সূচীপত্র
রূপায়ণ হালদার
কেয়া নন্দী
রহিত ঘোষাল
মেনকা সামন্ত
কিংশুক চক্রবর্তী
দেসা মিশ্র
সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)
পৃথা চট্টোপাধ্যায়
কবিতা সামন্ত
কাকলি দাশব্যানার্জী
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
প্রদীপ চক্রবর্তী
শ্রীমন্ত সেন
সুজাতা দে
তপনজ্যোতি মিত্র
সম্মিলন
বন্যা ব্যানার্জী
চিরঞ্জীব হালদার
আনুপূর্বিক
অয়ন দাস
কৌশিক চক্রবর্ত্তী
রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোট গল্প
পারমিতা মন্ডল
দীপ্র দাসচৌধুরী
পত্রসাহিত্য
অদিতি সেনগুপ্ত
মুক্তগদ্য
মানিক পন্ডিত
নীলম সামন্ত
স্মৃতির দুয়ারে
মেঘশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাভিত্তিক
রূপায়ণ হালদার
অনেক ভাবনা, অনেক শব্দ
অনেক কথা, অনেক জেদ
অনেক প্রতিবাদ, অনেক অভিমান
শুধু কথা বলে বিশ্ব বাংলা গেট থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত কিংবা বেহালা থেকে যাদবপুর পর্যন্ত।
বয়ে চলে ছোটো নদী;
অবঘর্ষ পক্রিয়ায় ছোটো ছোটো চিহ্ন তৈরি করে নদী বক্ষে।
অস্থির সময় বয়ে যায়
কয়েকটা নদীর পরিমিত উচ্ছাসে;
দোষীরা পর্দার আড়ালে অট্টহাসে।
সবার বুকে জ্বলজ্বল করছে তিলোত্তমার চিতা
অজান্তে জল পড়বে তাতে,
নিভে যাবে আগুন,
মজে যাবে ছোটো নদীগুলো,
বন্ধ হবে ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চলা পরিকল্পনা।
তবুও মনে থাকবে সবই।
কিন্তু যা করার কথা ছিল:
একত্রিত হয়ে জোয়ার আনার স্বপ্ন
তা পড়ে আছে কারোর হৃদয়ে আর
কারোর কবিতার খাতায়।
কবি ভাবে সামান্য ধুলো ঝড় আমার কবিতার খাতায় কী করে কল্লোল তুলবে?
সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিশ কিলোমিটার বেগের বিচ্ছুরণ খাতায় তুলতে হবে!
জোয়ার চায় আমার। জোয়ার।
কিন্তু কিছুই হবে না।
আবার বাঙালি মন জমবে আড্ডায়,
কলেজ পড়ুয়ারা ভীড় করবে ক্যান্টিনে,
নদী বক্ষে নিত্য হাঁটবে মানুষ,
সিগারেটের মতো শেষ হবে সময়
ফিকে হবে সবই।
পড়ে থাকবে তোমার আমার ফোনে
মৃদু আন্দোলনের ছবি।
তবুও ক্ষয়িত সময়ের মাঝে
হাঁটা পথে পিছন থেকে টেনে ধরবে তিলোত্তমা।
মনে পড়বে একটা প্রতিবাদী কবিতা লিখেছিলাম,
বন্ধুটা ছাপিয়ে ছিল লিফলেট, কতজনের মনে পড়বে
পতাকা উড়িয়ে গলা ফাটিয়ে নির্ধারিত কয়েক ঘন্টার হাঁটাপথ অতিক্রম করার কথা।
শুধু মনেই পড়বে।
মনে পড়তে পড়তে একদিন হয়তো কালো মেঘ আবার ঘর বাঁধবে কোনও কিশোরী কিংবা যুবতী মেয়ের শরীরে।
আবার কবিতা লেখা হবে,
আবার ছোটো নদী বয়ে চলবে,
আবার ভাঁটা পড়বে।
মেয়েটা
কেয়া নন্দী
একবছর ধরে ' মেয়েটা ' একা ঘুরছে
রাজনীতির মিছিলে, বলিষ্ঠ ভাষণে,
ছোট - বড় নানা আন্দোলনে।
' মেয়েটা ' ঘুরছে মাসের পর মাস আদালতের বিভিন্ন
দিনে।
' মেয়েটা ' ঘুরছে কখনো দিনে, কখনও বা মোমবাতির আলোয়।
যে কোনো আন্দোলনের উপসংহারে ও
ঐ ' মেয়েটা ' - ই ঘুরছে।
কোনো নিরুদ্দেশ সমাচার নয়
তবুও
পথে - ঘাটে , হাসপাতালের সব দেয়ালজুড়ে
ঐ ' মেয়েটা ' - ই ......
