মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কবিতার আলো মাসিক ব্লগজিন - সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সংখ্যা




প্রচ্ছদ ঋণঃ- নীলম সামন্ত 


সূচীপত্র


কবিতাভিত্তিক 

আভা সরকার মণ্ডল
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
ভাস্কর সিনহা
এলা বসু
অমিত কাশ‍্যপ
রহিত ঘোষাল
পিন্টু পাল
সুশান্ত সেন
কেতকী বসু
প্রশান্ত ভট্টাচার্য
অভিজিৎ সেন 
সুমিতা চৌধুরী
শামীম নওরোজ


সম্মিলন

শিশির আজম
চন্দ্রানী গোস্বামী
শিখর চক্রবর্তী
অনিন্দিতা সেন
শিবালোক দাস
পলাশ পাল
রূপক চট্টোপাধ্যায়
নিমাই জানা
পারমিতা দে দাস
রহিত ঘোষাল


মুক্তপদ্য

নিলয় নন্দী
শর্মিষ্ঠা মিত্র সেনগুপ্ত
অর্পিতা সরকার
রণতোষ কুমার দেব
অরিতা ভৌমিক

                 
স্মৃতির দুয়ারে

শাখী পাল
নীলাঞ্জনা হাজরা
সুস্মিতা রায়চৌধুরী
আলোক মণ্ডল     


গল্পাণু

কেয়া নন্দী
বিজয়া মিশ্র
রাজেন্দ্র কয়াল
অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়


চিঠি

পম্পা ঘোষ
অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়


ছোট গল্প

শম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়


আনুপূর্বিক 

হিমাদ্রি শেখর দাস 


 কবিতাভিত্তিক


বিচারের অধীন
আভা সরকার মণ্ডল

যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাওয়ার পর
পুরোপুরি ফিরে আসা সহজ নয়
অনিশ্চিত পথে হেঁটে,আশার পালক ছেঁটে
নত মস্তকে সেই স্বল্প ফিরে আসা
আশ্চর্য রকম ভাবে ধীর স্থির !
জেগে উঠা তৃষ্ণা আর মরে যাওয়া ভালোবাসা কে
ব্যাকুল কন্ঠে ডাকলেও
তাদের শ্মশান যাত্রা মুলতবি হয় না ---
যে নিয়মেই ঘটুক না কেন ঘটে যায় ঘটনা।
জটিল তত্ত্ব পুড়ে ছারখার হলেও
ফেরে না সময়
বিচারের অধীন হয় যাবতীয় ঝঞ্ঝাট।

সুলভ শৌচাগার
পিন্টু পাল

চশমা খোলার আগে ট্যাপ খোলো কবি
জল ?
নিরামিষ রস 
শাসকের
আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ফাঁকে
ওহ ! লেগেছে --
গাল ?
কপাল ?
ও বাম ডাট ?
উপভোগ করো
উপভোগ করো
কামুক লালপিঁপড়ে, তুমি  কি এখানেও থাকো  ?
পাওয়ারের সাদাকাঁচ : স্বচ্ছ
অবশ্যই
শুরু করেছ
আবার
ওঠা
নামা
ওঠা
নামা
        চারপাশে  ?
যাই হোক : কবি নগ্ন হলে
দূর থেকে দেখতে
কার না ইচ্ছে হয় !


এমনই একদিন
রহিত ঘোষাল

তখন আমার একটা তরতাজা প্রেম
ঠোঁটের ওপর রাখা,
তাই তো আত্মবিশ্বাস প্যান্ডোরার বক্সে।
শ্মশান-বন্ধুরা এসেছে বিকেলবেলায়,
ম্যাসাকার দেখতে এসেছে
কিছু চেনা মানুষ।
শিঙায় ফুঁ দিতে দিতে চলেছে
এক সাধু, তার দিকে সবাই ঘুরে তাকিয়েছে।
এমনই একদিন তুমি ব্রডওয়ে বারের সামনে
ফুটপাত আলো করে সিগারেট খাচ্ছ,
সাদা ড্রেসে তোমাকে প্রজাপতির মতো লাগছে,
তোমার কাঁধে আলগা চুমু এঁকে দিতে চাই—
এক হাত দূরে ভেজ চাওমিন,
আর ভিখিরি মেয়েটা বকা খেয়ে সরে যায়,
এমনই একদিন।

মিনি পার্লামেন্ট
অমিত কাশ‍্যপ

একটা কাকের মতো আর একটা কাক
একটা চড়াই, একটা সালিক আর একটার মতো
চিহ্নিত করার উপায় জানা না গেলেও
সবাই ঘুরতে ঘুরতে এ বাড়ির মাথায়, ও বাড়ির
জমায়েত হতেই, নানান কথাবার্তা, শলা
একটা মানুষ আর একটার মতো নয়ই
ব্রজবাবু প্রভাতভ্রমণ করেন, জিতেনবাবুর দশটা পেরিয়ে যায়
দুজনেরই গুড মর্নিং হয়, একজন নিয়মবাবু
আর একজনের চায়ের দোকানে বারোটা
সেখানে অনেক বাবুদের ভিড়, মিনি পার্লামেন্ট
রাজনীতি হতে হতে ফুড়ুৎ করে মেসি ঢুকে পড়ে
আবহওয়া, আসন্ন পুজোর জমায়েত হতে
নিজ নিজ অভিমত, নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্বের ব‍্যাখ‍্যা
আলেকজান্ডার-পুরু চা খেতে খেতে মুচকি হাসেন


প্রজাপতি জন্ম
এলা বসু

যে শুঁয়ো পোকাটি  জঙ্গলের আততায়ী রাত পেরিয়ে
প্রজাপতি হয়ে  বেরিয়ে আসে পায়ের পাতায় রোদ আলতা মেখে,
পবিত্র সিঁথিতে যার  ঝরে পড়ে আজ স্বাতী নক্ষত্রের জল,
তার স্বেদে  শুকিয়ে আছে বিগত জন্মের
কোটি অপমানের বিছের কামড়


রামধনুর শরীর
ভাস্কর সিনহা

আমি স্বপ্ন দেখি পৃথিবীর সব রঙ চাখার,
লালের তাপ, নীলের শীতলতা, হলুদের উচ্ছ্বাস,
সবুজের নির্মলতা, কমলার আগুন,
বেগুনির গভীরতা, আর সাদার অনন্ততা—
এসব যেন আমার শরীরে মাখামাখি হয়।
আমি চাই উড়তে আকাশের মতো মুক্ত,
পৃথিবীর সব কুয়াশা ভেদ করে চলে যেতে,
যেখানে সীমারেখা নেই, নেই কোনো বাঁধা,
শুধু আছে অসীম সম্ভাবনার দিগন্ত।
আমি চাই ভেসে যেতে নদীর স্রোতে,
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে,
গ্রামের নিস্তব্ধতায় নিজেকে খুঁজে পেতে,
যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায়, আর আমি শুধু থাকি।
আমি চাই লেখার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে,
অক্ষরের মাঝে আমার অস্তিত্ব বুনতে,
যেখানে প্রতিটি শব্দ আমার শরীরের অংশ,
প্রতিটি লাইন আমার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
আমি চাই ভালোবাসতে সবাইকে—
যারা হারিয়ে গেছে, যারা খুঁজে পায়নি পথ,
যারা ভোরের আলো দেখেনি,
যাদের চোখে এখনও রাত জমে আছে।
আমি চাই মুক্ত হতে নিজের ভয় থেকে,
সমাজের বাঁধা, মানুষের কথা, সব পেছনে ফেলে,
শুধু নিজের পথে হাঁটতে,
যেখানে শেষ নেই, শুরু নেই, শুধু আছে যাত্রা।
আমি চাই হারিয়ে যেতে প্রকৃতির বুকে,
গাছের ছায়ায়, পাখির ডানায়,
নদীর গর্ভে, পাহাড়ের চূড়ায়—
যেখানে আমি আর পৃথিবী একাকার।
আমি চাই লিখতে নীরবতার গান,
যে গান শোনে শুধু নির্জনতা,
যে গান বয়ে যায় সময়ের স্রোতে,
আমার শরীরের প্রতিটি কোষে।
আমি চাই মুক্ত হতে—সম্পূর্ণ মুক্ত,
শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে,
পৃথিবীর সব রঙ, সব রস, সব রূপ চাখতে,
আর শেষ পর্যন্ত নিজেকে খুঁজে পেতে—
এই অসীম যাত্রার শেষ প্রান্তে।


ফিরে যাবো উৎস যেখানে
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

তারা বললো, ঝড় আসছে, সব ছত্রভঙ্গ করে দেবে
আমি আতঙ্কে জানলা দরজা বন্ধ ঘরে বসে থাকলাম
ঘুরপাক খেতে থাকলো একরাশ বিরক্তি ক্ষোভ ও কটুভাষ
লক্ষ দানবের মতো ঝড় আমাদের দাপিয়ে কুংফু দেখালো
পরে দেখি মাথায় টিনের ছাউনি ভ্যানিস ! শিলাবৃষ্টি শুরু।
ওর বললো, আবহাওয়া ভয়ংকর, বন্যা আসছে, সব ভাসিয়ে
নিয়ে যাবে প্রাণ ও সম্পদ সাবধান !
নিরাপদ ভেবে আশ্রয় স্কুলবাড়ি একই গাছে সাপ ব্যাং
গিরগিটি হয়ে লেপটে থাকলাম
নদী বললো, খাবো খাবো, বহুদিন পর পেটভরে খাবো
আমি সাঁতারকৌশলে মরা-বেঁচে দেখি আমার সর্বস্ব গ্যাছে
জলে, বেঁচে থাকাই যন্ত্রণার।
কোন পক্ষ জানি না এখন গুঞ্জন উঠেছে ভূমিকম্প আসছে
টোকিও, তেহরান, লাতুরকেও ছাড়াবে নাকি সে
ঝুপড়ির সামনে রাস্তায় অপেক্ষা করি, কখন ধরণী দ্বিধা,
ত্রিধা বা নধা হবে প্রথম পৃথিবীর গন্ধে ডুব দেবো
মিশে যাবো আগুনের বুকে
সত্য মিথ্যা জানি না, বসে আছি, ভূমিকম্প আসছে,
সব ধ্বংস করেই না-কি ছাড়বে, হয়তো সেটাই ভালো,
হয়তো সেটাই অনেকগুলো দুর্ভেদ্য প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে।


ভালোবাসা
সুশান্ত সেন

ভালোবাসা অনেক দিন দাঁড়িয়ে আছে।
কোথায় ! কেউ ঠিক জানে না ।
সেখানে উত্তর দিক থেকে শীত আসে
আসে উত্তাল হাওয়া
গায়ে লাগায় শিহরিত কম্পন
জানালার শিক ধরে সে তাকায় মোহনার দিকে
অথবা
হয়ত তাকিয়ে আছে কিন্তু দেখছে না
যেন ত্বক আছে নেই অনুভব ।
যেন তুমুল গ্রীষ্মে একটা ঝরা পাতা
উড়তে উড়তে পাক খেয়ে খেতে
যে বেমানান উড়ে চলে যায়
কোন দিকে সে জানে না
স্রোত তাকে নিয়ে যায় !
না,
কোন নদীপাড়ে ফেলে রেখে চলে যাবে কেউ জানে না ।
যেন হারাপ্পার লিপি
যা কেউ পড়তে পারেনি  আজও।
তবু সেই ভালবাসা প্লাবিত
বহমান জ্যোতিরপুঞ্জ  জনিত আকর্ষণে ।


সৃজন কথা
কেতকী বসু


অনেক দিন আগেই শূন্য হয়েছিল যে সম্পর্ক
আজ তার পুনরুদ্ধার করতে চাইলো......
আমার  একচিলতে উঠোনের সুখ
সেও তো তোমার  আনন্দ আর উৎসাহে তৈরি হয়েছিল একদিন,
প্রতিটি সন্ধ্যার এক বুক অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকতে থাকতে
হয়তো ইচ্ছা গুলো এমনই হারিয়ে গিয়েছিলো।
আমার সেই অপেক্ষাকে উপেক্ষা করেই
তোমার মন অন্য কিছু চেয়েছিল
অজানা ভাষায় অভ্যস্ত ছিলামনা কোনোদিন
তাই বুঝিনি না বলা কথার অর্থ গুলো
পড়তে পারিনি নিঝুম রাতের কঠিন সব ভাষাকে,
আমার কাছে তখন কোনো পথ  ছিলনা
দিক ভ্রান্ত হয়ে ছুটে গিয়েছি তোমার অজানা ঠিকানায়!
ক্রমে নিয়মের বাইরে ভিন্ন রূপ দেখলাম
আমার বর্তমান ভবিষ্যৎ সব কিছু নিয়ে চলে গিয়েছিলে
আজ সেই ঘরে আমি একা ,পুরানো আসবাব
আর ধুলো পড়া আরাম কেদারায় বসে থাকা
চোখের জল আজ শুকনো ক্লান্তির ছাপ নিয়ে
সময় পার হয়েছে দায়িত্ব আর কর্ত্তব্যে
তবু সংশয় রাখিনি কোনো
মাথার ওপর ছাদ বলে দিয়েছে
আত্মমর্যাদা আর আত্ম সম্মানের কথা
তাই হয়তো বৃষ্টির ফোঁটা মাথাও ছুঁতে পারেনি।



মিথ ও উপবাস
প্রশান্ত ভট্টাচার্য

কেউ যায় কোতোয়ালের এজলাসে
কেউ বা ডনের
কেউ যায় সচিবালয়ে অন্যরা কবিতাতলায়।
আমি যাই বাঁকা নদী ঘাটে
মৃত বন্ধুদের সাথে ভার্চুয়াল ভাব সংঘর্ষে
ফিরে আসি হৃদয়ের কাছে
শব্দ খুঁজি নৈশব্দের চোরাকুঠরিতে
স্ফটিক খণ্ডের আলো গোত্রহীন লাশে
চুক্তিহীন বিচ্ছেদের ওকালতনামা
উড়ে উড়ে চলে যায় খাসদরবারে
শব্দরা প্রকাশের অধিকার হারায়
শব্দগুচ্ছে চাঁদের সৌন্দর্য বর্ণনায়
শুধু চিলচিৎকারে বিকল্প নির্মাণ
স্বভাব চন্দনে গাছেরা ইজেলে মগ্ন।
স্পর্শের আকাঙ্খা সীমানা ছাড়াতে চায়
নন্দিনীর অলীক স্পর্ধায় যক্ষপুরে।
জানে না সে, স্পর্শহীন সৌন্দর্যের টান
অধিকার বোধ এক মিথ্যে উপবাস
অসঙ্গতি অতিক্রমের ব্যর্থ প্রয়াস
নিঃসঙ্গের নিজস্ব ঠিকানা আবিষ্কার
দূরত্বের যতিচিহ্ন আঁকা এপিটাফ


বাংলা বর্ণমালা ও রাগ রাগিনী 
অভিজিৎ সেন 

ভৈরবী ও আশাবরী হয়ে ইমনে নেমে এলে সুর 
ভোর মধ্যাহ্ন পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে 
মায়ের আঁচলের তলায় এসে জড়ো হয় 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একান্নটি সন্তান
অখন্ডরূপ নিয়ে বাংলার সুজলা শ্যামলা
বুকে স্নিগ্ধ শীতল ঢেউ বইয়ে দেয় মায়ের হাসি
শিশু আবাল বৃদ্ধ বনিতা বাংলা ভাষায় কথা বলে ওঠে 
বাংলা ভাষা লাঞ্ছিত হলে তার সন্তানেরা 
কখনো ঢাকায় কখনো বরাক উপত্যকায় গর্জে ওঠে 
কখনো রফিক জাব্বার হয়ে কখন কমলা কানাইলালের
বেশে.... কত অজ্ঞাত অলিখিত তরুণ-তরনীর রক্ত পিচ্ছল 
সরণি বাংলা ভাষার পাথেয় 
শিউলি ঝরে শিশু কথা বলে 
কদম ফুটে ওঠে ময়ূর ওঠে ডেকে 
শরতের সাদা মেঘ ভাসে আনমনে 
বসন্ত নেমে এলে বাংলার বুকে 
প্রকৃতিও কথা বলে বাংলা ভালোবেসে 
মাঝি গেয়ে ওঠে গান
জারি শাড়ি ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালি
বাউলের উদাসী একতারা 
কোন বৈরাগী ভোরে শোনায় পদাবলী গান 
শোনা যায় সে সুরে বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রাণ ।


সরীসৃপের বসত
সুমিতা চৌধুরী

পৃথিবীতে আজ সরীসৃপের বসত সর্বত্র,
কান পাতলেই অস্বস্তিকর হিসহিসে শব্দ শোনা যায়।
চারদিকে বিষের প্রাদুর্ভাব,
ভারী বাতাস, শ্বাস নেওয়া দায়...
চোখের রঙিন চশমার আড়ালে
ক্রূর, হিংস্র দৃষ্টি সবার
আপাত শান্ত শীতলতার আবডালে,
প্রস্তুতি চলে বিষের ছোবল দেওয়ার....
চতুর্দিকে যেন অন্ধকারের আবাস,
স্যাঁতস্যাঁতে এক ঘৃণ্য পরিবেশ।
ছড়িয়ে আছে নানা মাপের খোলস,
হিসেব কষে কেউ পরে, কেউ ছাড়ে, অহর্নিশ।
কোনটা মুখোশ,  কোনটা যে মুখ
বোঝা বড়ই দায়!
সুখের বাসর ভেঙ্গে দিতে
অহরহ ষড়যন্ত্র রচনা হয়...


যৌনফুল, প্রত্নচুমু
শামীম নওরোজ

নির্জন দ্বীপের গপ্পো শ্যাষ হইলে, এ্যাট্টা মইরা যাওয়া কাক আবার জিইয়া ওঠে।
বৈঠার বাড়িতে জলও রক্তে লাল হইয়া যায়। নাও কান্দে, মাছগুলানের মরমে লাগে।
ফুলের শত্রু থাহে রেণুতে রেণুতে। ফলের শত্রু থাহে বোঁটায় বোঁটায়।
দ্বীপ মানে অভিসার, যৌনফুল। কাক মানে প্রেম, প্রত্নচুমু।
দ্বীপের তিন দিকে জল। জলের ভাঁজে মাইনষের কঙ্কাল। দ্বীপ আর কাক মাইনষের আত্মীয় লয়।


সম্মিলন

শিশির আজম
ধোঁয়া

আমার জামাকাপড় তোমার ধুতে হবে না
ওরা পড়ে আছে থাক আমার ঘাম ময়লা আত্মপ্রবঞ্চনা নিয়ে
শিক্ষামন্ত্রণালয় নির্ধারিত ইতিহাসের বই কেজি দরে বিক্রি করে
খানিকটা স্বস্তি
তারপর জামাজুতো না খুলে
বিছানায় তেরো মিনিট ঘুম
তেরোটা পিঁপড়ের একটা ডিমের ওপর আস্থা
একটা ডিম
হ্যা যীশুর যথার্থ অনুগামী না হয়েও
আমার জামাকাপড় আমি ধুয়ে নেবো স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মেনে
আর রোদে দেবো
দেখি ওরা কীভাবে আমার জল
আর আমার প্রজাপতির রক্তকে অস্বীকার করে
কেবল আমার কেন যে কোন শরীরে যখন কোন পোশাক
ঠায় নেয়
তার ভেতর তৃষ্ণা জাগ্রত হয় নতুন কিছুর
আর রেস্পনসিবিলিটি
আর আবসাঁথ কারাভানসারি
আর কচুরিপানা ফুলের নীলাভ নীরবতা


হিজল

প্রতিটা দিন এভাবে শুরু হয়
প্রতিটা রাত এভাবে শেষ হয়
মানে আমি যেমনটা চাইছি
ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা
মা বাবা আর বোনগুলোকে খুশি করতে পারছি না
খুশিই করতে পারছি না
অথচ সারাদিন সূর্য আমার শরীর থেকে
চর্বি চেটে খেয়ে নিচ্ছে
আর রাতের কুয়াশা কি অবলীলায় ঢেকে ফেলছে
আমার ছোট ছোট হ্রদ আর হিজলপূর্ণিমা
ভয়ংকর পাটিগণিতের ছক
ঝাঁঝালো আলোর ঢেউ
এখন মা বাবা আর বোনদের সামনে
কীভাবে দাঁড়াবো
আমার শরীরে তো এক টুকরো চর্বিও
অবশিষ্ট নেই
অথবা একটা হ্রদ
হিজলপূর্ণিমা


মানুষের ইতিহাস

দমবন্ধ ঘরে হাওয়ারা চুপচাপ বসে থাকতে পারে না
চিৎকার করে
নড়ে ওঠে টেবিলের খালি গ্লাস
জানালার কাঁচ ভেঙে চূরমার
রাস্তায় গাছের লাশ
আকাশ মাটিতে ভেঙে পড়ছে হুড়মুড়িয়ে
আগুন
বরফ
পরাক্রমশালী সভ্যতার অহমিকা বলতে
কী আর থাকে


মেয়ের হাসি

মাঝরাতে না একেবারে ভরদুপুরে বিভৎস এক স্বপ্ন দেখলাম
যে আমি মারা যাচ্ছি
আর মেয়ে আমার হাত ধরে আছে
হাসছে
কিন্তু ব্যাপারটা তো অতি স্বাভাবিক
আমার বিস্মিত বা আতঙ্কিত হবার দরকার ছিল না
মৃত্যু তেমন আহামরি কোন ঘটনা তো না
বলা যায় বস্তুজগতে জৈবপরস্পরায় এটা একটা প্রক্রিয়া
আর এই প্রক্রিয়ার ভেতর
শংকা ও সংকোচ এড়িয়ে
খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও
দরকারী কাজগুলো আমরা সারি
হ্যা একটা ব্যাপার বেশ ভাববার মতো
যে দরকারী কাজ কোনগুলো
সেটা ঠিকঠাক আমরা জানি কি না
আর যদি আমরা মারাই যাই
তাহলে মেয়ের হাসিটুকু কোথায় রেখে যাবো
কার কাছে


কাঁটাদের সঙ্গে

বইয়ের লাইনগুলোর ভিতর আমরা শুয়ে থাকবো, ঘুমিয়ে থাকবো। কুয়াশা প্রতিদিন খেয়ে ফেলে একটি-দু'টি করে প্রশ্ন-প্রশ্নপরিবার-প্রশ্নসমাজ, কাউকে আহত না করে, বৃষ্টি আর নুড়ির স্থাপত্যশীলতায়। এখন আমি উড়ছি গ্রীবাচ্ছিন্ন হাঁসের ডানায়, বনের কাঁটাদের সঙ্গে, যারা আবার নিজেদের কাঁটাপরিচয়ে বিরক্ত। অবিশ্বাস্য মনে হবে, এখনও আমরা পাইনি শীতের সাঁতার-কাটা বিছানা।


চন্দ্রানী গোস্বামী

বেনারসি

(০১)

একটা ময়ূরকন্ঠী রঙের বেনারসির কাছে 
                                   পড়ে আছি বহুকাল
সাউথ ইন্ডিয়া থেকে সিল্ক এনে পড়িয়েছিলে 
তোমার বউকে
অবিকল...

রঙের রঙিন থেকে ময়ূর আসে
ঠোঁটে করে রং তুলে মরুভূমিতে
                                        উড়ে যায়...

(০২)

রঙিন আই লাইনার, তোমার থেকে
নীল তুলে গার্হস্থ্য সাজাই---
ট্রাঙ্কে গুছিয়ে রাখা মায়ের বেনারসিও জানে
এমন খোলা বাজারে এসব শাড়ি
তন মন খুশি করলেই পাওয়া যায় ;
একান্তেই নিজে বেনারসি পড়ে নিই
রঙিন আই লাইনার, তোমার নীল জানে
আমি কেমন গার্হস্থ্য সাজিয়েছি
                           নিত্য নতুন শয্যায়...

(০৩)

বারান্দার এক পাশেই করবীফুলের গাছ।

বাবা ঘুমের মাঝেই 
রোজ এসে বেত মেরে যান
চাকরির অভাবে বেলা বোসও

আমার কাছে মায়ের দেওয়া বেনারসি আছে

করবীবীজ আর শাড়ির মাঝখানে 
                      ------ একফালি বারান্দা...
মৃত্যু অথবা তোমাকে পেরোতে হলে
এই পথটুকু যেতেই হবে
                              অথচ, পারি না।



শিখর চক্রবর্তী
ভুলো মন

পরিযায়ী ইচ্ছে গুলো কৌটোয় রাখি,
কৌটো বাঁধি ঐ আঁচলে।
বর্ষার আগে খুলে দেখো ...
এতো লাবণ্য, 
নইলে গলে জল হয়ে যাবে‌
আজকাল বড়ো ভুলো মন...
দুজনারই।

নীল নির্জন

কোনো দ্বীপেই যাওয়া হয়নি।
জলবেষ্টিত ভূখণ্ড মানে তাই হলে
আমি কে?
এলোমেলো পায়ের ছাপই বা কার?
মানচিত্র যাদের, তারা
নীল দিয়ে ঘেরে,
আমি দেখি চুমুতেই হেমলক।

আমাদের পাখি মন

পাঁচিলে সারিবদ্ধ আমাদের পাখিমন ,
সকাল হলেই নন্দিত খিদে।
দু চারদিন বর্ষার পর
ওরা অবধারিত জলের ফোঁটা,
তার বেয়ে নেমে আসা।
আমাদের গ্রাউন্ড ফ্লোর,
এখানেই সত্যনারায়ণে প্রথম আলাপ।


অনিন্দিতা সেন
মৃতবৎ অপেক্ষারা

(১)
শকুনের মতো অসীম ঘৃনা গলার কাছে পাক খায়
পায়ের কাছে পড়ে অসহায় ডানা ঝাপটায়
শকুন গুলো আদপেই কিছু দেখছিল না
আসলে ওরা সময়কে কাঁটাছেঁড়া করছিল
খুবলে খাচ্ছিলো হাড় আর মাংস
ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন মাথাগুলো
ফুটবল খেলার সামগ্রী এখন থেকে!

(২)
সব ধূপদানীই নিভে যায় একদিন
নীরবে পড়ে থাকে শুধু ছাই
নিজের ঘরেই সেই ছাইচাপা আগুন
যার থেকে মুক্তি নেই
অন্ধ আমি বোবা আবেগে
পুষে রাখি ক্ষোভ
অবরুদ্ধ ঘর
হৃদয়হীন বাতাস
খুঁজে ফিরি আলোর প্রতিমা।

(৩)
পিপাসার্তের মুখে আজকাল আর অমৃত তুলে দিতে পারিনা
তাই বলে, বিষ ও কি তুলে দেওয়া যায়
মৃত শরীরের বুকে সুগন্ধি গোলাপ তুলে দিতে দেখেছি
কবর থেকে তুলে আনা সেই গোলাপই সিগন্যালে বিক্রি হয়
উইয়ে জেরবার আজ হাড় সর্বস্ব শরীর
ধানের বদলে গাঁজা গাছের চাষ
নিরালা সঙ্গমে প্রেতাত্মা চুরি হয়ে যায়!


শিবালোক দাস
অভাবে

যদি বর্ষিত হও,
বিন্দু বিন্দু কঠোরতা মুছে দিতে
কেঁপে উঠবে আমার দূরগামী
চোখ—
কখনো তোমাকে অভাবে
ছিন্ন করিনি।
তবে রক্তসন্ধ্যা নামলে কেন
তোমার মুখ ক্ষমাহীন আলোতে
ভরে ওঠে?

এসো, শিথিল করো

এসো, শিথিল করো রুদ্ধদেশ,
মুছে দাও পরতে পরতে।
নক্ষত্রহীন এই সময়ে তোমাকে
কেউ করবে না ধ্বনিময়।
যদি সন্ধানে ফুরিয়ে যেতে চাও,
দ্বিধাহীন হও—
শব্দহীনতায় উন্মুক্ত করো
উপেক্ষিত চরাচর।


নীল

যেখানে থাকে না
কোনো স্পর্শ,
যেখানে ছিঁড়ে যাওয়া
যায় তারায় তারায়,
যেখানে কম্পনরত চোখ
রাখলেই ফুরিয়ে যেতে হয়
মুহূর্তে,
সেখানে আমি রাখিনি
আমার শয্যা…
তবুও প্রতিনিয়ত ছোট
হতে হতে তোমার পরিমিত
নীলে কেমন মিশে যাচ্ছি,
সমস্ত দাহ্যতা ভুলে।


পলাশ পাল
আবদার

কঠিন পথ আর অচেনা
পথের সাথে
হাসতে হাসতে পৌঁছে গেছি
মায়ার কাছে
ছোট্ট ছোট্ট আবদার
পথভোলা জোনাকির মতো
এগিয়ে আসে
বুকের পাথর ভেঙে যেতেই দেখি
আলোময় ছেঁড়া ফাটা
উপলব্ধিকথা...

২.
অচেনা সকাল
পলাশ পাল
বহুদিন বসন্ত লিখিনি
তবুও...
চোখে চোখ রাখে বসন্রতের ঙ
তোমার মেটাফেজ দশায়
অনুরণিত প্রেম
এখন সম্পর্কের ডাকঘরে
কোনো এক অচেনা সকাল
আজ পাহাড়, নদী, নীল সমুদ্র...
বহুদিন বসন্ত লিখিনি
তবুও...
ভালোবাসার সালোকসংশ্লেষে এখন
কবিতার চুম্বনের দাগ
মনের গীতাবিতানে মিশে যাচ্ছে
ক্রমশঃ ক্রমশঃ...


রূপক চট্টোপাধ্যায়

১) মৃত তারাদের শোকেসে থেকে এখনো
মৃদু মৃদু আলোর ক্ষরণ হচ্ছে।
কার আলতা পরা পা দুখানি
চৌকাঠে এসে থমথমে রাত হয়ে এলো।
ঘরে ফেরার পথটি সাপের মতো বাঁক নিয়েই
জড়িয়ে ধরেছে ঠান্ডা মহল্লার আস্ত শরীরটাকে!

২)  বিন্দু বিন্যাস একটি অনন্ত লিখে নিও
এর বেশি প্রেম দিতে পারে,
সে নদের গোরা! গৌরবর্ণ, দীর্ঘদেহি, আজানুলম্বিত বাহুদ্বয়। কেশভার কাঁধ ছুঁয়ে মেঘ হয়ে আছে।
এক বুক সুনীল  সমুদ্র নিয়ে ও পুরুটিকে
আমি বহুবার আমার বাগানে দেখেছি
স্বপ্নের মতো হেঁটে যেতে,
কথা বলার মতো শব্দ ছিলোনা আমার
শুধু ধূলো হোক, বলে ছিলাম আমার শরীর!
হেঁটে যাক তার ওপর আমার প্রেমিক ভগবান! 

৩) তোমার নাকছাবিটি
আলো করে পড়েছিল, মন্দার বাজারে!
আমি তুলে নেব ভেবেছিলাম,
কিছু এতো ভীড়ে
সেটি আমার প্রণয় যোগ্য কি না,
তখনো বুঝতে পারি নি!

৪) নিষ্ঠাবান পুরুষের ভেতরেও
একটা উড়নচণ্ডী পথ থাকে
আর জবড়জং সাইকেল।
সে যেদিন উড়ান খুঁজে পাবে
আর হাতে পাবে বিগত বিকেলের রোদ
সেদিন তুমি যতই আঠা করে রাখো
বুকের চৌদোলা
সে ঠিক আকাশ চিহ্ন সাজাবে সুদূর!

৫) স্বপ্নের কাছাকাছি একটা গাছ পুঁতেছি,
তোমার স্নান জল পেলে সে আরো ডালে পাতায়
সেজে উঠবে রোজ। আমিও
পীতাভ দুপুরে ঝিরিঝিরি বাতাস খুলে
খাটের ওপর শুয়ে শুয়ে একটা জীবন পার করে দেব।
বিশ্বাস করো এর বেশি,
আমার আনন্দ বা অসুখ কিছুই নেই!



নিমাই জানা


সামুদ্রিক যৌনপুরের দেবী, রক্ত ভর্তি অজগর ও হাইড্রোমিনের অমৃত ভোজী মাংস

এরপর জুম করা হবে গুগলের ধর্ম ডিনামিক্স এ , নীল ফ্রিসকিজ নক্ষত্রের নখওয়ালা লিভগ্লস ফটো আর্কাইভ প্যাথলজিস্টরা সিরিঞ্জ দিয়ে টানবে সামুদ্রিক কোন অপ্সরার হিম শীতল তেল , এখানে মর্দন দৃশ্য আমাদের হত্যা করবে সাদা কুরুক্ষেত্রে , s তাজুসপ্রেস এক্সেলের মতই আমি কোন ধর্ম তান্ত্রিক কুকুরকে চৌরাস্তার পুলিশের মতোই ডান হাত তুলতে দেখব না, আমি কখনোই সবুজের অ্যারো মার্কা সিগন্যাল ভাঙ্গিনি , আমি তবে কি সামুদ্রিক ওয়াচ টাওয়ারের নিচে আমার গৌণ গণিকাগুলোকে রেখে আসতে পারি তরমুজের মতো গোলাকার চাবুকের ভেতর ঢুকিয়ে , আল্ট্রা এটোর্ভা ২০ না খেয়ে মাথার ডানদিকে সমস্ত কালো ডাইনির রক্ত যায় কিভাবে নাইটি কালারের মধ্যাহ্নে ? আমি চিৎকার করে উপগ্রহের মৃতদেহের কান্না শুনতে পাচ্ছি পক্ষাঘাতগ্ৰস্থ ডান পায়ের ডগার ওপর উবু হয়ে বসে থাকি আমরা চারজন , কিভাবে শ্বেতাঙ্গ পাঁজরের ভেতর আমাদের জন্মোত্তর পেন্ডুলামটা বাজিয়ে ফেলছে এক একটা কম্পিউটেড টেমোগ্ৰাফিক ফায়ার বল স্টেশন মাস্টার , আমি ভয়ানক ভূমিকম্পের মতো পৃথিবীর সমস্ত মাংসপেশিগুলোকে দুলতে দুলতে ক্যানিয়ানে হাত রাখছি রাক্ষসের মাথা খাব বলে , থ্রি এএম হরর ফেন্সি দরজার ভেতর ভয়েস টেম্পার সৈনিকরা দাঁড়ি পাল্লায় মাপছে কালো কুচকুচে ভ্রুণের মাংস।


গ্রীন করিডরের হৃদপিন্ডের টুকরো , হাসপাতালের মেঝে ও তুলো ভর্তি গৌণ যৌনাঙ্গের সেবিকারা


ফিমেল ওয়ার্ডের জানালার মতো বিষাক্ত বাথরুম আর নেই , বাথরুমে যে রঙিন ফিনাইলটা দেওয়া হয় তার সাথে আমার পাতলা বীর্য মিশে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করে। সারারাত ন্যাকড়া বিক্রেতা যে নার্সিংহোমের সেবিকাটি লাকি বেবুন গাছের পালা করে করে দেবদারুর দাঁত খুলে রেখে শীতল গ্রীন করিডোর দিয়ে হাটে তাকে আমি ঠিক অনুসরণ করে তার শয়নকক্ষ অবধি চলে যেতে পারি , আমি কোন ড্রইং সেন্টার থেকে রাধাকান্তের মিষ্টি কিনব যৌন আক্রান্তদের মুখ টিপে ইনজেকশন নিতে বাধ্য করব আর রাষ্ট্রদ্রোহীকে খেতে দেব সায়াটিকা বাতের রস পাগলা কুকুরের জিভ আর ঠোঁটে হাত বুলিয়ে খেতে দেবো মাংস ও পরেরটা , এই বাঁদরটা কতদিন আমার যৌনদৃশ্য দেখে দেখে নিজেকে শোধরাতে পারেনি বলে নগর কীর্তনে বেরিয়েছে ট্রাফিক লাইসেন্সের ট্রেড ইউনিয়নদের মত একটা গাঁজাখোর সারারাত পাতালে গিয়ে জবাই কারখানার মাংস খাচ্ছে‌ নন আপডেটেড


নন ক্রোমাটিক বিড়ালের রহস্যাবৃত পাকস্থলী , তামাটে পিত্ত ও ধর্মতান্ত্রিক ডিম


পিতা মারা যাওয়ার পরেই যেভাবে বৃষ্টি হয়েছিল সেভাবেই আমার জন্ম রহস্য উড়ে গেছে অনেক আগেই , আমি গোটা রাস্তাতেই পিতার মৃতদেহ বইবার সময় থলথলে মাংসপিণ্ড ও দেখেছি চোখের ট্রান্সপারেন্ট লেন্স লাগিয়ে পিত্তথলি অবধি দেখে ফেলেছি সব কিছুই , পিত্তথলির গায়ে যে সবুজ রঙের মাংস তাকে বধ করতে দেখেছি কামুক কোন অদ্বৈতবাদী ধর্মতান্ত্রিক নারীকে, এখানে সাদা সাদা ডিমের মতোই অস্বস্তিকর কোন পৌস্টিকতন্ত্র ভেজে বিক্রি করছে একটা পাতলা কালারের ধোঁয়া বিক্রেতার শিরীন ডিম তৈরীর দেবী , এতো ভয়ানক কালো বিড়ালের মাংস কখনো দেখিনি দুর্ঘটনায় বিস্ফোরণে উড়ে যাচ্ছিল সেনাবাহিনীদের পোশাক ঘোড়াদের ঠ্যাং উটের স্তন্যপায়ী জিব লালা ভর্তি কবরের সমান্তরাল পূর্বপুরুষদের অতীন্দ্রিয় আন্ত্রিক রোগ , পুরুষ মানুষ না থেকেই কিভাবে গর্ভবতী হয়ে যাচ্ছিল এক একটা ডিম গাছ পুরুষ পিতারাই আমাকে প্যারা নরমালের ওষুধ কিনে খাওয়াচ্ছে সমঝোতা করার জন্য সেনারাও যুদ্ধ বিরোধী চাইছে না কোন মতেই মশার পেটের রক্ত আমি হার্ডকোর জিভ দিয়ে চেখে দেখছি বারবার


অযৌন হার্ডকোর , স্বৈরাচারী ধনুষ্টংকারের গলা পিতামহের চাটনি ও মাংসপেশীর বন্দর


নিজস্ব মেদ পুঞ্জ আছে মেঘের মতোই আমাদের অতৃপ্ত আত্মা ঘুরছে নির্ণেয়মান জলের নিচে , সবাই আততায়ী মাছ। গোরক্ষপুরের মতোই আমাদের হিতাকাঙ্খী গুলো নীরব আঁশযুক্ত ছটফটে জলাধারের নিচে অতৃপ্ত গুমঘরে গুদামের নীল নৈশ ভোজের আসর পেতেছি , আমি কি কোন অ্যাডিপোজ টিস্যুর মতোই জন্মান্ধকালীন সব রক্ত শুষে খেয়ে নিতে পারি চামড়ার তৈরি অতৃপ্ত গলার ভেতরে কেউ ডাকছে মৃত নক্ষত্রের নাম ধরে , সারারাত খঞ্জনি বাজলেই আমি কাকে দোষারোপ করতে পারি হে অতৃপ্ত বেকন বিক্রেতা লাল স্রাবের দোকানে নীলাভ সিঁড়ি নেমে আসে পান্থপাদকের স্বৈরাচারী ধনুক নিয়ে একাই অসংখ্য কুপিয়ে কুপিয়ে নিশাচর যৌন দৃশ্য দেখাবে আখরোট খাওয়া চাঁদকে , নরমেল লিমিট গাবাপিন আর বৃত্তির জঙ্ঘা উরু দেশের ঘা হে পক্ষাঘাত নাবিক সারারাত কর্ষণ করো নৈশ নৌকার বিষাক্ত তর্পণকে তরমুজের মতো আমাদের অশৌচ পালন হচ্ছে গান্ধর্ব মতে , ২৫×১১×২০ ঘন মিলিমিটারে একটা চৌবাচ্চায় এক কোটি ব্রাহ্মণশাসন বাস করছে পুরোহিতকে কাল সাপে কামড়ে ছিল বলেই তার সমগ্র বিষে চতুরাশ্রম বানাচ্ছে নিজের পোশাক তৈরির ভয়ানক প্রেমিকা


নিশাচর ক্যাপসুল হোমস্টে ক্রসবাইট ও ১৮ তম কসমিক কক্ষপথের পিশাচ সযগ্ৰ


নিশাচর ওষুধের কোন ব্যাসার্ধ নেই নখ দিয়ে খুলি বিষাক্ত প্রেসক্রিপশন যারা দুটো কালারের ক্যাপসুল গিলে খায় তাদেরও নিজস্ব ঝাউবাগান আছে। চা বাগানের নিচে অজগরের বিষাক্ত ফনা নম্র স্টেটমেন্ট অফ সিরোসিস , হোমের পাশেই মোমবাতি জ্বেলে রাত্রি কাবাব হোটেলের গেস্ট হাউসে ভেপারাস রুটি তরকারি শ্যেক হোমে মদের জল মেশাচ্ছে রাজলক্ষ্মী বস্ত্রালয় , উরশোকল খেতে খেতেই আমাদের নাম ভুলে গিয়েছিল প্রজন্মকালীন আদিম রতি যুগের কোন দানব , দানবের পুরুষের আঠালো হিংস্র পশু গুলোই সিঁড়ি কাঠের কাছে নামবে, জল খাবে, গলায় অ্যাসিড ঢেলে ফলের দোকানে যাবে হৃদপিন্ডের কস্টিক মাংসে ঢেলে দেবে নতুন তরোয়ালের একমাত্র বংশধরকে , স্টুপিডিটি বললেই জিনসেং খাওয়া ৩০ ফোটার মাথা। এ ব্যাৎসায়নের ভূত এসো রগশাস্ত্রের চরস ঢেলে ঢেলে গেছি ভবনের সমাধি প্রতিনিধিকে পারদের ক্ষার ধাতুতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে অতিরিক্তের ইস্পাতিফিকেশান বানাই ,


মিথ্যে আত্মার কাবাব বংশধরের গর্ভফুল ও একান্ত রক্তাক্ত বক্ষবন্ধনীর কেমেস্ট্রি


এক হাজারেরও বেশি ফিস ফ্রাই আয়নার মতো ঝুলছে এত রগ রগে প্রেসক্রিপশন এর মতই একটা চতুর্ভুজ ঘর নার্সিংহোমের মতোই এখানে আত্মীয়রা আত্মা ও টক টক বাসি ফলের মাংস নিয়ে ওৎ পেতে বসে থাকে ভিজিটিং আওয়ার্সে প্রসেসিং চার্জ বলে কিছু নেই সাদা সাদা শাওয়ার থেকে জল নামে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মকরধ্বজ হয় পড়তে থাকে মৃতদেহের নাকে গুঁজে রাখা সবুজ তুলো ডাস্টবিন থেকে উঁকি দিলেই আমাদের পরবর্তী আঠারো কোটি জন্মের নাভি ও গর্ভ ফুল নিজেরাই চিৎকার করবে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো , কাকে আমি নিয়ে যেতে পারি তরোয়াল মার্কা বক্ষবন্ধনী কেনার জন্য। সেলভিয়ান নদীর পাতাল থেকে দেখা যাচ্ছে শ্মশানে পুড়তে আসা সমস্ত মৃতদেহের জিভের লকলকে কালো হয়ে যাওয়ার দাঁত। এতো মিথ্যে রংয়ের সাদা কাকেরা জৈবিক আগ্নেয় আগুন জেলে হসপিটাল ঠাকুরের ডুবে যায় যে কোন রাজকীয় পুরোহিত কে ছয়মরা সবাই নিয়ে যেতে পারি না , কিভাবে ধর্মতলার কাছে একটা পরিতক্ত বাসস্থান রেখে গেছো হে মধুদা , তোমাদের জীবিত গাভীন ঘরে উদ্বায়ী মাছগুলো ফ্যালোপিয়ান টিউবের পাশে অসম্পৃক্ত জাইগোটের করাতকলে মাথা কেটে কেটে শুকোতে দিচ্ছে একটা ডিম্বাণুর পারদর্শী সাপের ফোঁড়া গুলোকে


পারমিতা দে দাস

অন্তরালে

ছবির ভেতর থেকে তুলে আনি নিজেরই প্রতিচ্ছবি।
হাত নেই! পা নেই!
শরীর যেন এবড়ো-খেবড়ো পথ
   তারই গর্তে জমা কাদাজল।
   কেউ হেঁটে গেলে,
   থুতু ছোঁড়ে
  ডিঙিয়ে যায় অন্ধকার।
সে-ই একদিন যত্নে করেছিল রাস্তা নির্মাণ,
যে রাতের অন্ধকারে চালিয়ে দিল বুলডোজার।

শাস্তি

বিশুদ্ধতার কাছে হাত পেতে দাঁড়িয়েছি।
যেভাবে দুধে মেশায় জল
যেভাবে কৃত্রিম সারে বাড়ানো হয় ফসলের উৎপাদন
সেভাবেই ভেঙে পড়ছে শরীর
  বিষিয়ে উঠছে মাটি।
চোখ বন্ধ করে ভালোবাসার পায়ে মাথানত রাখলে
এভাবেই আড়ালে বাড়ে শাস্তি!


রহিত ঘোষাল
আগুন আহুতি তপস্যা

এই দ্রুততা রেখে
সমান্তরাল চলেছে বাঁধন ও আলগা বাঁধন,
বধ্য জীবন, সময় চালিত কাল,
ভাষা সব অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর।
যৌন আবেগ নিয়ে একঘেয়ে দিন কাটে,
ঝুলে থাকে বহুগামিতা—
মহাসাগর নাচে বয়সের কাঁচা পদক্ষেপে,
হকারের হাঁক হালকা বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়,
চাঁদনি রাতে অন্তর্বাস ভারি হয়ে ওঠে,
পর্দা নেমে আসে মৈথুনঘন ঘরে
কেঁপে ওঠে আগুন আহুতি তপস্যা।

এমনই একদিন

তখন আমার একটা তরতাজা প্রেম
ঠোঁটের ওপর রাখা,
তাই তো আত্মবিশ্বাস প্যান্ডোরার বক্সে।
শ্মশান-বন্ধুরা এসেছে বিকেলবেলায়,
ম্যাসাকার দেখতে এসেছে
কিছু চেনা মানুষ।
শিঙায় ফুঁ দিতে দিতে চলেছে
এক সাধু, তার দিকে সবাই ঘুরে তাকিয়েছে।
এমনই একদিন তুমি ব্রডওয়ে বারের সামনে
ফুটপাত আলো করে সিগারেট খাচ্ছ,
সাদা ড্রেসে তোমাকে প্রজাপতির মতো লাগছে,
তোমার কাঁধে আলগা চুমু এঁকে দিতে চাই—
এক হাত দূরে ভেজ চাওমিন,
আর ভিখিরি মেয়েটা বকা খেয়ে সরে যায়,
এমনই একদিন।




মুক্তগদ্য

ফুটনোটে নির্বাসিত ঈশ্বর
নিলয় নন্দী

ঈশ্বর আজ নিজের চশমা খুলে কাচের বয়ামে রেখে ঘুমিয়েছেন। আমি সেই বয়ামটিকে রাষ্ট্র বলে ডাকি। আবদ্ধ সংবিধান , স্বপ্নের ফুটনোট। গভীরে যাও। গন্তব্য কোনো অপ্রকাশিত আর্কাইভ। সেখানে ভাষা আর শব্দ নয়— সিসিটিভির ব্লাইন্ড স্পট, যেখানে সত্য প্রতি রাতে ছদ্মবেশ বদলায়। আমি সেই বদলানোর শব্দ শুনি।  অথচ অভিধান তার বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর নেয় না।

রবীন্দ্রনাথ একটি এটিএম বুথ থেকে বেরিয়ে নিজের স্বাক্ষর মুছে ফেলেন। জীবনানন্দ পরিত্যক্ত ফ্লাইওভারের নিচে হরিণ নয়, ওয়াই-ফাই খুঁজছেন। কাফকা তার পোকাটিকে আপডেট করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন—সমস্ত রূপান্তর অ্যালগরিদমের মালিকানাধীন। ফুকো হাসেন না; তিনি শুধু আয়নার ওপর একটি বারকোড সেঁটে দেন। স্ক্যান করতে গেলে দেখি, আমার মুখের বদলে একটি ডিসকাউন্ট কুপন খুলে গেছে—মেয়াদ শেষ আগামী জন্মে।

মাগো, ভাতের পাতে নুন দিয়েছিলে আজ, মনে করতে পারছি না। খবরের কাগজে দেশজ  গুরুচন্ডালী। বাবা বানানের ভুল ধরছেন ক্রমাগত।  ডাইনিং টেবিলে আমাদের যা কিছু পারিবারিক আলাপ গিলে খাচ্ছে ব্ল্যাকহোল। পড়ে থাকে এঁটো চামচেরা...

আমি একটি কবিতা লিখতেই দেখি কবিতাটি আমাকে লেখে। কবি মারা যাননি;  প্রতিটি পাঠক নিজের সুবিধামতো লিখে গেছে পরের লাইন।  আমি আর 'আমি' নই—একটি উদ্ধৃতি, উৎস হারিয়ে গেছে। যতিচিহ্ন ধর্মঘট ডেকেছে। পূর্ণচ্ছেদ সীমান্তে গুলিবিদ্ধ। কমা উদ্বাস্তু শিবিরে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিজের মাথা খুলে বাজারে বিক্রি করছে....

শহরের সমস্ত মূর্তি মাঝরাতে নেমে এসে নিজেদের ছায়াকে জেরা করে। ছায়ারা কোনো উত্তর দেয় না; কারণ আলো ইতিমধ্যে কর্পোরেট স্পনসরশিপে বিক্রি হয়ে গেছে। আকাশের নীল রং আদতে বহুজাতিক সংস্থার ট্রেডমার্ক। মেঘ ব্যবহার করতে হলে সাবস্ক্রিপশন লাগে। বৃষ্টি এখন আর প্রকৃতির নয়; একটি সফটওয়্যার আপডেট।

শেষ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারি—কোনো কেন্দ্র নেই, কোনো প্রান্তও নয়। কেবল অসংখ্য টেক্সট, অসংখ্য প্রতিলিপি, অসংখ্য ভাঙা আয়না একে অপরকে উদ্ধৃত করে চলেছে। এই কবিতাটিও নিজেকে বিশ্বাস করে না। সে মুক্ত অথবা অন্ধ বন্ধ ঘেরাটোপ। এই দুর্বোধ্যতা আপনার নয়, আমারও নয়। কেবল ফুটনোট, কেবল দীর্ঘশ্বাস। আমায় অন্ধ করে দাও। আমায় বধির করে দাও। স্বরলিপি কখনো বা প্রশ্বাসে ভর করে। ঈশ্বর ঘুমোন। একমাত্র ঘুমই বোধ্য, নিরুদ্দেশ মানচিত্র যেন। নীরবতা কখন যে আমার জুতোর ফিতে বেঁধে অদৃশ্য হয়ে যায়...


দোলাচলে জীবন
শর্মিষ্ঠা মিত্র সেনগুপ্ত

দিনের কোলে সন্ধ্যা গড়িয়ে আসে। জানলার বাইরে উঠোনে তখনও লেগে থাকে এক ফালি আলো। দুটো শালিক এক মনে খুঁজে চলেছে বাকি রাতটুকুর রসদ। প্রতিদিন এই এক টুকরো দৃশ্যগুলো একটু করে জারিয়ে নিয়ে বেঁচে উঠি অথচ বাঁচার অন্য অর্থ বুকে ধরে এতটা কাল লালন করে এসেছি। একটা স্বপ্ন অথবা জ্বরের ঘোরের মতন। তার আবেশের হাত ছাড়াতে মন চায় নি। কুসুমর‌ঙা রোদে জলের ছোট ছোট ঢেউ ঝিলমিল করে ওঠে। স্বচ্ছ দৃষ্টি দীঘলতায় ডুব দেয় জীবন। প্রতিশ্রুতির হাত ধরে ঋতু বদলের মত জীবনে পালা বদলে ক্রমশে সেই মুঠোয় ভরা হাতে পরতের পর পরত জমে প্রস্তরীভূত হয়। অবাক চোখের সামনে জ্বলে নেবে গুচ্ছ গুচ্ছ জোনাকি। ওদের মায়াবী আলোর নাচন দেখে মনে পড়ে ছোটবেলায় কাচের বয়ামে রেখে ওপারে বিস্ময়ী দু'টো নিষ্পাপ চোখের কথা। কেন যে তাদের ধরে রাখতাম সেটা আজ আর মনে নেই।

স্নেহের জল এগিয়ে দাও। কাঁচের গ্লাসে গলা বুক জড়িয়ে যায়। এভাবে তিন দশক শান্তির জল ছিটিয়ে এসেছো নিদাঘ ফাটা ফাটা মনের জমিতে। বেসামাল ঝড় উঠলেই দুহাতের বেড়ে জন্মেছে মায়াগাছ। আজ তাদের ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে - অসংখ্য ঝুরিতে জমেছে অযুত কাহন। এভাবেই এক এক করে কুড়িয়ে তুলি কাঠগোলাপ। বৃষ্টির অঝোর ধারায় ভিজতে গিয়ে মনে পড়ে এবারের আষারে আমাদের একসাথে সমুদ্র দেখার কথা ছিল। অথবা ডালের ফোড়ন দিতে দিতে মনে পড়ে কোন এক পাহাড়ি বিকেলে তোমার ভালোলাগা কৃষ্ণাঙ্গি মেয়েটির কথা। তোমারই মুখে শোনা। দেড় দশকের সংসারী অল্প অভিমান জমিয়ে রাখে তার তো চিকনকারী বেড কভারের নিচে, তার চুলের চিরুনিতে অথবা অফিসের নকশি করা রুমালের কোণে।‌ চোখ বন্ধ করি। দক্ষিণের হু হু বাতাসে ভেসে আসে আজানের সুর।

চপল নদীর স্থবিরতা এলেও অসময়ে হড়পা বানে ভেসে যায় সংসারের চালচুলো। মনে হয় বাকি থেকে যাওয়া ভালোলাগার আয়ু হয়তো অনেকখানি। ভেতরে ভেতরে ভাঙন আটকে ডুব দিই। তোমাকে যতটা ভালবেসেছি এ'জন্মে সেটা তোমার শান্ত স্নিগ্ধতার কাছে নিতান্তই এক আঁজলা জলের মতো। তোমার মগ্ন মূর্তির সামনে বয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন। প্রবাহিত হয়েছে আমাদের বিগত দিন। উজান পাড়ি দিতে বদ্ধপরিকর আমরা এভাবেই নিত্য জীবনের দোলাচলে ভাসি - ডুবি; আবার ভেসে‌ উঠি।


বলাকাদিদি
অর্পিতা সরকার

কোথাও পড়েছিলাম, একটি মেয়ে মেঘলা দিনে দুধসাদা শাড়ি পরে। সে হয়তো গল্পের নায়িকা__

আজ তার নাম মনে পড়ে না। তাকে 'বলাকা' বলে ডাকতে খুব  ইচ্ছে করে। বেশ দেখতে পাই, তার আধভেজা খোলা চুল, শরীরে জুঁই এর গন্ধ, 

তার মনখারাপ, জানো...

আমি এক বলাকাকে চিনতাম। বলাকাদিদি। সে জলের সনে কথা কইতো।  ছবি আঁকত পাহাড়ের, মেঘরঙা উদাসী পাহাড়। তারপর সেই খাতা ছিঁড়ে নৌকা বানিয়ে ভাসাতো জলে, নিজেও ভাসত। চান্দের সাম্পান। তারপর একদিন ধুলোমাটির ওপর অভিমান করে একেবারে ভেসে গেল, অতসী ফুলের মতো।

  বলাকা, বলাকাদিদি

আঙুলের ডগায় তার বৃষ্টিফোঁটা,  বুকের মধ্যে শ্যামলী মেঘ। মৃদু বিষাদের আলো গালে মাখামাখি।  ভালবেসে ডাক দিলে ডুব দেবে বুঝি, বরষা নামবে ওই, ঝিরিঝিরি ব্যথা...

পাখা ভিজে যাবে জলে,

বৃষ্টি নামল বুঝি বলাকার বুকে

বলাকা। বলাকা দিদি। তার খুব মনখারাপ, 

জানো?


যে মানুষটি এখনো জানালার পাশে বসে
রণতোষ কুমার দেব

সবাই ভাবে মানুষ বদলে যায়। আসলে বদলে যায় তার চারপাশ। মানুষ কেবল নিজের ভেতরে একটু একটু করে নীরব হয়ে ওঠে। যে ছেলেটি একদিন বৃষ্টির মধ্যে ছাতা ছাড়া হাঁটত, সে আজ ভিজতে ভয় পায় না—ভয় পায় জ্বরকে। যে মেয়েটি একসময় বিকেলের আকাশে মেঘ গুনত, সে এখন মোবাইলের পর্দায় সময় গোনে। জীবন আমাদের ইচ্ছার চেয়ে বেশি দ্রুত বড় করে দেয়।

তবু কিছু মানুষ আছে, যারা ভিড়ের মধ্যেও জানালার পাশে বসে থাকে। তারা বাইরের পৃথিবী দেখে না, নিজের ভেতরের পৃথিবীটাকেই দেখতে থাকে। তারা জানে, প্রতিটি মানুষের বুকের মধ্যে একটি নির্জন উঠোন আছে; সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে, কিন্তু সব সন্ধ্যার জন্য প্রদীপ জ্বলে না।

আমরা সাফল্যের হিসাব শিখেছি, কিন্তু সন্তুষ্টির অঙ্ক শিখিনি। তাই আরও পাওয়ার নেশায় আমরা যা পেয়েছি, তার মূল্যই ভুলে যাই। নতুন বাড়ির স্বপ্ন দেখতে দেখতে পুরোনো উঠোনের আমগাছটিকে মনে রাখি না। দূরের শহরের আলো আমাদের টানে, অথচ গ্রামের সেই অন্ধকার পথেই প্রথম হাঁটতে শিখেছিলাম।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের নয়, মনোযোগের। আমরা একে অপরের কথা শুনি না; শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। অথচ অনেক সময় একটি নীরব শ্রোতাই একটি ভাঙা মানুষকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারে। পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হয়তো সময়ই—যে সময়ে কোনো তাড়া থাকে না, কোনো হিসাব থাকে না, থাকে শুধু একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি।

জীবন আমাদের প্রতিদিন শেখায়, সব হারানো পরাজয় নয়। কিছু হারানোই নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার শুরু। শুকনো পাতারা যদি গাছ ছেড়ে না পড়ত, তবে নতুন কুঁড়ির জন্ম হতো না। নদী যদি বাঁক নিতে না জানত, তবে সে সমুদ্রে পৌঁছাতে পারত না। তাই প্রতিটি সমাপ্তির ভেতরেই একটি অদৃশ্য সূচনা লুকিয়ে থাকে।

আজও যখন সন্ধ্যা নামে, কোনো না কোনো জানালার পাশে একজন মানুষ নিশ্চয়ই বসে থাকে। তার হাতে হয়তো কোনো বই নেই, পাশে কোনো মানুষও নেই। তবু সে অপেক্ষা করে—কাউকে নয়, নিজের ভেতরের সেই মানুষটির জন্য, যে এখনও বিশ্বাস করে পৃথিবী সম্পূর্ণ নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। যে এখনও জানে, একটি আন্তরিক শব্দ, একটি নির্ভেজাল হাসি কিংবা একটি ছোট্ট সহানুভূতি—এসবই মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

সময় আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নেয়, কিন্তু একটি জিনিস কেড়ে নিতে পারে না—মানুষ হয়ে থাকার ইচ্ছা। যতদিন সেই ইচ্ছা বেঁচে থাকবে, ততদিন জানালার পাশে বসে থাকা মানুষটিও বেঁচে থাকবে। আর তার চোখে প্রতিটি নতুন সকাল কেবল আরেকটি দিন নয়, বরং আরও একবার ভালো মানুষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।


শান্তির বাণী
অরিতা ভৌমিক

যারা আমার মতো বৃন্দাবনে হরিলুট আর গড়ে হরিবোল তাদের তো এমনই হয়। আসবে যাবে চিরদিনের সেই আমি-তুমি-আমরা। আর মাঝে যত রাম-শ্যাম-যদু-মধু কিংবা সিঙারা- বুলবুলি-মস্তক।এতোটা কি ভেবেছিলেন স্বয়ং পি.সি. সরকার! সরকার মানে সিঙারা।তারপর তোমার পরাণ পাখি বুলবুলির জন্য সিমেন্টের ঢালাই। মাঝে কিছু কাটমানি এদিক-ওদিক। লক্ষী থেকে অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠার বিস্মৃত অভয় অধ্যায়।স্মৃতি বড়ো খতরনাক। অতএব তুমি তুলে দাও তোমার মাথাটি কেটে সযতনে আমাদের গণতান্ত্রিক প্লেটে। ভাতা হোক ঘরে ঘরে। হাঁড়িতে ভাত নয় চুল্লু ফুটুক। ত্রাতা হই। কারণ জনতা জানে আমিই বিধাতা। মন্দির মসজিদ  খেলতে খেলতে আসিফা মরুক। আমরা ঘুরে দাঁড়াবোই। দখল করেছি রাম, সীতা বিনা একক। এবং অদ্বিতীয় পুরুষ প্রবর। জুতো মেরে গরুদান না করলে গর্দাখানি নেব কেমনে!

স্মৃতির দুয়ারে


শৈশবের বারান্দা
শাখী পাল


মনের উপর আজকাল রঙবাহারী পর্দা টানাই। বুনোট মেঘ পিরিত করে সখের জুলিয়েট বারান্দায়। কান্না চোখ হলেই রুমাল হয় পোর্টেবল ক্লথলাইনে ঝোলানো মসলিন জামদানী।

শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার আজ। লাল-সবুজ কাঁচের চুড়ির দোকান মন টানে। শৈশব জানালায় উঁকি দিই। মনে ভাসে, পিটার প্যান কলার ফ্রক না পেলেও মায়ের বানানো থান কাটা হাত সেলাই ফ্রক পরে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালছি। তারপর দেখি— লাল দোপাটির মতো গণ্ডদেশে অকাল আষাঢ়।

তবু বাবার বাড়ির ডাক আর আসে না।

আসলে ঠিকানা হারিয়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যায় না . . .



ঢাক
নীলাঞ্জনা হাজরা


পুজোর ছুটি পড়বে পড়বে সময়ে আর মন বসে না স্কুলে,মাঝে মাঝেই খুব বকুনি জুটতো বাড়িতে তো বটেই, স্কুলেও।বারোয়ারিতে বাঁশ পরতো।বাঙালীর প্রধান উৎসব দুর্গাপুজো আসছে,তারপর লক্ষী,কালী,জগদ্ধাত্রী।সব পর পর পুজো।দিন গোনা,পুজো গোনা পাল্লা দিয়ে চলতো।সেই অনুভূতি অনন্য, অসাধারন। পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাক।ঢাকের আওয়াজ একটা তাল সমেত বাজনা ছিল না কেবল,ঢাকের বাদ্যি সারা বছরের কথা,অভিযোগ, অভিমান মায়ের কাছে ব্যক্ত করার এক অনবদ্য মাধ্যম। আমার কাছে অন্তত তাই,,,,, গভীর গাঢ় গহীন ভালবাসার ছোঁয়া লেগে থাকে ঢাক বাদ্যিতে।

ঠাকুর বিজয়ার সময়ে ঢাক বাজলেই একটা অদৃশ্য মনখারাপ তাড়া করতো,যেটার রূপ দেওয়া খুব কঠিন। মা যেন সব কিছুতে ছন্দবদ্ধ বিশ্বাস, আশ্বাস আর আর্শীবাদ দিয়ে মর্ত্য থেকে বিদায় নিচ্ছেন। আবার সামনে বছর আসবেন,সবার কষ্ট নিবারণ করার জন্য ।

প্রত্যেক মণ্ডপে গোল করে ঢাকীরা বসে ঢাক বাজাতেন।পাড়ার এক একজনের বাড়িতে এক একজন ঢাকীর খাবার বরাদ্দ থাকত।গৃহস্থকে বারোয়ারি কতৃপক্ষ এসে বলে যেত।শেষ দিনে সবার কাছ থেকে আগামী বছর আবার দেখা হবে এই প্রতিশ্রুতিতে বিদায় নিত।যাবার সময় ঢাক বাজিয়ে পুরানো জামা কাপড় আর টাকার আবদার করত।আস্তে আস্তে ঢাকের বাজনা কমে আসত।খুব মন খারাপ করে পড়তে বসতে হত।সেইসময় ঐ পড়তে বসাটাই জীবনের একটা ট্রাজেডি ছিল। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ এলে মনের মধ্যে একটা নিরুত্তর কষ্ট অনুভূত হত।সেই ছোট বয়সে ঐ জোর করে পড়তে বসাটাই এক অসম্ভব ব্যথা।

আজকের বয়সে এসে পুলকিত হয়ে আর ঢাক শোনা হয় না।ড্যাং ড্যাং তালে নেচে ওঠা হয় না,জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত দম হারিয়ে ঐ দিন গুলোতে ছুটে যাওয়ার যায় না,মনের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে স্মৃতির বীজ সারা মন,মন থেকে হৃদয়ে ছড়িয়ে যায় অনবরত। বেজে যায় ঢাক, মৃদু আওয়াজে,মৃদু তালে অনবরত আর অনবরত কিন্ত পড়তে বসে নয়,অসংখ্য বাজনার ঝনঝনানির মাঝে ঐ আওয়াজটা সুদূর দিকশূন্যপুরের দিকে নিয়ে যায়।মন ছুটে যায় চরৈবতি,চরৈবতি করে এদিকে ওদিকে,,,


স্মৃতির উঠোন
সুস্মিতা রায়চৌধুরী


'উঠোন' শব্দটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু-হু করে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে চুনকাম খসে পড়া একটা মস্ত বড় শরিকি বাড়ি, যার খড়খড়ি দেওয়া জানলা দিয়ে বিকেলের আলো এসে পড়ত এক বিশাল উঠোনে। আজ যখন শহরের বারোশো স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটবাড়িতে বসে আমরা ‘পার্সোনাল স্পেস’ আর ‘প্রাইভেসি’র সূক্ষ্ম হিসেব কষি, তখন স্মৃতির ধুলোবালি ঘেঁটে মনে পড়ে যায় সেই একান্নবর্তী উঠোনের কথা। যেখানে জীবন কোনও জ্যামিতিক মাপে চলত না, চলত রক্তের টানে আর হৃদয়ের ওমে।

একান্নবর্তী মানে তো শুধু এক হাঁড়িতে চাল ফোটা নয়, এক আকাশে এক ঝাঁক পাখির ডানা ঝাপটানো। দুঃখ এলে একা কাউকে কাঁদতে হতো না, আর সুখ নিমেষেই হয়ে উঠত গোটা বাড়ির উৎসব।

মনে পড়ে সেই বাড়িটার হৃৎপিণ্ড—সেই খোলা উঠোনটা? দুপুরবেলা পুরুষমানুষেরা কাজে বেরোলে বাড়িটার রাশ চলে যেত মা-কাকিমাদের হাতে। বড়জেঠিমা, মেজকাকিমা, ছোটপিসিমা—সবাই মিলে একফালি রোদ পিঠে নিয়ে মাদুর পেতে উঠোনে বসতেন। আমসত্ত্ব, বড়ি আর কুলের আচার রোদে দেওয়ার পাশাপাশি চলত সংসারের হাজারো সুখ-দুঃখের গল্প। কারোর চোখে জল দেখলে অন্যজন পরম মমতায় আঁচল দিয়ে তা মুছিয়ে দিতেন।

আর আমাদের শৈশব? সে তো ছিল এক রাজকীয় ব্যাপার! আলাদা করে কোনও ‘প্লে-ডেট’ লাগত না, নিজের ঘরেই তৈরি হয়ে যেত আস্ত একটা ফুটবল টিম। নতুন খেলনা আসা মানে সেটা গোটা বাড়ির সম্পত্তি। মারামারি, চুলোচুলি, আর পরক্ষণেই একটি পেয়ারা নুন-লঙ্কা দিয়ে কামড়ে ভাগ করে খাওয়া। সন্ধে নামলে ঠাকুমার কোল ঘেঁষে বসা আর লোডশেডিং হলে মোমবাতির আলোয় দেওয়ালে ছায়ার পুতুলখেলা। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা ফোঁড়নের চেনা সুবাস আর অজস্র চেনা মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দে অন্ধকারও আমাদের ভয় দেখাতে পারত না।

আজকের দিনে আমরা বড্ড হিসেবি, বড্ড একা। দিতে বা ভাগ করতে ভয় পাই। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবার আমাদের শিখিয়েছিল এক আশ্চর্য গণিত—সেখানে ভাগ করলে আনন্দ বাড়ে, আর দুঃখটা অনেকগুলো কাঁধে ভাগ হয়ে হালকা হয়ে যায়। জ্যাঠামশাইয়ের কড়া শাসন, কাকার লুকিয়ে পকেটে গুঁজে দেওয়া লজেন্স, দাদুর খড়ম পায়ে বারান্দায় পায়চারি—সবটা মিলিয়ে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ পৃথিবী ছিল। কারোর চাকরি চলে গেলে বা ব্যবসায় ক্ষতি হলে বাড়ির উনুন নিভে যেত না। পুরো বাড়িটা যেন অদৃশ্য বটগাছ হয়ে সেই ঝড় নিজের মাথায় আটকে দিত।

এখন সময় বদলেছে। জীবিকার টানে আমরা একান্নবর্তী থেকে ‘অণু’ পরিবার হয়েছি। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির কাচের দেওয়ালে এখন বড্ড বেশি নীরবতা। ফ্ল্যাটে বৈভব বেড়েছে, দামি আসবাব এসেছে, কিন্তু সেই প্রাণখোলা সুরটা হারিয়ে গেছে।

হয়তো আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই শরিকি দিনগুলোতে পুরোপুরি ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বুকের ভেতরের সেই একান্নবর্তী টানটা কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়? আজও যখন কোনও পুজোয় বা আকস্মিক বিপদে আমরা দূর-দূরান্ত থেকে একসঙ্গে জড়ো হই, মুহূর্তের মধ্যে সব দূরত্ব ভেঙে পড়ে। চেনা হাসির কলরবে মেঝের এক কোণে চাদর পেতে শুয়েও রাতে শান্তিতে ঘুম চলে আসে। তখন বুঝতে পারি—ইঁট-কাঠের দেওয়াল আলাদা হলেও, আমাদের শিকড়টা আজও সেই একান্নবর্তী উঠোনের মাটির গভীরে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। অবচেতনে আজও সেই উঠোনে একান্নটি প্রদীপ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, আমাদের একলা হতে দেয় না।


একলা কিছুক্ষণ- জিয়ানস্টাল জিয়া
আলোক মণ্ডল


সেতু নেই। খরস্রোতা কাঁসাই,কিছুটা জলে হেঁটে,কিছুটা নৌকা। বাঁশের লগিতে ঠেলে ভেসে যাওয়া ওপারে।অপেক্ষায় লম্বামুখো বাস।হুড়-হুড় দুদ্দাড়। দু'পাশে শাল আর পলাশের সারি চিরে পৌছে যাওয়া, পাহাড়ের উর্মিমালা দেশ।

যতই এগোই পাহাড় পিছিয়ে যায়। ধরা না-দেওয়ার খেলা! দূর থেকে দেখা যায় বামনিসিনি, ধুলো ঢাকা। ফেলে আসা আমি বাবলা আঁঠা কুড়োতে মশগুল,দিগন্ত রেখায় সাদা চিক জলরেখা মকুটমনিপুর ।

একলা কিছুক্ষণে ভেসে আসে, জানালার পাশে আমলকী,পাতার ফাঁকে দেখা ন্যারোগেজ লাইন-লেবেল ক্রসিং। অঝোর বৃষ্টি। মাথায়, হরিদাস পাল। কাঠের বাঁটওয়ালা ছাতা। ঝুম ঝুম চলছি, প্যান্ট-কাটা খাঁকি কাপড়ের থলিতে বই।ছেঁড়া থলি,ফুটো থেকে পড়ে গেছে সুগন্ধী কাঠের স্কেল, কখন কে জানে! মনখারাপি ঘনমেঘ, চলেছি পাঠশালা। টিনের ছাউনি,অঝোর বৃষ্টির শব্দে নামতাঘুষা। মা ডাকছে, "ফিরে আয়, অঝোরে বৃষ্টি রিম ঝিম। আয়,আর যেতে হবে না !" ভিজে শপ জামা- চলেছি কোচিং ক্লাস।সামনেই বৃত্তি পরীক্ষা। োড়ো বাড়ি ভূতের মতন,গা ছম! পথে একলা আমি। এক দৌড়ে বনপুকুর।জলপাম্প টেস্ট করছে কেউ, নির্ভয়তা আসে তখনই। ঝোপের আড়ালে আহা ! সেই পাকাতাল কুড়িয়ে বাড়ি।ভাদ্রের বৃষ্টি থামে। থেমে যায় বৃষ্টি মনের ভেতর।

কু ঝিক বিডিআর রেল।পোড়া মাটির ওপর লোহার লাইন। পরাবাস্তব দুপুর,ঘর ফেলে হৈ-হৈ দে-দৌড় লাইন ধারে, কালো ধোঁয়া উগরে ছুটে আসে দৈত্য রথ।একটি দু'পয়সা লাইনে পেতে দিতেই চেপ্টে ইয়া বড়! আহা,কত্ত বড় পাওয়া!

দু'পয়সা,তিন পয়সা,পাঁচ,দশ, কুড়ি পয়সা -আঙুলের ডগায় রেখে থৈ-বালতি জলে ভাসিয়ে একাএকা খেলা।সঙ্গীহীন একাকী খেলা!দাড়িয়াবাঁধা,বুড়ি বসন্ত,গোল্লাছুট সে সব অন্য মজার! ভিজে মাটিতে কাঠি দিয়ে কোর্ট আঁকি। এক্কাদোক্কা- কতবার ফেলে আসা আহা, অজন্তা হাওয়াই! সকালে মনে পড়তেই ছুট্। চপ্পল হস্তগত করার আগে ঘাসের ডগা থেকে শিশিরের মুক্তোকণা, টগরের ডাল নাড়িয়ে জল ঝরানো, আহা সেই সব ছোট্ট বেলা!


গল্পাণু


আয়নায় দেখা 
কেয়া নন্দী


সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিতোষবাবু ' র দুইপুত্র টি.ভির পর্দায় পশ্চিম - এশিয়ার যুদ্ধের খবর দেখতে ব্যস্ত। তার - ই টুকরো - টাকরা কথা কানে আসে পরিতোষবাবু- র।

            মনে মনে ভাবেন, একটু একটু করে পুঁজি জমিয়ে ছেলেদের কথা ভেবে দোতলাবাড়ি তুলেছি,আধপেটা খেয়ে মা তোদের থালা ভরিয়েছে,লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করিয়েছি।তারপর বিবাহ - নাতি নাতনী সাধ্যমতো সব দায়িত্বপালন করেছি। সাধ একটাই শেষবয়সে একটা প্রাণোচ্ছল সংসারযাপন করা।কিন্তু নাহ্! সময় গড়াতেই বাবা - মায়ের দায়িত্ব নিয়ে দুই পুত্রের দ্বন্দ্বের বিরতি রইলো না। বাবা - মা ভাগ হলো _____ ধাক্কাটা সামলাতে না পেরে মা - টা চলেই গেলো !

              আজ দেশের যুদ্ধ নিয়ে নানা নৈতিক বক্তব্য না রেখে আয়নার সামনে নিজেদের দ্যাখ।


নীল আলোর কোলে
রাজেন্দ্র কয়াল

রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ ফোনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল তার প্রথম বার্তা। অচেনা পরিচয় ধীরে ধীরে অভ্যাসে বদলে গেল। প্রতিদিন ছোট ছোট কথার ভাঁজে জমে উঠত হাসি, অভিমান আর অদেখা এক টান। দীর্ঘদিন কথা হলেও কখনও কণ্ঠস্বর শোনা হয়নি, মুখোমুখিও দেখা হয়নি। তবু মনে হতো, সে যেন খুব কাছের মানুষ।

হঠাৎ একদিন সব থেমে গেল। তার বার্তা আর এল না। প্রতিদিন অপেক্ষায় ফোনের পর্দা খুলতাম, কিন্তু নীরবতাই ফিরে আসত। তখন বুঝলাম, এই সময়ে সম্পর্কের শুরুটা যত সহজ, তার স্থায়িত্ব ততটাই অনিশ্চিত। কিছু মানুষ জীবনে আসে, অল্প কিছু স্মৃতি রেখে নিঃশব্দেই হারিয়ে যায়—ঠিক ভোরের শিশিরের মতো, প্রথম সূর্যের আলোতেই মিলিয়ে যায়।



তোমায় খুঁজি
বিজয়া মিশ্র


অনেকদিন পর দেখলাম ওকে, ও মানে শালুক আমার ছোটবেলার বন্ধু। কী ভীষণ ছটপটে, দুরন্ত ছিল মেয়েটা।

কিন্তু কেমন যেন লাগছে ওকে ,অচেনা, শান্ত ধীর। প্রায় সতের বছর আগে শেষবার মামার বাড়িতে দেখা হয়েছিল।   দুজনের সেবার চড়ক মেলা গিয়ে আটকে পড়েছিলাম কালবৈশাখী ঝড়ে, ছুটে আসতে গিয়ে শালুক আছাড় খেল । মেলায় শখ ক'রে পরা লাল কাঁচের চুড়িগুলো ভেঙে ফুটেছিল হাতে, বের করে দিতেই ভীষণ রক্তপাত, মায়ের হাতে খুব মার খেয়েছিল সেদিন।ওর মায়ের আপত্তিতে বন্ধ হয়ে গেল যোগাযোগ...। মুখোমুখি হ'তেই বললাম "কেমন আছিস, চিনতে পারছিস। " একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। টলমলে, নিষ্পাপ, ফ্যাকাসে চোখে একরাশ জিজ্ঞাসা। শুধু বলল "আর হারিয়ে যেও না যেন... ।"


কথাচিত্র


প্যাকাটিদার প্রত্যাবর্তন
অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়


আমি।। আসুন আসুন প্যাকাটিদা। ওই আরাম কেদারায় বসুন। আমি আপনাকে সিগারেট দিচ্ছি। আরাম করে টান মারুন, যেমন ঘনাদা করতেন।

প্যাকাটিদা।। ঘনা? ওই শুটকো চেহারার লোকটা! যে শিশিরের সিগারেটের কৌটো ফাঁকা করে দিয়েছিল?

আমি।। হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে ঘনাদার আলাপ ছিল নাকি? বন্ধু ছিলেন?

প্যাকাটিদা।। ওই আর কি, অসমবয়সের বন্ধুত্ব। আমার থেকে ৫০ বছরের বড় ছিলেন।

আমি।। আপনি "কিশোর ভারতী" পত্রিকায় আসেন অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কলমে ।ওদের ভাগলপুরে "শরৎ স্মৃতি সংঘ" নামে একটি ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবে কল্যাণ, সন্দীপ ,রজৎ, তোতন এদের সঙ্গে আপনার ওঠাবসা ছিল।

আমি।।ওদের কত জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প বলেছি, ওরা শুনতো আর গুরু গুরু বলতো।

আমি।। তারপর দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "কিশোর ভারতী"-র পৃষ্ঠায় আপনাকে কয়েকবার দেখার পর হঠাৎই আপনার অন্তর্ধান। কোথায় গেলেন আপনি? উবে গেলেন বলা যায়।

প্যাকাটিদা।। গ্লোবট্রটার।

আমি।। সে আবার কি?

প্যাকাটিদা।। বিয়ে তো করিনি, জীবন তো আর কাটতেই চাইছিল না। তাই বেরিয়ে পড়লাম বিশ্ব ভ্রমণে। সারা পৃথিবী ঘুরে দেখতে চাইলাম ভেতরে কি আছে? কিছুই নেই। শুধু সাইলেন্স।

আমি।। সে আবার কি?

প্যাকাটিদা।। সংগীতে একটা নাদ বেরিয়ে আসে নাদব্রহ্ম থেকে , সেই শব্দে আলোড়িত হয় চেতনা, বিশ্বজগৎ । সেই শব্দ ফুরিয়ে গেলে, জীবনের সব লেনদেন ফুরিয়ে এলে "থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন"।

আমি।। তোমার বনলতা সেন কে প্যাকাটিদা?

প্যাকাটিদা।। বনলতা সেন নয়, সৌমিতা দত্ত।

আমি।। কি বলেছিল সে---এতদিন কোথায় ছিলেন?

প্যাকাটিদা।। না তো, তেমন কিছু বলেনি। ও জানত আমি আজ ব্রাজিলে ভিনিশিয়াসের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করছি তো কাল লন্ডনে ঝুম্পা লাহিড়ির সঙ্গে সাহিত্য আলোচনা করে জীবন ও জগতকে চিনছি। কবি পার্থিতা দত্ত আমাকে বলেছিলেন আমরা ধর্মের মধ্যে থেকেই জীবনকে চিনতে শিখবো। অনুষ্কা শঙ্কর আমার প্রশ্নের জবাবে মৌনতা অবলম্বন করে বুঝিয়ে দিলেন, শব্দ নয় শব্দহীনতায় আমাদের মুক্তি। সাইলেন্স।

আমি।। কিন্তু প্যাকাটিদা, আপনার অল্প বয়সে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে শুনতে মনে হতো আপনার কথার শব্দগুলো উদ্যত রিভলবারের গুলির মতন।

প্যাকাটিদা।। আমি তো বেশিদিন তোদের ভাগলপুরে থাকিনি, কল্যাণ আর তোতন বলেছিল থাকতে আরো কিছুদিন, কিন্তু স্রষ্টা বিপর্যস্ত হয়ে গেলে সৃষ্টি কোথায় মুখ লুকাবে?

আমি।। প্যাকাটিদা,তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলে?

প্যাকাটিদা।। হ্যাঁ কেমিস্ট্রিতে এমএসসি ডক্টরেট ।মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি নিয়ে রিসার্চ করেছি । আজকের অত্যুন্নত মেডিসিন নিয়ে আমার গর্ববোধ হয়। এ তো আমি পঞ্চাশ বছর আগে কল্যাণ- তোতোনদের বলে দিয়েছিলাম । এমনকি পঞ্চাশ বছর পরে ক্যান্সারের ওষুধ যে আবিষ্কৃত হয়ে যাবে , সে কথাও ওদের বলেছিলাম । রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক ইলিয়া তারাকোভস্কির সঙ্গে আমার হৃদ্যতা ছিল, ও অনেকটাই জানতো রাশিয়ান বৈজ্ঞানিকদের কণ্ঠস্বর।

আমি।। প্যাকাটিদা, আজকের পৃথিবীকে নিয়ে কিছু বলুন, এই যে এত যুদ্ধ,এত রক্তক্ষয়, এর পেছনেও তো বিজ্ঞানের অভিশাপ!

প্যাকাটিদা।। চোপ! বিজ্ঞান নিয়ে একটা কথাও বলবি না । হাড় হারামজাদা হলো মানুষ, বিজ্ঞানকে রাজনৈতিক সমাপতনে সৃষ্টি করেছে ভয়াল অস্ত্রশস্ত্র যা দিয়ে মানব সভ্যতা ধ্বংস হচ্ছে। লাশ আর লাশ। ইরানে গিয়েছিলাম , দেখলাম দেড়শো শিশুর লাশ সাদা কাপড়ে মুড়ে সারি সারি শুইয়ে রেখে দিয়েছে,মাথার কাছে এক একটি ফলক, তাতে লেখা শিশুর নাম। আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণে প্রথম দিনেই মৃত্যু। এই শিশুদের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার ছিল সুকান্ত- র, হায় পৃথিবী---

(পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের কোণটা মুছে নিলেন।)

আমি।। প্যাকাটিদা, রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে নি:সীম নির্জনতায় আঁতকে ওঠেন না পাশের গলি দিয়ে চলে- যাওয়া কয়েকজন শবযাত্রীর "রাম নাম সত হ্যায়" আর্ত চিৎকারে। মনে হয় না, মৃত্যু মানুষকে নিয়তির আবর্তে ঠেলে নিষ্ঠুর একটা দাহপত্রে সই করাচ্ছে?

প্যাকাটিদা। আমি আর থাকব না রে, এতদিন গ্লোবট্রটার ছিলাম, অনুভব করেছি এই বিশাল ঘেরাটোপে মানুষ এক গিনিপিগ, কোন ক্ষমতা নেই। প্রকৃতি কখনোই তার প্রতি অত্যাচার চালায় না, মানুষ, ওই রক্তচক্ষু মানুষের দল মানুষকেই গলা টিপে হত্যা করতে উদ্যত। আমি চলে যাব। আমি চলে যাব।

আমি।। কোথায় যাবেন প্যাকাটিদা?

প্যাকাটিদা।। হিমালয়ে। ট্রেকিং করে উঠে যাব অনেক অনেক ওপরে। পরনে একটা কৌপিন ছাড়া কিছু থাকবে না। সারা শরীরে ছাই মাখা থাকবে। সকালের ওঠা সূর্যকে নমস্কার করে উচ্চারণ করব,--- "ওম জবাকুসুম সঙ্কাশন কাশ্যপেয়ম মহাদ্যুতিম---" হে সূর্য, আলো দাও আলো দাও।

আমি।। আপনার গুণমুগ্ধরা পড়ে থাকবে এই নচ্ছার পৃথিবীতে?

প্যাকাটিদা।। থাকবে। সবার মনের জোর তো সমান হয় না। কল্যাণের স্ত্রী সেই কবে ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেছে, কল্যাণ পাগল হয়ে না গেলেও জীবনে রয়েছে আর আমার সঙ্গে আসবে না সেটা নিশ্চিত জানতাম। তোতন পুরোপুরি সংসারী মানুষ, হাজার দোলাচল মনের মধ্যে আসলেও ও কিন্তু সংসার ছাড়বে না। ওর স্ত্রী মারা গেছে শুনেছি,কষ্ট পেয়েছে নিদারুণ, কিন্তু ওর সাহস নেই সব মায়া- মমতা ত্যাগ করে আমার সঙ্গে এই হিমালয়ের উত্তুঙ্গ চূড়ায় উঠে বসা।---" আমরা সবাই, যে যার নিজের ধাঁচে ছাগশিশু করেছি জবাই।"

আমি।। আপনার বলা জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে একবার বুদ্ধদেব গুহ বলেছিলেন,--- এই গল্পগুলো থেকে যাবে। আজ "পত্রভারতী"-তে ত্রিদিববাবুর সঙ্গে দেখা করলে উনি কি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের "কিশোর ভারতী"বের করে গল্পগুলো উদ্ধার করে দিতে পারবেন?

প্যাকাটিদা।। নাইবা পারলেন! কত পুরনো স্মৃতি হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। ধরা যাক এর মধ্যে একটা তীব্র ভূমিকম্পে "পত্রভারতী"-র মুখপত্র "কিশোর ভারতী" মাটির তলায় তলিয়ে গেল। তারপর কোন জাদু মন্ত্রে একের পর এক সংখ্যা মাটির উপরে মাথা তুলে উঠতে শুরু করল। প্রথম সংখ্যাটাতেই রয়েছে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের "দাঁত না মারণাস্ত্র , ৫০ বছর আগের পুরনো সংখ্যায় । এখন তো পরবর্তী প্রজন্ম সেটা তারিয়ে তারিয়ে পড়বে।

আমি।। তা পড়বে। আমি তাহলে একটা বিধ্বংসী ভূমিকম্পের অপেক্ষায় রইলাম।

প্যাকাটিদা।। বেশি দেরি নেই । পৃথিবীর ধ্বংস খুব কাছেই। আমরা কেউ থাকবো না। শেষের সেদিন বড় ভয়ঙ্কর!


ডাকঘর

পম্পা ঘোষ

প্রিয়,


একটি জন্মের আশায় আজও আমি প্রতীক্ষার প্রদীপ জ্বেলে বসে আছি।

মনে মনে দেখি—ভোরের প্রথম আলোয় নদীর পবিত্র জলে স্নান সেরে ফিরছি। পরনে লালপাড় শাড়ি, পায়ে রাঙা আলতা, কপালে সিঁদুরের অরুণরেখা—স্নেহ, মমতা আর মঙ্গলকামনায় দীপ্ত এক অনামিকা নারী।

তারপর নিঃশব্দ পায়ে তুলসীতলায় এসে একটি প্রদীপ জ্বালাই। শিখার ক্ষুদ্র কম্পনে জড়িয়ে দিই তোমার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য আর অনন্ত কল্যাণের প্রার্থনা। ধূপের ধোঁয়া যেমন ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠে যায়, তেমনি আমার নীরব আরাধনাও প্রতিদিন ঈশ্বরের দ্বারে পৌঁছে যায়—শুধু তোমার মঙ্গললিপি রচনার আকাঙ্ক্ষায়।

সেই কবে থেকে এই স্বপ্ন হৃদয়ে  লালন করে চলেছি! সময়ের অসংখ্য ঋতু বদলেছে, নদীর স্রোত বহুবার দিক পরিবর্তন করেছে, কিন্তু আমার প্রতীক্ষার দীপটি নিভে যায়নি। সে আজও জ্বলে—নিভৃত বিশ্বাসে, অদৃশ্য অর্ঘ্যে, অব্যক্ত প্রেমের আরতিতে।

হয়তো কোনো এক জন্মে, কোনো শুভ প্রভাতে, এই অসম্পূর্ণ প্রার্থনার পূর্ণাহুতি মিলবে। তখন তুলসীতলার প্রদীপের আলোয়, নদীর জলে ধোয়া আকাশের নিচে, আমার সমস্ত অপেক্ষা এক বিন্দু আশীর্বাদ হয়ে তোমার জীবনকে স্পর্শ করবে।


ইতি
হারিয়ে  ফেলা আমিটা



আকাশ বাণী কলকাতার "প্রাত্যহিকী" বিভাগের গত পক্ষের বিষয় "কান্ডজ্ঞান" নিয়ে আমার না পাঠানো চিঠিটি

অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়


প্রভাত বন্ধু প্রাত্যহিকী,

এই পক্ষের বিষয় " কান্ড জ্ঞান" নিয়ে আমার কিছু কথা বলতে চাই।

  দেখুন একটা কথা আছে, " যার নয় পাঁচে তার নয় পঞ্চাশে।" অর্থাৎ এই কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা যাদের মধ্যে থাকে সেটা কিন্তু ছোট বেলা থেকেই থাকে। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু মানুষের অবশ্য অনেক বয়সে কান্ডজ্ঞান হয় অনেক ঠেকায় পড়ে। আবার কোন কোন মানুষ থাকে এমনি বেপরোয়া যে ঐ সব ফালতু কান্ডজ্ঞান ট্যানের বেশি ধার ধারেন না। তাদের মনোভাব কেমন জানেন? না, যা করছি বেশ করছি, আপনি কে মশাই এতো জ্ঞান দিতে আসেন?

         কিন্তু এরা হয় জানেন না আর নয়তো মানেন না যে সামান্য একটু কান্ডজ্ঞানের অভাবে কতো বড়ো বড়ো দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ পর্যন্ত চলে যায়। পেপার বা টিভির খবরে শিউরে ওঠেন দর্শক বা শ্রোতাগণ যখন তারা খবর পান যে বেপরোয়া বাইক চালানোর ফলে কোন বড়ো গাড়ি বা গাছে বা রাস্তার ধারের গর্তে পড়ে তরতাজা যুবকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। কিম্বা ভীষন গতিতে দুটি বাসের রেষারেষির শিকার হয়ে মারা পড়েছেন পথ চলতি কোন সাধারণ ও নিরীহ মানুষ।

         বর্তমানে স্রেফ ফেসবুকের রীল বানাতে গিয়ে নদীতে, সমুদ্রের ঢেউয়ে, চলন্ত ট্রেনে বা পাহাড়ের চূড়ায় বা ঝর্ণার জলে দাঁড়িয়ে রীল বানাতে গিয়ে কতো তরুণ তরুণী বা যুবক যুবতীর প্রাণ এক লহমায় শেষ হয়ে যাচ্ছে শোনা যায়। কানে মোবাইল গুঁজে ব্যস্ত যান চলাচলের রাস্তা পার হওয়ার সময় বা এভাবে বাইক বা কার চালাতে গিয়ে কতো সুস্থ সুন্দর মানুষের জীবন অকালে ঝরে যায় বা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ে।

           রাস্তায় প্রায়শই লক্ষ্য করি যে কিছু অসতর্ক মা, বাবা বা বয়স্ক মানুষ তাদের শিশু সন্তানকে নিজের বাঁ দিকে না রেখে ডান দিকে অর্থাৎ খোলা রাস্তার যেদিক দিয়ে সবেগে গাড়ী বাইক ছুটছে সেদিকে, ঐ শিশুর হাত ধরে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে। এটা যে কতটা ঝুঁকি পূর্ণ ঐ সব অজ্ঞান ও কোমলমতি শিশুদের জীবনের জন্য সেটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই যেন ঐ বয়স্ক মানুষদের। অনেক সময় এমনটা দেখলেই আমি সেই মা বাবাকে সতর্ক করে দিয়ে শিশুটিকে তাদের বাম হাতে ধরে রাস্তায় হাঁটতে বলি। অনেক ক্ষেত্রেই তাতে ঐ সব তরুণ প্রজন্মের মা বাবাদের বোধোদয় হয় দেখেছি। আবার অনেক সময় এটা দেখেও সভয়ে চমকে উঠি যখন দেখা যায় কোন যুবক বা যুবতী রাস্তার পাশে স্কুটার বা মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে তার সিটে নার্সারি বা প্রাইমারী স্কুলে পড়া তার শিশুটিকে বসিয়ে দিয়ে দিব্যি বেখেয়ালে বাজার করতে বা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত। এইসব কান্ড কারখানা দেখে একেবারে থ হয়ে যেতে হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপারটা ঘটে যখন মা ও বাবা থাকে ব্যস্ত রাস্তার দুই দিকে আনমনে কোন কাজে লিপ্ত আর মাঝখানে তাদের ছোট শিশু বা বালক পুত্র বা কন্যাটি কার কাছে যাবে ঠিক করতে না পেরে কখনো মায়ের কাছে বা কখনো বাবার কাছে ছুটে যায় রাস্তা ক্রশ করে। এমন পরিস্থিতিতে চলন্ত বাসের বা গাড়ির তলায় চাপা পড়ে কতো না শিশুর জীবন দীপ অকালে নিভে যায় দেখেছি বা শুনেছি।

        কিছু কিছু মানুষ এমন থাকে যাদের সাত জন্মেও কখনো কান্ডজ্ঞান হবার কোন আশা নেই। আমার শহরের বিভিন্ন দোকান, মল বা ইস্কুল, অফিসের সামনে অনেকেই এমন বিতিকিচ্ছিরি ভাবে তাদের গাড়ি লক করে পার্কিং করে রাখে যে তার আগে একটু ভিতরে গাড়ি রেখে যাওয়া মানুষটি যখন নিজের সেই গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে যেতে চায় তখন ঐ পরে গাড়ি  পার্কিং করা ব্যাক্তির লক করে রাখা গাড়ির বাধায় সহজে আর বেরোতে পারে না আগে গাড়ি রাখা মানুষটি। আবার এই নিয়ে আপনি যদি তাদের চোখ খুলে দিয়ে কিছু বলতে যান তো কথা তো শুনবেই না, উল্টে আপনাকেই দুচার কথা শুনিয়ে দেবে। আমি হাজার বলেও এই সব বেপরোয়া এবং অশিষ্ট তথা শৃঙ্খলা নষ্ট কারী মানুষের স্বভাব পাল্টাতে পারিনি।

সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানিয়ে চিঠি শেষ করছি। ভালো থাকবেন সকলে।


ছোটগল্প


আবাদ করলে ফলে সোনা
শম্পা বন্দ্যোপাধ্যায়


বাজারটা সেরে হন্তদন্ত হয়ে সুরভি একটা টোটোকে আসতে দেখে হাত দেখালো। একটুও সময় নেই হাতে।দেরি হয়ে গেল । মাছ বাছতে কিনতে ওর দেরি হয়।সারা সপ্তাহের বাজার করতে হয় একদিনেই। একটি ছুটির দিন,পড়ে পাওয়া ষোল আনার মতো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবে কোথায় তা না,রাজ্যের ঝামেলা গুলো এই দিনই এসে দাঁড়ায়।

বাথরুম সাফাই,ঘরের ঝুলকালি ঝাড়া। কাপড় জামা ধোয়া ইস্ত্রি করতে দেওয়া,মায়ের ডাক্তার কোবরেজ ইত্যাদি  ঊনকোটি কাজ ।বাজার আসা মানেও মায়ের হাজারটা ফরমায়েশ মতো সবজি নেওয়া।

এর সাথে ও ,ওর সাথে সে নাহলে মিলবে না। প্রত্যেক সবজির জুড়িদার কিনতে হবে।নাহলেই চিত্তির।

চিকেন খাবেন না উনি,তাই মাছেরও হরেকরকম্বা নিতে হবে। সুরভিও চিকেন খেতে চায়না।ওর একলার জন্য চিকেন মটন আর রান্না করতে হবে না।তা শুনলে তো বুড়ি,

-আমি খাবো না তো কি?রান্না করতে তো পারি।

না করলে রান্নাটা ভুলে যাবো না?

-রান্না,সাইকেল ,গাড়ি চালানো ,সাঁতার এই কয়েকটা জিনিস কেউ ভোলে না মা।

-তুই খুব জানিস?তুইও তো আজ বাইশ বছর পড়াচ্ছিস স্কুলে।তবুও রোজ রোজ বই নিয়ে বসিস কেন?

পেরে ওঠেনি মায়ের সাথে।কথায় পারবে তার সাথে?তিনি এখন মোবাইল ফোনে টাইপ করে করে কত ষষ্টি কথা লিখছেন।

সুরভিকে রাত্রেবেলা শোনাতে এলেই সুরভির ঘুমে চোখের পাতা বুজে আসে।

-তুই কী রে সুর?মা কে একটু এনকারেজ করতে পারিস না?আমার লেখার কত প্রশংসা করে লোকে আর তুই আমার লেখা পড়িস তো নাই,উল্টে শুনবিও না।

-মাম্মিজি রাগ করো না বাবু।দাও মাথাটায় একটু হাত বুলিয়ে, শুনছি, পড়ো।

ওমনি ইন্দ্রানী উৎসাহিত হয়ে কন্যার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে পড়েন নিজের লেখা গল্প।আর কন্যা শুনতে শুনতে একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ে।

এই নিয়মের কোনদিন ব্যত্যয় হয়নি।

সুরভি এই ক্ষণটুকু বড় তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। ফেসবুক,লেখা রান্নাবান্না

তার তো শখের শেষ নেই।ফেসবুকের সাহিত্যচর্চার গ্রুপ তার।হাজারটা বন্ধু।ভালোই আছে , ইন্দ্রানী ব্যানার্জী কন্যা সুরভি ব্যানার্জীর চেয়ে বরং ইয়াং আছে।

হাতে দুটো বড় বড় ঢাউস ব্যাগ সবজি ফল ঠাসাঠাসি ,উন্মুখ হয়ে বেরিয়ে রয়েছে মুলো বেগুন গাজরের মাথাগুলো।

টোটোতে উঠতে যেতেই হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে টোটোতে ধপাস করে  উঠে বসলো একটা মেয়ে। সুরভি থতমত খেয়ে টোটোতে উঠে বসতেই উল্টোদিকে বসা মেয়েটি

-ম্যাম হামাকে চিনতে নাই পারছেন?

এত ভারী ব্যাগ হাতের নড়াটা তো ছিঁড়ে যাবে।

বলেই ব্যাগ দুটো নিজের দিকে এনে গুছিয়ে বসলো ।

সুরভি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখের ঘাম মুছে গন্তব্য বলতেই টোটো চলতে শুরু করলো।


অতীব উৎসাহী কণ্ঠে  উল্টোদিকে বসে  মেয়েটার দিকে তাকিয়ে একটু হালকা হাসলো সুরভি।মুখটা একটুও চেনা লাগলোনা।একটা অধময়লা শাড়ি পরে আছে,মলিন চেহারা।বয়সও তো ভালোই মনে হচ্ছে।অন্তত সুরভির ছাত্রী বলে তো মনে হচ্ছেনা।

-ম্যাম আমায় চিনতে পারেননাই?

নিজের রসিকতায় নিজেই  বেশ জোরে হাসলো মেয়েটা।সুরভি ঘাড় নাড়লো।বাইশ বছরের শিক্ষকতার জীবনে কোথাও তো খুঁজে পাচ্ছেনা এই মুখটা।

-ম্যাম আমি বেলুনি !

বেলুনি সাও, দুটো কেলাস মাত্ররও পড়েছিলাম মাত্ররও ফাইব আর সিক্স।

-ওহ তাহলে কী করে মনে থাকবে বলো?

-হাঁ ম্যাম ,যেন সুরভির না চিনতে পারাটাকে ক্ষমা করে দিলো ও

-আপনার বাড়ি কুথায় ম্যাম?

-এই তো নামবো ,স্বস্তি সদনে

টোটো থেকে গলির মুখটাতে টোটো দাঁড়াতেই ঝপ করে ব্যাগদুটো তুলে  সুরভির আগে মেয়েটাই নেমে দাঁড়ালো।

-নিন ম্যাম নামুন ব্যাগদুটা আমি লিছি।খুব ভারী আছে।

-আরে নাহ নাহ আমাকে দাও,

বলতে বলতেই মেয়েটা ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু গলির দিকে।

অগত্যা টোটোওয়ালাকে দুটো ভাড়া দিয়ে সুরভি প্রায় ছুটে গেল কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই ব্যাগ ধরতে দিলো না।সুরভির বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে।গায়ে পড়া মানুষকে একদম সহ্য হয়না।

বেল বাজাতেই মা দরজা খুলে দিলো, দরজা খুলতেই

রোগা শুকনো মুখটা নিয়ে আকর্ণ হেসে মেয়েটা বললো

-আমি বেলুনি সাও, ম্যামের ছাত্রী হই,

এত ভারী ব্যাগ দুটা পচুর সবজিও আছে

মাসিমা বলুন দেখি কোথায় কলতলা

সেখানেই নামাবো নয়তো ঘরের কার্পেট নোংরা হবে।


মেয়েটা ব্যাগ নিয়ে সটান ভেতরের দিকে যেতেই সুরভি ওকে আটকালো।

-আরে বেলুনি তুমি রাখো মা করে নেবে।

-ম্যাম ইত কিছু বাজার করেছেন।মাসিমা কি পারে এতকুছু ধুয়ে গুছাই রাখতে?

চলে গেল কলতলায়

সুরভি বুঝতেই পারছে না।মেয়েটার মতলবটা।আজকাল কাউকে বিশ্বাস হয়না।এমন জোর জবরদস্তি ঢুকে পড়ে ও নিজের গ্যাংকে ডেকে ঘরে চুরি করিয়ে দিতে পারে।আরো কত কিছু করতে পারে।

রীতিমতো ঘেমে উঠলো সুরভি।

মাকে চোখ পাকিয়ে বললো

-বিদায় করো ওটাকে

-তুই তো নিয়ে এলি,আহ দাঁড়া না।দেখ কী সুন্দর সমস্ত সবজি ধুয়ে এখন  মাছ চিকেন ধুতে গেছে

যাতে শুনতে না পায় আওয়াজ চেপে সুরভি বলে

- মা এখনই কী বিপদ ঘটবে কে জানে।ছুরি টুরি নেই তো ওর কাছে?মোবাইল আছে?

দৌড়ে সুরভি বাইরের ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলো

দুটো ময়লা চটি ছেড়ে ঘরে ঢুকেছে আর গাছ রাখার স্ল্যাবটার উপরে একটা ছোট পার্সের মতো পুরোনো গয়নার ব্যাগ, সেটাও জীর্ণ।হাত দিতে ঘেন্না লাগছিলো সুরভীর তবু কোন লুকোনো কিছু নেই তো ?

ভেবেই আলগা আলগা খুলে দেখলো একটা মুড়িসুরি করে রাখা দশ টাকার ময়লা নোট ছাড়া কিছু নেই।

কিন্তু শাড়ির আঁচলে থাকতে পারে।

ওদিকে ঘরে ঢুকে দেখে মোড়ার উপর বসে বেলুনি মায়ের সাথে গল্প জুড়েছে

-মাসিমা আজকাল কাউরে বিসওয়াস করবেন নাই।

কেত্ব রকমের লোক আছে জানেননা।এই যে আমাকে ঢুইকতে দিলেন ইটাও কিন্তুক ভালো কাজ হয়নাই।আমিও তো চোর চোট্টা হতেই পারে নাকি?

ইন্দ্রানী চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে বলছে

-হ্যাঁ সে তো হতেই পারো বেলুনি।কিন্তু তোমার অমন সুন্দর চোখ,এত মিষ্টি মুখ তুমি কি চোর হতে পারো?দেখলেও তো একটা মানুষকে বোঝা যায়।আর আমি ফেসবুক ঘেঁটে ঘেঁটে মানুষ চিনতে শিখে গেছি।

-বেলুনি মিষ্টি করে হাসলো।কাপ ধুয়ে রেখে এসে বললো

মাসিমা একটা পুরানা নাইটি ঐটি দিন দেখি।এই কাপড়ে তো আপনি আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দিবেন নাই।কাপড় ছেড়ে আসি বাইরের বাথরুমটা থেকে।এসে সব করে ফেলছি।

সুরভি আঁতকে উঠলো। বাইরে বাথরুম আছে সেটাও দেখে নেওয়া হয় গেল।নির্ঘাত একে রেইকি করতে পাঠিয়েছে এর দল।এতো বিরক্ত লাগছে মা কে।

মা এদিকে তাকাচ্ছেও না।সুরভি চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিতে পারতো।কিন্তু তাকাবে তবে তো?


মা এখন নিশ্চিত গল্পের প্লট খুঁজছে।

এই টুকু ভাবতে না ভাবতেই সুরভি দেখলো সিরিঙ্গি মার্কা একখান জগঝম্প নাইটি গায়ে কলতলা থেকে পাশের দরজা দিয়ে ঢুকে গেলো বেলুনি।

কী যে আতান্তরে পড়লো সুরভি।আচ্ছা ঝামেলারে ভাই।ছুটির দিনটা এ সময় এক মগ সর ওঠা কফি নিয়ে ব্যালকনিতে বসে পাখির কিচিরমিচির আর আবিদা পারভিন বা আমানত আলী শুনতো।

আর মা রান্না করতে করতে ফোনে সকল আত্মীয়ের খোঁজখবর নিতো।তা না কী এক উপদ্রব এসে উপস্থিত!আচ্ছা চিটেল মেয়ে তো।মতলবটাই বা কী?

সুরভি রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বললো

-বেলুনি তুই কী করছিস?ছাড় এসব মা করে নেবে। তুই বাড়ি যা বাড়ির লোক খুঁজবে তো তোকে?

-কী যে বলো দিদি ,এমন আতান্তর অবস্থা মাসিমার।এসব একটু গুছাই তুলে না দিলে? ঘরে যেন কত লোক আমার খুঁজ করার।তুমি যে কী বলো।তুমি যাও তো তুমার দোলনায় বোসো আমি কফি লিয়ে দিয়ে আসসি।আমি এতক্ষণ যখন রইলাম,মাসিমা কি আমায় দুটি ভাত না খাইয়ে ছাড়বে ভেবেছো?

মা মৃদু মৃদু হাসছে। কী সুন্দর গুছিয়ে কাজ করে দেখ সুর? নিশ্চয় খেয়ে যাবি বেলুনি।

এই তো এখনই রান্না করে ফেলছি দেখ না।

তুমি কেন করবে ?আমি করবো

আমার হাতের রান্না খেয়ে দেখো একবার।এসব আমার অভ্যেস আছে।

লটে মাছ,মাছের মাথা দিয়ে লাউ ,পেপার চিকেন

সুরভি থ ,আন্টি থেকে মাসিমা,ম্যাম থেকে দিদি।

মা বুঝতেই পারছে না।আর ছাত্রী কিসের? চেনেই না।


যা পারে করুক আর নিতে পারছে না।পেপারটা নিয়ে ও ভেতরের ঘরে গিয়ে রুবাইকে ফোন করলো।

কবে কোন ব্যাচ কোন সাল সমস্ত মনে থাকে রুবাই এর।

-হ্যাঁ রে রুবি বেলুনি নামের কোন মেয়েকে মনে পড়ছে তোর?

-বেলুনি ? হ্যাঁ মনে পড়ছে ,ওর এই নামটার জন্যই মনে আছে বেলুনি টাইটেল কি ছিল যেন ,দাঁড়া..

-সাও

-হ্যাঁ ঠিক ,সাও ,বেলুনি সাও খুব টকেটিভ মেয়ে ছিল।বেশিদূর পড়াশুনা করেনি তো,কী হলো তোর,ওকে নিয়ে পড়েছিস কেন?কন্যাশ্রী কেস?

আরে না ,বলেই মোটামুটি ঘটনাটা সংক্ষেপে বললো সুরভি

শুনেই রুবাই বললো

-এই তাড়া তো।এইসব উৎপটাং ঝামেলা নিস কেন?

-আরে খুব গায়ে পড়ে এমন করছে যেন কতকাল ধরে মাকে চেনে।দেখ গিয়ে আমার এক মা হয়েছেন।চুটিয়ে গল্প করছে..

ফোনে কথা বলতে বলতেই মায়ের লম্বা ঝুলের নাইটি পরে ঠিক জগঝম্পের মতো ঘরে ঢুকে এলো বেলুনি

হাতে গরম ধোঁয়া ওঠা কফি

-দিদি লাও তুমার কফি ,তারপর মা বললেন নাহাতে যাও।

বলেই বেরিয়ে গেল

ফোনের ও প্রান্ত থেকে রুবাই চেঁচিয়ে উঠলো

কী রে সুরি এ তো ঘরের মালকিন হয়ে গেলো?

-হ্যাঁ তাই তো দেখছি, মাসিমা থেকে আন্টি এখন মা হয়ে গেল?দাঁড়া মায়ের মা হওয়া বার করছি রাখ তো ফোনটা।

ফোন রেখে উঠতে গিয়েও সুরভি কফিটা দেখে আটকে গেলো।খেয়ে নিয়েই যাবে।

কফিতে চুমুক দিয়ে মন একদম মজে গেল।

আহ বলে একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসতেই সামলে নিলো।ওদিকে তুমুল গল্প আর হাসি চলছে।

মায়ের কী কোনদিন আক্কেল হবে না।যত বয়স বাড়ছে তত কেমন এলেবেলে হয়ে যাচ্ছে। টিভি সিরিয়াল না কোন নায়িকা কী নিয়ে যেন বেলুনির সাথে গল্প চলছে।

মাকে বলছে বেলুনি ,এই ঘর থেকেই শুনতে পেল সুরভি

-হাঁ মা কুছু চিন্তা করো না।খেয়েই যাবো এত সুন্দর মাছের মাথা দিয়ে লাউ ,লটে মাছ চিকেন ছেড়ে কোই যায় ক্যায়া?

-সুরভি রাগে গরগর করে উঠলো। কী হ্যাংলা মেয়েরে বাবা।চেহারা তো ওই খ্যাংড়াকাঠি।এত সমস্ত করছে কিভাবে? আর লোভ দেখো!

আপদটা বিদেয় হলে বাঁচি।কোন সকাল থেকে চিটে রইলো এটুলির মতো।যাবার নামটি নেই।এখন দুপুরের খাবার খাবে তারপর

উফঃ ভাবো একবার ,নিজেই অবাক হয় সুরভি।

নিজের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে স্নান করে ও।আজ অনেক কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। কয়েকটা টব খালি, ভেবেছিল সামনের নার্সারিতে গিয়ে চারা আনবে কয়েকটা ।কিছুই হলোনা আপদটার জন্য।

রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলো।

মা খাবার বেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো।সুরভি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই মা বললো

-তুই খেয়ে নে

আমি আর বেলুনি একসঙ্গে বসবো

-মানে? বাড়াবাড়ি করছো না মা?

মা কিছু বুঝলো বললো আচ্ছা আচ্ছা বাড়ছি, তুই খেতে শুরু কর

মা নিজের খাবার বাড়ার আগে

একটা থালায় গুছিয়ে ভাত তরকারি সাজিয়ে বাড়লো বেলুনির জন্য।বুঝলো যে সুরভি রেগে যাবে তাই ডাইনিং হল এর একধারে একটা আসন পেতে বেলুনিকে ডেকে বসিয়ে মা খেতে দিলো।

তারপর নিজে টেবিলে বসে খেলো।

প্রত্যেকটা পদ খাওয়ার সময় বেলুনির মুখ দিয়ে নানারকম শব্দ ও বাক্য নির্গত হলো।

-মা দেখো, আমার কপালে ইখেনের অন্ন লিখা ছিল না তাইনা এমন দিদির সঙ্গে দেখা হইয়ে গেল।

বলেই হেসে উঠলো।

খাওয়ার সময় সুরভি মায়ের সাথে গল্প করতে অভ্যস্ত, কিন্তু এখন মুখ বন্ধ করে খেয়ে উঠে গেল।

রাগত স্বরে বললো

-বেলুনি তুই বাড়ি ফিরবি তো এবার।সন্ধে হয়ে যাবে।যা এবার।

- শুনেই খিকখিক করে হেসে উঠলো বেলুনি।

-আমার জন্য কোউ চিন্তা করবে না।তুমি চিন্তা করোনা দিদি আমি ঠিক চলে যাবো।

মায়ের মুখে প্রশ্রয়ের হাসি স্পষ্ট দেখলো সুরভি।

ভয়ঙ্কর বিরক্ত লাগলো

খুব গম্ভীর স্বরে বললো

মা তুমি এত রয়েসয়ে খাচ্ছো ,বেলা হলো কতটা দেখেছো?ওষুধটা খেতে হবে না ?

-হ্যাঁ রে বাবা উঠছি উঠছি এইতো হয়ে এলো।

দাঁড়া অবিনাশবাবু এই মাত্র বাড়ি ঢুকলেন দেখি কী করে,সব্বাই মিলে মিঠিকে কেমন কোন ঠাসা করে দিচ্ছে দেখ দেখি!বেচারি মেয়েটা। সবে বিয়ে হলো।

বেলুনি ফুট কাটছে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে

দেখো দেখি মা

ওই আইবুড়ো ননদটা বিহা করলি না তো বিয়া হওয়া মেয়ের কষ্টটা কী বুঝব্যাক?

মা একটু অস্বস্তি বোধ করে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে বললো

বেলুনি তুই এসব সিরিয়াল কোথায় দেখিস?তোদের ঘরে টিভি আছে?

-না না মাসমা ,টিবিউবি নাই ,ওই পাশের গীতা দিদির ঘরে কখনোউখনো যাই!বলেই দাঁত বের করে হাসলো।

-কে অবিনাশবাবু ?কোন মিঠি?

-ওহ দিদি তুমি নাই জানো ইটা মাসমা আর আমার ব্যাপার! বলো মাসমা!

মাও হেসে সায় দিয়ে বললো

-এইযে  সিরিয়ালটা রে "সজনী লো ,মনটা দিয়ে যা "

ওরই বাড়ির কর্তা অবিনাশবাবু,বড় ন্যায্য লোক। মিঠিকে ছোট ছেলেটা বিয়ে করে নিয়ে এলো ,আর এদিকে বাড়ির সবাই মিলে মেয়েটাকে এমন অত্যাচার করছে..বলতে বলতে মায়ের গলা যেন একটু ধরে এলো

ও তুই জানিসনা

এদের ব্যাপার স্যাপার দেখে সুরভি অবাক!

একবেলা জোরজবরদস্তি ঘুষপেইটির মতো এসে মাসমা আর ওর ব্যাপার হয়ে গেল?সুরভি যেন বাইরের লোক! উঠতে গিয়ে চেয়ারটা খুব জোরে সরালো সুরভি।

থাকো ওই সব সস্তা বস্তাপচা সিরিয়াল নিয়ে।

-সিরিয়ালটা মাসমা রোজয় দেখে তাইতে ঈগলা বলছে দিদি ,দেখলে তুমিও বৈলত্যে

খিক খিক করে হাসতে হাসতে

মনে হয় মা ওকে চোখ পাকালো..

বেলুনি উঠে ঝট করে টেবিলের সমস্ত এঁটো থালাবাসনগুলো নামাতে শুরু করলো।সুরভি ওকে ধমকে উঠলো।

-এই তুই এসব করছিস কী জন্য?রোজি আসবে বিকেলে বাসন ধোবে।তুই যা

আচ্ছা মেয়ে তো।

খুব বিরক্ত হয়ে সুরভি উঠে নিজের ঘরে চলে যেতে যেতে মায়ের দিকে চোখ কটমট করে তাকালো।

মানেটা এরকম যে এবার বিদায় করো ওকে।

সুরভি ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে।

বিভূতিভূষণটা টেনে নিয়ে বসলো।পুঁইমাচা গল্পটা পড়তে পড়তে কখন চোখ লেগে গেছে।ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলো  ক্ষেন্তির মুখটা অবিকল বেলুনি।


বিকেলে দরজা ধাক্কা দিতেই ধড়ফড় করে উঠে বসে

অন্ধকার হয়ে গেছে।কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ঈশ্!

দরজায় আবার ধাক্কা

-এখনো বেলুনি যায়নি ?

দরজা খুলতেই দেখে মা চায়ের কাপ হাতে।মুখটা ভার,

সুরভি বাইরের দিকে তাকাতেই মা বলল

-চলে গেছে চিন্তা নেই তোর।

উফঃ কী এক জ্বালাতন সারাটাদিন ধরে।

মা চুপ করে রয়েছে দেখে সুরভি মজা করতেই বললো

বাবা পোষ্য পুত্রী চলে গেল বলে কি মনখারাপ নাকি!


সুরি কত বিরক্ত হলি,জানিস ওকে জোর করেও একটা টাকা দিতে পারলামনা।বললো শুধু দুটো ভালোমন্দ খেতেই এসেছিল।সেটাও মায়ের জন্যই।

সুরভি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই মা বলে উঠলো..


মা'টা শয্যাশায়ী আজ তিনবছর।মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিল ,ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওকে বাপের ঘরে দিয়ে গেছে।আর এমুখো হয়নি।

মা কাঁদে বিলাপ করে করে , রোজ । দুবেলা দুটো খাওয়াতে পারেনা তো ,ভালোমন্দ খাওয়াবে কোথা থেকে।

জানিস আজ মেয়েটার জন্মদিন ছিল।মা খুব মনের কষ্টে ভুগছিলো।তাই বেলুনি মাকে কথা দিয়েছিল যে, যেমন করেই হোক  জন্মদিনে ও ভালোমন্দ খাবেই।


বেরিয়েছিল এক আত্মীয়ের বাড়ি যাবে বলে।পথে তোকে পেয়ে তোর সঙ্গ ধরেছিলো।

মা তারপর কত কি বলে যাচ্ছিলো।

সুরভি শুধু ভাবছিলো

বাইরে থেকে দেখেই মানুষকে জাজ করতে বসে যাওয়ার এই অভ্যাস তো বদলালো না ,এতদিন ধরে শিক্ষকতা করে বেলুনির মতো একটা বাউন্ডুলে মেয়ের কাছে ফেল করে গেল সুরভি।ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো সুরভির।মেয়েটার ক্যানসার !বারবার স্বপ্নটার কথা মনে হচ্ছিলো। পুঁইমাচা গল্প পড়াতে গিয়ে ক্ষেন্তির জন্য খুব দুঃখ পায় সুরভি।অথচ বাস্তবে বেলুনিকে সহ্য করতে পারলো না !

দুচোখ দিয়ে জলের ধারা নামছিলো !


হঠাৎ মা উঠে এলো নাটকীয় কায়দায় বলে উঠলো

জানতাম তো প্রচণ্ড কষ্ট পাবি।

তাইতো বেলুনিকে কাল থেকে আসতে বলেছি।


সুরভি মায়ের দিকে তাকাতেই মা বলে উঠলেন


মানে ওই হাতে হাতে একটু হেল্প করে দেবে।আর আমারও তো একটা সঙ্গী দরকার নাকি?

সুরভি জোরে বলে

-মা .. তার মানে সব নাটক ..


ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মা বলে ওঠে

নো বাডি ইটস অবসলিউটলি সত্যি,অনলি ব্লাড ক্যানসারের জল মিলিয়েছি।

তা না মেশালে কি বাজারে কাটে?এই তো তুইই কেমন রুক্ষ মরুভূমি হয়েছিলি।যেই শুনলি মেয়েটার ক্যানসার অমনি মরুদ্যান হয়ে গেলি।আমিই তো তোর ভেতরের এই বদল আনতে পারলাম।

তুইই বল মেয়েটার অমন মারণ ব্যাধি হলে তুই খুশি হবি?না তো ?হে হে আমি কি জানিনা তোকে ?

সুরভি মায়ের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে

ভাবতে চেষ্টা করে বেলুনি তারমানে ওর টোটোতে উঠে পড়াটাও এই নাটকের অংশ নাকি? সুরভির হাঁ মুখের দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রাণী ভয় পেলো, মেয়েটাতো তারই সব ধরে ফেলবে

তাই দ্রুত একমুখ হাসি নিয়ে বলে


-মনা তোর জন্য কটা পকোড়া বানাই

সুরভি নামক বোমাটি ফাটার আগেই মা ঝুপ করে রান্নাঘরে ঢুকে গেল,

কখন বিস্ফোরণ হবে সেই আশঙ্কায় বেসন ফেটছে

হঠাৎ আদুরী বেড়ালটির মতো মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটা।

বলে পার্থ মিত্রের সিরিয়ালের অবিনাশবাবুর চেলি হয়ে ভালোই ড্রামা শিখেছো দেখছি মিসেস ইন্দ্রানী ব্যানার্জী।


আনুপূর্বিক


মিঠে কড়া- শিশু মনের স্বপ্নের সঙ্গে  নৈতিক শিক্ষা   এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণ 

হিমাদ্রি শেখর দাস 


বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল কাব্যধারায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মাত্র একুশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে কাব্যভুবন নির্মাণ করে গেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর কবিতায় যেমন আছে সংগ্রামের ডাক, তেমনি আছে মানবপ্রেম, শিশুমন, স্বপ্ন, আশাবাদ এবং নতুন পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়। *ছাড়পত্র, ঘুম নেই*, *পূর্বাভাসের পাশাপাশি  মিঠে কড়া সুকান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি প্রধানত শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্যে লিখলেও, তার অন্তর্নিহিত বক্তব্য কেবল শিশুদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজবাস্তবতা, রাজনৈতিক চেতনা, নৈতিক শিক্ষা, ব্যঙ্গরস এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য সমন্বয় এখানে লক্ষ্য করা যায়।

*মিঠে কড়া* নামটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর মূল তাৎপর্য। "মিঠে" অর্থ মধুর, আর "কড়া" অর্থ তীক্ষ্ণ বা কঠোর। অর্থাৎ, মধুর ভাষার আড়ালে কঠিন সত্যের প্রকাশই এই কাব্যগ্রন্থের মূল বৈশিষ্ট্য। শিশুমনের উপযোগী সহজ ভাষায় কবি এমন সব সামাজিক সত্য তুলে ধরেছেন, যা বড়দেরও ভাবিয়ে তোলে।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্যসৃষ্টি মূলত ১৯৪০-এর দশকে। এই সময়টি ছিল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক অস্থির অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শাসনের অত্যাচার, স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশ এবং সমাজে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে এক সংকটময় সময়।

এই বাস্তবতা সুকান্তের কবিমানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতি গভীরভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেননি। বরং ছড়া, হাস্যরস, রূপক এবং ব্যঙ্গের মাধ্যমে সমাজের অসংগতি তুলে ধরেছেন।

এই কারণেই  মিঠে কড়া শুধু শিশুতোষ ছড়ার বই নয়; এটি এক যুগচেতনার দলিল।


"মিঠে কড়া" নামটি দ্বৈত অর্থবহ।

একদিকে এর ভাষা সহজ, মজাদার, ছন্দোময় এবং শিশুবান্ধব। অন্যদিকে এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য তীক্ষ্ণ, প্রতিবাদী এবং সমাজসচেতন। কবি যেন বলতে চেয়েছেন—সত্যকে সব সময় কঠিন ভাষায় বলতে হয় না; মিষ্টি ছন্দেও কঠোর সত্য প্রকাশ করা যায়।

এই নামটি সুকান্তের কাব্যদর্শনেরও পরিচয় বহন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন সাহিত্য শুধু বিনোদনের জন্য নয়; সমাজ পরিবর্তনেরও হাতিয়ার।


মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার ভাষা।

অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল শব্দচয়ন, কথ্য বাংলার ব্যবহার, ছন্দের স্বাভাবিক গতি, হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মিশ্রণ,  সংলাপধর্মী উপস্থাপনা।,  শিশুদের কল্পনাজগতের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ।

এই সহজ ভাষার মধ্যেই কবি গভীর জীবনবোধ প্রকাশ করেছেন। ফলে শিশুরা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরাও নতুন অর্থ আবিষ্কার করেন।

গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় শিশুমনের স্বাভাবিক কৌতূহল, খেলা, আনন্দ, দুষ্টুমি ও কল্পনার জগৎ ফুটে উঠেছে।

সুকান্ত শিশুদের কখনও অবজ্ঞা করেননি। তিনি শিশুদের ভবিষ্যৎ সমাজের নির্মাতা হিসেবে দেখেছেন। তাই তাদের চিন্তা, প্রশ্ন এবং অনুভূতিকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।


মিঠে কড়ার অন্যতম প্রধান বিষয় সমাজসচেতনতা।

কবি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই অন্যায়, শোষণ, কুসংস্কার ও অসাম্যের বিরুদ্ধে সচেতন হতে শেখাতে চেয়েছেন।

এই শিক্ষা কখনও সরাসরি নয়; বরং গল্প, ছড়া ও রসিকতার মাধ্যমে এসেছে।

সুকান্তের ব্যঙ্গ অত্যন্ত সূক্ষ্ম।

তিনি সমাজের ভণ্ডামি, অলসতা, আত্মম্ভরিতা, অন্ধ অনুকরণ এবং কুসংস্কারকে ব্যঙ্গ করেছেন।


তাঁর ব্যঙ্গ কখনও নিষ্ঠুর নয়; বরং তা সংশোধনের উদ্দেশ্যে।


সুকান্ত শ্রমকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।

তিনি মনে করতেন  শ্রমই সভ্যতার ভিত্তি।

তাই শিশুদের অলস না হয়ে পরিশ্রমী, কর্মঠ এবং আত্মনির্ভর হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা এই গ্রন্থের অন্যতম প্রধান শক্তি।

ধনী-গরিব, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান মর্যাদার কথা তিনি বলেছেন।

এই মানবতাবাদ সুকান্তের সমগ্র সাহিত্যজীবনের মূল ভিত্তি।

এই গ্রন্থে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তার বিরোধিতা  সুস্পষ্ট।

তিনি শিশুদের প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন।

যা শুনবে তাই বিশ্বাস করবে না, নিজে ভাববে, বিচার করবে।

এই মননশীল শিক্ষাই আধুনিকতার অন্যতম লক্ষণ।

সুকান্তের দেশপ্রেম আবেগনির্ভর নয়; কর্মনির্ভর।

তিনি দেশকে ভালোবাসতে বলেছেন মানুষের সেবা করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এবং সমাজ গড়ার কাজে অংশ নিয়ে।

এই দেশপ্রেম সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়; মানবমুক্তির সঙ্গে যুক্ত।

সমস্ত কষ্টের মধ্যেও সুকান্ত আশাবাদী।

তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন— যেখানে ক্ষুধা থাকবে না, শোষণ থাকবে না শিশু প্রাণ খুলে  হাসবে , মানুষ সমান অধিকার পাবে, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই স্বপ্নই *মিঠে কড়ার প্রাণশক্তি।

এই কাব্যগ্রন্থে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিশেষ  শিল্পগুণ লক্ষণীয়—যেমন  সহজ অথচ অর্থবহ উপমা,  প্রাণবন্ত চিত্রকল্প,  সজীব ছন্দ,ধ্বনিসৌন্দর্য,  হাস্যরসের সঙ্গে প্রতিবাদের সংমিশ্রণ।, ছোট ছোট কবিতার মধ্যেও গভীর বক্তব্য।

এই বৈশিষ্ট্যগুলির জন্য  মিঠে কড়া*বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমান সমাজেও মিঠে কড়া অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

আজও  বৈষম্য রয়েছে,কুসংস্কার রয়েছে, ভণ্ডামি রয়েছে।  শিশুদের মানবিক শিক্ষা প্রয়োজন  যুক্তিবাদী চিন্তার প্রয়োজন।

 বর্তমানে ডিজিটাল যুগেও এই গ্রন্থ শিশুদের সামাজিক দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়।


বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে *মিঠে কড়া* একটি মাইলফলক।

 শিশুদের জন্য অনেক ছড়া  আগে লেখা হলেও সুকান্ত শিশুতোষ সাহিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তিনি কেবল বিনোদন দেননি; চিন্তা করতে শিখিয়েছেন।

এই গ্রন্থ আমাদের শেখায় শিশুসাহিত্য মানেই কেবল রূপকথা নয়; সমাজচেতনা, মানবিকতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের বীজও সেখানে নিহিত থাকতে পারে।


*মিঠে কড়া কেবল একটি ছড়ার বই নয়; এটি এক মানবিক শিক্ষার পাঠশালা। শিশুমনের উপযোগী সহজ ছন্দে সুকান্ত ভট্টাচার্য সমাজের কঠিন বাস্তবতা, নৈতিক মূল্যবোধ, শ্রমের মর্যাদা, মানবপ্রেম, যুক্তিবাদ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে একসূত্রে গেঁথেছেন। গ্রন্থটির "মিঠে" ভাষা পাঠককে আকৃষ্ট করে, আর "কড়া" বক্তব্য তাকে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই *মিঠে কড়া*-কে বাংলা সাহিত্যে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।

আজকের সময়ে যখন শিশুরা প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে ক্রমশ বাস্তব সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন *মিঠে কড়া* তাদের মানবিক, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সুকান্তের এই কাব্যগ্রন্থ তাই শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের এক মূল্যবান সাংস্কৃতিক দলিল।

তথ্যঋণ 


১. সুকান্ত ভট্টাচার্য, মিঠে কড়া- সারস্বত লাইব্রেরি।

২. সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুকান্ত সমগ্র-পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি।

৩. ক্ষেত্র গুপ্ত, -সুকান্ত ভট্টাচার্য: জীবন ও সাহিত্য।

৪. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (আধুনিক যুগ)।

৫. সুমিতা চক্রবর্তী, আধুনিক বাংলা কবিতার রূপরেখা।

৬. শঙ্খ ঘোষ, বাংলা আধুনিক কবিতা বিষয়ক  প্রবন্ধ।

৭. পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত সুকান্ত-সংক্রান্ত গবেষণাগ্রন্থ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন