শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫

 



প্রচ্ছদ ঋণঃ- অদিতি সেনগুপ্ত 


সূচীপত্র

কবিতা ভিত্তিক

রূপায়ণ হালদার
কেয়া নন্দী
রহিত ঘোষাল
মেনকা সামন্ত
কিংশুক চক্রবর্তী
দেসা মিশ্র
সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)
পৃথা চট্টোপাধ্যায়
কবিতা সামন্ত
কাকলি দাশব্যানার্জী
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
প্রদীপ চক্রবর্তী
শ্রীমন্ত সেন
সুজাতা দে
তপনজ্যোতি মিত্র

সম্মিলন 

বন্যা ব্যানার্জী 
চিরঞ্জীব হালদার

আনুপূর্বিক

অয়ন দাস
কৌশিক চক্রবর্ত্তী
রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোট গল্প

পারমিতা মন্ডল
দীপ্র দাসচৌধুরী

পত্রসাহিত্য

অদিতি সেনগুপ্ত

মুক্তগদ্য

মানিক পন্ডিত
নীলম সামন্ত

স্মৃতির দুয়ারে

মেঘশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়


কবিতাভিত্তিক


ফিকে হবে সবই
রূপায়ণ হালদার

অনেক ভাবনা, অনেক শব্দ
অনেক কথা, অনেক জেদ
অনেক প্রতিবাদ, অনেক অভিমান
শুধু কথা বলে বিশ্ব বাংলা গেট থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত কিংবা বেহালা থেকে যাদবপুর পর্যন্ত। 
বয়ে চলে ছোটো নদী;
অবঘর্ষ পক্রিয়ায় ছোটো ছোটো চিহ্ন তৈরি করে নদী বক্ষে। 
অস্থির সময় বয়ে যায় 
কয়েকটা নদীর পরিমিত উচ্ছাসে; 
দোষীরা পর্দার আড়ালে অট্টহাসে। 
সবার বুকে জ্বলজ্বল করছে তিলোত্তমার চিতা
অজান্তে জল পড়বে তাতে, 
নিভে যাবে আগুন, 
মজে যাবে ছোটো নদীগুলো, 
বন্ধ হবে ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলা পরিকল্পনা। 
তবুও মনে থাকবে সবই। 
কিন্তু যা করার কথা ছিল:
একত্রিত হয়ে জোয়ার আনার স্বপ্ন
তা পড়ে আছে কারোর হৃদয়ে আর
কারোর কবিতার খাতায়। 
কবি ভাবে সামান্য ধুলো ঝড় আমার কবিতার খাতায় কী করে কল্লোল তুলবে? 
সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিশ কিলোমিটার বেগের বিচ্ছুরণ খাতায় তুলতে হবে! 
জোয়ার চায় আমার। জোয়ার। 
কিন্তু কিছুই হবে না। 
আবার বাঙালি মন জমবে আড্ডায়, 
কলেজ পড়ুয়ারা ভীড় করবে ক্যান্টিনে, 
নদী বক্ষে নিত্য হাঁটবে মানুষ, 
সিগারেটের মতো শেষ হবে সময়
ফিকে হবে সবই। 
পড়ে থাকবে তোমার আমার ফোনে 
মৃদু আন্দোলনের ছবি।
 
তবুও ক্ষয়িত সময়ের মাঝে 
হাঁটা পথে পিছন থেকে টেনে ধরবে তিলোত্তমা। 
মনে পড়বে একটা প্রতিবাদী কবিতা লিখেছিলাম, 
বন্ধুটা ছাপিয়ে ছিল লিফলেট, কতজনের মনে পড়বে
পতাকা উড়িয়ে গলা ফাটিয়ে নির্ধারিত কয়েক ঘন্টার হাঁটাপথ অতিক্রম করার কথা। 
শুধু মনেই পড়বে। 
মনে পড়তে পড়তে একদিন হয়তো কালো মেঘ আবার ঘর বাঁধবে কোনও কিশোরী কিংবা যুবতী মেয়ের শরীরে। 
আবার কবিতা লেখা হবে, 
আবার ছোটো নদী বয়ে চলবে, 
আবার ভাঁটা পড়বে।

মেয়েটা
কেয়া নন্দী

একবছর ধরে ' মেয়েটা ' একা ঘুরছে
   রাজনীতির মিছিলে, বলিষ্ঠ ভাষণে,
ছোট - বড় নানা আন্দোলনে।
' মেয়েটা ' ঘুরছে মাসের পর মাস আদালতের বিভিন্ন 
                                                                   দিনে।
' মেয়েটা ' ঘুরছে কখনো দিনে, কখনও বা মোমবাতির আলোয়।
যে কোনো আন্দোলনের উপসংহারে ও 
    ঐ ' মেয়েটা ' - ই ঘুরছে।
    কোনো নিরুদ্দেশ সমাচার নয়
                      তবুও 
পথে - ঘাটে , হাসপাতালের সব দেয়ালজুড়ে 
                                            ঐ ' মেয়েটা ' - ই ......
'  মেয়েটা ' চিৎকার করছে কবে, আর কবে ?
নরখাদকদের বিচার হবে ?
' মেয়েটা ' হাহাকার করছে গোটা দেশ জুড়ে
কেউ শুনতে পাচ্ছে না, দেখতে পাচ্ছে না মেয়েটাকে।
বিদ্বদজনেরা জানে, ' মেয়েটা ' লাশ হয়ে গেছে।
কিন্তু আজও ওর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত__
কাঠগড়ায় অপেক্ষা করছে  ওর কান জোড়া 
                                     ' শেষ রায় ' শোনার।

একটা বছরের নাম অন্ধকার 
রহিত ঘোষাল 

চিনতে পেরেছ ওদের? 
নাকি এখনো আড়াল করছে কেউ 
ভয়ের সুড়ঙ্গে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি 
সাড়া পাচ্ছি না বজ্র আগুন 
সাড়া পাচ্ছি না ক্লোরোফর্ম খাদ 
প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙেনি এখনও 
তাঁবুতে চীৎকার-চাকরি-কান্না
শেকড় নাড়িভুঁড়ি রেললাইন ঘূর্ণিঝড় 
কাঁচা শিরদাঁড়া মাছের তেলে ভাজা 
সেতুটির নাম দ্রোহ 
বছরের নাম অন্ধকার 
ক্ষুধা ও উল্কা গোপন রাখি না আজ 
অবলীলায় শহরের জ্বর দেখি 
সাঁজোয়া দেখি উদ্বাস্তুদের সরাইখানা থেকে
দাঁতনখের পাশে পাপী 
পাপের পাশে দেবীমূর্তি 
সেতুটির নাম দ্রোহ 
বছরের নাম অন্ধকার 


চির অস্তাচলে
মেনকা সামন্ত

চলে গেল আরও একটা বছর 
এলো আরো একটা 
স্বাধীনতা দিবস,
যে রবি অস্তাচলে গিয়েছিল 
সে নিয়ম করে হয়েছে উদিত, 
অস্ত গেছে পশ্চিম দিগন্তে।
কিন্তু,  যে তিলোত্তমার জীবনরবি অস্তমিত হয়েছিল, 
রাহুগ্রাসে আক্রান্ত হয়েছিল 
তার রাহুমুক্তি ঘটেনি,
কতজন সুদর্শনচক্র  হাতে 
নেমেছিল পথে ---
রাহুর গলা কেটে
মুক্ত করতে পারেনি তাকে।
চলছে লড়াই---যদি কোন ওভাবে    
ওই রাহুদের বিনাশ  করা যায়,
রক্ষা করা যায়  
আরো অনেক অভয়াকে 
চির অস্তমিত হওয়ার হাত থেকে।।


ভারত মুনি
কিংশুক চক্রবর্তী

দৌড়চ্ছে উর্ধ্বশ্বাসে
বুকের কাছে জাপ্টানো ব্যালট বক্স 
যেন যক্ষের ধন
হতে পারে কারো কাছে অবিকল কফিনের মতো
মেঠো পথ - পাকা রাস্তা 
ডিঙিয়ে যাচ্ছে বাঁকা রোদ 
ভিজে ছায়ার 
    তাল তমাল –  ভাঙা আলোর ল্যাম্পপোস্ট 
খিদে – 
দাউ দাউ জ্বলছে 
দৌড়চ্ছে সে 
অবতল পেটের কাছে জমা পড়েছে কালো হাত 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যালট 
হাইজ্যাক ইচ্ছের ওপর 
                   ছাপ্পা পড়ছে ইচ্ছে 
অস্থির মধ্যবিত্ত দেখছে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন
বারুদ কিছু কম ছিল না এদেশে 
বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি 
চেতনার বাইরে 
       শীর্ণ অবশেষের অসংযত খিদে  
শক হুন দল পাঠান মোগলের মতোই হবে লীন 
সংহত আত্মার যৌথ উন্মেষে 
এক মগ্ন ঋষি বসে আছেন এখানে 
ভূখণ্ড জুড়ে


আমরা স্বাধীন?
দেসা মিশ্র

উৎসব ধুঁকছে ,
স্বাধীনতা কোথায়?
কলম 
কন্ঠ
তুলি 
থেকে ঝড়ে পড়ছে
থোকা থোকা মৃত্যু ,
বিবেকের দালানে সবল উইপোকার নৃত্য।
ভাতের হাঁড়ির ক্ষুধার্ত পেট
আর
নরপশুদের ক্ষুধার্ত মন 
ঢেকে রাখি-
উজ্জ্বল পতাকা দিয়ে।
আমাদের-
শৈশব 
যৌবন 
জীবন 
ডুবে আছে অথৈ অন্ধকারে ।
আর কত রক্ত 
কত মৃত্যু আড়াল করে 
স্বাধীনতা লিখব 
হে রাষ্ট্র?


দূরে থাকা ভালো
সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)

মিথ্যে এবং মিথ্যেচারীর থেকে দূরে থাকা ভালো;
দূরে থাকা ভালো পাপ, পাপীদের 
                           সম্পর্ক এবং সংস্পর্শ থেকে।
অন্যায়, অবিচার থেকে দূরে থাকা ভালো।
শান্তিতে থাকতে হলে চুপ থাকা ভালো, 
চোখ বেঁধে রাখা ভালো।
তবু এই দূরে থাকা ভালো-র ব্যথা যদি নিজেকে 
আঘাত করে মারে রোজ
তবে আওয়াজ তোলা ভালো,  প্রতিবাদ করা ভালো।
রাস্তায় নামা ভালো, ধ্বংস করা ভালো।
দূরে থাকা ভালো -
এই অসুস্থ মানসিকতার মানুষজন থেকে।



আগুন সময়
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

দুঃশাসন রক্তচোখা সময়ের ঘোর,
নিহিত বিশ্বাস ছেঁড়া 
কপট আশ্বাস,
ছেঁড়াযোনি, শিশুশব, রক্তদলা
গলা ঠেলে ওঠে
দু'চারটে জোনাকিরা অন্ধকার কোণে,
চিক চিক করে।
ওই মেয়ে জেগে থাক,সাবধানে থাক
ভিতর-আগুনে সেঁকে গোপন কুঠারে,
কোষে-কোষে প্রতিবাদ আঁক।
চুপ করে আছি মানে ভুলে গেছি নয়,
শাদা এ্যপ্রন ভাসে এখানে হাওয়ায়-
মুষ্টিবদ্ধ হাত আমরাও তুলে আছি
স্বাধীনতা মানচিত্র নারীর জঠরে।


স্বাধীনতা রক্ত স্নান 
কবিতা সামন্ত

স্বাধীনতা শব্দে রক্ত স্নানে ধৌত 
ভারত মায়ের আঁচল।
এ ভারতের মাটিতে শিশিরভেজা ঘাসে কত রক্তের দাগ।
বেদিতে সাজানো ফুলেরা সাক্ষী।
হিমালয়ের শিখরে পতপত করে উড়তে থাকা 
পতাকা জানে রত্ন হারিয়ে ফেলার মর্ম।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ 
যে মাটিতে কান পাতলে আজও শোনা যায় 
মা বোনেদের চিৎকার।
পূব আকাশের রক্তিম সূর্য আজও রক্ত স্নানে 
উঠে আসে একটা স্বাধীনতা নামে।
স্বাধীনতা নাম গর্বের,স্বাধীন শব্দ কান্নার,
স্বাধীনতা মায়ের ত‍্যাগ,
স্বাধীনতার গান স্ত্রীর মুছে যাওয়া সিঁন্দুর হাতের চুড়ি,
স্বাধীনতার অর্থ আত্মবলীদান।


বিভঙ্গ
কাকলি দাশব্যানার্জী

স্বাধীনতা চরমভাবাপন্ন সেই উদগ্র বিশ্বাস 
যা ধারণ করে অক্ষ বীজ;
কিন্তু সে স্বাধীনতা ভারতে আসে নি 
যে তথাকথিত আলোর আদল  পেয়েছিল সেদিন
এ দেশ, - তাতে ছিল 
শুধু দম্ভ আর ক্ষমতার হস্তান্তর 
সেই উলঙ্গ সফরনামায়
বিদেশি শব্দের  ফন্দি 
জট পাকিয়ে দিয়েছে দিশায় , 
দাবানল আজও তাই নেভেনি -
প্রতিটি  পনেরোই আগস্টে
আবেগের ভঙ্গিমা নকল করে যায় 
কিছু সাপ আর
নেতিয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা মানুষ -
যাদের মেরুদণ্ড খোয়া গ্যাছে। 


নিষ্ফলা সময়ের বদ্ধ হাওয়ায় দুর্গন্ধ শ্যাওলাদলের দাপট
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় 

কান্নারাতের পর একটা আশার সকাল এঁকে বসেছিলুম আর
পাড়ার রাম মাধা কালোদের ডেকে দেখাচ্ছিলুম ঝকঝকে আলো 
ওরা কেউ খুশি, কেউ বা বিস্ময়-অবিশ্বাসে চোখের ছুরিতে
প্রশ্ন রেখেছিল, তাই ?  তাই নাকি ? তাই কি হয় ! 
সব প্রশ্ন তুড়িতে উড়িয়ে একটা তৃপ্তির প্রয়াস পাই সেদিন
এবার হবেই, বালকবেলার  'শোধবোধ' শব্দটি উল্লাসে পল্লবিত হয়।
কতগুলো দিন মাস পেরিয়ে বছরের হিসেব বদলে যেতে
খেয়াল হলো, কিছুই হয়নি তো ! 
প্রত্যয় ভাঙলে যা জন্মায় তাকে বলে সংশয় 
প্রবল ঢেউয়েরা অসহায় হয়ে যায় সামান্য শেওলায়, ভাবাই হয়নি।
নৈরাশ্যের নোনা হাওয়ায় শুকনো স্বপ্ন আর মরাপাতার মধ্যে
কোনো বিভেদ পাই না, তবুও তবুও সেই মরাপাতা আর
মরাস্বপ্নগুলো জমিয়ে জমিয়ে দাবানল, হোম বা আহুতির
কৌশল কোন আখড়ায় শেখানো হয় তার ঠিকানা খুঁজে ফিরি
যদি একবার তাকে পাই...  তাহলে হয়তো হোমের আগুন
রাক্ষস আগুনে শ্যাওলার বিভূতি তিলক হবে।

 
স্বাধীনতা তোর।।
প্রদীপ চক্রবর্তী।।

চোখের জল লোনা লোনা দুখসায়রের স্বাদ,
নষ্টজলের স্পষ্টধারায় বাসি রোদনপুরের ঢেউ!
বুক ভাঙছে,  সংসার ভাসে, ভাসলো বুঝি দেশ,
কেউ দেয়নি ,কেউ দেবে না_ নাশ রুখতে বাঁধ!
ভালো-মানষের ঝি-পোরা কথা রাখেনি কেউ ।
গেরস্থালি ধ্বস্ত ,ত্রাস হাসছে,নাশ করেছে জান!
বেপথু নিত্য ঝাঁকের কই ঝাঁকেই মিশে যায়,
চেনা আলো বিমুখ_ চেনা গলিও শ্মশান-গোরস্থান!
মাংসলোলুপ ভোগীর পিছে পিছে ধায় ফেউ,
ভয়ে ভয়ে কাঁপছে মোমেরা চির- অমাবস্যায়,
রাতগভীরে বাঁচন মরণ  লেপ্টে কোলাকুলি!
রতন খুঁজি ছাই জ্বলা দেশ  মানচিত্র খুলি!


‘স্বাধীনতা’ 
শ্রীমন্ত সেন

স্বাধীনতা কাঁপে বিড় বিড় করা ক্ষুধাক্ষীণ ঠোঁটে,
স্বাধীনতা গিয়ে সাহসী উঠোনে চুপি চুপি জোটে।
স্বাধীনতা খোঁজে প্রবল আবেগ জীবনের ভাঁজে,
স্বাধীনতা বোজে দুচোখ আরামে জটলার মাঝে।
স্বাধীনতা জানে হাতে-হাত-ধরা মিছিলের মানে,
স্বাধীনতা টানে ভীরু প্রাণগুলি যে আছে যেখানে। 
স্বাধীনতা মাপে জীবনের তাপ সবহারা-বুকে,
স্বাধীনতা জ্বলে নিষ্পেষিতের থমধরা দুখে।
জীবনের স্বাদ পায় স্বাধীনতা সবুজের গানে,
জীবনের গান গায় স্বাধীনতা হতাশের প্রাণে।
চায় স্বাধীনতা রূঢ় সত্যের হতে মুখোমুখি,
স্বাধীনতা সুখী সব দুখী হলে সীমাহীন সুখী।
স্বাধীনতা কাঁদে বীর শহিদের রক্তধারায়,
স্বাধীনতা হাঁটে ভিন্নমতের ব্রাত্যপাড়ায়। 
স্বাধীনতা ভাঙে সব জোড়াতালি আপনার জোরে, 
দুহাত বাড়িয়ে ডাকে স্বাধীনতা আগামীর ভোরে।   

              
স্বাধীনতার মন্ত্র
সুজাতা দে

একলা চলে আজ দেখি ঘর নেইকো ঘরে..
ছিঁড়ে নিতে স্বাধীনতা পাকায় তালেবরে।
কেড়ে কি আর যায় রোখা স্বাধীনতার স্বাদ?
তিক্ত আঘাতে রিক্ত নয় একজোট হাত।
অনায়াসে যায় পেরোনো তেমন কোনো সাঁকো..
বুকেরব মাঝে রক্তরঙা আগুন পুষে রাখো।
সম্মাননা বাঁচিয়ে রাখি বুকের মাঝে অলি
স্বাধীনতার মন্ত্র জপে  সগর্বে চলি।


হে জন্মভূমি ভুবনডাঙা
তপনজ্যোতি মিত্র

তুমি সে ধরিত্রী হয়ে থেকো ভুবনডাঙা।

সুন্দর ফিরে এলে -
বহতা হয়ে যায় রুখা নদী, 
বয়স বাড়ে গাছেদের,
স্মৃতির পথযাত্রায় বেজে ওঠে সারেঙ্গী,
একটুকরো ভালোবাসার অপেক্ষায় দীর্ঘকাল পথে বসে আছে মানুষ -
দীনতমের কুঁড়েঘরের ওপরে ঝরে পড়ছে বিষণ্ণতম বৃষ্টি।

কে ফিরিয়ে দেয় করুণা আর ভালোবাসা ?
তুমি কি মানুষের কাছে এসে দাঁড়ালে ?
তোমাকে নিয়েই জেগে আছে প্রকৃতির দৃশ্যতম অনুভব,
জীবনযাপনের যেসব গল্পগুলো চিলেকোঠায় রেখে এসেছে সেই বালক -
দেখো আজ তার বিস্ময়বিহ্বল দিন !

শূন্য ক্যানভাসে জেগে ওঠে জীবনের সব ছবি -
আলো-আঁধারিময় ভাঙাচোরা অনুভব।
রাত শেষে হে জন্মভূমি - তোমার গল্প তো তোমারই,
সে ভোরাই তো তোমারই,
মানুষকে যে দিয়েছো আকণ্ঠ তৃষ্ণার জল, হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর -

তুমি সে ধরিত্রী হয়ে থেকো তবে ভুবনডাঙা !


সম্মিলন

বন্যা ব্যানার্জী 
শিরোনাম হীন


প্রত্যেকবার নতুন হচ্ছে
বদলে যাচ্ছে রং
প্যাটার্ন।
বাইরে দাঁড়িয়ে কে! ওমন সুজলা সুফলা ক্ষেত! বোনা হলো কার নামে!
অলস মধ্য বেলা! ভাতের থালায় ছায়া দীর্ঘ হয়। 
 মিছিল শেষ করে ঘরে ফেরে দেশপ্রেমিকের দল। পতাকা উড়ছে।
আমি একটা ক্যাপশন খুঁজি স্বাধীনতার কবিতা লিখব বলে।


ধোঁয়া


পীরের দরগায় মন্ত্রপূত জল
আম্মুর বাঁধা তাবিজ
ধারণ করে আলাদিন রওনা দিল
প্রদীপের খোঁজে।
মিলে গেলেই বদলে যাবে পোশাক।
খোলস ছেড়ে বার করে আনবে আস্তিনের সাপ।
ঘুঘু দের ফাঁদ।
ঋণমুক্ত পৃথিবীতে আলাদিন জ্বেলে দেবে তার হারানো প্রদীপ টি।ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে বেরিয়ে আসবে নতুন ভারতবর্ষ।


চিরঞ্জীব হালদার
বিক্রয়নামা

এই দূর্গে প্রবেশের কোন পথ নেই।
চৌদিকে নোটিস জারি হয়েছে যে
এটি যথার্ত মূল্যে বিক্রিত হইবে।
শুধু মাত্র এক প়ঙ্খীরাজ জানে তার প্রবেশের
সুলুক সন্ধান।

বায়ুকে জিজ্ঞেস করলে খল খল হেসে উঠবে।
এই প্রশ্নে দিগন্ত মুচকি হেসে বৃষ্টির দিকে সরে যাবে।
ঔরঙ্গজেব কয়েক'শ প্রেক্ষিত নিয়ে খুঁজে চলেছে
দু'হাজার চব্বিশের কোন ক্রেতাকে।

ধর্ষিত নারীদের অস্থি দিয়ে বানানো প়ঙ্খীরাজটার
হালহকিকত একমাত্র পাঠক বলতে পারে।



ভ্রমযাত্রা

সংগৃহীত ভ্রম থেকে যে ছবি উঠে আসে -
করমচা গাছের ছায়ার ওপারে যে প্রেতস্বর-
হট্টগোল থেমে যাওয়ার পর যে থেতলানো পাখিডাক-
এদেরকে কত সহজে তুমি মিথ্যের ভূমিকায় নামিয়ে দিতে পার।

মস্তক মুন্সিয়ানা পূর্বক জেনে যায়
অভিজ্ঞান ধৌতকরণ কোন প্রক্রিয়া নয় ।
আচ্ছা তোমার কোন নিজস্ব পিসি আছে।
তাদের মিথ্যেঈর্ষা আর গ্রস্তচিন্তা দিয়ে কোন খড়ের
দেবীলালিমা বানানো যায়।

ভেবে দেখুন ভ্রম কোন পূর্ব নির্ধারিত শর্ত নয়।
দলিলের রক্তপাত কোন জ্যামিতিক হিসেবের ধার ধারে না।
করমচা গাছ করো কাছে কোন ঋণ মঞ্জুর করে না।
হট্টগোল থেমে যাওয়ার পর দেখো চাঁদ কতটা 
নিষ্পাপ শর্তহীন আলো দেয় ।

তোমার পিসির বাড়ি আর চাঁদের বাড়ি এক গাঁয়ে হলে তোমার বাড়ি যাওয়ার জন্য কোন স্টেশনের টিকিট সংগ্রহ করবে।


রীতি বহির্ভূত লিখন প্রণালী

মানবজাতির ঘৃণা সম্পর্কে দুকলম লিখতে বলা হলে  কোথা থেকে শুরু করবেন।
আকাশ আপনাকে তীক্ষ্ণ নজরদারি দিয়ে ঢেকে রেখেছে। 

বিদ্বেষ ঢাকার জন্য কি কি পোশাক ব্যবহার করবেন । তার রং নির্বাচনের জন্য মাটির কিছু শর্ত মানা বাঞ্ছনীয়।

আগে ভেবে নিন কত শতাংশ  রাজনৈতিক মিথ্যে ব্যবহার করবেন।ভালবাসা আর ভাবুকতার ভেতর কোন সুড়ঙ্গ না রাখাই শ্রেয়।

দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর অন্ধকারকে  আর অভাবগ্রস্ত সেবাকর্মীকে ক্রীড়নক বানানো আপনার সহজাত প্রতিভা।
আপনাকে একটি সচল পেন্ডুলাম দেওয়া হলো । তৃষ্ণার্ত হলে তার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকি ধার হিসেবে নিতে পারেন।

নিজস্ব মন্তব্য আর উপসংহারের ভেতর কোন নদীকে উহ্য রাখা চলবেনা। 


জাগরণের কবিতা

রাষ্ট্রনৈতিক উন্নতির কারণ আমি প্রতিদিন দুটি করিয়া তরমুজ সেবন করি।
ইহা উপাদেয় ও অর্থকরী পানীয়।
কোন বহুজাতিকতা নেই।
 ঘাওড়ামি নেই।
উক্ত পানীয়টি সেবন করার পর চাঁদকে আমি ধেড়ে গোবিন্দ বলিয়া উৎফুল্ল ও আত্মপুলকিত।
অতঃপর আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সতর্ক থাকিয়া
ষড়যন্ত্রকারীদের ঠিকানায় লাল দাগ প্রেরণ করি।

আমার অলীক পতাকার  তাপমাত্রা সহ হ্যাঁচ্চো শুরু করলে চান্দ্রপিপাসা জাগরিত হয়।
তখন খরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌবাইচ জারি রাখি।

এই অবসরে হবু ডাক্তারদের এ্যাপ্রোনে বিষ কাঁকড়ার  যৌন লালার নিলাম শুরু করা যায়।

 

আনুপূর্বিক

 


নেতাজি সুভাষ কিছু বিস্ময়কর তথ্য
অয়ন দাস

১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইহকু বিমান দুর্ঘটনায় নাকি নেতাজি মারা গেছিলেন। অন্তত ইতিহাস বইতে এমনই লেখা আছে। 
অথচ পরবর্তীকালের গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু বিস্ময়কর তথ্য। যা শুনলে চমকে উঠতে হয়।মোদি সরকারের আমলে একবার শোনা গিয়েছিল সব সত্য প্রকাশিত হলে নাকি কোনো একটি দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হবে।তাই সব ধামাচাপা পড়ে গেছিল।
আমি এক এক করে সেই সব তথ্য ও কিছু না মেলা প্রশ্ন আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

১) জাপানের রেঙ্কোজি মন্দিরে নাকি নেতাজির চিতাভস্ম আছে।এতগুলো সরকার পরিবর্তিত হল,সেই চিতাভস্ম ভারতে আনা হল না কেন? কেন নেতাজির পরিবারের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হল না? আজকের বিজ্ঞান বলে DNA TEST করলেই আসল সত্যি বেরিয়ে আসবে।এত সহজ সমাধান থাকতেও কেন দেশে আনা হল না সেই চিতাভস্ম? 

২) ১৯৪৫ সালেই যদি নেতাজি মারা গিয়ে থাকেন তাহলে ভারত সরকার ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত নেতাজির এলগিন রোডের বাড়ির উপর নজরদারি রাখল কেন?  বসু পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত চিঠিপত্র কেন এলগিন রোড পোস্ট অফিসে সেন্সর করা হত ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ? 

৩) নেতাজিকে ভালোবেসে ভারতীয়রা তাদের সোনা গয়না দান করেছিলেন। সেই সোনার পরিমান ছিল নব্বই কেজি।হ্যাঁ, একটুও ভুল শোনেননি।নব্বই কেজি।১৬ই আগস্ট, ১৯৪৫, জাপান আত্মসমর্পণ করে।ছ জন শীর্ষ স্থানীয় সেনা আধিকারিককে নিয়ে নেতাজি পাড়ি দেন অজানা সফরে।যাওয়ার আগে তিন মাসের বেতন অগ্রিম দিয়ে যান বাহিনীর সদস্যদের।বিমানে নেতাজির সঙ্গে ছিল ৯০ কেজি সোনা।বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হল।তার অস্থি রেঙ্কোজি মন্দিরে স্থান পেল কিন্তু ৯০ কেজি সোনা কোথায় গেল? মজার ব্যাপার হল,এই সোনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক বড় বড় নাম।যে নাম গুলো প্রকাশ্যে এলেও খুব চাতুর্য্যের সঙ্গে মুছে ফেলা হয়েছে। 

১৯৭৮ সালে বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব  সুব্রহ্মনিয়াম স্বামীর হিন্দুস্থান টাইমসকে দেওয়া একটি স্টেটমেন্ট ঝড় তুলে দিয়েছিল সারা দেশে।কী সেই স্টেটমেন্ট? 
"আজাদ হিন্দ বাহিনীর সমস্ত সম্পত্তি নেহেরু চুরি করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন "।চমকে উঠতে হয় না? 

শোনা যায় নেহেরু ও নেতাজি ছিলেন দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু।আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি ব্রিগেডের নাম ছিল নেহেরু ব্রিগেড। 
অথচ সম্প্রতি নেহেরুর একটি চিঠি আবিস্কৃত হয়েছে যেখানে ১৯৪৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর  নেহেরু বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলিকে চিঠিতে জানাচ্ছেন - ' সুভাষ চন্দ্র বোসকে স্তালিন রাশিয়ায় ঢুকতে দিয়েছেন।সুভাষ চন্দ্র বোস আপনাদের ওয়ার ক্রিমিনাল। রাশিয়া এই ক্রিমিনালকে আশ্রয় দিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। রাশিয়া এটা কখনোই করতে পারেনা।আপনি যা করার করুন।'
রাশিয়া ও বৃটেন তখন মিত্র শক্তি এবং তখন নেতাজিকে ওয়ার ক্রিমিনাল ঘোষণা করেছে বৃটিশ সরকার। ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট নেতাজি যদি সত্যিই মারা যান তাহলে ১৯৪৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর  নেহেরু তার এক সময়ের প্রিয় বন্ধুর সম্মন্ধে কেন এমন চিঠি লিখলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ? 

এবার সোনাগয়নার কথায় আসি।তাইহোকু বিমান বন্দরের দায়িত্বে থাকা মেজর তাকাকুরা বলেন উদ্ধার হওয়া গয়না গুলিকে একটি পেট্রোলিয়াম ক্যানের মধ্যে ভরে ফেলা হয়।যার ওজন হয় ১৬ কেজি।১৯৪৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর সেই ১৬ কেজি সোনা লেফট্যানেন্ট কর্ণেল তাকাকুরা তুলে দেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর কর্ণেল রামমূর্তির হাতে।১৯৫২ সাল অবধি রামমূর্তি সেই সোনা নিজের কাছে রেখে দেন।

১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসে গয়না ভরা বাক্স দিল্লিতে পৌঁছায়।নেহেরু ঘোষণা করেন ১১ কেজি গয়না তিনি পেয়েছেন এবং সেগুলি অতি সাধারণ মানের।উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমান ছিল ১৬ কেজি অথচ নেহেরুর ঘোষণা অনুযায়ী ১১ কেজি সোনা ভারতে পৌঁছেছে। তাহলে পাঁচ কেজি সোনা গেল কোথায়?  নেহেরু কেন বললেন, সোনাগুলি অত্যন্ত সাধারণ মানের? নেহেরু কি জানতেন না যে সোনাগুলিতে বৃটিশ সরকারকে উৎখাত করার জন্য অগনিত ভারতীয় জনগণের আবেগ জড়িয়ে আছে?

এবার একটি বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ করছি যা শুনলে কেঁপে উঠবেন আপনি।

৪) ভদ্রমহিলার নাম পূরবী রায়।পূরবী  গবেষণার কাজে রাশিয়া গেছিলেন এবং গোপনে নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল পূরবী তখন রাশিয়ায়। 
রাশিয়ায় তখন তুমুল অরাজকতা চলছে।গোপন ফাইল ও নথি তখন লুঠপাট হচ্ছে।পয়সার লোভে সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছে চোরেরা। সেগুলো অকশানে বিক্রি হচ্ছে।এমনই একটা নিলামে একটি ছবি দেখে শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত নেমে এলো পূরবীর।
ছবিটি একটি ডিটেনশন ক্যাম্পের।সেখানে ওভারকোট পরা একজন লম্বা চওড়া মানুষকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন বন্দুকধারি রাশিয়ান আর্মি অফিসার। সেই লম্বা চওড়া মানুষটি আর কেউ নন,স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে পূরবী খোঁজ পেলেন সেই ডিটেনশন ক্যাম্পের।সেটি মস্কো থেকে কিছু দূরে পোডক্স নামক এক স্থানে। পূরবী জানতেন রাশিয়ার গোপন ফাইল নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে তার স্থান হবে কারাগারে। পূরবী থেমে গেলেন কিন্তু ঈশ্বর তাকে এক অন্য পথ খুঁজে দিলেন। আলেকজান্ডার কালাশনিকভ নামের এক রাশিয়ান আর্মি অফিসারের সঙ্গে আলাপ ছিল পূরবীর,সেই আলাপ রূপ নিল গাঢ় বন্ধুতায়।আলেকজান্ডার রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল পদে কাজ করতেন। 
পূরবী ছবিটি দেখালেন, সব খুলে বললেন আলেকজান্ডারকে।আলেকজান্ডার গোপন ফাইল ঘেঁটে কয়েক মাস ধরে তদন্ত করে যে তথ্য সামনে আনলেন তা শুনে চমকে গেলেন পূরবী।ক্লাসিফায়েড ফাইলের তথ্য অনুযায়ী ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ান শাসক স্ত্যালিন তার তিন সহকারী ও উপদেষ্টাকে নিয়ে একটি জরুরি মিটিং করেন।যে মিটিং এর নাম ছিল - "Where to keep Subhas Chandra  Bose" অর্থাৎ সুভাষ চন্দ্র বোসকে কোথায় রাখা হবে?



আজকের স্বাধীনতা ও দেশভাগ
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

ভারতের এই ৭৯ তম স্বাধীনতা দিবসের পরবর্তী লগ্নে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবার সময় এসে দাঁড়িয়েছে। আজকের ভারতবর্ষ সেই অখণ্ড ভারতবর্ষ নয়। যে ভারতবর্ষ আমরা কখনোই দেখে উঠতে পারিনি, যে ভারতবর্ষের মাটিতে সম্পৃক্ত ছিল কোটি কোটি হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের আবেগ, সেই ভারতবর্ষের মাটি কত অনায়াসে দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে। তাই একটা প্রশ্ন বারবার এই ৭৯ বছর ধরে উঁকি দেয়৷ তা হল স্বাধীনতা সত্যিই কি সুখের? যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অতলে ২০০ বছর ধীরে ধীরে ভারতীয় গণপ্রজাতন্ত্রের ধারণার জন্ম হয়েছিল, একদিনে সেই সাম্রাজ্য দুটুকরো হয়ে যায়নি। দেশভাগের পটভূমিকা এক দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে। আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আগে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের এই ধারণাটাই ছিল না। আমরা যদি ধরে নিই ভারত একটি দেশ, আর সেই দেশের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের অজস্র আবেগ, তবে তার শুরু অবশ্যই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে। কারণ তার আগে এই ভারতের মাটিতে ছিল রাজণ্যবাদ এবং বাদশা নবাবদের নির্দিষ্ট সাম্রাজ্যের কাড়াকাড়ি। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ আমরা ধরে নিতে পারি মুঘল সাম্রাজ্য যেমন একটি দেশ ছিল, ঠিক তেমন মারাঠারা ছিল অন্য একটি দেশ। ঠিক তেমনভাবে ছোট ছোট প্রদেশে বিভক্ত ছিল আমাদের এই ভারতবর্ষ। আর তখন দেশ সম্বন্ধীয় এই কেন্দ্রীয় ভাবনার প্রকাশও ছিল না আমজনতার মনে। যে যার নবাব বাদশা এবং রাজাদের খাজনাটুকু দিয়ে নিজেদের জীবন এবং সংসার ধর্ম পালন করতেই ব্যস্ত থাকত। কিন্তু সম্পূর্ণ দেশটাকে ধীরে ধীরে নিজেদের রাজত্বের আওতায় এনে তাকে বিভিন্ন প্রেসিডেন্সিতে ভাগ করে এই দেশ এবং সংবিধানের চিন্তাভাবনার শুরুটা যে ব্রিটিশদের হাত ধরেই শুরু হয় তা মেনে নিতে কোন অসুবিধা নেই। হাইকোর্ট থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট অথবা গভর্নর বা প্রেসিডেন্ট, সবটাই সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনুকরণ মাত্র। কিন্তু মাঝখান থেকে ভাগ হয়ে গেল আমাদের দেশটা। সত্যিই কি তা কাম্য ছিল? নাকি সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই দেশভাগের বিষয়টি অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিল? আমরা শুনে থাকি মাউন্টব্যাটেন দেশভাগ করেছেন। কিন্তু তার পটভূমিকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বিষয় খানিকটা জটিল হয়ে পড়ে। দেশভাগের পিছনে যদি থেকে থাকে দ্বিজাতিতত্ত্ব, তবে তার সামনে রয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুল্লাহের মতো এক ঝাঁক ভারতীয় সাম্প্রদায়িক নেতারা। আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তবে কি দেশভাগের জন্য আমরা সরাসরি ভারতের মুসলিম লীগকেই দায়ী করব? ঘটনার গতিপ্রকৃতি তো সকলেই জানেন। ১৯৪৬ সালে ১৬ ই আগস্ট যে ভয়াবহ দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতার মাটিতে, তারই যেন পুনরাবৃত্তি দেখা গেছিল ১০ই অক্টোবর নোয়াখালীতে। স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে প্রায় এক বছর ধরে ভারতের মাটিতে বিভিন্ন স্থানে এই দাঙ্গা মারাত্মক রূপ নেয়। কিন্তু ৪৬ এর সেই দাঙ্গার কারণ এবং ফলাফল অনুধাবন করতে বসে কিছুটা অবাক হতে হয় বৈকি। যখন দেখি কলকাতার মাটিতে শুধুমাত্র একটি সকালে প্রায় চার হাজার গণহত্যা হয়ে যায়, অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী লালবাজারে বসে সেই দাঙ্গার ছবি প্রত্যক্ষ করেন এবং পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকতে আদেশ দেন, তখন বিষয়টা সত্যিই এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ভাবাদর্শকে চিহ্নিত করে। কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং সারা ভারতে সক্রিয় দিবস ঘোষণা করেন। ডাইরেক্ট একশন ডে। আর তার ফলাফলই হলো দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। আমাদের এই প্রিয় শহর কলকাতায় ধর্মতলা ডালহৌসির মত খোলা চত্বরে পড়ে রয়েছে হাজার হাজার মানুষের মৃতদেহ। আজ ভাবতে বড় কষ্ট হচ্ছে তাই না? কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখুন, শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিমকে প্রজেক্ট করে কিভাবে একটি রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষের উপর দিয়ে নিজেদের ফায়দা তুলতে পারে। জিন্না ঘোষণা করলেন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। সাথে সাথে কলকাতার মাটিতে বিভিন্ন দিক থেকে আছড়ে পড়ল মুসলিমরা। হিন্দু এবং মুসলিম উভয়পক্ষই দায়ী করে পরস্পরকে। এটা সাম্প্রদায়িক বিষয়ে আলোচনা করবার জায়গা নয়। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো অসাম্প্রদায়িক আলোচনা থেকে দেশভাগের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা যায় না। কারণ দেশভাগের মূল লুকিয়ে আছে ধর্মের গায়ে। মুসলিমরা অবশেষে কেন পাকিস্তান চাইলেন? থুড়ি মুসলিমরা চাননি। চেয়েছে মোহম্মদ আলী জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দীরা এবং তাদের মুসলিম লীগ। ১৯০৬ সালে জন্ম নেওয়া এই রাজনৈতিক দলটি তখন ভারতীয় গণপরিষদের প্রধান একটি অঙ্গ। আর তার সঙ্গে রয়েছে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। মুসলিম লীগের ধারণা কংগ্রেস মুসলিমদের ভালো করবে না এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে হিন্দু অধ্যুষিত মন্ত্রিসভায় দেশের মুসলিমরা কখনও ভালো থাকতে পারবে না। শুধুমাত্র এই ধারণার বশবর্তী হয়ে পাকিস্তানের দাবী তোলা জিন্নাহ সরাসরি দাঙ্গায় দেশকে যুক্ত করে ফেললেন৷ আর দেশের দুই প্রান্তে পাঞ্জাব এবং বাংলা বরাবরই হিন্দু মুসলিমের মিলিত জমি হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। তাই পাকিস্তান গঠিত হলে এবং দেশ দ্বিখন্ডিত হলে বাংলা ও পাঞ্জাব যে ভেঙে যাবে সে বিষয়ে কারোর কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ভয়টা হলো কলকাতাকে নিয়ে। হঠাৎ করে কিভাবে যেন খবর ছড়িয়ে পড়ল কলকাতা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুদের মধ্যে খেলে গেল শীতল রক্তের স্রোত। দেশভাগের সেই আতঙ্ক তখন যেন মহামারীর রূপ নিয়েছে। আর এদিকে ১৯৪৬ এর ১৬ই আগস্ট রাজাবাজার, কলাবাগান, মেটিয়াবুরুজের মত অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায় মুসলিম লীগের ছাতার তলায় অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে খোলা রাস্তায়। সুতরাং দাঙ্গা অনিবার্য। আর হলও তাই। সেই ভয়াবহ দাঙ্গার ছাপ লেগে গেল কলকাতা শহরের গায়ে। যে কলকাতা এক সময়ে নবাব সিরাজকে যুদ্ধ করতে দেখেছে, যে কলকাতা ধীরে ধীরে দেখেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে, যে কলকাতা দেখেছে নবাবের চোখে ধুলো দিয়ে ব্রিটিশদের দ্বারা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ হতে, সেই কলকাতার বুকেই দাঙ্গায় রক্তাক্ত হলো দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়। শুধুমাত্র মুসলিম লীগের দেশভাগের দাবী নিয়ে সারা দেশব্যাপী উত্তপ্ত হয়ে ওঠা, এবং সোহরাওয়ার্দীর অদ্ভুতভাবে নিষ্ক্রিয়তা একটা শহরকে যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল। আর ব্রিটিশরা বসে বসে সেই খেলা দেখছিল। তাদের যেন অপেক্ষা ছিল এমন একটি ভয়ংকর দাঙ্গার। কারণ দেশভাগের প্রেক্ষাপট নির্মাণে কংগ্রেসের কার্যকলাপ জুতসই হচ্ছিল না কখনোই। আর হালে পানি দিল মুসলিম লীগের এই সিদ্ধান্ত এবং কার্যকলাপ। দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক এক বছর আগে সারা দেশে যেন নতুন করে উদ্ভূত হলো দেশভাগের প্রয়োজনীয়তা। মুসলিমরা ভালো নেই, এই তত্ত্বকে যত তাড়াতাড়ি দেশের সমগ্র মুসলিম সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, ততো পাকিস্তান গঠনে সহায়ক হয়ে উঠবে রাজনীতি, এই নীতির উপর ভিত্তি করে জিন্নাহ এগিয়ে চললেন। আর ধীরে ধীরে আমাদের ভারতবর্ষ ভাগ হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে উঠল। 
কিন্তু স্বাধীনতার রং কী? শুধুমাত্র লাল রক্তের উপর দাঁড়িয়ে যে দেশে লাখ লাখ স্বাধীনতা সংগ্রামী নিজেদের স্বার্থকে বলি দিয়ে দেশের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের কি স্বপ্ন ছিল এমন দেশভাগের পর স্বাধীনতা? মাস্টারদা সূর্য সেন কি জানতেন যে স্বাধীন দেশে তাঁর মাতৃভূমি চট্টগ্রাম ভারতের বাইরে চলে যাবে? নাকি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যখন ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করছেন, তখন তিনি জানতেন যে আর কয়েক বছর পর এই অংশ দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে যাবে! সত্যিই ভাবতে বসলে বারবার অবাক হতে হয়। কিভাবে আমরা স্বাধীন হলাম? কোন নীতির উপর ভিত্তি করে ব্রিটিশরা অনায়াসে দেশকে দু ভাগ করে বাঙালি এবং পাঞ্জাবিদের আলাদা করে দিল! ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট যখন দেশের একটি অংশ স্বাধীনতায় মেতে রয়েছে, তখন আরেকটি অংশে মানুষ নিজেদের জন্মভূমি আগলাতে ব্যস্ত। নিজেদের অস্তিত্বকে হাতড়ে হাতড়ে তখন তাদের মধ্যে এক টুকরো মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার লড়াই। দেশ তো স্বাধীন হল৷ দিল্লিতে ইউনিয়ন জ্যাক নেমে পতপত করে উড়লো তিরঙ্গা। কিন্তু কী হলো বাংলা এবং পাঞ্জাবের? প্রেক্ষাপট বানিয়ে শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে তৈরি হলো পাকিস্তান। মুসলিম লীগ পেল নতুন একটা দেশ। আর নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসল কোটি কোটি ভারতবাসী। কেউ এপার থেকে ছুটে গেল ওপারে, আবার কেউ ওপার থেকে ছুটে এলো এই ভারতের মাটিতে। যদিও ওপার থেকে ভারতে আসার সংখ্যাটাই বেশি। কারণ পাকিস্তানে হিন্দুরা নিজেদের সুরক্ষিত মনে করলো না কোন অংশেই। যে দেশ গঠিত হয় ধর্মের ভিত্তিতে, সেখানে ধর্মই যে প্রধান হয়ে ওঠে। ভারতবর্ষ গঠনের মূল ভিত্তি অসাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো মুসলিম লীগ ভয়ংকর দাঙ্গার ভেতর দিয়ে ঠিক একটি নিজেদের জন্য দেশ বার করে নিয়ে চলে গেল। আর আমরা কত সচ্ছলভাবে স্বাধীনতা উদযাপন করতে ব্যস্ত। তাই যতবারই স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা দিবসকে বিশ্লেষণ করতে বসি, ততবার খোঁচা দেয় পাকিস্তান তৈরি এবং এই তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষে ধর্ম নিয়ে ভয়ংকর সেই দাঙ্গার পরিস্থিতি। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। কংগ্রেস কি কোনভাবেই দেশভাগকে আটকাতে পারল না? জিন্নাহ যখন প্রকাশ্যে 'বিভক্ত ভারত অথবা বিধ্বস্ত ভারত' তত্ত্ব প্রচার করছেন, তখন তাঁর সেই আত্মহননকারী সিদ্ধান্তকে কোনভাবেই কি কংগ্রেসের পক্ষে দমন করা সম্ভব ছিল না? আসলে এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ইংল্যান্ড থেকে আদেশ এসেছিল দেশকে ভারতীয়দের হাতে তুলে সরকারের হস্তান্তর ঘটিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সেখানে ধর্মীয় উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে দেশকে ভেঙে ফেলা ছিল ব্রিটিশদের জন্য এক উপরি পাওনা। তাই "দেশকে ভাগ করতে হলে আমার বুকের উপর দিয়ে ভাগ করতে হবে" - গান্ধীজীর এই মতামত কখনোই ধোপে টেকেনি। এখানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলিম লীগের স্বার্থ এবং ব্রিটিশ সরকারের সদিচ্ছার অভাব। শুধুমাত্র একটা কথা না বললেই নয়। হয়তো আমাদের প্রিয় কলকাতাও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। শুধুমাত্র কিছু মানুষের ভূমিকা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ৪৬ এর দাঙ্গার দিন হিন্দুরা যদি অস্ত্র হাতে রাস্তায় না নামতো এবং গোপাল চন্দ্র মুখার্জির (গোপাল পাঁঠা) মত মানুষেরা যদি পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ তৈরি না করতেন তবে হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। এখানে সাম্প্রদায়িক বিষয়গুলোকে সরিয়ে রাখলেও মুসলিম লীগের অদূরদর্শী চিন্তাভাবনার এক ভয়ঙ্কর ফলাফল চোখে পড়ে। এমনকি দাঙ্গার দিনে দুপুর দুটোর সময় কলকাতায় মনুমেন্ট এর নিচে মুসলিম লীগের জনসভা থেকেও সহিংস বার্তা ছড়িয়ে যায় কলকাতার বিভিন্ন দিকে। তাই দেশভাগের সূত্রপাত শুধুমাত্র ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছার উপর নিয়ন্ত্রিত ছিল একথা চিন্তা করা নিতান্ত বোকামি। ভারতীয় রাজনীতিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উঠে আসা, এবং মুসলিম লীগের নতুন দেশ দাবী থেকে শুরু করে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে, সবটাই ছিল দেশভাগের কারণ। আর সেই কারণের ফলাফল হল আজকের খন্ডিত ভারতবর্ষ। তাই দেশ স্বাধীন হলেও আজও বাংলা এবং পাঞ্জাবের গায়ে সুতীব্র ক্ষত। আজ ৭৯ বছর পরেও তাই বাঙালিকে কাঁদতে হয়। নিজের মাতৃভূমি এবং জন্মভূমিকে হারিয়ে ফেলে কত মানুষ আজও নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে বেড়ায়। এমনই হলো আমাদের স্বাধীনতার আসল রূপ। তাই যতবার ১৫ই আগস্ট আসে, আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দ্বিজাতিতত্ত্বের সেই ভয়াবহ দিক এবং কলকাতার দাঙ্গা। আজ ভারতবর্ষে পৃথিবীর সব থেকে বেশি পরিমাণ মুসলমান সম্প্রদায় বাস করেন। এই দেশের মাটিতে থাকবার জন্য তাঁদের পৃথক পাকিস্তান প্রয়োজন হয় না। তাই হয়তো আমরা আরো বৃহত্তর সীমান্ত নিয়ে সকলে একসঙ্গেই থাকতে পারতাম। হয়তো কোটি কোটি বাঙালিকে নিজের জন্মভূমি খুঁজবার জন্য সারা জীবন ছটফট করতে হতো না। আর দেশ পেতো এক স্বাধীন, শক্তিশালী, অসাম্প্রদায়িক এবং বিশাল ভারতবর্ষ। আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও, দেশভাগের ক্ষততে কিছুটা প্রলেপ তো বটেই। জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দীরা আর নেই। নেই তাদের মুসলিম লীগ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুসলিম লীগে ভাঙন তৈরি হয়। কিন্তু দেশ ততদিনে ভেঙ্গে গেছে, ভেঙে গেছে ভারতবাসীর হৃদয়। এটাই আসলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার রং। এই দ্বিখন্ডিত ভারতবর্ষের উপর দাঁড়িয়েই আমাদের স্বাধীনতার উদযাপন।



হুল দিবস 
রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় 

ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রামের নাম সাঁওতাল বিদ্রোহ, আর এই দিনকে স্মরণ করে পালিত হয় হুল দিবস।  ‘হুল’ কথার অর্থ বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক ২ বছর আগে ১৮৫৫ তে ঘটে যাওয়া এই বিদ্রোহই ছিল ইংরেজদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার প্রথম আন্দোলন। এক পরিবার থেকে ছয় ভাইবোনের (সিধু, কানু, বিরসা, চাঁদ, ভৈরব,আর দুই বোন ফুলমনি এবং ঝানু মুর্মু ) সংগঠিত আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। এই ছয় ভাইবোনের ডাকে এককাট্টা হয়েছিল চারশোটি গ্রাম। তবে শুধুই যে সাঁওতাল অধ্যুষিত নাগরিকরা তা নয়, অন্যান্য নির্যাতিত মানুষও এর অংশীদার হয়ে উঠেছিল।

সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্যই ছিল, ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী এবং অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর মহাজনদের শোষণ, অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য গড়ে তোলা। তাই নিজেদের স্বাধিকার ছিনিয়ে নিতে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন সিধু ও কানুর নেতৃত্বে ভাগনাদিহির মাঠে সমবেত হয় হাজার হাজার সাঁওতাল৷ এরপর কলকাতা অভিমুখে প্রথম গণযাত্রা শুরু করেন তাঁরা। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য সেই প্রথম মিছিল বা গণযাত্রার সূচনা হয়েছিল।

তবে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা যে ১৮৫৫ সালেই, তা কিন্তু নয়। আরও ৭৫ বছর আগে ১৭৮০ সালে সাঁওতাল জননেতা তিলকা মুর্মু, যিনি তিলকা মাঞ্জহী নামেও পরিচিত ছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে শোষকদের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের সূচনা করেছিল সাঁওতালরা। সাঁওতালদের নিয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করে পাঁচ বছর ধরে ব্রিটিশ অনাচার ও শোসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন তিলকা মাঞ্জহী৷

ইংরেজ আমলে স্থানীয় মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ ও নিপীড়ন এবং ব্রিটিশদের অত্যাচারের শিকার হয়ে তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই এই আন্দোলনের সূচনা। স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে সাঁওতালরা। যার ফলাফলে ইংরেজ সিপাহিদের গুলিতে প্রাণ হারান সিধু। কানুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাঁদের স্মরন করতেই প্রতিবছর এই দিনে পালিত হয় ‍‍`হুল দিবস‍‍`।

তাই তার ঠিক ৭৫ বছর পর সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সান্তাল হুল-এর সূচনা হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম দিকের সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা এই ভাতৃদ্বয়। তবে কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে ব্রিটিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সিধু। পরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে ১৮৫৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভগনডিহির সন্নিকটে পাঁচকাঠিয়া বটবৃক্ষে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয় কানুকে। ফাঁসির মঞ্চ থেকে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "আমি আবার আসব, আবার সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলব।"

এই দুই অমর বীর অসম সাহসে ভর করে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়়ে গিয়েছিলেন। সাঁওতাল বাহিনীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়, স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তব করতে দিয়েছিলেন নিজেদের প্রাণও। যে কারণে আজও তাঁদের স্মরণে শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে মাথা। তাঁদের সেই আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতেই আজও পালিত হয় ‍‍`হুল দিবস‍‍`।

অতীত ফিকে হয় না। ইতিহাস না জানা মানুষ আর স্মৃতিহীন মানুষ এক। ফলে ইতিহাস জানতে হবে, ইতিহাস জেনেই বর্তমানে আমাদের চলা। অতীতের ভিতেই গড়ে ওঠে প্রতিটা বর্তমান।


ছোটগল্প

স্বাধীনতার এক দিন 
পারমিতা মন্ডল 

বিশু নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিল। কালু এসে পেছনে এক সজোরে ধাক্কা মেরে বলল "এই ওঠ। কটা বাজছে দেখেছিস! ভুলে গেছিস নাকি আজ পনেরোই আগষ্ট?" বিশু বিরক্ত হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল "আরে সবে তো সাতটা, আর একটু ঘুমোতে দে। আটটায় উঠব। খুব ঘুম পাচ্ছে মাইরি।" মুখ ভেঙচে কালু বলল "উঁহু, ঘুম পাচ্ছে, পাওয়াচ্ছি।" এই বলে কালু বিশুকে হিড়হিড় করে টেনে বিছানা থেকে নামালো। তারপর গালে দু চারটে চড় থাপ্পর মেরে বলল "তাড়াতাড়ি ওঠ বলছি। আজ স্বাধীনতা দিবস। ক্লাবে দাদা আসবে পতাকা তুলতে। এসে যদি দেখে কিছু আয়োজন করা হয়নি তো খুব খচে যাবে। জানিস তো কেমন রাগী।" এবার বিশুর যেন টনক নড়লো। সত্যিই তো আজ স্বাধীনতা দিবস। নাহ্, আর না উঠলেই নয়। দাদা পাঁচ মিনিটের জন্য আসবে। কত জায়গায় যেতে হবে তাকে আজ। এসে সবকিছু তৈরি না দেখতে পেলে রক্ষা নেই। এইবার বিশু পড়ি কি মরি করে ছুট লাগালো। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে কালুকে মটরসাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে সোজা ক্লাবে। ক্লাব একদম ঝাঁ চকচকে। ফুলের দোকান থেকে ফুল মালা আগেই এনে রেখেছে কালু। পতাকা তোলার বাঁশের খুঁটি লাগানোর কথা বিশুর। বিশু সেই কাজেই ডুব দিলো। এদিকে কালু পতাকা বের করার কাজে ব্যস্ত। পতাকা থাকে ক্লাবের আলমারিতে। সেখান থেকে পতাকা বের করে রাখলো টেবিলের ওপর। নেতাজির ছবিটাও বের করতে হবে। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই ছবি কোথাও পেলো না। ক্লাব ঘরের সামনের জায়গাটায় পতাকা উত্তোলন হবে। কালু বিশুকে এক হাঁক মারলো।
"এই বিশু, নেতাজীর ছবিটা কোথায় রেখেছিস রে? খুঁজেই পাচ্ছি না। হাওয়া হয়ে গেল নাকি!" 
"দেখ না। আলমারির ওপরে টোপরে আছে।" 
আলমারির ওপর থেকেই পাওয়া গেল নেতাজির ছবি। সেই তেইশে বেরিয়েছিল। তারপর আজ। ছবির ওপর ধুলোর মোটা আস্তরণ পড়ে গেছে। সেটা ভিজে ন্যাকরা দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে কালু একটা হাঁচি ফেলে বলে উঠলো 
"এই জানিস বিশু, আজ ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে। ছোটবেলায় আজকের দিনে সকাল সকাল স্কুলে যেতাম। প্রভাত ফেরী হত। এখন তো দেখি না এসব তেমন। তারপর পতাকা তুলে গান আবৃত্তি এইসব হত। কী আনন্দ হত। মনে আছে তোর? বিস্কুট আর কমলা লেবু লজেন্স দিত। কী সোনার দিন ছিল সব।"
এসব ভাবনার সাগরে খানিক ডুব দিয়েছে কালু যখন তখন বিশু কালুকে এক ঠ্যালা মারে। 
"কী রে, ছোটবেলার কথা ভাবলেই হবে? ছবিটা লাগা বেদিতে ঠিকঠাক। তোকে নিয়ে এই এক সমস্যা। খুব ভাবুক, ইমোশনাল।"
"কী করব বল? মনে পড়ে সব। কত ভাল ছিল দিনগুলো। তারপর ধীরে ধীরে সব আবছা। এতো পড়াশোনা করে কী হল বল তো বিশু। কত স্বপ্ন ছিল বড় চাকরি করব। অনেক টাকা হবে। মা বাবার কষ্ট দূর হবে। কিন্তু কোথায় কী! চাকরি নেই কিছু নেই। পান বিড়ির দোকান করে আর কত আয় হয়! তোর বাবার পয়সা আছে। তোর শুয়ে বসে দিন কাটালেও হবে। কিন্তু আমার! বাবা আর কাজ করতে পারে না। মা-ও অসুস্থ। অথচ আমি অপদার্থ ছেলের মতো হয়ে আছি। মাঝে মাঝে মনে হয়...।"
"চুপ কর তো কালু। দাদা তো বলেছে তোর কিছু একটা হিল্লে হয়ে যাবে। অত চাপ নিস না।" 
কিছুক্ষণ পর পার্টির বড় নেতা আসেন। পতাকা উত্তোলন করে ক্লাব ও দেশের উদ্দেশে একটা ছোট্ট ভাষণ দিয়ে চলে যান। যাওয়ার সময় কালু পেছন থেকে ডাকে "দাদা, আমায় একটা কাজ ঠিক করে দেবেন বলেছিলেন। অনেক দিন হয়ে গেল। এবার একটু দেখুন দয়া করে।" জনৈক নেতা অত আমল না দিয়ে বললেন "আজ খুব ব্যস্ত। পরে কখনো আসিস পার্টি অফিসে।" সকালটা কেটে গেল। চারিদিকে আজ স্বাধীনতার সুর, স্বাধীনতার গান। দুপুরে দুটো ডাল ভাত খেয়ে ভাতঘুম দিল কালু। স্বপ্ন সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকলো সে। স্বপ্নে কেউ বলছে, কী রে, আমার ছবিটায় এতো ধুলো জমেছিল কেন? আমাদের অবহেলা করে উন্নতি করবি ভাবছিস?" কালু চমকে উঠে চোখ খুললো। দেখলো ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন নেতাজি। সামনে ধোঁয়া উড়ছে। সেই ধোঁয়ায় মুখটা পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। কালু হাত জোড় করে বিস্ময় মাখা চোখে চেয়ে রইল। নেতাজি আবার বললেন "শোন কালু, আমরা অনেক সংগ্ৰাম করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। তবে এইসব দেখার জন্য নয়। আজ তোরা দেশটার কী হাল করেছিস! চারিদিকে মার, দাঙ্গা, হিংসা, বিবাদ, অরাজকতা। গোল্লায় গেছে সবকিছু।" 
কালু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল 
"আপনি আমাকে বলছেন কেন এসব?"
"তোর মধ্যে এখনও মনুষত্ব আছে মনে হল। তাই। যাই হোক, এবার আমায় যেতে হবে।"
কালু একটু সাহস জুগিয়ে বলে ফেললো
"নেতাজি, আমার কি কোনো চাকরি হবে?"
নেতাজি হো হো হো হো করে হেসে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। 
কালুকে বিড়বিড় করতে দেখে মা ডাকলো, "বাবা ওঠ, সন্ধে হয়ে এলো যে।" কালু ধরফড়িয়ে উঠে একটু পর ধাতস্থ হলে বুঝতে পারলো সবটাই স্বপ্ন ছিল। মা বলল "কী রে, দোকান খুলবি না?"
কালু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
"হ্যাঁ খুলব। নাহলে খাব কী?"



কণ্ঠরোধ
দীপ্র দাসচৌধুরী

সুতপা বসে আছে ব্যালকনিতে। ওর মন ভাল নেই। অবশ্য গত একবছর ধরেই ওর মন ভাল নেই, তবে আজ একটু বেশিই খারাপ। সামনের সপ্তাহে মিতালির চলে যাওয়ার একবছর পূর্ণ হবে। এই একবছরে মেয়েটা সঠিক বিচার পেল না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওর ঘটনা তোলপাড় করলেও বাস্তবে খুব বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। কিছুদিন ওকে কিছু ছদ্মনাম দিয়ে প্ল্যাকারে সাজিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করেছিল কিছুজনে। কিন্তু সেখানেও কোনও সুরাহা হয়নি।
“কী রে মা এখানে বসে বসে কী করছিস? চা খাবি? করব?”- সুতপার বাবা অরবিন্দবাবু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন মেয়েকে। প্রিয় বান্ধবীর আকস্মিক চলে যাওয়া সুতপাকে অনেকটা ভেঙে দিয়েছে, তাই তিনি চেষ্টা করেন মেয়েকে মনের দিক থেকে শক্ত রাখার। কিন্তু, তিনিও আজকাল খুব দুশ্চিন্তা করেন মেয়েকে নিয়ে। দিনকাল সত্যিই ভাল নয়।
বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে সুতপা বলল, “একটু পরে খাব বাপি। মাথাটা ধরেছে তাই একটু ফ্রেস এয়ার নিচ্ছি।”
অরবিন্দবাবু চেয়ার টেনে নিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন। বললেন, “তোর পরীক্ষা কবে থেকে? এইবার তো ফাইনাল সেমিস্টার! এরপরে কী করবি ভেবেছিস?”
“হ্যাঁ এরপরে ভাবছি মাস্টার্সটা করব। তার সাথে ভাবছি মেয়েদের সুরক্ষার জন্য কোনও একটা সংস্থায় যুক্ত হব।”
“মেয়েদের সুরক্ষার জন্য? এটা ভাল ভেবেছিস মা, কিন্তু কোন সংস্থার সাথে যুক্ত হবি? দেখিস মা, দিনকাল ভাল নয়। একটু সাবধানে…”
সুতপা বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বাবা আজকাল একটু বেশিই চিন্তা করে ওকে নিয়ে। সুতপা ধীর কণ্ঠে বলল, “পশ্চিমবঙ্গে ‘সাগরিকা’ নামক একটা প্রতিষ্ঠান আছে। যারা মেয়েদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কাজ করে। নানারকম মার্সাল আর্টসের ট্রেনিং থেকে শুরু করে মেয়েদের বিভিন্ন বিপদে পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি। ওদের অ্যাপ আছে। সেখানে যোগাযোগ করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের সব শহরেই আস্তে আস্তে ওদের সেন্টার গড়ে উঠছে।”
অরবিন্দবাবু মাথা নাড়ালেন। মেয়ে যা ভাল বুঝছে করুক। তাঁর কোনও আপত্তি নেই। তিনি মেয়েকে অন্যভাবে গড়ে তুলেছেন। সমাজের কথা ভাবতে শিখিয়েছেন। এখন পিছিয়ে আসতে বলতে পারবেন না কিছুতেই। অরবিন্দবাবু উঠে চা করতে গেলেন। ছোটবেলায় মাকে হারানো মেয়ে সুতপার কাছে ওর বাপি’ই সব।
সুতপা ফোনটা বের করে ডায়াল করল একটা নম্বরে। ট্রু কলারে উঠল “সাগরিকা এনজিও” নাম। ওপাশ থেকে এক মহিলা ফোন ধরে বললেন, “হ্যালো…”
“হ্যালো এটা সাগরিকা এনজিও। মেয়েদের সুরক্ষা সংক্রান্ত কাজকর্ম এখানেই হয় তো?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম, এখানেই হয়। বলুন কী জানতে চান?”
“আসলে আমি আপনাদের সংস্থার সাথে যুক্ত হতে চাই। কীভাবে হব?”
“আপনি কোথায় থাকেন?”
“বর্ধমান, হাটগোবিন্দপুরে।”
“বেশ তাহলে আগামীকাল সকাল দশটায় আপনি আমাদের বর্ধমানের সেন্টারে উপস্থিত থাকবেন। এখন আপনাকে একটা ফর্ম দেওয়া হবে হোয়াটসঅ্যাপে, সেটি ভর্তি করে নিয়ে আসবেন। আর সাথে আনবেন দু’শো টাকা এন্ট্রি ফি।”
ফোন কাটার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ফর্মের পিডিএফ এসে গেল সুতপার হোয়াটসঅ্যাপে। সেটিতে চোখ বুলিয়ে নিল ও। আগামীকাল জীবনের এক বড় অধ্যায় শুরু করতে চলেছে ও।

সুতপা সকাল দশটা বাজার দশ মিনিট আগেই সংস্থার বাইরে এসে দাঁড়াল। ওর সাথে রয়েছে ফর্ম আর আধার কার্ড। দু’শো টাকা অনলাইন পেমেন্ট ও আগের দিনই করে দিয়েছে যোগাযোগ করে। দারোয়ানকে বলে ভেতরে ঢুকতেই এক মহিলাকে ডেকে সুতপা জিজ্ঞেস করল, “যুক্ত হওয়ার জন্য কোথায় ফর্মটা জমা দিতে হবে।” 
মহিলা আঙুল তুলে একটা ঘরের দিকে দেখিয়ে দিল। সুতপা সেই ঘরের ভেতর ঢুকতে গিয়ে দেখল সেখানে এক মধ্যবয়স্কা মহিলা বসে আছেন। ইনিই সম্ভবত রজনী দত্ত। এই ব্রাঞ্চের প্রধান। ঘরের বাইরেও তাই’ই লেখা। সুতপা আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাম আসতে পারি?”
মহিলা মুখ তুলে দেখে সুতপাকে ইশারা করে ভেতরে ডাকলেন। তারপর বসতে বললেন ইশারায়। সুতপা বসে নিয়ে নিজের ফর্মটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমি এই সংস্থার সাথে যুক্ত হতে চাই। আগামীকাল কথা হয়েছে। পেমেন্টও করা হয়ে গেছে…”
সুতপাকে থামিয়ে দিয়ে মহিলা বললেন, “হ্যাঁ প্রধান দপ্তর থেকে আমাকে জানানো হয়েছে আপনার কথা। আমি রজনী দত্ত, এই বর্ধমান ব্রাঞ্চের হেড।”
“ম্যাম আমি অনেকটাই ছোট আপনার থেকে। প্লিজ আমায় আপনি বলে ডাকবেন না।”
“আচ্ছা বেশ, তুমি বলেই ডাকছি। তো সুতপা তুমি কেন এই সংস্থার সাথে যুক্ত হতে চাও?”
সুতপা তখন ওর বান্ধবীর সাথে বছরখানেক আগে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার কথাটা বলল রজনীদেবীকে। রজনীদেবী সব শুনে থমথমে মুখে বললেন, “তুমি মিতালির বান্ধবী। খুব ভাল হল তুমি এলে। আমরা আজ রাতে একটা প্রোটেস্ট মিছিল অর্গানাইজ করেছি। বছরখানেক হয়ে গেল কোনও বিচার নেই সেই প্রতিবাদে। তুমি এই প্রতিবাদের মুখ হও এটা আমি চাই। আমি এখনই সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি তোমার।”
সুতপা যেন হাতে চাঁদ পেল। ওর বান্ধবীর জন্য প্রথমদিনেই লড়াইয়ে নামতে পারবে এর থেকে ভাল আর কীই বা হতে পারে! রজনীদেবী সুতপাকে নিয়ে গেলেন হল ঘরে। তার আগে একজনকে ডেকে বললেন, “সবাইকে উপস্থিত থাকতে বল হল ঘরে দশ মিনিটের মধ্যে।” 
সুতপা সেখানে গিয়ে দেখল বিভিন্ন বয়সের মহিলারা এই সংস্থার সাথে যুক্ত। রজনীদেবী সুতপার আলাপ করিয়ে দিলেন সকলের সাথে। এবং বললেন সুতপা মিতালির বান্ধবী, সুতপাই হবে আজকের প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান মুখ। তারপর সুতপার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজকে মিছিলে বর্ধমান তথা বাংলার স্বনামধন্য গায়ক সুবিমল সেন আসছেন আমাদের সাথে যোগ দিতে। আমাদের জোর বাড়াতে।”
সুতপার চোখ গোলগোল হয়ে গেল শুনে। এতদিন যাঁর গান শুনেছে ও, আজকে সাক্ষাতে এইভাবে দেখতে পাবে ভাবতে পারেনি। সুতপাও একসময় খুব ভাল গান গাইত, রীতিমত তালিমও নিয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে কেরিয়ারের চাপে মুছে গেছে সে অধ্যায়। সবাইকে রজনীদেবী রাত আটটার মধ্যে কার্জন গেটে দাঁড়াতে বললেন। আর প্ল্যাকার বা যাবতীয় সরঞ্জাম তিনি বিভিন্নজনকে আনার নির্দেশ দিলেন।
সুতপা খুব খুশি হয়ে বাড়ি ফিরল। ফিরেই বাবাকে এই কথাটা বলতেই বাবা বললেন, “ঠিক আছে যেও। তবে সারারাত বাইরে থেকো না। ফিরে এসো। একা ফিরো না, কাউকে সঙ্গে নিয়ে ফিরো। কেমন?”
সুতপার উৎসাহ একটু হলেও দমে গেল বাবার কথা শুনে। বাপিটা কিছুতেই আগের মতো হতে পারছে না। যাই হোক, আজকের রাতটা ওর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ম এক রাত। সব ঘুমন্ত শহরবাসীকে জাগিয়ে তোলার এক রাত।

সুতপা কিছু শুকনো খাবার, ফ্লাস্কে গরম চা আর একটা প্ল্যাকার নিয়ে ঠিক আটটাতেই পৌঁছাল গন্তব্যস্থলে। গিয়ে দেখল রজনীদেবী আগেই পৌঁছে গেছেন। সঙ্গে রয়েছেন একজন বছর পঞ্চাশের সুপুরুষ ব্যক্তি। সুতপার চিনতে অসুবিধা হল না তাঁকে। তিনি আর কেউ নন বর্ধমানের বিখ্যাত গায়ক সুবিমল সেন।
রজনীদেবী সুতপাকে দেখেই ইশারায় কাছে ডাকলেন। তারপর সুবিমলবাবুকে বললেন, “এই মেয়েটিই আজ জয়েন করেছে। ওর নাম সুতপা। সুতপা আবার মিতালির বান্ধবীও ছিল। তাই আজ ওকেই মিছিলের মুখ করেছি। 
সুবিমল সেন হাত বাড়িয়ে বললেন, “আমি সুবিমল সেন। তোমার সাথে আলাপ হয়ে ভাল লাগল।”
সুতপা হ্যান্ডসেক করে হেসে বলল, “আমি আপনার গানের ভক্ত। গতবছর দোলে টাউনহলে আপনার অনুষ্ঠান আমি আর মিতালি দু’জন মিলেই দেখেছিলাম…”
সুবিমলবাবু বললেন, “শুনে ভাল লাগল। তুমি কি কখনও গান শিখেছ?”
সুতপা অবাক হল। লোকটা কীভাবে বুঝল এই কথাটা। আর লোকটাকে যতটা ভাল বাইরে থেকে লেগেছিল আজ ততটা ভাল লাগল না। হ্যান্ডসেক একটি অতি সাধারণ ব্যাপার হলেও কার ছোঁয়া কেমন সেটা বুঝিয়ে দিতে পারে।
সুতপা কৌতূহলবশত বলল, “আপনি কী করে জানলেন?”
রজনীদেবী কথাটা কেটে দিয়ে বললেন, “আমি একটু ওদিকটায় যাচ্ছি বাকিদের কাছে। তোমরা কথা বলো। ঠিক সাড়ে আটটায় হাঁটা শুরু করব।”
সুবিমলবাবু সেই কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে সুতপাকে বললেন, “গলা শুনে বুঝতে পারি। তোমার গলাটাও বেশ সুন্দর।”
সুতপা আর কিছু বলতে পারল না। লোকটার কথাবার্তা ঠিক না। সুতপা কোনওরকম এড়িয়ে বাকিদের কাছে চলে গেল। ঠিক সাড়ে আটটায় শুরু হল মিছিল। সুতপার ধারে কাছেই সুবিমল সেন ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, অনেকটা ইচ্ছে করেই। তারপর ইচ্ছে করেই বললেন, “একদিন আমার বাড়ি এসো। গান শোনা যাবে।”
সুতপা শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। কথায় কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একঘণ্টা মিছিল চলার পর ওরা সকলে এক জায়গায় দাঁড়াল। রাতের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানেও সুবিমল সেন সুতপার কাছে এসে বসলেন। “কী এনেছ বাড়ি থেকে?”- এই কথাটা বলার অছিলায় সুবিমলবাবু সুতপার গা ঘেঁষে বসলেন আরও।
সুতপা কোনওরকমে বললেন, “একটু শুকনো খাবার…”
“এই দেখি দেখি…”- এই কথাটা বলতে বলতেই সুবিমলবাবু হাত দিলেন সুতপার ঠোঁটে, লেগে থাকা খাবার সরানোর বাহানায়। কিন্তু এইবার সুতপা থেমে থাকল না। হাতটা ধরে টেনে নামিয়ে দিল নিচে। তারপর কটকট চোখে তাকিয়ে বলল, “আর একবার যদি ছোঁয়ার চেষ্টা করেন তাহলে ভুলে যাব আপনি একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ আর আমার থেকে বয়সে বড়।”

মিছিলটা থমথমে হয়ে গেল। রজনীদেবী দৌড়ে এলেন সুতপার কাছে। সবাই তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুবিমলবাবু থতমত খেয়েও নিজের গলার জোরকে অক্ষুণ্ণ রেখে বললেন, “বেশি বেড়ো না মেয়ে। তোমাদের মতো মেয়েদের সাথে কথা বলাই আমার কাল হয়েছে।”

রজনীদেবী সুতপাকে দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, “কী হয়েছে সুতপা? এরকম করছ কেন ওঁর সাথে?”
সুতপা সব খুলে বলল রজনীদেবীকে। কিন্তু সবটা শুনে রজনীদেবী যেন নির্বিকার। তিনি বললেন, “শোনো, একটু মানিয়ে নিয়েই বড় লড়াই চালাতে হয়। এ’সব ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে বসে থাকলে, বড় ঘটনার বিরুদ্ধে লড়া যায় না। উনি একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ। ওঁর সাথে মিটমাট করে নাও। নাহলে, তোমার জন্য আমাদের সংস্থা সাফার করবে।”
সুতপার অবাক লাগল এটা শুনে। যে সংস্থার ওপর ও এতটা ভরসা করেছিল, আজ সেই সংস্থাই ওকে সুরক্ষা দিতে অক্ষম। মিটিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। ক্ষমতার কাছে মাথা নত করতে বলছে। এরা আর মেয়েদের সুরক্ষা কী দেবে! বাপি ঠিক কথাই বলে, দিনকাল খুব খারাপ!

সুতপা রজনীদেবীকে বললেন, “আমি আপনাদের সংস্থার সাথে আর যুক্ত নই। আমি বাড়ি ফিরব।”

তারপর গটগট করে নিজের ব্যাগটা আনতে এগিয়ে গেল ও। সেখানে আবার মুখোমুখি সুবিমলবাবুর সাথে। সুবিমলবাবু রাগে গজগজ করতে করতে দাঁত চিপে বললেন, “আজ খুব অপমান করলে আমায়। এ’সব স্বভাব ছাড়ো। নাহলে বন্ধুর মতো অবস্থা তোমারও হবে।”

এটা শুনে সুতপা আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। টেনে এক চড় মারল সুবিমলবাবুকে। তারপর সেখান থেকে গটগট করে বেরিয়ে টোটো ধরল। চলে গেল নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। পেছনে পড়ে রইল একরাশ গুঞ্জন আর চাপা উত্তেজনা। এবং মুখোশধারী হায়নার জমায়েত।

বাড়ি ফিরে সুতপা ঘুমিয়ে পড়ল । মনখারাপ, বিষণ্ণতা আর হেরে যাওয়া ফিল হলে খুব ঘুম পায়। ও ঘুমিয়ে পড়ল সে’রকম কিছু না খেয়েই। ওর বাবা অরবিন্দবাবু বুঝেছেন কিছু একটা হয়েছে কিন্তু রাতে আর ওকে বিরক্ত করেননি। সকালে সুতপার ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। দুটো শালিক ঝগড়া করছে ওর জানালায়। ও চোখ খুলতেই ধড়ফড় করে উঠে বসল। ফোনটা অন করে দেখল সেখানে রজনীদেবীর বারোটা মিস কল। ওর মনে পড়ে গেল সব ঘটনা। ও আর ফিরবে না ওসব জায়গায়। ফেসবুক অন করতেই চমকে উঠল। গতরাতের মিছিল শেষে সবার গ্রুপ ছবি আপলোড করেছে সাগরিকা সংস্থার ফেসবুক পেজ। সুতপা চলে আসার পর সেখানে মিডিয়া এসেছিল। এখন মিডিয়াও পুলিশের মতো দেরিতে আসে দেশে। তাই আসল ঘটনা তারা টের পায়নি। সেখানে রজনীদেবী এবং সুবিমলবাবু একত্রে বলেছেন মেয়েদের সুরক্ষার জন্য তাঁরা অনেক দূর যেতে পারেন। এটাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।

সুতপার ঘেন্না হচ্ছে। কিন্তু তাতে কার কী যায় আসে! সুতপার চোখ গেল জানালার দিকে। দেখল শালিক দুটো এখনও ঝগড়া করছে। তারপর একটা শালিক উড়ে গেলে আরেকটিও গেল তার পেছনে। সুতপার মনে পড়ে গেল মিতালির কথা। ওরা দুজনও এ’রকম ঝগড়া করত আবার একে অপরকে ছাড়া থাকতেও পারত না। সুতপা মনে মনে ভাবল, ওরা পাখি হলেই বোধহয় ভাল থাকত। কেউ কণ্ঠরোধ করতে পারত না। তিলে তিলে মারতে পারত না কেউ। 

সুতপা উঠে চলে গেল বাবার রুমে। আজ থেকে নতুনভাবে যুদ্ধর পরিকল্পনা করতে হবে ওকে। থামলে চলবে না।

 

পত্রসাহিত্য

অর্ক,

জানোতো, বৃষ্টিটা এবছর যেনো ওভারটাইম করছে! অবশ্য তোমায় আর বৃষ্টির কথা বলে কিই বা লাভ! তোমার আলয় তো মেঘেদের দেশেই! বৃষ্টি যেখানে রোজনামচায় মিশে থাকে। তবে আজ অনেকদিন পরে আকাশ জুড়ে তারা দেখা যাচ্ছে! ওদের দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, তাদের মতো আমরাও কী এমন ঝিকমিকে এমন মুক্ত হতে পেরেছি? হয়তো পারিনি! আজও শিকল আমাদের বেঁধে রেখেছে, শুধু চোখে দেখা যায় না!

আমরা জন্মেছি স্বাধীন দেশের মাটিতে, এ আমাদের পরম সৌভাগ্য। কিন্তু মনটা কেমন যেন প্রশ্নে ভরে ওঠে, 

আমরা কী সত্যিই স্বাধীন? 

মানুষের ভেতর যে ভয়, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, এগুলোই তো আমাদের ডানা ছেঁটে দেয়। সমাজ আজও আমাদের ভালোবাসাকে সহজভাবে নিতে পারেনা। তুমি জানো, তোমার হাতটা যখন ধরি, তখনো মনে ভয় থাকে, কেউ যদি দেখে! অথচ ভালোবাসা তো অন্যায় নয়, এ তো সবচাইতে পবিত্র এক অনুভূতি। তাহলে কিসের এই শৃঙ্খল?

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, স্বাধীনতা মানে কি শুধু একটি ছুটির দিন, নাকি একে-অপরকে সম্মান দিয়ে ভালোবাসতে পারার শক্তি অর্জনের দিন? তখন নিজের অবচেতনেই উত্তর নেমে আসে, ...সত্যিকার মুক্তি সেদিনই আসবে, যেদিন আমি সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে তোমাকে ‘আমার’ বলে গভীর শ্বাস নিতে পারব।

তবে এ কথা ঠিক যে, তুমি পাশে আছ বলেই আমি অনেকটা মুক্তির বোধ অনুভব করি। তোমার চোখে যখন নির্ভরতার আলো দেখি, মনে হয়, আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আমি ইতিমধ্যেই খুঁজে পেয়েছি তোমার অন্তরমহলে। জানি দেশ আজও অগণিত বাঁধনে আবদ্ধ, সেই লড়াই চলছিল, সে লড়াই চলবে! কিন্তু আমাদের ভালোবাসা যদি বেঁচে থাকে, তবে সেই লড়াইও একদিন ঠিক জিতে নেবো।

চলো, দুজনে ভেতরের বাঁধনগুলো আলগা করি। হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করি, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সত্যের পথে হাঁটবো। তবেই হয়তো একদিন আমরা সত্যিই বলতে পারবো, হ্যাঁ, আমরা স্বাধীন।

তুমি-ই আমার অনন্ত মুক্তির সোপান,

আজ আসি...


---অদিতি সেনগুপ্ত

মুক্তগদ্য

 

দ্রোহ-বিদ্রোহ, শতবর্ষে খুঁজি নিজেরই বিগ্রহ-
মানিক পন্ডিত

       সুকান্ত তাঁর কবিতায় লিখলেন- “এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ/ দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ”..”- কিশোর বয়স,তাঁর বিখ্যাত বিদ্রোহ  কবিতার ছত্র এ। সে সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহ। বঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্জয় আর দুর্ভিক্ষের ১৯৪৩। গ্রাম-শহরে রাস্তায় রাস্তায় আকালের পদধ্বনি। ”একটু ফ্যান দাও মা”- কাতর আর্জিতে কলকাতায়-

” বাতাস হয়েছে ভারী
এই পোড়া দেশে
লাশ সারি সারি 
বইছে নিশ্বাস কেবলই আফশোষে (লেখক) 
এই সঙ্গে হিন্দু মুসলমানের ভিতর The Great Calcutta Killing ১৯৪৬, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

          আসলে সময় আর পরিস্থিতির অভিঘাতে দ্রোহকাল বয়ে বয়ে যায় নদীর মতোই। তার পলিতে হয়তোবা ফসলের হাতছানি,নতুবা প্লাবনের অনিবার্যতা-যেন যুদ্ধ আর শান্তি হাঁটছে পাশাপাশি। বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে মশাল নিয়ে হাতে- “যুদ্ধ নয় শান্তি চাই”,ওদিকে আবার “শন্তির জন্য যুদ্ধ চাই” কিন্তু সেই বিদ্রোহই আবার দ্রোহের পথে পথে যায়- “There is no way to peace, peace is the way”. স্লোগান তুলতে তুলতে।

        আমাদের দ্রোহ বা বিদ্রোহের সময়কাল বিচার কেবল ফেলে আসা একশ’ বছরে সীমাবদ্ধ হয়ে নেই কেননা রামমোহন ১৭৭২ এ জন্মে সামাজিক কুসংস্কার অচলায়তন ভাঙছেন,সমাজ সংস্কার করছেন।” পাবলো পিকাসো শিখিয়ে যান- “The act of creation is an act of destruction first”- আমাদের সমাজের ইতিহাসের হিসেবে এই সময়টা মধ্যযুগের অন্ধকারের শাপদ। এইসব কালখন্ড হিসেব করে অগ্রসর হতে চাইলে ১৮২০ বা ৩০ থেকে ধরে ১৯৪৭ অব্দি একশ’ পঁচিশ বা তিরিশ বছর সময়কালটা ধরে নিয়ে একে চিহ্নিত করতে পারি “ আমাদের বিদ্রোহের কাল”। এই কালে আমাদের গান লিখে দেন রবীন্দ্রনাথ,আমরা গাই- 

“বাঁধ ভেঙে দাও
 বাঁধ ভেঙে দাও”...
“বন্দে মাতরম  বন্দে মাতরম
একই সূত্রে বাঁধিয়িছি সহস্রটি মন”- কিংবা 

নজরুল লেখেন-

 “কারার ওই লৌহ কপাট,
ভেঙে ফেল কর রে লোপাট 
রক্তজমাট শিকল পুজোর পাষাণবেদী”- অথবা 

সুকান্তের কলম থেকে বের হয়- 

 “ওই শৃঙ্খল ভাঙা সুর বাজে পায়ে 
ঝন ঝনাঝন ঝন
সর্বহারার বন্দী শিবিরে 
ধ্বংসেরই গর্জন, ওঠে ধ্বংসেরই গর্জন ”।

      রক্ত ঝরাই আমরা, ফাঁসিতে ঝুলে যাই,শোকে-দুখ্খে বিলাপ করি-”একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি…”।  আবার বিদ্রোহের ডাকে দুঃসাহসে ভর করে অন্তর্ধ্যান হয়ে যান আমাদের নায়ক দেশ-দেশান্তরের পথে,শূন্য পড়ে থেকে যায় এলগিন রোড। আফশোস করে বলে উঠি - “সুভাষ ঘরে ফেরে নাই-”। 

       আসলে অবাধ্যতার ঢেউয়ে আর কিছু না হোক নতুন দ্রোহকাল আর বিদ্রোহের উপাত্ত তৈরি হতে থাকে। অন্যদকে “হিস্ট্রি রিপিটস্ ইটসেল্ফ” এর দ্রোহ আসে যখন সময়ের হাহাকরে যন্ত্রণদগ্ধ হয়ে মুক্তির পথ খোঁজে । এই দ্রোহ আছে তাই বিদ্রোহ ঘনায়। ওদিকে “আছে ওয়ালা” আর “নেই ওয়ালার” দ্বন্দ্বে লুকানো আছে বিদ্রোহ,রয়েছে মহাবিদ্রোহের বীজ। ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে  বিশ্বের প্রথম শ্রমিক শাসিত রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত। রাষ্ট্র নিজে সময়ের তাড়নায়,নিজের তৈরি নিয়ম ভেঙে তৈরি করে দিয়ে যায় বিদ্রোহের আগুন-যেন সুকান্তের সেই কবিতা “দেশলাই কাঠি”। শাসক নিজেরাই এই অগ্নুৎপাতের নাম দিয়েছে “অবাধ্যতার ঢেউ”,এ ঢেউ তৃতীয় বিশ্বের মানুষ শুনতে পাই সেইগান-

“Through the winters cold and famine
From the fields and from the town
 At the call of Comrade Lenin
There arose the Partisans.” 

        শ্রমিক -কৃষক জেগে ওঠে, ঘটে যায় রুশ বিপ্লব-১৯১৭,পৃথিবী শুনতে পায় নতুন যুগের পদধ্বনি-সে ঢেউ আছড়ে পড়ে আমার ভারতে বাংলার শহর গ্রাম গঞ্জে। আসন্ন বিদ্রোহের আহ্বান- স্বাধীনতা স্বাধীনতা, ব্রিটিশ তুমি ভারত ছাড়ো। ছাড়ে কিন্তু রেখে যায় ভ্রাতৃত্বের ভিতর বিভাজনের বিষ, বাংলা দ্বিখন্ডিত- 

         প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনাও চলমান,মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তাও তুঙ্গে এ বাংলায়। মুসলিম লীগের ধারাবাহিক বিস্তার হতে থাকা, এদিকে আবার ১৯৪৬ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে তাদের বিপুল আসন পেয়ে যাওয়া, রয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যাওয়া উপাদান। যেন মুসলিম সমাজের জন্য পাকিস্তান গঠনের দাবিকে স্পষ্ট করে তুলছে। এও এক বিদ্রোহ,দ্বিজাতি তত্ত্বে ধর্মের নামে দুই ভাইয়ের বিবাদ আর ভারত ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আত্মঘাতী বিদ্রোহ।

          কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য,রাজনৈতিক অস্থিরতার চূড়ান্ত একটা বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে বাংলা,তবু….। এ বাংলায় সামন্ততন্ত্রের বা জমিদারীর অবক্ষয়ের যুগ এবং সেই জমিতে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে ধনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার যুগ হয়ে উঠেছে। দ্বি-জাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তানের দাবি,ধর্মের ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজন,হিন্দু- মুসলিম সম্পর্কের ক্রম অবনতি এবং শেষমেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে যাওয়া, ভয়াবহ সন্ত্রাসের কবলে বাঙালি সমাজ দিন গুনছে অজানা বিপদের। সব মিলিয়ে জটিলতম এই কালখন্ড কোনমতে পার করছে বাংলা,কিন্তু-সুকান্তের কাব্যভাষার শব্দ ব্যঞ্জনাটি ধ্বনিত হয় বাতাসে -

“বিদ্রোহ চারিদকে বিদ্রোহ আজ,
আমি যাই তার দিনপঞ্জিকা লিখে”... 

        নতুন কথা নয় যে বিদ্রোহ অসন্তোষ বা সংগ্রাম হঠাৎ নেমে এলো আকাশ থেকে। দীর্ঘতর ধারাবাহিক ইতিহাস শ’ শ’ বছর জুড়ে অব্যাহত থেকেছে দেশে দেশে। দ্রোহের ইতিহাসে স্বাধীনতা, ন্যায়,অধিকার ইত্যাদির প্রশ্নে কিশোর বিপ্লবীদের ভূমিকাও তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ভাষ্যে আফ্রিকান- আমেরিকান কিশোরী ফিলিস হুইটলি  ১৭৭৩ এ লিখছেন বিদ্রোহের কবিতায় স্বাধীনতার বার্তা-

         ১৭৭৫- ১৭৮৩’র মার্কিন স্বাধীনতা যুদ্ধ, এদিকে ১৭৮৯ ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিশোর-তরুণদের গণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ,“ছাত্র সমিতি” নামে নিজস্ব সংগঠন গড়ে তোলা,ইউরোপ ফ্রান্স ইতালি জার্মান জুড়ে ১৮৪৮ সালের বিপ্লব এবং ছাত্র-তরুণরাই রাস্তায় নেমে এসেছেন, এদিকে ১৮৬৮তে ইউরোপীয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন…। ওইসব ইতিহাস ছুঁয়ে ভারতে এবং বাংলার দিকে স্বাধীনতার জন্যে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম, সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য লড়াইয়ের ছবিই ভাসছে চোখে।          

         ১৮২৫-৩০ থেকে ১৯৪৭ জুড়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরণের বিদ্রোহগুলির সংহত রূপ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর প্রতিবাদের বহিপ্রকাশই আমাদের বিদ্রোহী সত্ত্বার মূর্ততা । ১৮৫৭ সিপাহী বিদ্রোহ,১৮৫৯-৬০ এর নীল বিদ্রোহ,১৮৫৫ সাঁওতাল বিদ্রোহ-এর পাশে কোল, চূয়াড়,পাইক,পারলাকিমেড়ি,ওয়াহাবি,মোপালা রামোসি,খিলাফৎ হোমরুল আন্দোলন,ভারত ছাড়ো আন্দোলন- এইসবই শাসকের বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ আর সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। অগ্নিগর্ভ ভারতবর্ষে  ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ,সারা ভারত ডাক-তার ধর্মঘটে সামিল হয়ে গেয়েছি সলিলকে- ‘ঢেউ উঠছে/ কারা টুটছে/ আলো ফুটছে….

        দোহকাল বললে সামরিক সামাজিক রাজনৈতিক বিদ্রোহ ছাড়াও কৃষক শ্রমিক আদিবাসী ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন সংগ্রাম ও বিপ্লবের ধারা জড়িয়ে আছে,হতে পারে তা ১৯৪৭ এর আগে এমনকি পরেও। এইসব আন্দোলনের আর বিদ্রোহের মিলিত আত্মত্যাগ শেষে ভারতের স্বাধীনতা। কিন্তু এর পরেও শ্রেণি-বৈষম্য,জমির অধিকার,সাংবিধানিক ন্যায়-অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ চলতেই থাকে, চলবেও। এইসব দ্রোহের প্রভাব পড়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনে,সমাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষে-

          ভারতের প্রধান দ্রোহ ইতিহাসে স্বাধীনতা আন্দোলন- প্রশাসনিক সংস্কার,সামাজিক চেতনা সাধারণ মানুষের জাগরণ এবং রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন চেয়ে। বিদ্রোহ  এবং আন্দোলনগুলি বিশেষত জাতিবর্ণ ব্যবস্থার সনাতন রীতিতে দিয়েছে ধাক্কা। বিভিন্ন বিদ্রোহগুলির পথ ধরে নারী ও অনগ্রসর শ্রেণিগুলির সামাজিক অবস্থান,জাতীয়তাবাদ ও সংহতির জন্ম দিয়েছে। গেয়েছি নতুন নতুন সংগীত-  

“হারাবার কিছু ভয় নেই শুধু শৃঙ্খল হবে হারা
জন কল্লোলে উত্তাল নদী মোহানায় দিশাহারা…..”

      স্বাধীনতা, শাসনের হাতবদল,কিন্তু রাষ্ট্র আর শাসকের চেহারায় ফুটে উঠছে সেই পুরাতন চেহারা- কখনও সে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী,কখনও সে পূঁজির দোসর কখনও সে গণতন্ত্র খেকো রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বগ্রাসী চালক … । পদে আসীন কুর্সিতে নেই নারী বা পুরুষের পৃথক রূপ। অসত্যের ঘনকালো মোড়কে সারাক্ষণ ঢেকে যাচ্ছে ন্যায় বিচার,আবার অন্ধকার নামছে বাংলায়। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি তাই বিদ্রোহের সারে- আমাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে- 
        “ … দিগন্তে কারা আমাদের সাড়া পেয়ে
             সাত রঙের ঘোড়ায় চাপায় জিন
             তুমি আলো
             আমি আঁধারের পথ বেয়ে
             আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন”…

           আমাদের দ্রোহের শতবর্ষ জুড়ে সাংস্কৃতিক সামাজিক রাজনৈতিক মানবিক মু্ক্তির দাবীতে গড়ে উঠুক দুর্দম প্রতিরোধ ও বিপ্লবী চেতনার জাগরণ। এই পথে রবীন্দ্র- নজরুল- সুকান্ত– বুদ্ধদেব- সুভাষ- দীনেশ-বিষ্ণুরা কবিতায় মুক্তিকামী চেতনার মশাল জ্বেলে চলার মহাকাব্যিক অধ্যায় রচনা করে দিয়ে গেছেন।

… অন্ধকার রাতের পর,
প্রভাতের সেরা রঙ-ও লাল,
আবার ডুবন্ত সূর্যটা জমা করে যায়
 নতুন দিনের সূর্যের কাছে- 
এমন করেই প্রায় দিন 
আরো লাল হয়ে ওঠে। 
বিদ্রোহের এই একটাই রঙ…. ।।                                                                                                     (১১১১)




রন্ধ্রে রন্ধ্রে দ্রোহ —ছোঁয়াচে অসুখ (নিরাময়হীন)
নীলম সামন্ত

যুগ যুগ ধরে দ্রোহ আমাদের রন্ধ্রে। যখনই রাষ্ট্র খড় চাপা খড়ের মতো পচতে থাকে, দুর্গা ছাতু মাথা তোলে৷ দোঁয়াশ মাটি হিউমাস চেনে। পচা গলা মৃতদেহের ওপর ভূ-কীটের অবাধ বিচরণ, খেয়ে ফেলার স্বভাব জমিকে উর্বর করে কিন্তু জীবন হোঁচট খায় ইঁদুর খাওয়া পতাকায়। আমরা প্রত্যেকেই এখন রাষ্ট্র-সংগ্রাম অথচ ব্যালটে বন্দি হয় কাটা জিভ। রাত ঘনালে গা ঘেঁষাঘেঁষি বোদ্ধার উপঢৌকনে উপচে ওঠে মশালের আগুন। 

ব্যালকনির রেলিং-এ হাত ঠেকিয়ে চা খাই। নিচের রাস্তায় যায় মিছিল। স্বাধীনতার মিছিল। প্রতিবাদের মিছিল। শোকের মিছিল৷ যেন মিছিলই আমাদের পথ। মিছিলই আমাদের পরিণতি৷ যেন লাল পিঁপড়ের জীবনসুখ। পেছন ঘুরে তাকাই না। আমরাও কি ফেরোমন নিষ্ক্রমণ করি? কাকে জিজ্ঞেস করব এ কথা? জাতি ঘুমিয়ে আছে সুখের পালঙ্কে। 

সুখের স্বপ্নে মাঠের পর মাঠ আফিম চাষ। ব্রিটিশের গটমট জুতো৷ পোস্তবাটা ভাতের সুখে দুপুর ফুরোয়। অথচ সোনারও বিকল্প হয়, জাতি জানে, জাতি নিরুপায়, জাতি ক্ষণিকের জিভে তা দিতে চায়৷ তারা জানে বেল পাকলে কাকের কি! রাজা আছে, রাজা বদলাবে, নতুন রাজা আসবে। একদিন মস্ত রাজাও ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে৷ সারা মাটিময় রেখে গেছিল পায়ের ছাপ৷ বৃদ্ধ চোখ, সফেন চুল—দূর থেকে সে আজও দেখে,  যে পথে একদিন সাপ ঢুকত, মুখ ভর্তি ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ নিয়ে সেই পথে জাহাজ ঢোকে, কন্টেইনার ভর্তি রঙিন কাগজ।  

জাতি জানে, দেওয়ালের ছায়া দৌড়োয় দেওয়াল জুড়ে ৷ কিন্তু খিদে পেলে সংবিধান তাকিয়ে থাকে— নির্বাক রক্তপাত। যে কটা দ্রোহ বর্ষপূর্তির মুখ দেখে, পোয়াতি হয়, তাদের স্তন দুধের ভার চেনে—জানে ক্রমশ বংশবিস্তার হল এক প্রকার নিরাময়হীন চর্মরোগ, যা আপোষ চেনে না অথচ অক্লান্ত প্রসবশ্রমে নিভে আসে নক্ষত্রযোনী। 

আমরা ব্যালকনিতে না হোক বসার ঘরে কিংবা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, বসে, দিনে আটবার চা খাই। কারণ দু'শ বছরের পরাধীনতার বীজ আমাদের বিকেলবেলায় এক কাপ চা খেতে শিখিয়েছিল। শিখিয়েছিল অল্প অল্প করে রোদ ওটা আকাশের গলা আলতো হাতে কেটে ফেলতে। আমাদের সময় নেই। কাল ছুটছে মহাবিশ্বের গতিতে। তাই যোনী ছিঁড়ে যজ্ঞ করি। শিশুর মুখে তুলে দিই তারই মায়ের কাটা স্তন — 

জাতি জানে দ্রোহের অক্ষর। জাতি দেখে মিছিলে হেঁটে যাচ্ছে পঙ্গু রাষ্ট্র আর বিকলাঙ্গ সংবিধান।



স্মৃতির দুয়ারে


‘স্বাধীনতা একটি বোধের নাম’
মেঘশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়


আমার কাছে স্বাধীনতা কোনও বিশেষ দিন বা ক্ষণ নয়, স্বাধীনতা একটি বোধ। এই বোধ আমাকে ডুবতে বাধ্য করে সেই রক্ত নদীর মাঝে যেখানে হাজার হাজার তরুণ অমানবিক বেদনা সয়ে, মাথা উঁচু করে, হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নে দেখে, এটা জেনেও যে সেই স্বাধীনতার স্বাদ তাঁরা কোনদিন পাবেন না। ঊন-আশি বছর পরেও ‘আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?’ এই ধরণের বিতর্কে আজ যাব না। বরং রক্ত নদী সাঁতরে পৌঁছে যাই সেই ছোটবেলার দিনগুলিতে যেখানে ‘স্বাধীনতা দিবস’ মানে ছিল দেশাত্মবোধক গান সহযোগে স্কুলের মাঠে পতাকা উত্তোলন আর বাবা-মায়ের অফিস ছুটির দিনে বাড়িতে কিছু ভালোমন্দ খাওয়া,  টিভিতে সারা বছর না চলা কিছু বিশেষ দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র দেখা! 

না শুধু এইটুকুই না। আগেই বললাম, স্বাধীনতা দিবস আমার কাছে অগাস্টের একটি দিনমাত্র নয়। আর সেই বোধের জন্ম একদিনে বুকে গেঁথে যায়নি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের আলমারি ভর্তি বই। তার মধ্যে বেশ কিছু বইয়ে লেখা আছে  বিপ্লবীদের সংগ্রামের কথা। বাবা,মা, ঠাকুমা, দাদু মুখে মুখেও বলেন সেইসব গল্প। ‘বুড়ি বালামের তীরে’ বাঘা যতীনের পরিণতি, মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্ব, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কর্মজীবন, মাতঙ্গিনী হাজরার সাহসে ভরা বলিদানের অক্ষরগুলো কখন যেন মূর্ত হয়ে উঠত মনের মাঝে। বারেবারে মনে হতো ওই জায়গায় ওই সময় আমিও ছিলাম। ওই লড়াই আমিও করেছি ওঁদের সঙ্গে। 

আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল খুবই মনোরম, জাঁকজমকহীন। মাথার উপর টালির ছাদ, ইঁটের দেওয়ালের ভিতর কেন জানি না এক স্তর করে কঞ্চির দেওয়াল। আম গাছকে মধ্যমণি করে এক বিরাট মাঠে রোজ গাওয়া হতো প্রার্থনা সঙ্গীত। ‘বল বল বল সবে’, ‘উঠে গো ভারতলক্ষী’, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর, হও উন্নত শির, নাহি ভয়’ গানগুলির অর্থ তেমনভাবে না বুঝলেও মনে এক অপরূপ গর্বে মনটা ভরে উঠত। আমি সমেত আমাদের ক্লাসের পাঁচটি মেয়ে তৈরি করলাম এক গুপ্ত সমিতি। নাম দীবাপ্রবিক্ষু। আমরা একেকজন একেকটি সংগ্রামী চরিত্র দীনেশ, বাদল, প্রফুল্ল চাকী, বিনয় আর ক্ষুদিরাম। রাইটার্স বিল্ডিঙের অলিন্দে নির্ভয় তিন বাঙালীর দাপিয়ে বেড়ানো যেমন আমাদের নাড়া দিয়েছিল, তেমনই কষ্ট দিয়েছিল ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর অতটুকু বয়সে মৃত্যুবরণ করার গল্প। সেই বয়সে আমাদের কোনও শত্রু ছিল না। তবু ওই দেওয়ালের কঞ্চি ভেঙে ভেঙে সর্বদা ‘অনুশীলনে’ ব্যস্ত থাকতাম ঠিক আমাদের পূর্বজদের মতো। এতে ফল ভালো হলো না। দিদিমণি দেখে ফেললেন আমাদের দুটো বেন্চের পাশের দেওয়ালটা কেমন গর্ত মতো হয়ে আছে। আমাদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্রশস্ত্র সব ধরা পড়ল। হেড মাস্টারমশাইয়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা তখন বুঝে ফেলেছি কিছু একটা মারাত্মক ভুল করেছি। কিন্তু সত্যি কথা বলার সাহস সকলের বুকে ছিল। মনে আছে, সমস্তটা শোনার পর হেড মাস্টারমশাই আমাদের মাথায় হাত রেখে কী যেন বিড়বিড় করেছিলেন। তারপর চোখ মুছে বলেছিলেন, আর কঞ্চি ভাঙিস না।

স্বাধীনতার মুহূর্তটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার ঠাকুমার মুখে সেই গল্প শুনে শুনে আশ মিটত না। ঠাকুমা বলতেন, “একদিন শুনলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু তাতে যে আসলে কী হয়েছে তা বুঝে ওঠার আগেই দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল! চেনাজানা কত লোক হঠাৎ অচেনা হয়ে উঠল!” তারপর প্রাণ হরণের অজস্র দুর্ভাগ্যজনক গল্পের মধ্যে হিন্দুর বাড়িতে মুসলমানকে আশ্রয় দেওয়ার মতো সৌহার্দ্যের কাহিনীও কম শুনিনি। 

দেশকে স্বাধীন করার জন্য ভারতবাসীকে অজস্র অমূল্য প্রাণ বলি দিতে হয়েছে, এই সত্যিটা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। ব্যক্তিগত স্বার্থে আকণ্ঠ ডুবে থাকার দলে কোথাও হয়তো সেই ‘দীবাপ্রবিক্ষু’র আমিও সামিল হয়ে গেছি। সত্যিই তো দেশের জন্য কীই বা করতে পেরেছি আজ অবধি! এই ভাবনা মাথায় এলেই ছেলের দিকে তাকাই। এগারো মাস বয়স থেকে ছেলে বিদেশে বড় হচ্ছে। ছোটবেলায় কথা বলার সমস্যা আর ‘ডেভলপমেন্ট ডিলে'র জন্য ডাক্তারের পরামর্শে শুধু ইংরাজি ভাষায় কথোপকথনে অভ্যস্ত হতে ওকে আমরাই বাধ্য করেছি। ও ভারতীয় পতাকার রঙের মর্ম জানে। কিন্তু ক্ষুদিরামের কথা এখনও জানে না। এখন ওকে  বাংলা শেখাই। ছোট ছোট বাক্য বলে। কিন্তু আমার পড়া সমস্ত বই, যা ওর মনেও দেশাত্মবোধ গড়ে তুলবে, সে সব ওর হাতে তুলে দোয়ার যে স্বপ্ন আমি দেখি তা আজও অধরা। হয়তো পরের প্রজন্মের হৃদয়ে  সংগ্রামের ইতিহাসটুকুর দ্বীপ প্রজ্জ্বলিত করতে পারলে আমার হৃদয়ের ভার কিছুটা কমবে। 

স্বাধীন ভারতে সবাই শান্তিতে থাকুক আর চিন্তা আর বাকশক্তির ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে বাঁচুক, এইটুকুই প্রার্থনা।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  প্রচ্ছদ ঋণঃ-  অদিতি সেনগুপ্ত