে মণ্ডপে বসবে, তখন ওটা আসলে বিয়ের আসর হবে না, ওটা হবে একটা শ্মশান। রূপা নামের ওই রক্তমাংসের শরীরটা হয়তো বেঁচে থাকবে, সে সরকারি বরের ঘর করবে, রান্না করবে, কিন্তু তার ভেতরের প্রেমিকা সত্তাটা আজ রাতেই আত্মহত্যা করল।

হঠাৎ বাবাইয়ের ঘরের কোণ থেকে সেই টিকটিকিটা ডেকে উঠল... 'টিক... টিক... টিক'। বাবাই অন্ধকারে ম্লান হাসল। বিড়বিড় করে বলল, "আর মিথ্যে ডাকিস না রে। তুইও জানিস, আর আমিও জানি—রূপা আর বেঁচে নেই। ও এখন এক সরকারি লাশের নাম।"


ছোট গল্প

দুঃস্বপ্ন

শংকর ব্রহ্ম


'ভালবেসে তুমি তার কাছে কিবা চাও?  
সুখ নাকি কষ্ট? সেটা আগে ভেবে নাও।
ভালবেসে যদি তুমি কষ্ট নাহি পাও
তবে সেটা ভালবাসা কিনা,
                       মনে আগে জেনে নাও।'            


                         রাত বারটার পর শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা, নিয়েই ফেলল অধ্যাপক বিনোদ মজুমদার। 

না আর নয়।  অনেক হয়েছে। অণিমা রায় তার মেয়ের মতো। তবু তাকে ছাড়া বাঁচবে না সে।

বিচার বুদ্ধি হারিয়ে, এতোটা ভালবেসে ফেলেছে সে তার ছাত্রীকে ।

                 রাত এখন গভীর। কুকুরগুলো ডাকতে ডাকতে ঝিমিয়ে পড়েছে। কিংবা হয়তো ঘুমিয়েও পড়ছে। জেগে নেই কেউ। 

                 ফ্যান থেকে ফাঁসটা ঝুলিয়ে গলায় পরানোই আছে। শুধু টুলটা একটু পা দিয়ে ঠেলে দিলেই হলো। এত ভালবেসেছে অণুকে, এখন মরণ ছাড়া আর কোন গতি নেই তার। 

                  কৃষ্ণও তো রাধাকে ভালবেসে ছিল। রাধা সম্পর্কে হতো কৃষ্ণের মামী। আর বয়সের ব্যবধানও তাদের মধ্যে খুব একটা কম ছিল না।  তাদের প্রেম নিয়ে কত অমর কাব্য লেখা হয়েছে যুগে যুগে। তাদেরটা ছিল লীলা। আর আমি মেয়ের বয়সী কারও সাথে প্রেম করলে, সেটা হয়ে যায় বিলা। মনে মনে ভাবল সে। কী বিচার এই পঙ্গু সমাজ-ব্যবস্থার ! 

                  টুলটা পায়ের ধাক্কায় ঠেলে দেবে এমন সময় আচমকা ঘরে ঢুকল কে যেন। চমকে উঠল সে। 

-  কে ?

-  আমি তোমার বিবেক 

-  কি চাই তোমার ?  কেন  এসেছো এখানে?

-  তোমাকে সাহায্য করতে

-  কি ভাবে ?

-   টুলটা আমি সরিয়ে নিচ্ছি, তোমার আর কষ্ট করে টুলটা সরাতে হবে না।


-  না   না   না ।  

চেচিয়ে  উঠল বিনোদ। অণু আমাকে এবারের মত বাঁচাও আমাকে বাঁচাও প্লীজ  •••

-   কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।  অণিমা এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কাল সকালে উঠে খবরটা শুনবে।  

কিংবা খবরের কাগজের হেড লাইনে দেখবে

-- একটি আত্মহত্যা আর অনেক জল্পনা --     

               আঁতকে উঠল সে। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল তার। গলা শুকিয়ে কাঠ। সারা শরীর ঘামে ভিজে, সপসপ করছে। বিছানা ছেড়ে উঠে এসে, এক বোতল জল ঢকঢক করে খেল সে।

               জীবনে বাঁচার যে এত স্বাদ, এত আনন্দ বিনোদ আগে আর কখনও টের পায়নি। সারারাত সে আর ঘুমতে পারল না। দুঃস্বপ্নটা যদি আবার পুনরায় ফিরে আসে।

 

চিঠি
অদিতি সেনগুপ্ত


অর্ক,

আজ রাতটা অদ্ভুতভাবে নীরব। জানলার বাইরে তাকিয়ে আছি আর দেখছি শহরটা কেমন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, আর আমার ভেতরে জমা শব্দগুলো এই নোটপ্যাডের পাতায় মুক্ত হতে চাইছে। আসলে মনে হল, শেষ বারের মত তোমায় কিছু বলে যাওয়া দরকার! কিংবা শুধু নিজের কাছেই একটা স্বীকারোক্তি রেখে যাওয়া দরকার...

অনেকদিন ধরেই সবাইকে হাসিমুখের মেঘলাকে দেখিয়ে চলেছি। কাউকে বুঝতে দিইনি, বন্ধ দরজার পিছনের আমি কতটা ক্লান্ত, কতটা একা। যখনই মন খুলে কিছু বলতে চেয়েছি, তুমি "পরে শুনি? একটা ফোন আসছে, খুব জরুরি.." বলে থামিয়ে দিয়েছো! হয়তো ভেবেছো, "ও এমন কি আর বলবে, ওই কবে আসবে, ডাক্তার দেখাওনি কেনো! তুমি বদলে গেছো... এসবই..."  

তোমার এই অবহেলা, মেসেজ সিন করেও উত্তর না দেওয়া অথবা ১২ ঘণ্টা পর ক্যাজুয়াল একটা উত্তর, একটা হঠাৎ দূরত্ব... এগুলো আমার ভেতরে একটা একটা করে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিলো।

আজ পুরোনো চ্যাটগুলো পড়ছিলাম জানো! পড়তে পড়তে হঠাৎই মনে হল, আমি যেন অনেকদিন ধরে বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি; ভেতরে আদৌ তুমি কী আছো? জানি না, তবুও দাঁড়িয়ে আছি শুধু পুরোনো অভ্যেসে। আজকে আমার জীবনের হয়ত শেষ রাতে তোমার কাছে আর কোনও চাওয়া নেই! শুধু একটা বোধ তোমার মনে ছড়িয়ে যাক কাউকে তীব্র মনোযোগ দেবার পর চরম অবহেলা দিলে ঠিক কতখানি নিঃস্ব হয়ে যায় সেই মানুষটা।
আমি কিন্তু বাঁচতেই চেয়েছিলাম।  ছোট ছোট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছিলাম, তোমার সেই, "চলো বেরিয়ে পড়ি, অনেক দেখা বাকি..." মেসেজটা পড়ে! যদিও তেমন কিছুই শেষ পর্যন্ত ঘটেনি, কিন্তু তাই বলে সেই ক্ষণ তো মিথ্যে ছিল না। আমি সত্যিই সেগুলো আঁকড়ে বেঁচে ছিলাম অনেকদিন। 
কিন্তু...
আজ আমার শুধু একটাই ভয় হচ্ছে! না না, মৃত্যুর জন্য নয়, বরং যদি কোনোভাবে বেঁচে যেতে হয়, তবে কি করে বাঁচব সেই বাঁচাটা! আগের মত করে সাজানো হাসি আর তো হাসতে পারব না! এই ভয়টাই আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তবু এই শেষ রাতে কাউকে অপরাধী করতে ইচ্ছে করছে না! না তোমাকে, না সময়কে। শুধু স্বীকার করছি, আমি ক্লান্ত। সেই ক্লান্তি আমার আত্মাকে ছুঁয়ে ফেলেছে!

যদি কখনও এই লেখা তোমার কাছে পৌঁছোয়, তুমি শুধু এটুকু ভেবো যে, তুমি কি সত্যিই কাউকে এতোটা একা করে দিতে চেয়েছিলে? যদি উত্তর আসে, "না..." তাহলে অন্তত পরবর্তীতে যে মানুষটা তোমার জীবনে আসবে, তাকে এভাবে অবহেলা কোরো না!

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আজ আকাশটাকে কি পরিষ্কার লাগছে! তোমার শহরের আকাশটাও কী এমনই পরিষ্কার? আজ এই রাতে যদি কোথাও কোনও কোণে আলো তোমার চোখে পড়ে, একবার ভেবে নিও, এই আলোটা কোনো এক সময় নীরবে তোমায় ভালোবেসেছিল। কোনও বিনিময় ছাড়াই...

ভালো থেকো, অর্ক।

এলাম (আজ এলাম আর বললাম না!),

মেঘলা

 


আনুপূর্বিক  

আত্মহনন প্রবণতা এবং…

মানিক পন্ডিত

  কথামুখ

        জন্ম এবং মৃত্যু দুটিই জীবনের স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা। কিন্তু আত্মহনন ( suicide) স্বাভাবিক বা স্বতস্ফুর্ত ঘটনা নয়। এটি সাধারণত তীব্র মানসিক যন্ত্রণা,হতাশা বা মানসিক ব্যাধির ফল। World Health Organisation (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, আত্মহনন একটি বড় ধরণের জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধযোগ্য। WHO এর একটি হিসাব বলছে পৃথিবীতে প্রতিবছর ৭২০,০০০জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এদের ভেতর ৭৩ শতাংশ ঘটে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশের কষ্টে থাকা মানুষেরা। গবেষণায় দেখা যায়,আত্মহননের সাথে প্রায়ই যেসব বিষয়গুলো জড়িয়ে থাকে তার ভেতর বিষন্নতা (Depression), দ্বিধাবিভক্ত মানসিক ব্যাধি (Bipolar Disorder),মাদকাসক্তি (Drug addiction),তীব্র মানসিক আঘাত বা ট্রমা (trauma),দীর্ঘমেয়াদী চাপ (Long term stress),সম্পর্কের ভাঙন (Relationship breakdown),সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social isolation) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

           আত্মহনন প্রাকৃতিক মৃত্যু না,বরং এ মানসিক কষ্টের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। WHO ( world health organisation) এবং IASP ( international association for suicide prevention) সংগঠন প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহনন প্রতিরোধ দিবস পালন হয় থাকে। ২০২৫ এ “ changing  the narrative on suiside ”...each life lost  has profound social emotional and economic consequences.. ইত্যাদি বক্তব্য হাজির করে ঠেকাতে চেয়েছে এই অকালমৃত্যু বা আত্মহনন এবং আত্মসমীক্ষাও করেছে। 

  আত্মহনন প্রবণতা

 আত্মহনন প্রবণতা (Suicidal tendencies) একটি বহুমাত্রিক জটিল মনস্তাত্বিক, সামাজিক এবং বায়োলজিক্যাল বিষয়ও। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিস্তর গবেষণা রয়েছে এবং এই প্রবণতার কারণ , প্রভাব নিয়েও খোঁজ-তালাশ হয়েছে অনেক। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ( Sigmund Freud) মানুষের মন এবং সে নির্ভর গবেষণাগুলি প্রকাশ্যে আসবার পর অন্যান্য বিষয়ের ভিতর আত্মহনন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ রকমের সাড়া ফেলেছে। উনি মন্তব্য করেছেন- “পৃথিবীতে এমন একজনও মানুষ পাওয়া যাবেনা যে আত্মহত্যার কথা একবারের জন্যও ভাবেনি”।

         মনোবিশ্লেষক ফ্রয়েড মহোদয় “Life instinct (Eros)” ও Death instinc t(Thanatos)” ধারণা দিয়েছিলেন। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান অত্মহননকে কোন “স্বাভাবিক মৃত্যু প্রবৃত্তি” হিসেবে নয়,বরং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট হিসাবেই দেখে। গবেষণায় দেখা গেছে একজন মানুষের আত্মহনন তার পরিবার,বন্ধু এমনকি সমাজের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব রেখে যায়। সেখানে তীব্র শোক ও অপরাধ বোধ,দীর্ঘ মেয়াদী মানসিক আঘাত এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সুস্থ থাকবার ঝুঁকি ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়।

        ফ্রয়েডের “Life instinct (Eros)” ও Death instinct( Thanatos)” ধারণায় দুটি ব্যাপার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় উনি দেখিয়েছেন যে মানুষের ভিতর দুটি সত্ত্বা পাশাপাশি বিদ্যমান। বিশেষ ধরণের কোন ঘটনায় সে তার জীবন থেকে কাউকে সরিয়ে দেবে (murder) নতুবা সে নিজেই জীবন থেকে সরে যাবে (suicide)। তাই suicide কে Thanatos বা মৃত্যু প্রবৃত্তি হিসেবেই ধরতে হবে। ফলে মানুষের জীবন প্রবাহে এই দু’ধরণের ধারাই প্রবাহিত হয়,হতেও থাকবে।

 Thanatos বা মৃত্যু প্রবৃত্তি

      মানুষের আচরণ তার পরিবেশ ও যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar 

Disorder) মানসিক স্বাস্থ্য এবং এই সমস্যা আত্মহনন প্রবণতা বৃদ্ধি সম্পর্কিত বিষয়। মানসিক অসুস্থতা বড় ধরণের বিষন্নতা,উন্মাদনারা শেষঅব্দি আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে দেয়। 

       প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা পর্যবেক্ষণ করে ফ্রয়েড ১৯২০ সালে ” Beyond the Pleasure Princple” গ্রন্থে থ্যানাটোস বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। এটি জীবন প্রবৃত্তি “ইরোস” এর বিপরীত,যা মানুষকে নির্জীব (inanimate) জড় (object) অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগায়। আত্মহত্যা এই প্রবৃত্তির চরম প্রকাশ, যেখানে অবচেতন মনে ধ্বংসাত্মক আবেগ জমা হয়। যুদ্ধকে ফ্রয়েড দেখতেন Thanatos বা মৃত্যু-ধ্বংস হিসেবে আবার একই সঙ্গে যুদ্ধোত্ত পুনর্গঠণকে Eros বা Life instinct হিসেবে দেখেছেন।

  আত্মহনন সম্পর্ক মনস্তাত্বিক তত্ত্ব

         আত্মহনন সম্পর্ক বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণগুলির ভিতর সব চেয়ে বেশি এবং বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় মনস্তাত্বিক তত্ত্ব (General Psychological Theory)। এর ভেতর উল্লেখযোগ্যভাবে ফ্রেডরিখ স্কিনার এর ( Frederic Skinner) আচরণবাদ,কার্ল রজার্সের (Karl Rogers) আসল আমি ( real self) এবং আদর্শ আমি ( ideal self)  মধ্যে  সামঞ্জস্যের উপর জোর দিয়েছেন যা মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম অংশ এবং ভিত্তি। আর রয়েছে stress ও coping theory এবং এ ব্যাপারে লাজারাস ও ফোকম্যান (Lazarus and Folkman)এর প্রবণতা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণগুলি। এনাদের মতামত অনুযায়ী মানুষ যখন বড় ধরণের মানসিক চাপের সম্মুখীন হয় আর মোকাবিলা করতে অক্ষম বা coping strategy ঠিক করে উঠতে পারেনা  তখনই সে বা তারা আত্মহননের চিন্তার কবলে পড়ে যায়।  

        এ নিয়ে গ্রহণযোগ্য কারণসমূহের ভিতর অবদমিত আগ্রাসন,মৃত্যুর নীরব টান,জীবনশক্তির বিকাশ ব্যাহতি (disruption) রয়েছে। ইগো অগ্রহণযোগ্য আক্রমণাত্মক ইচ্ছাকে অবচেতনে দমন করে,যা থ্যানাটোসের সাথে মিলে আত্মঘাতী আচরণের রূপ নেয়। অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়াও এই প্রবণতার মধ্যে পড়ে। মৃত্যুর নীরব টান (the silent pull of death) নিয়ে আলোচনার অংশে মানুষের হিংসা আত্মনিপীড়ন ইত্যাদি প্রবৃত্তিরই ফসল এবং পরিবেশগত চাপে এসব মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। 

         আর রয়েছে জীবনশক্তি বিকাশ ব্যাহতি বা disruption.। এ ধরণের হতাশা বা অসুস্থতায় জীবন নিয়ে অনুভূতি ক্ষীণ হলে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ে, ফ্রয়েডের নিজের মৃত্যুর ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মুখের ক্যানসারের (oral cancer) সঙ্গে লড়াই করছিলেন। যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তাঁর চিকিৎসক বন্ধু ম্যাক্স শুরের (Max Schur) মরফিনের দেওয়া একটি মারাত্মক ডোজ গ্রহণ করে ইচ্ছামৃত্যু বা( Assisted Suicide) গ্রহণ করে প্রযাত হ’ন। ফ্রয়েডের এই ইচ্ছা মৃত্যু ( Euthanasia) চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। 

 সেরোটোনিন কি এবং এর প্রভাব

        মানব মস্তিষ্কে এবং শরীরে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার( neuro transmiter) বা রাসায়নিক বর্তাবাহক,যা মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা, হজম এবং অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এ মূলত মস্তিষ্ক ও অন্ত্রে উৎপাদিত হয় ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan) নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে। প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপন্ন হয় অন্ত্র (intestines) থেকে। বাকিা মস্তিষ্কে বিশেষ করে Raphe nuclei অঞ্চলে তৈরি হয়।একে প্রায়শই “সুখের হরমোন” বা অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী রসায়ন হিসেবে গণ্যকরা হয়। এর ভারসাম্যহীনতা উদ্বেগ বা বিষণ্ণতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ নিয়ে এখানে আর একটু বিস্তৃত আলোচনা রাখছি। 

     মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত : মস্তিষ্কে সেরোটোনিন কমে গেলে বিষণ্ণতা (depression),উদ্বেগ (anxiety),প্যানিক ডিজঅর্ডার (Panic  disorder) এবং ওসিডি (অবসসিভ ক্পলসিভ ডিসঅর্ডার) এর মতো মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিষয়টি মানুষের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

       শারীরিক কার্যাবলী : এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ( হজম),রক্তজমাট বাঁধা,ক্ষত নিরাময়,হাড়ের স্বাস্থ্য এবং যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে  বিশেষ ভূমিকা রাখে।

        সেরোটোনিন সিনড্রোম : শরীরে অত্যধিক সেরোটোনিন তৈরি হলে চাপ কমাতে বা মেজাজ ভালো রাখতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে এবং “সেরোটোনিন সিনড্রোম” সৃষ্টি করে,যার ফলে কাঁপুনি,ডায়েরিয়া,পেশীর অনমনীয়তা বা খিঁচুনির মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

       উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ : এটি ট্রিপটোফ্যান নামক প্রোটিন থেকে তৈরি হয় এবং সাধারণত সূর্যালোক,সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক ব্যায়াম সেরোটোনিন উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে।

         প্রভাব : এর প্রভাবে মানসিক প্রতিক্রিয়ার ভেতর মন ভাল রাখা (Mood regulation),বিষন্নতা কমানো  reduce of depression) উদ্বেগ হ্রাস (Anxiety reduction),আত্মবিশ্বাস ও প্রশান্তি বৃদ্ধি (increase of confidence and calmness),ঘুমের চক্র ( Sleep-wake cycle) নিয়ন্ত্রণ,হজম প্রক্রিয়ায় অন্ত্রর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা বমি হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা,আঘাত পেলে রক্তনালীর সংকোচন (vasoconstriction) ঘটিয়ে রক্তপাত কমাতে সাহায্য করা,ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করা,শরীরে এনার্জি ব্যালান্স বজায় রাখা,যৌন ইচ্ছা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। এর পাশাপাশি ঝুঁকির ভিতর  অতিরিক্ত উত্তেজনা জ্বর,হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া পেশীতে কাঁপুনি,বিভ্রান্তি (এসব সাধারণত ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় হতে পারে)

সিফিলিটিক মায়োজেম

       সিফিলিটিক মায়োজেম ক্রনিক  রোগের একটা ভিত্তি এবং মানসিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। যদিও সরাসরি কোন আধুনিক মনোরোগ নয়। কিন্তু এই রোগর শিকার ব্যক্তিদের সবসময় তিক্ততা ,অতৃপ্তি বুদ্ধির খর্বতা এবং আত্মহত্যার ইচ্ছা দেখা যায়। খুন বা আত্মবিনাশের প্রবণতাও যথেষ্ট থাকে। ক্ষিপ্রতা হঠকারিতা ভীতি উৎকন্ঠা এদের তাড়া করে ফেরে আর মানসিক বিভ্রান্তিতে ডুবে যায়। শরীরে বিকলাঙ্গতা, শুষ্ক হয়ে পড়া, অস্থিরতা এমনকি ঝড়বৃষ্টিসহ ঝতু পরিবর্তনে এদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একান্ত নিজের পরিসরে এরা  নির্জনতা খুঁজে নেয় এবং আত্মহননের দিকে অগ্রসর হয়। 

 অন্যকোন প্রাণিদের ভিতর আত্মহনন

      কৌতুুহল আছে যে মানুষ বাদে অন্যকোন প্রাণিদের ভিতর আত্মহনন প্রবণতা আছে কিনা। উত্তর হ’ল- না নেই। অন্যান্য প্রাণিদের মধ্যে সত্যিকারের আত্মহত্যার প্রবণতা নেই যেমনটা মানুষের মধ্যে দেখা যায়। সচেতনভাবে মৃত্যুর ইচ্ছা পরিকল্পিত একটা কাজ। তবে কিছু প্রাণির আচরণ যেমন তিমি বা ডলফিনের সমুদ্রতীরে আটকে পড়া,লেমিংদের দলবেঁধে চলা বা বন্দী ডলফিনের শ্বাসবন্ধ করে নেওয়া মানুষের  আত্মহত্যার মতো মনে হলেও এগুলো মূলত জৈবিক,পরিবেশগত বা সংস্থান সম্পর্কিত কারণে ঘটে। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে মানসিক চাপ (কর্টিকল হরমমোনের বৃদ্ধি) বা অভিযোজনের অক্ষমতা বলে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তুু এসব সচেতন আত্মহত্যার মতো জটিল মানসিকতার প্রকাশ বলে প্রমাণিত নয়।

      পশু মনোরোগ বিদ্যা (animal psychopathology) অনুসারে প্রাণিরা মানুষের মতো উচ্চতর স্ব-চেতনতা (self awareness) ছাড়াই টিকে আছে। আত্মহত্যার মৌলিিক শর্তের পরিবর্তে প্রবৃ্ত্তিগত (instinctual) বা শিক্ষিত আচরণ (educated behaviour) অথবা সেরোটোনিন সম্পর্কযুক্ত (serotonin related) হতাশার মতো নিউরোকেমিক্যল ( neurochemical) প্রক্রিয়া প্রাণীদের মধ্যে আছে কিন্তু তা   তার আত্মহত্যার পরিকল্পনায় রূপ নিতে পারেনা।

আত্মহনন ও সামাজিক সংযুক্তি

        সামাজিক সংযুক্তি বিষয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ইমিল দুরখেইম (Emile Durkheim) তাঁর প্রখ্যাত গদ্য “Suicide এ আত্মহননের প্রবণতার সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামাজিক ঐক্য সংযোগের অভাবকে দায়ী করেছেন”। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের শিথিলতা বা বিচ্ছিন্নতাও আত্মহননের প্রবণতা বাড়ায় বলে তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন।

             সামাজিক-অর্থনৈতিক ( socio-economic) কারণও আত্মহত্যর অন্যতম উৎস। সমাজের দুর্বল অংশ, বা সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ বা আর্থিক সংকটে পড়ে যাওয়া মানুষ দীর্ঘ মেয়াদ অব্দি কষ্ট এবং মানসিক চাপ বহন করে যেতে যেতে একটা সময় হেরে যায়,তখন সে নিজেকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়-আসলে,  একেই  আত্মহনন বলা হয়। 

            পূর্ব অনুচ্ছেদে আত্মহননের প্রবণতার জন্য দায়ী সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ইমিল দুরখেইম (Emile Durkheim) তাঁর গদ্যে মানুষের সামাজিক ঐক্য সংযোগের অভাবকে দায়ী করেছেন”। সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের শিথিলতা বা বিচ্ছিন্নতা ও কতকগুলি বিষয়ের ভিতর পরিবেশগত চাপও উল্লেখ করেছি। অন্যদিকে রাষ্ট্রের হাতে থাকা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও সমানভবে দায়ী। দারিদ্র্য,ঋণের চাপ,বেকারত্বের মতো বিষয়গুলিও আত্মহত্যার বড় কারণ। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যর্থতাও এর অন্যতম কারণ। প্রতিদিন গতর খাটিয়ে টিকে থাকা মানুষদের ভিতর, ফসলের দাম না পাওয়া ঋণ জর্জরিত গরীব চাষীদের ভিতর এ প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে,আর গ্রামীণ এলাকায় এসব হামেশাই ঘটছে। পাশাপাশি সমাজিক বৈষম্য, নির্যাতন,যৌন নির্যাতন,ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকার এবং রাষ্ট্রের ঔদাসিন্য বা ব্যর্থতা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষের ওপর শোষণ এবং অবিচার আত্মহননের প্রবণতাকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলেছে।

মানবাধিকার সংগঠন, WHO এর  ভূমিকা 

        জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়েছে।এই সংগঠন মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষায় কাজ করে এবং আত্মহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগও তদন্ত করে। এটি সরকারকে সুপারিশ করে এবং সচেতনতা বাড়ানোর কাজে যুক্ত।এছাড়া বিভিন্ন এনজিও কাউন্সেলিং,হেল্পলাইন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রোগ্রাম নিয়ে থাকে যা সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে।

      বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO ভারতে আত্মহনন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে,বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং জাতীয় নীতি প্রনয়ণে সহায়তা,,সচেতনতা বাড়ানো ইত্যাদির কাজে। সংগঠনটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল (NSPS) তৈরিতে সহায়তা করেছে যা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো এবং ঝুঁকি চিহ্নিতকরণের ওপর জোর দিয়ে থাকে। এরা সরকারের সঙ্গে মিলে Helpline, Counselling Programme, স্কুলভিত্তিক কর্মসুচি নিয়ে সচেতনতার কাজ করতে থাকে। এবাদেও  WHO মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট গ্যাপ বিশ্লেষণ করে এবং Training Module প্রদান করে থকে,যাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কর্মীরা আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতার কাজে দক্ষ হয়। এটি ডেটা সংগ্রহ এবং নীতি মূল্যায়ণে সহায়তা করে।

        অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিতর UNICEF ভারতে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করছে। স্কুল ভিত্তিক প্রোগ্রাম এবং অভিভাবকদের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর কাজও এদের অন্যতম বিষয়। মানবাধিকার সংস্থা যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশন্যাল (Amnesty International) মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এবং সরকারের উপর চাপ সৃষ্টিও করে থাকে। 

আত্মহনন প্রতিরোধ বা হ্রাস

        ভারত সরকার এবং মানবাধিকর সংগঠনগুলো আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল এবং সংশ্লিষ্ট আইন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ যোগ্য। ২০২২ সালে  প্রথম স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক জাতীয় কৌশল প্রকাশ করেছে। এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের ভিতর আত্মহননের হার ১০ শতাংশ হ্রাস করা। একাজে সার্ভেইল্যান্স বাড়ানো,জেলায় জেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু,পরিকল্পনা গ্রহণ  বা অপরাধ কমানোর চেষ্টা  চলেছে।

        একটা সময় আত্মহনন প্রচেষ্টাকে অপরাধ হিসাবে রাষ্ট্র বিবেচনা করত কিন্তু ২০১৭ সালে আইন সংশোধন করে একে  অপরাধমুক্ত করেছে এবং পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান করেছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জাতীয় টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে যা পরামর্শ ও সচেতনতার জন্য ২০২৫ সালে একটি ওয়েবসাইটও  চালু করেছে। এছাড়া টেলি মানসিক স্বাস্থ্য হেল্পলাইনও চালু হয়েছে। তবু আত্মহত্যা সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্যান্য যেকোন বিষয়ের ভিতর বহুমাত্রিক জটিল মনস্তাত্বিক, সামাজিক এবং বায়োলজিক্যাল বিষয়। তাই এ নিয়ে নিবিড় চর্চা,জনসচেতনতা নির্মাণ রাষ্ট্র-আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা উচিৎ। 

___________________________________________________________________________

উৎস :  1. Question to various  AI, overview relating to critical psychological angle of mind

           2. “Beyond the pleasure principles” by Sigmund

           3. Wiki : Emile Durkheim

           4. Wiki :  Frederic Skinner

           5. wiki:  Lazarus and Folkman 

           6.www.who.int.



যেখানে ব্যথা ভাষা হয়ে ওঠে


জি কে নাথ

মানুষের ইতিহাসে চিকিৎসার দুটি সমান্তরাল ধারা সব সময় পাশাপাশি চলেছে—একটি শরীরের, অন্যটি অর্থের। প্রথমটি ক্ষত সারায়, দ্বিতীয়টি অস্তিত্বের শূন্যতা। আমরা সাধারণত চিকিৎসাকে বুঝি শরীরের ব্যথা কমানোর প্রযুক্তি হিসেবে, কিন্তু সভ্যতার গভীর স্তরে চিকিৎসা সব সময়ই ছিল মানুষের অর্থহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ।

এই কারণেই বলা যায়—
যেখানে চিকিৎসা থামে, সেখানে শুরু হয় ভাষা—আর ভাষার গভীরতম রূপই কবিতা।

কবিতা থেরাপির প্রকৃত তাৎপর্য এই দ্বিতীয় স্তরেই। এটি কেবল মানসিক স্বাস্থ্যচর্চার একটি উপশাখা নয়, বরং মানুষের অর্থসঙ্কট, ভাষাসঙ্কট এবং অভিজ্ঞতার বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক নীরব সভ্যতাগত প্রতিক্রিয়া।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ব্যথা নয়—অবর্ণনীয়তা। যে অনুভূতিকে ভাষায় ধরা যায় না, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়। ট্রমা নিয়ে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর আঘাতের স্মৃতি মস্তিষ্কে “কাহিনী” হিসেবে সংরক্ষিত হয় না, বরং বিচ্ছিন্ন অনুভূতির টুকরো, দেহগত প্রতিক্রিয়া ও চিত্রকল্পের মতো ছিন্ন খণ্ডে জমা থাকে। ফলে মানুষ ঘটনাটি মনে রাখতে পারে, কিন্তু তা বর্ণনা করতে পারে না। এই অবস্থাকেই বলা যায় অভিজ্ঞতার ভাষাহীনতা। কবিতা থেরাপির মৌলিক কাজ এখানেই—এটি মানুষকে অভিজ্ঞতার কাহিনি দিতে সাহায্য করে। অর্থাৎ স্মৃতিকে তথ্য থেকে গল্পে রূপান্তরিত করে। আর গল্প মানেই মানসিক পুনর্গঠন।

দর্শনের ইতিহাসে ভাষার একটি গভীর সংকটের কথা বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। বিংশ শতকের অস্তিত্ববাদীরা দেখিয়েছিলেন, আধুনিক মানুষ এমন এক জগতে বাস করে যেখানে তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক ক্রমশ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অনেক কিছু অনুভব করে, কিন্তু তার ভাষা সেই অনুভূতির তুলনায় অপ্রতুল। ফলে তৈরি হয় এক ধরনের অভ্যন্তরীণ নির্বাসন—নিজের ভেতরে থেকেও নিজের কাছে পৌঁছাতে না পারা। কবিতা থেরাপি এই নির্বাসনের বিরুদ্ধে কাজ করে। কারণ কবিতার ভাষা যুক্তির ভাষা নয়, এটি ইঙ্গিতের, নীরবতার এবং সম্ভাবনার ভাষা। যুক্তির ভাষা যেখানে স্পষ্টতা চায়, কবিতার ভাষা সেখানে অস্পষ্টতাকে আশ্রয় দেয়—আর মানুষের গভীরতম অনুভূতিগুলো সব সময়ই অস্পষ্ট।

মনস্তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো প্রতীকীকরণ। শিশুমন বাস্তবকে সরাসরি গ্রহণ করে, কিন্তু পরিণত মানসে অভিজ্ঞতা প্রতীকের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। প্রতীক মানুষকে এমন এক মানসিক দূরত্ব দেয়, যেখানে সে নিজের যন্ত্রণাকে সহ্য করতে পারে। কবিতা থেরাপির শক্তি এখানেই। কেউ যখন নিজের ব্যথাকে সরাসরি বলে, তখন ব্যথাটি তাকে গ্রাস করে, কিন্তু যখন সে বলে—“আমার ভেতরে এক শুকনো নদী আছে”—তখন ব্যথাটি এক চিত্রকল্পে রূপ নেয়। এই রূপান্তরই নিরাময়ের সূচনা।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আধুনিক সভ্যতা মানুষের অভিজ্ঞতাকে ক্রমাগত খণ্ডিত করে। কাজ, সম্পর্ক, সময়—সবকিছু আলাদা খোপে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে মানুষের জীবনের কোনো সামগ্রিক কাহিনি থাকে না। সে কর্মক্ষেত্রে এক মানুষ, ঘরে আরেক, অন্তরে আরেক। কবিতা থেরাপি মানুষের জীবনের এই বিচ্ছিন্ন খণ্ডগুলোকে এক বর্ণনায় যুক্ত করে। যখন কেউ নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতা লেখে, তখন সে নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকতায় সাজায়—এই সাজানোই আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠন।

নিউরোমনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে কবিতার কাজ বিস্ময়কর। মানুষের মস্তিষ্কে ভাষা ও আবেগ আলাদা অঞ্চলে প্রক্রিয়াকৃত হয়। সাধারণ কথোপকথনে ভাষা-কেন্দ্র বেশি সক্রিয় থাকে, আবেগ-কেন্দ্র তুলনামূলক কম। কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ, রূপক ও ধ্বনি ভাষা ও আবেগ উভয় কেন্দ্রকে একসঙ্গে সক্রিয় করে। ফলে আবেগ ও ভাষার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়—যা ট্রমা নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর।

কবিতা থেরাপির আরেকটি গভীর দিক হলো সময়ের পুনর্গঠন। ট্রমা মানুষের সময়বোধকে বিকৃত করে দেয়—অতীত যেন বর্তমান হয়ে থাকে, বর্তমান যেন স্থবির হয়ে যায়। কবিতার ভাষা রূপকের মাধ্যমে সময়কে নতুনভাবে সংগঠিত করে। এতে মানুষ নিজের জীবনের ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

সমসাময়িক সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট একাকিত্ব নয়, বরং আবেগগত অসাড়তা। মানুষ জানে অনেক, কিন্তু অনুভব করে কম। প্রযুক্তি তাকে তথ্য দিয়েছে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা কেড়ে নিয়েছে। কবিতা এই অসাড়তার বিরুদ্ধে ধীর প্রতিরোধ। কারণ কবিতা মানুষকে থামতে বাধ্য করে—আর থামা ছাড়া অনুভব সম্ভব নয়।

দার্শনিক স্তরে কবিতা থেরাপি অর্থ নির্মাণের এক প্রক্রিয়া। এটি কষ্ট দূর করে না, বরং কষ্টকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। এই অর্থপূর্ণতাই সহনশীলতার ভিত্তি।

সমাজগত স্তরে এটি সহমর্মিতার পুনর্গঠন ঘটায়। অন্যের কবিতা পড়া মানে তার অভিজ্ঞতার ভেতরে প্রবেশ করা। এই প্রবেশই মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কবিতা থেরাপিকে কখনো “আত্মিক ব্যথানাশক” বলা হয়। কারণ এটি ব্যথা কমায় না—ব্যথার অর্থ বদলে দেয়। একজন মানুষ যখন নিজের জীবনকে ভাষায় রূপ দেয়, তখন সে কেবল স্মৃতি লিখে না—সে নিজের অস্তিত্বকে নতুনভাবে অর্থ দেয়।

শেষ পর্যন্ত সত্যটি সরল—মানুষ তখনই সুস্থ হয়, যখন সে নিজের কাহিনি বলতে পারে। আর কবিতা সেই কাহিনিকে কেবল বর্ণনা করে না, তাকে অর্থ দেয়, রূপ দেয়, এবং সহনীয় করে তোলে।

এই কারণেই ভাষার মাধ্যমে আত্মার চিকিৎসা—এটি কোনো রূপক নয়, এটি মানবচেতনার গভীর বাস্তবতার এক নিখুঁত সংজ্ঞা।



মরিতে চাহিনা আমি

অনিলেশ গোস্বামী

তবুও মরতে চেয়েছিলেন। অন্তত একবার। যিনি লিখেছিলেন, "যাহার লাগি চক্ষু বুজে/ বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর/ তাহারে বাদ দিয়েও দেখি/ বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর", অনুমান করা যায় যে তাঁরও স্বেচ্ছামৃত্যু বাসনা হয়েছিল। নতুন বৌঠানের আত্মহত্যার অভিঘাতে রবীন্দ্রনাথের ভগ্নহৃদয়ের হাহাকার শেষ বয়স পর্যন্ত ছিল। এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের পরে একদিন নিজের হাতের শিরা কেটে ফেলার কথাও ভেবেছিলেন এমনটা জানা যায় রানি চন্দের স্মৃতিকথা থেকে। বৃদ্ধ বয়সেও একবার নানাকথার সাথে বলেছিলেন - 'যে মরে গেল সে তো চলেই গেল। আর কোনদিনই তাকে দেখতে পাওয়া যাবেনা নিশ্চিত তবুও মন তো মানেনা।' গভীর রাত পর্যন্ত ছাদে একা পাইচারি করতেন আর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতেন 'কোথায় আছো, একটু দেখা দাও।' তাই দেখা যায় জীবনকে উদ্দীপিত করবার কবি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একদিন বলছেন- 'কত রকমের মৃত্যু আছে। গরম জলের টবে বসে হাতের নাড়ী কেটে দাও, আস্তে আস্তে সব রক্ত বেরিয়ে গিয়ে শরীরটা ক্রমশ ঝিমিয়ে আসবে। কত সহজ মৃত্যু।'

কবি জীবনানন্দ দাশ ট্রামে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলেন। কেউ কেউ, এমনকি তাঁর প্রিয় বন্ধু সঞ্জয় ভট্টাচার্য বা বাংলাদেশের কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও আরো অনেকের মতে এটি ছিল আসলে আত্মহত্যা। জীবনানন্দ বেশিরভাগ সময়ই থাকতেন আত্মনিমগ্ন, কিছুটা অন্যমনস্ক। যে জায়গাটায় দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেই 'শেলী কাফে'র উল্টোদিকে রাস্তায় কেউ কখনো তাঁকে ট্রামলাইন পেরোতে দেখেনি। শোনা যায় এই ঘটনার কিছুদিন আগে থেকেই তিনি গল্প করার সময় মৃত্যুর কথা খুব বেশি বলতেন। বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বে ভুগতেন নানা কারণে।

পরাজয়ের গ্লানি বা পরাজিতের অসম্মান ক্লিওপেট্রাও মেনে নিতে পারেননি। হ্যাঁ, সেই বিখ্যাত ক্লিওপেট্রা, আজ থেকে ২০৯০ বছর আগে যার জন্ম মিশরে। পরবর্তীকালে টলেমি সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী, ইতিহাসের শেষ ফারাও যার প্রসাধনের বিলাসবৈভব ছিল কিংবদন্তি, যাকে একটু পাবার জন্য জীবনপন করতে পারতেন অনেকেই, স্বয়ং জুলিয়াস সিজার বা আ্যন্টনী যার আলিঙ্গনে ধন্য হয়েছিলেন। সেই বহুজনবল্লভা বর্ণময় ব্যক্তিত্ব, আত্মহত্যা করেছিলেন ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপের ছোবলে। তাঁর বয়স তখন ৩৯ বছর যখন আলেকজান্দ্রিয়া আক্রান্ত হলো। পরাজয়ের পর ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যা ও সেইসঙ্গে মিশরে টলেমি সাম্রাজ্যের পতন আর শুরু হলো রোমান শাসনের।

মধ্যযুগে আত্মহত্যা করার পরেও কারো রেহাই ছিলনা। অর্থাৎ মরেও যে জ্বালা জুড়োবে তাও হবেনা কারণ চার্চের অনুশাসন। জঘন্যতম পাপ আত্মহত্যা কারণ স্বয়ং ঈশ্বরের নির্দেশকে অপমান। তাই আত্মহণকারীর দেহ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে আঘাতে আঘাতে একেবারে ছিন্নভিন্ন করা হতো সর্বসমক্ষে। চার্চ নাকি বলেছে যে-জীবন একমাত্র ঈশ্বরই দিয়েছেন তাকে নিজের হাতে শেষ করা মহাপাপ। অবশ্য এই চিন্তাধারাকে নস্যাৎ করেছেন বিখ্যাত ফরাসি গবেষক জর্জ মিনোয়া ( George Minois) তাঁর প্রকাশিত "Historie du Suicide" বইটিতে। যাবতীয় ভুল নীতি ও নিষ্ঠুরতার জন্য মিনোয়া আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন খ্রিস্টধর্মকেই। তাঁর মতে যীশুর নিজের মৃত্যুই আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কিছু ছিলনা। উদ্ধৃত করেছেন  Jesus এর বিখ্যাত কথাগুলি -- " No one takes it (my life) from me but I lay down on my own accord."

জর্জ মিনোয়ার মতে যে-ধর্মের মূলেই ছিল এক আত্মহত্যা এবং যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে করুনার উদ্রেক করবার জন্য কিছুটা চাতুরি, তারা কেমন করে আত্মহননের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যার অন্তরেই রয়েছে স্ববিরোধ। এই মত অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠনের মতে প্রতিবছরই পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় নানা কারণে। এর মধ্যে প্রধান হলো একাকীত্ব, যেন সবকিছুর মধ্যে থেকেও সবকিছুর বাইরে। কাম্যুর ভাষায় -" An outsider to the society in which he lives -- wondering on the fringe -- on the outskirts of life, solitary and sensual." ( "The Outsider"
                     -- Albert Camus)

গুয়াহাটি থেকে প্রায় শ'তিনেক কিলোমিটার দূরে হাফলং এর কাছে জাটিঙ্গায় প্রতিবছর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে আত্মহত্যা করতে--এমন একটি বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি আছে। পরবর্তীকালে এই তথাকথিত আত্মহত্যা রহস্যের কারণ জানতে পারা যায়। বৃটিশ চা ব্যবসায়ী ও পক্ষীবিশারদ E.P.Gee'র লেখা ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত "The Wildlife of India" তে এই ঘটনার যে কারণগুলি লেখা আছে তার সারমর্ম হলো জাটিঙ্গা গিরিশিরার পাথরে থাকা উচ্চ চুম্বকশক্তিযুক্ত খনিজ পদার্থ, উপত্যকার নীচে থাকা "Halflong - Disang fault" নামের ভৌগলিক ফাটল ইত্যাদির ফলে মাধ্যাকর্ষন ও চুম্বকশক্তির অস্বাভাবিক পরিবর্তনে ( distortion) পরিযায়ী পাখির দল কক্ষচ্যুত অর্থাৎ disoriented হয়ে নীচে আলোর দিকে আছড়ে পড়ে। তখন স্থানীয় মানুষরা তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে যুগ যুগ ধরে আত্মহত্যার গল্প চালু রেখেছে। এই পাখিদের মাংসের খুব চাহিদা তাই গোটা ব্যাপারটা একটি বানিজ্যিক দিক আছে এবিষয়ে সন্দেহ নেই।

সারস পাখির মৃত্যুর মধ্যে একটা বৈশিষ্ট্য আছে। তারা নাকি আজীবন একজনের সঙ্গেই জোট বেঁধে থাকে। Monogamy তাদের স্বভাবে আছে। একজনের মৃত্যু হলে অন্যজন কিচ্ছু খায়না। এইভাবে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে তারা তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করে। সচেতনভাবে আত্মহত্যার বিষয় নয়, হয়তো নিছকই জনশ্রুতি তবু এটি একটি ভালোবাসার কাহিনী এমন কল্পনা করতে ভালোই লাগে। আসলে মানুষের ক্ষেত্রে তীব্র একাকীত্বের জন্য গভীর বিষন্নতা নিউরোট্রান্সমিটারের রাসায়নিক প্রকৃতি বদলে দিয়ে তাকে আত্মহননের পথে উদ্বুদ্ধ করে। এই গভীর গোপন অসুখটিই depression। মনের সঙ্গীটি চিরকালের জন্য চলে গেলে অপর সারসটি হয়তো জীবনের বাকি কয়েকটি দিন এভাবেই থাকতে পছন্দ করে। এটাও আত্মহত্যা ভাবা যেতে পারে।

এবার রাজস্থানের কৃষক-রমণী অমৃতার কাহিনী লিখতেই হবে। সুন্দরলাল বহুগুণার লেখাটি পড়ে চমকে উঠেছিলাম। যোধপুর থেকে ১৩৬ কিলোমিটার দূরে জয়সলমিরের কাছে খেজরী গ্রামে বিশনয় সম্প্রদায়ের এক মর্মস্পর্শী কাহিনী। বিশ ও নয় অর্থাৎ ২৯টি নিয়মপালন করে যারা ধর্মাচরণ করে। ১৭৩০ সালে এই নারীর নেতৃত্বে তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় গাছগুলি বাঁচানোর জন্য একদিনে ৩৬৩ জন গ্রামবাসী উদ্যত কুঠারের সামনে প্রাণ দিয়েছিল। এটাও তো আত্মহত্যা কিন্তু একটি মহান আদর্শের জন্য স্বেচ্ছায় জীবনদান। ঘটনাটি ছিল এইরকম--

যোধপুরের রাজা নাকি সেই সময় একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। চুন পোড়ানোর জন্য প্রয়োজন প্রচুর কাঠের। রাজস্থানে কাঠ দুর্লভ। রাজসভায় একজনের মনে পড়ে গেল খেজরী গ্রামে খেজরীবনের কথা। অমনি রাজার আদেশে কাঠুরিয়ার দল রওনা হয়ে গেল ধারালো অস্ত্র নিয়ে। তাদের উদ্দেশ্য জানতে পেরে অমৃতা প্রতিবাদ করলো, দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করলো একাজ তারা করতে দেবেনা। কাঠুরিয়াদের আদেশ তারা গ্রাহ্য করলোনা। অধৈর্য্য কাঠুরিয়ার দল অমৃতার শরীরে ভয়ঙ্কর কুঠারাঘাত করলেও সে গাছটিকে দুহাতে জড়িয়ে থাকে। অমৃতার দেহ টুকরো টুকরো হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ৩৬৩ জন গ্রামবাসী এক একজন এক একটা বৃক্ষ জড়িয়ে ধরে এবং শাণিত কুঠারাঘাতে প্রত্যেকের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বৃক্ষ বাঁচানোর জন্য আত্মহত্যার এমন অসাধারণ উজ্জ্বল আর কোনো উদাহরণ আছে কিনা আমার জানা নেই।

বৃক্ষপ্রেম নিয়ে একটি কবিতা:

"আমার মৃত্যুর পর/ আমাকে যেন কবর দেওয়া হয়,/ আমি মাটি ফুঁড়ে গাছ হবো।/ বাঁশগাছ হয়ে ঝুঁকে দেখবো--/ এই রবিশস্যের দেশ।"
                   -- শ্যামলবরণ সাহা



আত্মহত্যা - পরিস্থিতি, সমাজ,  বিশ্লেষণ ও সমাধান

হিমাদ্রি শেখর দাস 

আত্মহত্যা একটি গুরুতর সমস্যা যা প্রায়ই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সাথে যুক্ত। যারা হতাশা, উদ্বেগ, বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার সাথে লড়াই করছেন তাদের আত্মহত্যার কথা ভাবার বা চেষ্টা করার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। এই সংযোগটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের সতর্কতা চিহ্নগুলি সনাক্ত করতে এবং যাদের এটি প্রয়োজন তাদের সহায়তা করতে পারে৷

মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের চিন্তা, সম্পর্ক এবং জীবনের সামগ্রিক গুণমানকে প্রভাবিত করে শুধু আবেগের বাইরেও অনেকগুলি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে। আমাদের শারীরিক সুস্থতার মতো, মানসিক স্বাস্থ্য আমরা কীভাবে চাপ পরিচালনা করি, সম্পর্ক গড়ে তুলি এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া করি তা নির্ধারণের জন্য অপরিহার্য। প্রতি বছর বাহাত্তর  হাজারের  বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যায়। ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার ৭৩ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আত্মহত্যার কারণগুলি বহুমুখী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পরিবেশগত কারণগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয় যা সারা জীবন জুড়ে থাকে। প্রতিটি আত্মহত্যার জন্য আরও অনেক লোক রয়েছে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পূর্বে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা সাধারণ জনগণের আত্মহত্যার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।

বেশ কিছু মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি আত্মহত্যার ঝুঁকির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে:

হতাশা:- হতাশা, আত্মহত্যার ঝুঁকির কারণগুলির মধ্যে একটি, প্রায়শই হতাশা, মূল্যহীনতা এবং জীবনের প্রতি অনাগ্রহের অনুভূতি সৃষ্টি করে। সময়মত পরিচালনা না করলে শক্তিশালী আবেগ আত্মহত্যার চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

উদ্বেগজনিত ব্যাধি:- দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ব্যক্তিদের তাদের উদ্বেগের মধ্যে আটকা পড়ে থাকতে পারে, যার ফলে হতাশার অনুভূতি হতে পারে। আতঙ্কিত আক্রমণ, তীব্র ভয় এবং ক্রমাগত উদ্বেগ আত্মহত্যার ধারণায় অবদান রাখতে পারে, বিশেষ করে যদি চিকিত্সা না করা হয়।
 
বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মেজাজের উল্লেখযোগ্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে যায়, তীব্র উৎসাহ পর্ব থেকে গভীর হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় চলে যায়। বিষণ্ণ পর্বগুলি, বিশেষ করে, আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে তীব্র হতাশার সময়।

পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) যা প্রায়শই আঘাতজনিত ঘটনা থেকে তৈরি  হয়, ব্যক্তিদের ফ্ল্যাশব্যাক, দুঃস্বপ্ন এবং তীব্র উদ্বেগ অনুভব করতে পারে। PTSD আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাস্তবতা থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারে এবং তাদের ট্রমা দ্বারা অভিভূত হতে পারে, যার ফলে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা হতে পারে।
 
পদার্থ ব্যবহারের ব্যাধি: আসক্তি এবং পদার্থের অপব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং আবেগপ্রবণ আচরণের দিকে পরিচালিত করতে পারে। পদার্থের অপব্যবহার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সংমিশ্রণ আত্মহত্যার সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে।

সামাজিক এবং পরিবেশগত কারণের প্রভাব ঃ- মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধিগুলি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়, তবে সমস্যাটি ব্যক্তির বাইরেও প্রসারিত হয়। সামাজিক এবং পরিবেশগত কারণগুলি পরিস্থিতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। এই কারণগুলি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলিকে আরও খারাপ বা ভাল করে তুলতে পারে, যা একজন ব্যক্তির নিজের ক্ষতি করার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।

একাকীত্বের অভিজ্ঞতা, অপর্যাপ্ত সামাজিক সমর্থন সহ, হতাশা এবং উদ্বেগের অনুভূতি বাড়িয়ে তুলতে পারে, উল্লেখযোগ্যভাবে আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা এবং কর্মের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদের থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন বোধ করা ব্যক্তিরা বিশ্বাস করতে পারে যে তারা চলে গেলে কেউ খেয়াল করবে না বা যত্ন করবে না।

ক্রমাগত চাপ, কাজ, সম্পর্ক বা আর্থিক সমস্যা থেকে হোক না কেন, একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক  চাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে অসহায়ত্ব এবং হতাশার অনুভূতি হতে পারে, যা আত্মহত্যার চিন্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
 
ট্রমা এবং অপব্যবহার: ট্রমা অনুভব করা, বিশেষ করে শৈশবে, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অপব্যবহার, অবহেলা এবং অন্যান্য আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি সৃষ্টি করতে পারে যা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
  
যে ব্যক্তিরা অপবাদ এবং বৈষম্যের সম্মুখীন হন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা, যৌন অভিমুখীতা, জাতি বা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণেই হোক না কেন, তারা মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের উচ্চ মাত্রা অনুভব করতে পারে। ভুল বোঝাবুঝি এবং সমর্থন ছাড়া একজন ব্যক্তিকে আত্মহত্যার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

সতর্কতা সংকেত চিনতে,
আত্মহত্যার সতর্কীকরণ চিহ্নগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রতিরোধের জন্য অত্যাবশ্যক, কারণ তারা একটি উচ্চতর ঝুঁকি নির্দেশ করতে পারে, যদিও মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে লড়াই করা প্রত্যেকেই একই সূচকগুলি প্রদর্শন করবে না। এই লক্ষণগুলি সম্পর্কে সচেতন হওয়া, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ এবং সহায়তার অনুমতি দেয়, সম্ভাব্য জীবন বাঁচাতে পারে।

মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আত্মঘাতী চিন্তা প্রকাশ করতে পারে। "আমি যদি মরে যেতাম," "আমি চলে গেলে কেউ পাত্তা দেবে না" বা "বেঁচে থাকার কোন মানে নেই" এর মতো বাক্যাংশগুলিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।
 
আকস্মিক আচরণগত পরিবর্তন, যেমন সামাজিক জীবন থেকে প্রত্যাহার, মূল্যবান সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া, বা আবেগপ্রবণ আচরণে জড়িত হওয়া, আত্মহত্যার চিন্তার ইঙ্গিত হতে পারে।
 
নাটকীয় মেজাজের পরিবর্তন, বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি হতাশাগ্রস্ত হওয়ার পর হঠাৎ শান্ত বা সন্তুষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে তারা তাদের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ক্রিয়াকলাপ, শখ বা সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ হারানো যা একবার আনন্দ নিয়ে আসে একটি লাল পতাকা হতে পারে।
 
দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক লক্ষণ, যেমন মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা বা ক্লান্তি, কোনো সুস্পষ্ট চিকিৎসা কারণ ছাড়াই, অন্তর্নিহিত মানসিক স্বাস্থ্যের সংগ্রামের সাথে যুক্ত হতে পারে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং সমর্থন
আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে এই জটিল সমস্যাটি মোকাবেলা করার জন্য একাধিক কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকে ।

মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধিগুলির প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিত্সা আত্মহত্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। থেরাপি, ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসা ব্যক্তিদের তাদের লক্ষণগুলি পরিচালনা করতে এবং মোকাবেলার কৌশলগুলি বিকাশ করতে সহায়তা করতে পারে।

ব্যক্তিদের শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ বিকাশ এবং বজায় রাখতে উত্সাহিত করা সঙ্কটের সময়ে একটি সুরক্ষা জাল সরবরাহ করতে পারে। প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব এবং সহায়তা গোষ্ঠীগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমর্থন নেটওয়ার্ক এবং ব্যবহারিক সহায়তা প্রদান করতে পারে।

জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষা  কমাতে পারে এবং ব্যক্তিদের সাহায্য চাইতে উত্সাহিত করতে পারে। স্কুল, কর্মক্ষেত্র এবং সম্প্রদায়গুলি মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
 
হটলাইন, ক্রাইসিস সেন্টার এবং জরুরী মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলি সঙ্কটে থাকা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করে। এই পরিষেবাগুলি কোথায় এবং কীভাবে ব্যাবহার  করা যায় তা জানা জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।

আত্মহত্যার উপায়ে ব্যবহৃত বস্তু  সীমিত করা, যেমন আগ্নেয়াস্ত্র বা বিষাক্ত পদার্থ, আবেগপ্রবণ আত্মহত্যার প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করতে পারে। 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে থেরাপি এবং কাউন্সেলিং অপরিহার্য হাতিয়ার। বিভিন্ন থেরাপিউটিক পন্থা ব্যক্তিদের তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিচালনা করতে, আত্মহত্যার চিন্তা কমাতে এবং স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।

কলঙ্ক, বিশেষ করে মানসিক ব্যাধি এবং আত্মহত্যার আশেপাশের, মানে অনেক লোক নিজের জীবন নেওয়ার কথা ভাবছে বা যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে তারা সাহায্য চাইছে না এবং তাই তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য পাচ্ছে না। একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে আত্মহত্যা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং অনেক সমাজে এটি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করার নিষেধাজ্ঞার কারণে আত্মহত্যা প্রতিরোধে পর্যাপ্তভাবে সুরাহা করা হয়নি। আজ অবধি, শুধুমাত্র কয়েকটি দেশ তাদের স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকারের মধ্যে আত্মহত্যা প্রতিরোধকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং মাত্র ৩৮টি দেশে একটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল রয়েছে বলে রিপোর্ট। 

সিবিটি একটি জনপ্রিয় এবং কার্যকর পদ্ধতি যা ব্যক্তিদের ক্ষতিকারক চিন্তাভাবনার ধরণগুলিকে চিনতে এবং রূপান্তরিত করার ক্ষমতা দেয়।
 
মূলত বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, DBT আত্মঘাতী আচরণ কমাতে কার্যকর। এই থেরাপি আবেগ নিয়ন্ত্রণ, কঠিন পরিস্থিতি পরিচালনা এবং অন্যদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার জন্য মূল্যবান কৌশল শেখায়।
 
সাইকোডাইনামিক পদ্ধতিতে অন্তর্নিহিত মানসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলি বার করে যা মানসিক স্বাস্থ্যের লড়াইয়ে অবদান রাখে। এই মূল কারণগুলির সমাধান করে, সাইকোডাইনামিক থেরাপি আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে পারে।
 
সচেতনতা প্রচার করে, এই প্রচারাভিযানগুলি কলঙ্ক কমাতে পারে এবং লোকেদের সাহায্য চাইতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

সম্প্রদায় এবং সামাজিক সমর্থনের গুরুত্ব

যদিও ব্যক্তিগত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সম্প্রদায় এবং সামাজিক সমর্থন আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানসিক সুস্থতাকে উৎসাহিত করে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি কমায় এমন পরিবেশ তৈরি করার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রচেষ্টার জন্য স্বাস্থ্য খাত এবং শিক্ষা, শ্রম, কৃষি, ব্যবসা, ন্যায়বিচার, আইন, প্রতিরক্ষা, রাজনীতি এবং মিডিয়ার মতো অন্যান্য খাত সহ সমাজের একাধিক সেক্টরের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। আত্মহত্যার বহুমুখী প্রকৃতির কারণে এই প্রচেষ্টাগুলি অবশ্যই ব্যাপক এবং সমন্বিত হতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ নিতে গেলে নিয়োগকর্তারা মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রচার করে, কর্মচারী সহায়তা প্রোগ্রাম (EAPs) প্রদান করে এবং একটি সহায়ক কর্মক্ষেত্র সংস্কৃতি তৈরি করে আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

শিক্ষামূলক কর্মসূচি হিসাবে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে যা শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনে কীভাবে সাহায্য চাইতে হয় তা শেখায়।

জাতীয় এবং স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রচারণা আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পদ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে। সচেতনতা প্রচারের মাধ্যমে, এই প্রচারাভিযানগুলি প্রবণতা কমাতে পারে এবং ব্যক্তিদের সমর্থনের জন্য উপযুক্ত  পথ দেখাতে পারে।
  
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্তা উন্নত করে, অপরাধবোধ কমায় এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এমন নীতিগুলির পক্ষে সমর্থন করা অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রশিক্ষণ, এবং সম্প্রদায় স্তরে আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশলগুলি বাস্তবায়ন করা।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ মানসিক স্বাস্থ্যের গভীরে নিহিত, এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং আত্মহত্যার মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বোঝা জীবন রক্ষাকারী হস্তক্ষেপের জন্য অত্যাবশ্যক। সতর্কীকরণ চিহ্নগুলি খেয়াল  করে, সহায়তা প্রদান এবং মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে, আমরা আত্মহত্যার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারি এবং যারা সংগ্রাম করছেন তাদের জন্য একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি। প্রতিটি ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং সমাজের আত্মহত্যা প্রতিরোধে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ, সমর্থন এবং পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তথ্যসূত্র :-
১.  National Institute of Mental Health (NIMH)
২.  American Psychological Association (APA)
৩. Mental Healthcare Act, Government of India
৪. আত্মহত্যা প্রতিরোধ: মানসিক স্বাস্থ্য, থেরাপি ও কাউন্সেলিং এর ভূমিকা- ডঃ অসীমা শ্রীবাস্তব 
৫. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

কবিতার আলো মাসিক ব্লগজিন - মার্চ, ২০২৬ সংখ্যা, বিষয় - আত্মহত্যা...?

                                                   প্রচ্ছদ ঋণ ঃ- অদিতি সেনগুপ্ত                               সূচিপত্র                      ...