' মেয়েটা ' চিৎকার করছে কবে, আর কবে ?
নরখাদকদের বিচার হবে ?
' মেয়েটা ' হাহাকার করছে গোটা দেশ জুড়ে
কেউ শুনতে পাচ্ছে না, দেখতে পাচ্ছে না মেয়েটাকে।
বিদ্বদজনেরা জানে, ' মেয়েটা ' লাশ হয়ে গেছে।
কিন্তু আজও ওর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত__
কাঠগড়ায় অপেক্ষা করছে ওর কান জোড়া
' শেষ রায় ' শোনার।
একটা বছরের নাম অন্ধকার
রহিত ঘোষাল
চিনতে পেরেছ ওদের?
নাকি এখনো আড়াল করছে কেউ
ভয়ের সুড়ঙ্গে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি
সাড়া পাচ্ছি না বজ্র আগুন
সাড়া পাচ্ছি না ক্লোরোফর্ম খাদ
প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙেনি এখনও
তাঁবুতে চীৎকার-চাকরি-কান্না
শেকড় নাড়িভুঁড়ি রেললাইন ঘূর্ণিঝড়
কাঁচা শিরদাঁড়া মাছের তেলে ভাজা
সেতুটির নাম দ্রোহ
বছরের নাম অন্ধকার
ক্ষুধা ও উল্কা গোপন রাখি না আজ
অবলীলায় শহরের জ্বর দেখি
সাঁজোয়া দেখি উদ্বাস্তুদের সরাইখানা থেকে
দাঁতনখের পাশে পাপী
পাপের পাশে দেবীমূর্তি
সেতুটির নাম দ্রোহ
বছরের নাম অন্ধকার
চির অস্তাচলে
মেনকা সামন্ত
ভারত মুনি
কিংশুক চক্রবর্তী
দৌড়চ্ছে উর্ধ্বশ্বাসে
বুকের কাছে জাপ্টানো ব্যালট বক্স
যেন যক্ষের ধন
হতে পারে কারো কাছে অবিকল কফিনের মতো
মেঠো পথ - পাকা রাস্তা
ডিঙিয়ে যাচ্ছে বাঁকা রোদ
ভিজে ছায়ার
তাল তমাল – ভাঙা আলোর ল্যাম্পপোস্ট
খিদে –
দাউ দাউ জ্বলছে
দৌড়চ্ছে সে
অবতল পেটের কাছে জমা পড়েছে কালো হাত
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যালট
হাইজ্যাক ইচ্ছের ওপর
ছাপ্পা পড়ছে ইচ্ছে
অস্থির মধ্যবিত্ত দেখছে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন
বারুদ কিছু কম ছিল না এদেশে
বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি
চেতনার বাইরে
শীর্ণ অবশেষের অসংযত খিদে
শক হুন দল পাঠান মোগলের মতোই হবে লীন
সংহত আত্মার যৌথ উন্মেষে
এক মগ্ন ঋষি বসে আছেন এখানে
ভূখণ্ড জুড়ে
আমরা স্বাধীন?
দেসা মিশ্র
উৎসব ধুঁকছে ,
স্বাধীনতা কোথায়?
কলম
কন্ঠ
তুলি
থেকে ঝড়ে পড়ছে
থোকা থোকা মৃত্যু ,
বিবেকের দালানে সবল উইপোকার নৃত্য।
ভাতের হাঁড়ির ক্ষুধার্ত পেট
আর
নরপশুদের ক্ষুধার্ত মন
ঢেকে রাখি-
উজ্জ্বল পতাকা দিয়ে।
আমাদের-
শৈশব
যৌবন
জীবন
ডুবে আছে অথৈ অন্ধকারে ।
আর কত রক্ত
কত মৃত্যু আড়াল করে
স্বাধীনতা লিখব
হে রাষ্ট্র?
দূরে থাকা ভালো
সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)
মিথ্যে এবং মিথ্যেচারীর থেকে দূরে থাকা ভালো;
দূরে থাকা ভালো পাপ, পাপীদের
সম্পর্ক এবং সংস্পর্শ থেকে।
অন্যায়, অবিচার থেকে দূরে থাকা ভালো।
শান্তিতে থাকতে হলে চুপ থাকা ভালো,
চোখ বেঁধে রাখা ভালো।
তবু এই দূরে থাকা ভালো-র ব্যথা যদি নিজেকে
আঘাত করে মারে রোজ
তবে আওয়াজ তোলা ভালো, প্রতিবাদ করা ভালো।
রাস্তায় নামা ভালো, ধ্বংস করা ভালো।
দূরে থাকা ভালো -
এই অসুস্থ মানসিকতার মানুষজন থেকে।
আগুন সময়
পৃথা চট্টোপাধ্যায়
দুঃশাসন রক্তচোখা সময়ের ঘোর,
নিহিত বিশ্বাস ছেঁড়া
কপট আশ্বাস,
ছেঁড়াযোনি, শিশুশব, রক্তদলা
গলা ঠেলে ওঠে
দু'চারটে জোনাকিরা অন্ধকার কোণে,
চিক চিক করে।
ওই মেয়ে জেগে থাক,সাবধানে থাক
ভিতর-আগুনে সেঁকে গোপন কুঠারে,
কোষে-কোষে প্রতিবাদ আঁক।
চুপ করে আছি মানে ভুলে গেছি নয়,
শাদা এ্যপ্রন ভাসে এখানে হাওয়ায়-
মুষ্টিবদ্ধ হাত আমরাও তুলে আছি
স্বাধীনতা মানচিত্র নারীর জঠরে।
স্বাধীনতা রক্ত স্নান
কবিতা সামন্ত
স্বাধীনতা শব্দে রক্ত স্নানে ধৌত
ভারত মায়ের আঁচল।
এ ভারতের মাটিতে শিশিরভেজা ঘাসে কত রক্তের দাগ।
বেদিতে সাজানো ফুলেরা সাক্ষী।
হিমালয়ের শিখরে পতপত করে উড়তে থাকা
পতাকা জানে রত্ন হারিয়ে ফেলার মর্ম।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ
যে মাটিতে কান পাতলে আজও শোনা যায়
মা বোনেদের চিৎকার।
পূব আকাশের রক্তিম সূর্য আজও রক্ত স্নানে
উঠে আসে একটা স্বাধীনতা নামে।
স্বাধীনতা নাম গর্বের,স্বাধীন শব্দ কান্নার,
স্বাধীনতা মায়ের ত্যাগ,
স্বাধীনতার গান স্ত্রীর মুছে যাওয়া সিঁন্দুর হাতের চুড়ি,
স্বাধীনতার অর্থ আত্মবলীদান।
বিভঙ্গ
কাকলি দাশব্যানার্জী
স্বাধীনতা চরমভাবাপন্ন সেই উদগ্র বিশ্বাস
যা ধারণ করে অক্ষ বীজ;
কিন্তু সে স্বাধীনতা ভারতে আসে নি
যে তথাকথিত আলোর আদল পেয়েছিল সেদিন
এ দেশ, - তাতে ছিল
শুধু দম্ভ আর ক্ষমতার হস্তান্তর
সেই উলঙ্গ সফরনামায়
বিদেশি শব্দের ফন্দি
জট পাকিয়ে দিয়েছে দিশায় ,
দাবানল আজও তাই নেভেনি -
প্রতিটি পনেরোই আগস্টে
আবেগের ভঙ্গিমা নকল করে যায়
কিছু সাপ আর
নেতিয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা মানুষ -
যাদের মেরুদণ্ড খোয়া গ্যাছে।
নিষ্ফলা সময়ের বদ্ধ হাওয়ায় দুর্গন্ধ শ্যাওলাদলের দাপট
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
কান্নারাতের পর একটা আশার সকাল এঁকে বসেছিলুম আর
পাড়ার রাম মাধা কালোদের ডেকে দেখাচ্ছিলুম ঝকঝকে আলো
ওরা কেউ খুশি, কেউ বা বিস্ময়-অবিশ্বাসে চোখের ছুরিতে
প্রশ্ন রেখেছিল, তাই ? তাই নাকি ? তাই কি হয় !
সব প্রশ্ন তুড়িতে উড়িয়ে একটা তৃপ্তির প্রয়াস পাই সেদিন
এবার হবেই, বালকবেলার 'শোধবোধ' শব্দটি উল্লাসে পল্লবিত হয়।
কতগুলো দিন মাস পেরিয়ে বছরের হিসেব বদলে যেতে
খেয়াল হলো, কিছুই হয়নি তো !
প্রত্যয় ভাঙলে যা জন্মায় তাকে বলে সংশয়
প্রবল ঢেউয়েরা অসহায় হয়ে যায় সামান্য শেওলায়, ভাবাই হয়নি।
নৈরাশ্যের নোনা হাওয়ায় শুকনো স্বপ্ন আর মরাপাতার মধ্যে
কোনো বিভেদ পাই না, তবুও তবুও সেই মরাপাতা আর
মরাস্বপ্নগুলো জমিয়ে জমিয়ে দাবানল, হোম বা আহুতির
কৌশল কোন আখড়ায় শেখানো হয় তার ঠিকানা খুঁজে ফিরি
যদি একবার তাকে পাই... তাহলে হয়তো হোমের আগুন
রাক্ষস আগুনে শ্যাওলার বিভূতি তিলক হবে।
স্বাধীনতা তোর।।
প্রদীপ চক্রবর্তী।।
চোখের জল লোনা লোনা দুখসায়রের স্বাদ,
নষ্টজলের স্পষ্টধারায় বাসি রোদনপুরের ঢেউ!
বুক ভাঙছে, সংসার ভাসে, ভাসলো বুঝি দেশ,
কেউ দেয়নি ,কেউ দেবে না_ নাশ রুখতে বাঁধ!
ভালো-মানষের ঝি-পোরা কথা রাখেনি কেউ ।
গেরস্থালি ধ্বস্ত ,ত্রাস হাসছে,নাশ করেছে জান!
বেপথু নিত্য ঝাঁকের কই ঝাঁকেই মিশে যায়,
চেনা আলো বিমুখ_ চেনা গলিও শ্মশান-গোরস্থান!
মাংসলোলুপ ভোগীর পিছে পিছে ধায় ফেউ,
ভয়ে ভয়ে কাঁপছে মোমেরা চির- অমাবস্যায়,
রাতগভীরে বাঁচন মরণ লেপ্টে কোলাকুলি!
রতন খুঁজি ছাই জ্বলা দেশ মানচিত্র খুলি!
‘স্বাধীনতা’
শ্রীমন্ত সেন
স্বাধীনতা কাঁপে বিড় বিড় করা ক্ষুধাক্ষীণ ঠোঁটে,
স্বাধীনতা গিয়ে সাহসী উঠোনে চুপি চুপি জোটে।
স্বাধীনতা খোঁজে প্রবল আবেগ জীবনের ভাঁজে,
স্বাধীনতা বোজে দুচোখ আরামে জটলার মাঝে।
স্বাধীনতা জানে হাতে-হাত-ধরা মিছিলের মানে,
স্বাধীনতা টানে ভীরু প্রাণগুলি যে আছে যেখানে।
স্বাধীনতা মাপে জীবনের তাপ সবহারা-বুকে,
স্বাধীনতা জ্বলে নিষ্পেষিতের থমধরা দুখে।
জীবনের স্বাদ পায় স্বাধীনতা সবুজের গানে,
জীবনের গান গায় স্বাধীনতা হতাশের প্রাণে।
চায় স্বাধীনতা রূঢ় সত্যের হতে মুখোমুখি,
স্বাধীনতা সুখী সব দুখী হলে সীমাহীন সুখী।
স্বাধীনতা কাঁদে বীর শহিদের রক্তধারায়,
স্বাধীনতা হাঁটে ভিন্নমতের ব্রাত্যপাড়ায়।
স্বাধীনতা ভাঙে সব জোড়াতালি আপনার জোরে,
দুহাত বাড়িয়ে ডাকে স্বাধীনতা আগামীর ভোরে।
স্বাধীনতার মন্ত্র
সুজাতা দে
একলা চলে আজ দেখি ঘর নেইকো ঘরে..
ছিঁড়ে নিতে স্বাধীনতা পাকায় তালেবরে।
কেড়ে কি আর যায় রোখা স্বাধীনতার স্বাদ?
তিক্ত আঘাতে রিক্ত নয় একজোট হাত।
অনায়াসে যায় পেরোনো তেমন কোনো সাঁকো..
বুকেরব মাঝে রক্তরঙা আগুন পুষে রাখো।
সম্মাননা বাঁচিয়ে রাখি বুকের মাঝে অলি
স্বাধীনতার মন্ত্র জপে সগর্বে চলি।
---অদিতি সেনগুপ্ত
মেঘশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার কাছে স্বাধীনতা কোনও বিশেষ দিন বা ক্ষণ নয়, স্বাধীনতা একটি বোধ। এই বোধ আমাকে ডুবতে বাধ্য করে সেই রক্ত নদীর মাঝে যেখানে হাজার হাজার তরুণ অমানবিক বেদনা সয়ে, মাথা উঁচু করে, হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নে দেখে, এটা জেনেও যে সেই স্বাধীনতার স্বাদ তাঁরা কোনদিন পাবেন না। ঊন-আশি বছর পরেও ‘আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?’ এই ধরণের বিতর্কে আজ যাব না। বরং রক্ত নদী সাঁতরে পৌঁছে যাই সেই ছোটবেলার দিনগুলিতে যেখানে ‘স্বাধীনতা দিবস’ মানে ছিল দেশাত্মবোধক গান সহযোগে স্কুলের মাঠে পতাকা উত্তোলন আর বাবা-মায়ের অফিস ছুটির দিনে বাড়িতে কিছু ভালোমন্দ খাওয়া, টিভিতে সারা বছর না চলা কিছু বিশেষ দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র দেখা!
না শুধু এইটুকুই না। আগেই বললাম, স্বাধীনতা দিবস আমার কাছে অগাস্টের একটি দিনমাত্র নয়। আর সেই বোধের জন্ম একদিনে বুকে গেঁথে যায়নি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের আলমারি ভর্তি বই। তার মধ্যে বেশ কিছু বইয়ে লেখা আছে বিপ্লবীদের সংগ্রামের কথা। বাবা,মা, ঠাকুমা, দাদু মুখে মুখেও বলেন সেইসব গল্প। ‘বুড়ি বালামের তীরে’ বাঘা যতীনের পরিণতি, মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্ব, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কর্মজীবন, মাতঙ্গিনী হাজরার সাহসে ভরা বলিদানের অক্ষরগুলো কখন যেন মূর্ত হয়ে উঠত মনের মাঝে। বারেবারে মনে হতো ওই জায়গায় ওই সময় আমিও ছিলাম। ওই লড়াই আমিও করেছি ওঁদের সঙ্গে।
আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল খুবই মনোরম, জাঁকজমকহীন। মাথার উপর টালির ছাদ, ইঁটের দেওয়ালের ভিতর কেন জানি না এক স্তর করে কঞ্চির দেওয়াল। আম গাছকে মধ্যমণি করে এক বিরাট মাঠে রোজ গাওয়া হতো প্রার্থনা সঙ্গীত। ‘বল বল বল সবে’, ‘উঠে গো ভারতলক্ষী’, ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর, হও উন্নত শির, নাহি ভয়’ গানগুলির অর্থ তেমনভাবে না বুঝলেও মনে এক অপরূপ গর্বে মনটা ভরে উঠত। আমি সমেত আমাদের ক্লাসের পাঁচটি মেয়ে তৈরি করলাম এক গুপ্ত সমিতি। নাম দীবাপ্রবিক্ষু। আমরা একেকজন একেকটি সংগ্রামী চরিত্র দীনেশ, বাদল, প্রফুল্ল চাকী, বিনয় আর ক্ষুদিরাম। রাইটার্স বিল্ডিঙের অলিন্দে নির্ভয় তিন বাঙালীর দাপিয়ে বেড়ানো যেমন আমাদের নাড়া দিয়েছিল, তেমনই কষ্ট দিয়েছিল ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর অতটুকু বয়সে মৃত্যুবরণ করার গল্প। সেই বয়সে আমাদের কোনও শত্রু ছিল না। তবু ওই দেওয়ালের কঞ্চি ভেঙে ভেঙে সর্বদা ‘অনুশীলনে’ ব্যস্ত থাকতাম ঠিক আমাদের পূর্বজদের মতো। এতে ফল ভালো হলো না। দিদিমণি দেখে ফেললেন আমাদের দুটো বেন্চের পাশের দেওয়ালটা কেমন গর্ত মতো হয়ে আছে। আমাদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্রশস্ত্র সব ধরা পড়ল। হেড মাস্টারমশাইয়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা তখন বুঝে ফেলেছি কিছু একটা মারাত্মক ভুল করেছি। কিন্তু সত্যি কথা বলার সাহস সকলের বুকে ছিল। মনে আছে, সমস্তটা শোনার পর হেড মাস্টারমশাই আমাদের মাথায় হাত রেখে কী যেন বিড়বিড় করেছিলেন। তারপর চোখ মুছে বলেছিলেন, আর কঞ্চি ভাঙিস না।
স্বাধীনতার মুহূর্তটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার ঠাকুমার মুখে সেই গল্প শুনে শুনে আশ মিটত না। ঠাকুমা বলতেন, “একদিন শুনলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু তাতে যে আসলে কী হয়েছে তা বুঝে ওঠার আগেই দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল! চেনাজানা কত লোক হঠাৎ অচেনা হয়ে উঠল!” তারপর প্রাণ হরণের অজস্র দুর্ভাগ্যজনক গল্পের মধ্যে হিন্দুর বাড়িতে মুসলমানকে আশ্রয় দেওয়ার মতো সৌহার্দ্যের কাহিনীও কম শুনিনি।
দেশকে স্বাধীন করার জন্য ভারতবাসীকে অজস্র অমূল্য প্রাণ বলি দিতে হয়েছে, এই সত্যিটা আজ আমরা ভুলতে বসেছি। ব্যক্তিগত স্বার্থে আকণ্ঠ ডুবে থাকার দলে কোথাও হয়তো সেই ‘দীবাপ্রবিক্ষু’র আমিও সামিল হয়ে গেছি। সত্যিই তো দেশের জন্য কীই বা করতে পেরেছি আজ অবধি! এই ভাবনা মাথায় এলেই ছেলের দিকে তাকাই। এগারো মাস বয়স থেকে ছেলে বিদেশে বড় হচ্ছে। ছোটবেলায় কথা বলার সমস্যা আর ‘ডেভলপমেন্ট ডিলে'র জন্য ডাক্তারের পরামর্শে শুধু ইংরাজি ভাষায় কথোপকথনে অভ্যস্ত হতে ওকে আমরাই বাধ্য করেছি। ও ভারতীয় পতাকার রঙের মর্ম জানে। কিন্তু ক্ষুদিরামের কথা এখনও জানে না। এখন ওকে বাংলা শেখাই। ছোট ছোট বাক্য বলে। কিন্তু আমার পড়া সমস্ত বই, যা ওর মনেও দেশাত্মবোধ গড়ে তুলবে, সে সব ওর হাতে তুলে দোয়ার যে স্বপ্ন আমি দেখি তা আজও অধরা। হয়তো পরের প্রজন্মের হৃদয়ে সংগ্রামের ইতিহাসটুকুর দ্বীপ প্রজ্জ্বলিত করতে পারলে আমার হৃদয়ের ভার কিছুটা কমবে।
স্বাধীন ভারতে সবাই শান্তিতে থাকুক আর চিন্তা আর বাকশক্তির ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে বাঁচুক, এইটুকুই প্রার্থনা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন