কবিতাভিত্তিক
কবিতাভিত্তিক
শৌভিক গাঙ্গুলী
সুশান্ত সেন
সহদেব প্রধান
তপন মাইতি
বিকাশ চন্দ্র দাস
উদয় সাহা
অর্ণব সামন্ত
মহুয়া জানা
দিলীপ কুমার দাস
শিশির আজম
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
দিলীপ পণ্ডা
সম্মিলন
লালন চাঁদ
ঈপ্সিত চক্রবর্ত্তী
বিকাশ দাশ
শামীম নওরোজ
মুক্তপদ্য
সায়ন চক্রবর্তী
গল্পাণু
মাখনলাল প্রধান
শিখর চক্রবর্তী
জয়শ্রী দাস
আনুপূর্বিক
ভাস্কর সিনহা
ছোটগল্প
সমীর জানা
অর্পিতা দাস
কাক আর ক্যাকটাস
শৌভিক গাঙ্গুলী
পিছনের বারান্দায় আলো নিভে যেতেই
কলির অন্দরমহলে স্পষ্ট হলো ফুলের পাপড়ি
ন্যারেটিভ অস্পষ্ট, ছুতমার্গ এড়িয়ে পথে নামতেই; কাকের ডাক বেশ মোলায়েম, বিকেলটা যদিও ক্ষয়িষ্ণু।
পাচিলের কানকো ঘেষা ক্যাকটাসের ইশারায় অভিযোজনের পাঠ; মর্ফোলজিক্যিল!
জলের স্বল্পতায় পাতাগুলো শিরদাড়া, বাঘনখ হয়ে ওরাই সুরক্ষা চক্র।
সমাজের শিরদাড়ায় জলের অভাব, কাকভেজা ভিজলেও মানুষ কাক হতে পারেনা, তাই-
শহরের জানালায় কাকের দাপট, আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসছে, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক!
আমি
সুশান্ত সেন
অমি যখন স্বরবর্ণ এ থাকি তখন আমি "ই"
আবার ব্যঞ্জনবর্ণ এ সেই আমি হয়ে যাই "চ"।
এখন কোন দলে আপনি খেলতে চান ঠিক করলে
আমি সেই দলে চলে যেতে পারি
লক্কা পায়রাদের মত উড়ে চলতে পারি
দলবদ্ধ।
তবু খালি ক বর্গ চ বর্গ ইত্যাদি বিভাগ নিয়ে
চুলচেরা বিচারে
রাস্তার খানা খন্দ বাড়তেই থাকে
গিয়ার বক্স ভেঙে
রাস্তায় গাড়ি অচল পড়ে থাকে।
সাধের কলকাতা তখন লেকের কিনারায়
ফুচকা আর চুরমুর ভাজা খেতে থাকে।
বৃদ্ধেরা ব্যাপৃত হন সমালোচনায়।
তেজ মূর্তি অশ্রুচোখ ছিলা টানটান
সহদেব প্রধান
“ সজনি ভাল করি পেখন না ভেল
মেঘমাল সঙ্গে যেন তড়িৎলতা জনু
হৃদয়ে শেল দেই গেল। ”
সহস্র চিৎকারের ভিতর
বিচ্ছিন্ন নম্র সুর—ঘাসে রিমঝিম
আভাস দিয়েই কোথায় উধাও
তোলপাড় আকার,আবার ঘাড়ে হাড়হিম।
ব্যানার ছেঁড়ার উথাল বাতাস
জোটবদ্ধ সত্য হাত—সোজা বিপ্লব
তেমন মেয়ের চোখের পালক
ছুঁইলেই ওলটপালট—লড়া সম্ভব।
বিনম্র অন্ধকার পালায়
ছিঁড়বেই সে ছদ্মবেশ,যত জল তল
শিরের ভিতর তড়িৎ খেলায়
ঝঞ্ঝার নেশায় মাটির বাসা টলমল।
দাঁড়াও হিলের ভিড়ের ওপর
তেজমূর্তি অশ্রুচোখ ছিলা টানটান
সবাই তেমন তেজের করুণ
রূপ পাক,সহজ ছোঁয়ায় হয়ে খানখান।
প্রথম প্রেম
তপন মাইতি
এই শহরে মেঘলা হলে ছাতিম গন্ধ
কাঠগোলাপের উঠোন জুড়ে বাংলা ছন্দ।
প্রথম যেদিন কলেজ আসি একটি মেয়ে
ওড়না সুবাস আলতো ছুঁয়ে মনটা চেয়ে।
প্রথম প্রেমের স্পর্শটুকু এইটুকু তাই
মনের স্মৃতি বওয়া ছাড়া উপায় আর নাই...
আলতো রোদে বসত যখন ক্যান্টিন পাড়া
বইমেলাতে মাথা নিচু নেইকো সাড়া।
বিজ্ঞান ক্লাসে পেছন বসে সুনীল পড়া
বললে হয়তো খারাপ ভাবতিস ভয়ে মরা!
গাঁয়ের থেকে প্রথম এসে এই শহরে
মধ্যবিত্ত জীবন মরে নেই বহরে।
এখন তুই অন্য কারোর প্রেম সামলে রাখি
প্রথম প্রেমের স্পর্শটুকু মনে আঁকি
আলতো রোদে বইপাড়াতে ভালো থাকি।
আকাশ
বিকাশ চন্দ্র দাস
আকাশ রয়েছে। বিপণি নীলিকা নেই।
পাখিও হইনি-- নেই দুপাশের ডানা।
ভাবনায় নয়-- রং আছে শূন্যেই।
ওর নিচে উঁচু, বড়ো করি আস্তানা।
বাতাসে এবং জলের সোহাগে বাঁচি।
লাল-নীল বীজ বুনি বর্ণের ক্ষেতে।
আসতে পারিনি আজও কারও কাছাকাছি।
বাইরে-ভেতরে আছি দেখি ম্যাকবেথে।
সিঁড়ি খুঁজি। পাশে লবিও রয়েছে খাড়া।
হঠাৎ আড়ালে কেড়ে নেয় কেউ মই।
ইচ্ছে মায়াবী তারা হয় কন্যারা
স্পর্ধায় উঠি-- ভাবি ঠিক উঠবোই---
শুরু ও অন্তে ছিল, আছে গরমিল ---
সত্যি আকাশ এখনও হয়নি নীল।
সমস্বরে উদাসীন
উদয় সাহা
মননে মেঘ নিয়ে হেঁটে যায় অপরাহ্নের কার্তিক। সদ্য রং করা জানলার কাছে ঘুরঘুর করে বেপাড়ার বনটিয়া। প্রবল বর্ষার দাগ বুকে নিয়ে চোখ বুজেছে নরোত্তম। মাঠ ভরা মাধুর্যে ছাপ পড়েনি একফোঁটাও। অলীক গল্পের নিজস্ব ছায়ায় তুমি যেদিন আড়াল হলে, নিমগ্ন আমি ঘোষণা করেছি আর্তনাদের নৈবেদ্য। কখন যে ভোর আর কখন গোধূলি চিবুক জানেনা। এক বন্ধনীতে যুক্ত হয়ে আছে রক্ত-মাংসের ডেসিবল, শীতবন্দর আর ছেদযতিহীন তুমি। বাতাসের গান দিয়ে বানানো সিঁড়িতে কাদা ও মাটি লেগে গেল কী করে ! এই আমি নিঝুম হ'লাম... মেঘের মননে ধানদুর্বার অর্বাচিন।
বালুচরীর স্রোত
অর্ণব সামন্ত
স্রোতকে ভুলতে চেয়েছি বালুচরীতে
বালু আর চরী দুটি শব্দের উচ্চারণে
মনে পড়ে চোরাবালির কথা যেখানে মানুষ
হাজার চেষ্টা করেও বাস্তবিক চক্রব্যুহে পড়ে যায়
অভিমন্যুর থেকে বড়ো হবার চেষ্টা করেও পারে না
আকন্ঠ মায় আমস্তক ডুবে যায় সহজিয়া ভঙ্গিতে
একটি সহজ গান গাইতে গাইতে , যার মর্মকথা
বেদনার বালুচরে খেলাঘর বাঁধার ইচ্ছা
মহাকালের বিন্দুর চেয়েও আরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু
অথবা প্রায়ই শূন্য শূন্যপুরের যার অনায়াস যাতায়াত
স্রোত বন্ধ হলেও তার মধ্যে আগুন থাকে
যা সেই স্রোতস্বিনীকে বা অন্তরঙ্গ হওয়া মানুষজনকে
পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় , কখনো সখনো স্রোত দৃশ্যমান
না হলে ফল্গুভাবে বহমান হয় , তার চোরাবালিতে
সে প্রিয়জনকে গ্রাস করে আনন্দ পায়
তবে সে মৃত্যু মৃত্যু নয় মৃত্যুর অধিক মৃত্যু
যার সঞ্জীবনী সুধা পানে জীবন পেয়ে যায়
জীবনের থেকেও বেশি জীবন ,
তখন স্রোতস্বিনী সমুদ্রে হারায় নাকি
সমুদ্র স্রোতস্বিনীতে হারায় তার জন্য
কোনো ভূগোলবিদ বা সেচদপ্তরের আধিকারিককে লাগবে না
কিংবা জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করার টারবাইন বা ইঞ্জিনিয়ার দরকার নেই
শুধু স্রোত বসে থাকে , হেঁটে বেড়ায় , ছোটে সহজ পোশাকে
সরল ভঙ্গিতে , অক্ষরে অক্ষরে ঢেউ লাগে
বিবর্তনে বিবর্তনে পরিবর্তনই ধ্রুবসত্য বলে
এক জীবন অন্য জীবনের ঠোঁটে চুমু খায়
আর শিষ দিতে দিতে উদাত্ত গান গেয়ে ওঠে
সমুদ্র ফেনায় , জ্যোৎস্নায় , স্পন্দনে , কম্পনে , আনন্দের অর্গাজমে !
মাটির কাছে
মহুয়া জানা
তখনও আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে
ছিলো ছেলেটি --
এক ঢেলা মাটির কাছে যে স্বপ্ন কিনেছিলো ।
স্বেদবিন্দু নাকছাবি ফুলের
মেয়েটিকে ভেবে ---
তার সলজ্জ ঠোঁটের ভেতর সেদিন
সদ্যফোটা বকফুল ।
মুঠোর ভেতর পরব শেষের
লাল মাটির খাড়ু ,
বুকের ভেতর ধামসা মাদল ,
একদিন পরিয়ে দেবে ভেবে
লুকিয়ে এলো আটচালায় ---
তারপর হারিয়ে গেছে ছেলেটি ।
আতুর গন্ধ বুকে মাটি গুছিয়ে
রাখছে মাটিকে ।
ইতিহাস বানায় কে ?
দিলীপ কুমার দাস
সবাই বানায় সবকিছু যেমনটা যে পারে
আমাদের এই সমাদৃত গল্পের সংসারে ।
কেউ বানায় জীবন জীবিকা
ছাপিয়ে মরণ খেলা ,
কেউবা শুধুই পটভূমি আঁকে
বানায় না কিছুই সোনা ।
তবুও আবার , শুনি তারাই মহাকাব্যিক উদ্ধার
অতিমাত্রায় স্মৃতিকথা লেখে নিয়মের আখড়ায়।
নিপাট শান্ত সমাহিত তারা
গবেষকদের পৃষ্ঠা ,
তাদের কাহিনি মায়াজাল শুধু
নয় আগামীর দীক্ষা ।
প্রশ্ন কিন্তু এখানেই আবার বিশেষ সাক্ষাৎকারে
সবাই যদি এতকিছু করে পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে।
ইতিহাস বানায় কে ?
সব তো গোপাল ভাঁড় ।
আত্ম-আবিষ্কারে সচেতন নয় কেউ , যদিও ভাবে
তারাই মজাদার এই পৃথিবীর শেষ অন্ত্যমিল ।
যুদ্ধ শেষ হলে
দিলীপ পণ্ডা
যুদ্ধ শেষ হলে শুশ্রুষার একটা ব্যবস্হা থাকে
আপৎকালীন।
উৎসব শেষে যেমন বিসর্জনে যায় প্রতিমা
আত্মবিসর্জনে কোনো কল্পলোকে শায়িত দেবতা
শ্মশান অথবা কবরে।
সকলেই সহজভাবে
মেনে নেয়, প্রতিটি প্রাণের আন্তরলোক ---
যেখানে পাখি ওড়ে,ফুল ফোটে আকাশ থেকে
আকাশে
মহাজাগতিক। অলখনিরঞ্জন।
নিজস্বভূবন।
এক শূন্যতা অনন্তে বহুমাত্রিক চেতনাতরঙ্গে
মিশে যায়। মায়াচোখ ফকিরি না হলে অভিমান
অবিশ্বাস কেউ নিজের জিম্মায় লটকে রাখে
জন্মান্তর অবধি।
ত্রাণশিবিরে ফেলে -রাখা সেই আত্মগ্লানি
সম্পদসূচক প্রাণকোষ
পুড়ে যায়। গলে যায়। ক্ষয়ে যায়।
শুশ্রুষা থাকে,যুদ্ধ কেবলই শতকে শতকে স্মরণীয়
থামে সবই,থমকে থাকে না কবির মনোভূমি।
সে কাঁদে, এক মানবিক শুশ্রুষার কান্না
সাইরেনের আড়ালে গুমরে মরে সাদা পায়রা।
সাক্ষীবটকে বলুন ছেঁড়া ছেঁড়া কথাগুলি
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
তিরিশ বছর পরেও যদি নদীপারে দাঁড়ান আর দেখেন
বটগাছটি দিব্যি ডাল পালা ঝুরি নিয়ে সংসার করছে
তবে নিশ্চয় আপনার হারানো প্রতিশ্রুতিগুলি মনে পড়বে
হয়তো কিছু ছন্দ যতি গন্ধ ভুলে গেছেন, সবকিছু তবুও মোছেনি।
চল্লিশ বছর পরেও সেই অমর গাছটি ভাঙা সংসারের
বেড়ে ওঠা বারান্দায় দাদু-ঠাকুমা হয়ে বেশ জেগে থাকবে,
বুকে যার অজস্র কাঁটাছেড়া তার বিভক্তছায়ায় দু-দণ্ড দাঁড়াতে
মন চাইবে, দাঁড়ান, একটু হেমন্ত বাতাস মাখুন
আপনার আবার মনে পড়বে সেই হারানো প্রতিশ্রুতিগুলি,
হয়তো ভাঙাডাল স্বপ্নেরা, শব্দেরা মরে গ্যাছে, অথবা
তিনমাস টানা বৃষ্টিতে শ্যাওলাসবুজ হয়ে আছে, ওদের
কড়া ডিটারজেন্টে ধুয়ে দেখে নেবেন, কৈশোরের খেয়ালে লেখা
এ প্লাস বি ইকুয়াল টু সি লেখাটি দেখা যাচ্ছে কি ?
কালো জুতো
শিশির আজম
সকাল সকাল কাজে বেরোতে হবে আমাকে, বের করলাম জুতো জোড়া, সারা দিনকার জন্য আমার পা-দুটোকে গলিয়ে দিতে হবে ওদের ভেতর, ঐ কালো জুতো জোড়ার ভেতর, ওমা দুটো শেয়াল দেখি খিক খিক করে হাসছে, ওরা দখল করেছে আমার ঐ জুতো জোড়া আর আরামসে ওদের ভেতর বসে আমাকে উপহাস করছে, কিন্তু যা আমাকে আহত করলো তা হলো নচ্ছার ঐ জুতো জোড়া হ্যা ওরা তো শয়তান শেয়ালদুটোকে তলে তলে উশকাচ্ছে!
শীর্ষক।। তার পরিচয়
অচেনা রোদে এখনো দেখি তার ছায়া ভেসে যায়,
গোধূলির ফিরে যাওয়া আলোয় যেন নরম ব্যথা বাজায়।
চেনা সুবাস মিশে আছে শুকনো পাতার ঘ্রাণে,
তবু তার সেই মুখখানি হারায় কেমন স্মৃতির টানেপথে।
যে নামটি ঠোঁটে আসতে চায়, বুকেই থেমে যায়,
মেঘের ভেতর সূর্য যেমন—লুকিয়ে রোদ ছড়ায়।
অচেনা সুরে বেজে ওঠে মন, পুরোনো কোনো ছেঁড়া তারে,
তার পরিচয়? ঝরে যায় কেবল কানে কানে ফিসফিস স্বরে।
সে কি ছিলো প্রিয়ার মতো, নাকি এক বৃক্ষের ছায়া?
না কি এক অপূর্ণ কবিতা, জড়িয়ে রেখে গেছে মায়া?
সময়ের নদী বয়ে চলে, স্মৃতি হারিয়ে যায় ভেসে—
তার পরিচয়? মন বলে চুপিচুপি, "চিনি তাকে ভালোবেসে..."
সম্মিলন
শিশির আজম
সকাল সকাল কাজে বেরোতে হবে আমাকে, বের করলাম জুতো জোড়া, সারা দিনকার জন্য আমার পা-দুটোকে গলিয়ে দিতে হবে ওদের ভেতর, ঐ কালো জুতো জোড়ার ভেতর, ওমা দুটো শেয়াল দেখি খিক খিক করে হাসছে, ওরা দখল করেছে আমার ঐ জুতো জোড়া আর আরামসে ওদের ভেতর বসে আমাকে উপহাস করছে, কিন্তু যা আমাকে আহত করলো তা হলো নচ্ছার ঐ জুতো জোড়া হ্যা ওরা তো শয়তান শেয়ালদুটোকে তলে তলে উশকাচ্ছে!
শীর্ষক।। তার পরিচয়
অচেনা রোদে এখনো দেখি তার ছায়া ভেসে যায়,
গোধূলির ফিরে যাওয়া আলোয় যেন নরম ব্যথা বাজায়।
চেনা সুবাস মিশে আছে শুকনো পাতার ঘ্রাণে,
তবু তার সেই মুখখানি হারায় কেমন স্মৃতির টানেপথে।
যে নামটি ঠোঁটে আসতে চায়, বুকেই থেমে যায়,
মেঘের ভেতর সূর্য যেমন—লুকিয়ে রোদ ছড়ায়।
অচেনা সুরে বেজে ওঠে মন, পুরোনো কোনো ছেঁড়া তারে,
তার পরিচয়? ঝরে যায় কেবল কানে কানে ফিসফিস স্বরে।
সে কি ছিলো প্রিয়ার মতো, নাকি এক বৃক্ষের ছায়া?
না কি এক অপূর্ণ কবিতা, জড়িয়ে রেখে গেছে মায়া?
সময়ের নদী বয়ে চলে, স্মৃতি হারিয়ে যায় ভেসে—
তার পরিচয়? মন বলে চুপিচুপি, "চিনি তাকে ভালোবেসে..."
সম্মিলন
বিকাশ দাশ
১/ডেকেছ যখন -যাবোঝরা বাঁশ পাতা
নিক্কণের ইশারায় ডেকেছ যখন - আমি যাবো।
কিন্তু তার আগে --
ব্যালেন্সের দড়িতে হাঁটা মেয়েটি মাটিতে নামুক
বাবার ব্যবসায় অবাধ্য হয়ে স্কুলে যাক
চড়াই -শালিখে মিতালি করুক ;
নজরবন্দি খেলায় যে মেয়েটি খুন হল এইমাত্র
সে বেঁচে উঠলে আমি যাবো।
মানুষ মানুষকে মানুষ জ্ঞান করলে
কোন সন্তাপ না রেখে আমি যাবো।
কোনদিকে " না ' শব্দ ছড়াবো না
আমার তাল সুপারির বাগান ফেলে
আম - কাঁঠালের বাগান ফেলে
মায়ের আঁচল থেকে স্নেহভার আলগা করে
আমি ঠিক যাবো ।
যাওয়ার আগে জেনে যাবো
যে দুঃখ দিতে এসে ফিরে গেছে
সে ক্ষমা করেছে কি না
আমার তক্ষক ঘর আমাকে ক্ষমা করেছে কি না
তারপর আমি যাবো হাসতে হাসতে।
২/ আধময়লা মন খারাপ
যখন একটা আধ ময়লা মন খারাপ
একটা আস্ত দুপুর পেটে পুরে আমাকে ধ্বংস করে দেয়
আমি তখন সেলাই করা বিকেলের গায়ে
একটা গোটা ভারতবর্ষের ছবি আঁকি
ভেজা ভেজা অক্ষর সাজাই
ভাবনার গায়ে তালি দিই।
যখন আধ ভাঙা ভুলেরা শরীরে কষ্ট আঁকে
আমি মন খারাপ পুড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজি।
চা বাগানের এক চামচ রোদ এনে দেয় ভেষজ ঘুম
পালিয়ে যাওয়া পাতলা আকাশ আরও গাঢ় হয়
আমার হারানোর কিছু ছিল না, কেবল এক বালতি মন খারাপ ছাড়া
চাওয়ার মধ্যে খেজুর রসের অনন্ত সকাল
এক পেয়ালা সুখ, এক বারান্দা আলো
আর মনের জ্বর মাপা একটা সন্ধ্যা।
কাচের চুড়ির মতো ঠুনকো ভালোবাসা
প্রজাপতির হয়ে হাতে বসলে
আমি ফোনের ভেতর আলগোছে চুমু খাই
আর মন খারাপ উড়িয়ে হো হো হেসে উঠি।
৩/আমার কবিতারা
গ্রামের যে সাঁওতাল মেয়েটি ধান রোয়া সেরে কাদা মাখা শরীরে
ঝুমুর কণ্ঠে বাড়ি ফিরছে
তার নাম কবিতা।
অদিগন্ত ভালো লাগা যেখানে
একলা পায়ে পায়ে উঠে আসে -
তার নাম কবিতা।
ধানের শিসে যখন সুর বেজে ওঠে
আমার কবিতা তখন আলতা পায়ে সদ্য কিশোরী ।
মেঠো রাখাল যখন বনপথে বাঁশির সুরে আনমনা
আমার কবিতা তখন অভিমানিনী রাই।
অনন্তের সীমানা পেরিয়ে যে প্রেম
আঁচল পেতে অপেক্ষা করে আছে
-তার নাম কবিতা।
জনমজুরের চাটানো বুকে
সাফল্যের যে ঘাম ফুটে ওঠে
তার নাম কবিতা।
কবিতা আমার শৈশবের মাতৃত্ব -
কৈশোরে সহচরী ; যৌবনের আকাঙ্খা - বার্ধক্যের বেদমণ্ত্র।
পৃথিবীর যে কোন সূতিকাগারে
এইমাত্র যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হল -
সে আমার কবিতা।
কাশ্মীর সীমান্তে যে সমস্ত ভারতীয় জোয়ান ভাইয়েরা
বুক চিতিয়ে লড়ছে - তারাই আমার কবিতা।
ভারতবর্ষের কল কারখানা ; কয়লা খাদানে
যে সমস্ত শ্রমিক
মৃত্যু ছুঁয়ে ফসল তুলে আনছে -
তারা আমার কবিতা।
কিশোরীর রঙিন ফিতে ; কাঁচের চুড়ি
পায়ের নূপুর ; চোখের কাজল - আমার কবিতা।
নারীত্বের লান্ছনা - অপমানে
কবিতা আমার বীরাঙ্গনা।
ভুখা মানুষের মিছিলে - আর্তনাদে
কবিতা আমার প্রতিবাদী।
গঙ্গা -পদ্মা এপার ওপার একাকার আমার কবিতা।
ফুটপাতে অপুষ্ট শিশুর চিৎকার আমার কবিতা ।
মন্দির্ - মসজিদ - গির্জা - গুরুদোয়ারা আমার কবিতা।
যুবকের উচ্ছলতায় - কর্মোদ্যোগে আমার কবিতা।
আমার কবিতা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে প্রহরী ।
জনপ্লাবনে -মিছিলে - স্লোগানে -যে প্রতিবাদ
-- তারও নাম কবিতা।
৪/কৃষকেরাই ঈশ্বর জেনেছি
লাঙল কাঁধে যেসব মানুষ
কেবল স্বপ্ন রোপণ করে
রুখা মাটির ভেতর ভরসা রোপণ করে
কাদা মেখে বাড়ি ফেরে
তাদের পায়ে পায়ে ঈশ্বর উঠে আসে।
রক্ত, ঘাম, দিয়ে লিখে রাখে লাঙলের ফলায়,
কষ্টের স্বরলিপি ফুটে ওঠে ধানের শিসে।
ধানের শিসে বাজনা বাজে
বাতাসে বাতাসে বাজে ঈশ্বরের পদধ্বনি।
রক্ত ঘাম নিংড়ে ক্লান্ত শরীর যন্ত্রণার বালিশে
বিসর্গ থ হয়ে বসে থাকে।
রাত কাঁথায় জোনাকি লিখে রাখে
দুরন্ত সকাল।
ঈশ্বর পায়ে পায়ে আলপনা আঁকে নিরাময়
খামার জুড়ে আনন্দ মুখ ধুয়ে নেয় ভোরের শিশিরে ।
টিয়ার পালকের মতো সবুজ ধান খেত জুড়ে
নেচে ওঠে শস্য খেতের অহংকার।
কৃষক ঈশ্বর পুরুষ
আমাদের স্বপ্নে বাঁচে এক একটি নিরন্ন রাত
এসো, তাকে আসন পেতে দিই
অযত্নের জঞ্জাল সরিয়ে সাবলীল।
৫/ফিরে আসি যদি
মনে পড়ে কুঁড়ে ঘর ফুটিফাটা চালা
মনে পড়ে ফ্যান ভাত চিনামাটি থালা।
ভুলিনিতো লাল ধুলো রাঙামাটি পথ
ভুলিনি চোখের জল ফেরার শপথ।
মনে পড়ে ভাইবোন অভাবের ঘর
ঝরে পড়ে টুপটাপ মায়ের আদর।
মনে পড়ে শালবন বিকেলের মাঠ
মনে পড়ে সোনাঝুরি যত পথ ঘাট।
ভুলিনিতো আমবীথি কাঁঠালের বন
ভুলিনিতো মেঠোপথ রাখাল জীবন।
মনে পড়ে গরুপাল পাহাড়ের সারি
মনে পড়ে ধানখেত খেজুর সুপারি।
ভুলিনিতো সাঁঝবেলা সন্ধ্যাদীপ শাঁখ
ভুলিনিতো ঝিঙেমাচা চড়াইয়ের ঝাঁক।
ভালো থেকো লাল ধুলো শালুক পুকুর
ভালো থেকো ঝিঁঝিঁপোকা সারাটা দুপুর।
ভালো থেকো মন খারাপ ভালো থেকো সই
ভালো থেকো শিশুকাল আঁচলের খই।
ভুলিনি চোখের জল হৃদয় বেদনা
ভুলিনিতো অভিমান ভুলিনি ঠিকানা।
মনে পড়ে কংসাবতী শিলাবতী নদী
দেখা হবে কোনোদিন ফিরে আসি যদি।
৬/ হাঁড়িতে ফুটছে ক্ষোভের কবিতা
হাঁড়িতে রোজ অভাব সিদ্ধ হয়
উষ্ণ জলে ফুটতে থাকে ক্ষোভ
উথলে ওঠে ক্ষোভের মাড় দু'বেলা ,
ফুটন্ত ক্ষোভের ভেতর জন্ম নেয়
এক একটি কবিতা ।
টিউশান শেষে বাড়ি ফেরৎ ক্লান্ত শরীর জুড়ে
জমে ওঠে সময়ের ধুলো,
দুঃস্বপ্নেরা ভিড় করে আসে অভাবের জানালায়
উনুন ধরাই
রক্ত, ঘাম, মাংস পোড়ে
মায়ের হাতের তালু থেকে ঝরতে থাকে
অভাবের বিন্দু বিন্দু মায়া,
অনন্ত ক্ষোভের চালে সিদ্ধ হয়
এক একটি কবিতা।
ঘুম আসে
থমকে থমকে রাত শেষ হয়
সূর্যশোক ঝরে শরীরে, চোখের পাতায়
উনুনে জীবন পোড়ে দু-বেলা,
ক্লান্ত স্বপ্নের ভেতর থেকে
লাফিয়ে পড়ে দু-একটা সাদা ভাত,
জন্ম নেয় এক একটি হাহাকার।
নিক্কণের ইশারায় ডেকেছ যখন - আমি যাবো।
কিন্তু তার আগে --
ব্যালেন্সের দড়িতে হাঁটা মেয়েটি মাটিতে নামুক
বাবার ব্যবসায় অবাধ্য হয়ে স্কুলে যাক
চড়াই -শালিখে মিতালি করুক ;
নজরবন্দি খেলায় যে মেয়েটি খুন হল এইমাত্র
সে বেঁচে উঠলে আমি যাবো।
মানুষ মানুষকে মানুষ জ্ঞান করলে
কোন সন্তাপ না রেখে আমি যাবো।
কোনদিকে " না ' শব্দ ছড়াবো না
আমার তাল সুপারির বাগান ফেলে
আম - কাঁঠালের বাগান ফেলে
মায়ের আঁচল থেকে স্নেহভার আলগা করে
আমি ঠিক যাবো ।
যাওয়ার আগে জেনে যাবো
যে দুঃখ দিতে এসে ফিরে গেছে
সে ক্ষমা করেছে কি না
আমার তক্ষক ঘর আমাকে ক্ষমা করেছে কি না
তারপর আমি যাবো হাসতে হাসতে।
২/ আধময়লা মন খারাপ
যখন একটা আধ ময়লা মন খারাপ
একটা আস্ত দুপুর পেটে পুরে আমাকে ধ্বংস করে দেয়
আমি তখন সেলাই করা বিকেলের গায়ে
একটা গোটা ভারতবর্ষের ছবি আঁকি
ভেজা ভেজা অক্ষর সাজাই
ভাবনার গায়ে তালি দিই।
যখন আধ ভাঙা ভুলেরা শরীরে কষ্ট আঁকে
আমি মন খারাপ পুড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজি।
চা বাগানের এক চামচ রোদ এনে দেয় ভেষজ ঘুম
পালিয়ে যাওয়া পাতলা আকাশ আরও গাঢ় হয়
আমার হারানোর কিছু ছিল না, কেবল এক বালতি মন খারাপ ছাড়া
চাওয়ার মধ্যে খেজুর রসের অনন্ত সকাল
এক পেয়ালা সুখ, এক বারান্দা আলো
আর মনের জ্বর মাপা একটা সন্ধ্যা।
কাচের চুড়ির মতো ঠুনকো ভালোবাসা
প্রজাপতির হয়ে হাতে বসলে
আমি ফোনের ভেতর আলগোছে চুমু খাই
আর মন খারাপ উড়িয়ে হো হো হেসে উঠি।
৩/আমার কবিতারা
গ্রামের যে সাঁওতাল মেয়েটি ধান রোয়া সেরে কাদা মাখা শরীরে
ঝুমুর কণ্ঠে বাড়ি ফিরছে
তার নাম কবিতা।
অদিগন্ত ভালো লাগা যেখানে
একলা পায়ে পায়ে উঠে আসে -
তার নাম কবিতা।
ধানের শিসে যখন সুর বেজে ওঠে
আমার কবিতা তখন আলতা পায়ে সদ্য কিশোরী ।
মেঠো রাখাল যখন বনপথে বাঁশির সুরে আনমনা
আমার কবিতা তখন অভিমানিনী রাই।
অনন্তের সীমানা পেরিয়ে যে প্রেম
আঁচল পেতে অপেক্ষা করে আছে
-তার নাম কবিতা।
জনমজুরের চাটানো বুকে
সাফল্যের যে ঘাম ফুটে ওঠে
তার নাম কবিতা।
কবিতা আমার শৈশবের মাতৃত্ব -
কৈশোরে সহচরী ; যৌবনের আকাঙ্খা - বার্ধক্যের বেদমণ্ত্র।
পৃথিবীর যে কোন সূতিকাগারে
এইমাত্র যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হল -
সে আমার কবিতা।
কাশ্মীর সীমান্তে যে সমস্ত ভারতীয় জোয়ান ভাইয়েরা
বুক চিতিয়ে লড়ছে - তারাই আমার কবিতা।
ভারতবর্ষের কল কারখানা ; কয়লা খাদানে
যে সমস্ত শ্রমিক
মৃত্যু ছুঁয়ে ফসল তুলে আনছে -
তারা আমার কবিতা।
কিশোরীর রঙিন ফিতে ; কাঁচের চুড়ি
পায়ের নূপুর ; চোখের কাজল - আমার কবিতা।
নারীত্বের লান্ছনা - অপমানে
কবিতা আমার বীরাঙ্গনা।
ভুখা মানুষের মিছিলে - আর্তনাদে
কবিতা আমার প্রতিবাদী।
গঙ্গা -পদ্মা এপার ওপার একাকার আমার কবিতা।
ফুটপাতে অপুষ্ট শিশুর চিৎকার আমার কবিতা ।
মন্দির্ - মসজিদ - গির্জা - গুরুদোয়ারা আমার কবিতা।
যুবকের উচ্ছলতায় - কর্মোদ্যোগে আমার কবিতা।
আমার কবিতা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে প্রহরী ।
জনপ্লাবনে -মিছিলে - স্লোগানে -যে প্রতিবাদ
-- তারও নাম কবিতা।
৪/কৃষকেরাই ঈশ্বর জেনেছি
লাঙল কাঁধে যেসব মানুষ
কেবল স্বপ্ন রোপণ করে
রুখা মাটির ভেতর ভরসা রোপণ করে
কাদা মেখে বাড়ি ফেরে
তাদের পায়ে পায়ে ঈশ্বর উঠে আসে।
রক্ত, ঘাম, দিয়ে লিখে রাখে লাঙলের ফলায়,
কষ্টের স্বরলিপি ফুটে ওঠে ধানের শিসে।
ধানের শিসে বাজনা বাজে
বাতাসে বাতাসে বাজে ঈশ্বরের পদধ্বনি।
রক্ত ঘাম নিংড়ে ক্লান্ত শরীর যন্ত্রণার বালিশে
বিসর্গ থ হয়ে বসে থাকে।
রাত কাঁথায় জোনাকি লিখে রাখে
দুরন্ত সকাল।
ঈশ্বর পায়ে পায়ে আলপনা আঁকে নিরাময়
খামার জুড়ে আনন্দ মুখ ধুয়ে নেয় ভোরের শিশিরে ।
টিয়ার পালকের মতো সবুজ ধান খেত জুড়ে
নেচে ওঠে শস্য খেতের অহংকার।
কৃষক ঈশ্বর পুরুষ
আমাদের স্বপ্নে বাঁচে এক একটি নিরন্ন রাত
এসো, তাকে আসন পেতে দিই
অযত্নের জঞ্জাল সরিয়ে সাবলীল।
৫/ফিরে আসি যদি
মনে পড়ে কুঁড়ে ঘর ফুটিফাটা চালা
মনে পড়ে ফ্যান ভাত চিনামাটি থালা।
ভুলিনিতো লাল ধুলো রাঙামাটি পথ
ভুলিনি চোখের জল ফেরার শপথ।
মনে পড়ে ভাইবোন অভাবের ঘর
ঝরে পড়ে টুপটাপ মায়ের আদর।
মনে পড়ে শালবন বিকেলের মাঠ
মনে পড়ে সোনাঝুরি যত পথ ঘাট।
ভুলিনিতো আমবীথি কাঁঠালের বন
ভুলিনিতো মেঠোপথ রাখাল জীবন।
মনে পড়ে গরুপাল পাহাড়ের সারি
মনে পড়ে ধানখেত খেজুর সুপারি।
ভুলিনিতো সাঁঝবেলা সন্ধ্যাদীপ শাঁখ
ভুলিনিতো ঝিঙেমাচা চড়াইয়ের ঝাঁক।
ভালো থেকো লাল ধুলো শালুক পুকুর
ভালো থেকো ঝিঁঝিঁপোকা সারাটা দুপুর।
ভালো থেকো মন খারাপ ভালো থেকো সই
ভালো থেকো শিশুকাল আঁচলের খই।
ভুলিনি চোখের জল হৃদয় বেদনা
ভুলিনিতো অভিমান ভুলিনি ঠিকানা।
মনে পড়ে কংসাবতী শিলাবতী নদী
দেখা হবে কোনোদিন ফিরে আসি যদি।
৬/ হাঁড়িতে ফুটছে ক্ষোভের কবিতা
হাঁড়িতে রোজ অভাব সিদ্ধ হয়
উষ্ণ জলে ফুটতে থাকে ক্ষোভ
উথলে ওঠে ক্ষোভের মাড় দু'বেলা ,
ফুটন্ত ক্ষোভের ভেতর জন্ম নেয়
এক একটি কবিতা ।
টিউশান শেষে বাড়ি ফেরৎ ক্লান্ত শরীর জুড়ে
জমে ওঠে সময়ের ধুলো,
দুঃস্বপ্নেরা ভিড় করে আসে অভাবের জানালায়
উনুন ধরাই
রক্ত, ঘাম, মাংস পোড়ে
মায়ের হাতের তালু থেকে ঝরতে থাকে
অভাবের বিন্দু বিন্দু মায়া,
অনন্ত ক্ষোভের চালে সিদ্ধ হয়
এক একটি কবিতা।
ঘুম আসে
থমকে থমকে রাত শেষ হয়
সূর্যশোক ঝরে শরীরে, চোখের পাতায়
উনুনে জীবন পোড়ে দু-বেলা,
ক্লান্ত স্বপ্নের ভেতর থেকে
লাফিয়ে পড়ে দু-একটা সাদা ভাত,
জন্ম নেয় এক একটি হাহাকার।
ঈপ্সিত চক্রবর্ত্তী
বিতস্তা কে
১
স্নান সেরে রোজ গায়ে আগুনের আভা মেখে নিই বাজারের ওঠা নামা বেঁচে থাকাটাকে মেপে নেয় ঘুম থেকে ওঠা মানে স্বপ্নের গুঁড়ো জড়ো করা ভাবনারা জেনে গেছে কাসুন্দি ঘেঁটে যেতে হবে বিতস্তা তুমি যদি নদী হয়ে যেতে একদিন!
চাঁদ দেখে করতাম বাজারের সাথে মস্করা।
বিতস্তা কে
১
স্নান সেরে রোজ গায়ে আগুনের আভা মেখে নিই বাজারের ওঠা নামা বেঁচে থাকাটাকে মেপে নেয় ঘুম থেকে ওঠা মানে স্বপ্নের গুঁড়ো জড়ো করা ভাবনারা জেনে গেছে কাসুন্দি ঘেঁটে যেতে হবে বিতস্তা তুমি যদি নদী হয়ে যেতে একদিন!
চাঁদ দেখে করতাম বাজারের সাথে মস্করা।
২
চারপাশে অনেকের ভীড়ে একা একা হয়ে থাকা চোখ আজ বেশি দূর এগোনোর গলি ভুলে গেছে ক্লান্তির কথা ভুলে গিয়ে যেত গা ভাসিয়ে দেওয়া বিতস্তা তুমি যদি নদী হতে সময়ের স্রোতে,
তুমিও তো নদী নও, আমি তাই বেঁচে মরে আছি হেঁটে যেতে হয় বলে হাঁটি, নয় ঠিক হেঁটে যাওয়া
৩
বিতস্তা, তুমি যদি ভুল করে নদী হয়ে যাও
দুঃখের সাথে সাথে সুখগুলো বইতেও পারে।
গলা খুলে বলতাম নদীর ভেতর শুয়ে থাকি তোমার ভেতরে কত চঞ্চল প্রাণ খেলা করে। জানি কোনোদিন তুমি নদী হতে চাইবেনা, তাই
এ জন্মে পৃথিবীর সাথে হবে না তো বোঝাপড়া জন্মান্তরবাদ মেনে নিয়ে নদী হয়ে যেও,
আমার চাওয়াটা বুঝি শিশুদের মতো চাঁদ ধরা!
৪
বাজারের থলিটাকে বাজারেই ফেলে ফিরে আসি প্রতিদিন হাসি মুখে খুঁজে চলি দরজার চাবি রুটিনের মতো করে বাড়ি ফিরবার পথটাকে রোজ হারিয়েছি একবার করে নিজের খেয়ালে বিতস্তা তুমি যদি নদী হয়ে যেতে একদিন
দেখতে আমার মতো সংসারী আর দুটো নেই।
লালন চাঁদ
অশান্ত নদী
ভুলে যাচ্ছি নাম
কথাগুলো শিশিরে ভেজে সারারাত
মরে যায় সংলাপ।
পথ শেষ
দূরে দাঁড়িয়ে সীমান্ত
কাঁটাতারের বেড়া
বন্দি জীবন
প্রতিদিন মরে যায় হৃদয় নদী।
জল নেই
তবু জলে দাঁড়াই
জলে তার ছায়া। আমার বুকে অশান্ত সমুদ্দুর।
অন্ধকার
জীবন সিঁড়িভাঙা অঙ্ক
আগ্নেয়গিরি
ঘরে বসে ভাগ করছি সম্পর্ক
হিসেব মেলে না কিছুতেই
জন্ম মৃত্যু সঙ্গী
নীরব রাত্রি
দুচোখের ভেতর গর্ত খুঁড়ছে হায়না।
কথাগুলো কবিতা হয় না আর
আলোর নীচে অন্ধকার
তুলসীতলায় আর পিদিম জ্বলে না।
ঈশ্বর মানুষ
তুমি ঈশ্বর খোঁজো
আমি মানুষ।
তোমার ঈশ্বর চোখে দেখি না
আমি মানুষ দেখি
সারা জীবন।
তোমার ঈশ্বর স্বপ্ন দেখায়
স্বপ্নের মোহে আচ্ছন্ন সরল মানুষ
স্বপ্ন সব জাল।
কোথায় ঈশ্বর !
মানুষ মরলে না কি ঈশ্বরের দর্শন পায়।
মানুষ
হাওয়া পাল্টে যাচ্ছে
মানুষও
আগের মানুষ এখন পুরোনো বটগাছ।
গাছ ছায়া দেয়
মানুষ মনে রাখে না
চারদিকে মুখোশ। মুখোশে ভরছে ভুবন
রাস্তায় ধর্ষণ
কলঙ্কিত ঘরের রমণী।
লুপ্ত বিবেক
হুঁশ নেই
মানুষ এখন পশু
তবু স্বীকার করে না নিজের অপরাধ।
কবিতা
জন্ম নিচ্ছে কথা
কথার ভেতর নিঃস্ব ফসলের ঘ্রাণ
শেষ হয় না পুতুল খেলা।
বড়োশুলে সমাবেশ
কথা পাঠ করছে রাখাল বালক
বাঁশি হাতে মাধব
দাঁড়িয়ে আছে যুব যুগ।
এলে কথা হয়
গল্প হয় না আর
গল্প শোনার মানুষ নেই। কবিতা হয় না বিপ্লব।
তুমি
তুমি নেই
পড়ে আছে তোমার ছায়া
দ্যাখা নেই কথা নেই কতোদিন
স্মৃতিগুলো অমর।
চাঁদ নেই আকাশে
তবু জোছনা মাখো তুমি
তোমার গায়ে ছুড়ে দিই রাত
স্বপ্ন নিঝঝুম।
তুমি স্বপ্ন
আমি স্বপ্নের মুসাফির
তোমাকে দেখি
তুমি অথৈ জল পিপাসার সমুদ্দুর।
ধর্মান্ধ
পৃথিবীর গর্ভে প্রসব যন্ত্রণা
জন্ম নিচ্ছে মানুষ
কপট ভালোবাসা।
সব পেয়েছির দেশ ফাঁকা
শূন্য হৃদয়
ভালোবাসা ছিলো আজ নেই।
আঁশটে গন্ধ
বুকের ভেতর অশান্ত ঢেউ
ঘর ভাঙে বিচ্ছেদ
বিভক্ত মানুষ।
ভাঙছে ঐক্য
থেমে যাচ্ছে জীবনের সংগ্রাম
আমরা তবু ধর্মান্ধ।
শামীম নওরোজ
বার্তা
বিষয়টি বোঝা জরুরি নয়
বেগানা বাতাস ঘোরে গোরস্থানে
বেগানা বৃষ্টি পড়ে শ্মশানঘাটে
পাখিরা কাচা ও পাকা ফলের স্বাদ বোঝে
মানুষেরা বোঝে প্রেম ও প্রকৃতি
বিষয়টি খুব বেশি জরুরি
কাজ নেই, কথা আছে
কথা নেই, কাজ আছে
পাখি ও মানুষ উভয়ই জীব
বিষয়টি বোঝা তেমন জরুরি নয়
বিষয়টি বোঝা খুব জরুরি
বিবৃতি
আমি মানুষ, একলা মানুষ
ভীষণ একা
ফাঁকা ঘরে একা থাকি
টেবিল আছে, চেয়ার আছে
হাজার পাঁচেক বইও আছে
আমি মানুষ, একলা মানুষ
একথাটি ঠিক নয়
আমি মানুষ, একলা মানুষ
আট কোটির কম নয়
দূরে-কাছে আমরা সবাই
এ ওর প্রিয়
অপেক্ষা
বাবা মা'র জন্য অপেক্ষা করছে
মা বাবার জন্য অপেক্ষা করছে
ভাই বোনের জন্য অপেক্ষা করছে
বোন ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে
আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করি
তুমি তোমার জন্য অপেক্ষা করো
কেউ ভিক্ষুকের জন্য অপেক্ষা করে না
পথ চলতে যতটুকু...
যাপন
কেউ ঘুরে যাচ্ছে শ্মশানের দিকে
কেউ ঘুরে যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে
ফসলের ক্ষেতে সবুজ আগাছা
ক্লান্তিহীন কৃষকের নিড়ানি
শব্দের ভেতর মড়া-পোড়ার ছাই
বাক্যের ভেতর কাফনের সাদা রঙ
ছাই যাচ্ছে শ্মশানের দিকে
কাফনের সাদা যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে
মানুষের যাবার কোনো জায়গা নেই
গল্পাণু
পাথর ও হাওয়া
মাখনলাল প্রধান
যেন অনন্তকাল অপেক্ষা করেছিল পাথরপুরের পাথর একান্ত হাওয়ার জন্য ।
সূর্যের আঁচড়ে ফালাফালা শরীরে সে জমিয়ে রেখেছিল অনন্ত নীরবতা ।
হাওয়া জানত , মানত না পাথরের উত্তেজনা ।এবং ছুঁয়ে যাওয়া তার স্বভাবেই ছিল , তবু আমল পেত না ।
অনেকদিন পরে একদিন হাওয়া না এসে পারল না , দাঁড়াল পাথরের মুখোমুখি ।
পাথরের ঠাণ্ডা চোখে রাশিরাশি কথা যেন জমাট বেঁধে থমকে আছে ।
হাওয়া অনুরক্ত স্বরে বলল —" আমি তোমার কথাই শুনতে চাই । "
পাথর কেটে কেটে বলল— "সেসব কথা তো কবেই বলা হয়ে গেছে ।"
হাওয়া কিছুক্ষণ থমকাল , তারপর উড়ে চলে গেল দূর আকাশে ।
বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে গেল ছোট্ট অভিমান —
"স্ট্যাচুর সঙ্গে সম্পর্কে আমি বাঁধন মানি না ।"
সুইট ডিলেমা
শিখর চক্রবর্তী
মাখনলাল প্রধান
যেন অনন্তকাল অপেক্ষা করেছিল পাথরপুরের পাথর একান্ত হাওয়ার জন্য ।
সূর্যের আঁচড়ে ফালাফালা শরীরে সে জমিয়ে রেখেছিল অনন্ত নীরবতা ।
হাওয়া জানত , মানত না পাথরের উত্তেজনা ।এবং ছুঁয়ে যাওয়া তার স্বভাবেই ছিল , তবু আমল পেত না ।
অনেকদিন পরে একদিন হাওয়া না এসে পারল না , দাঁড়াল পাথরের মুখোমুখি ।
পাথরের ঠাণ্ডা চোখে রাশিরাশি কথা যেন জমাট বেঁধে থমকে আছে ।
হাওয়া অনুরক্ত স্বরে বলল —" আমি তোমার কথাই শুনতে চাই । "
পাথর কেটে কেটে বলল— "সেসব কথা তো কবেই বলা হয়ে গেছে ।"
হাওয়া কিছুক্ষণ থমকাল , তারপর উড়ে চলে গেল দূর আকাশে ।
বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে গেল ছোট্ট অভিমান —
"স্ট্যাচুর সঙ্গে সম্পর্কে আমি বাঁধন মানি না ।"
সুইট ডিলেমা
শিখর চক্রবর্তী
অষ্টমীর সকালে মেসেজটা ঢুকলো। বোস্টন থেকে কলিগ অর্ক..., "কোম্পানির লে অফ ক্যান্সেল। এমপ্লয়ীদের পাঁচ দিনের মধ্যে জয়েন করতে বলছে এমডি... ফিরে আয় নেক্সট ফ্লাইটেই।"
খুশিটা অনুভব করতে করতেই রাধিকার মেসেজ, "আমার সেক্টর ফাইভে টিসিএস জবটা এইমাত্র কনফার্মড। নাউ উই ক্যান ম্যারি অর্ণব। তোর জবটা গেছে তো কী? দ্যাখ আমি তো পেয়ে গেছি। আপাতত তাতে সংসার পাতাই যায়। তারপর তোর ব্রাইট সিভি আছে তো। এখানে কেউ না কেউ ডেকে নেবেই, আই প্রমিস।"
এত সুইট ডিলেমায় আগে পড়েনি অর্ণব।
"সি ইউ সুন" ... রাধিকার স্ট্যাটাসে সপরিবারে দুর্গা, ঘরের দাওয়ায়।
ফ্লাইট টিকেট বুকিং সাইটটা বন্ধ করে কল লগে রাধিকার নামের ওপর আঙ্গুল...
শহরের আলো আর নিঃশব্দ রাত
জয়শ্রী দাস
রাতের শহরে আলো ঝলমল করছিল। মাস্ক পরে সবাই তাড়াহুড়ো করছিল—করোনার নতুন ঢেউ আবার এসেছে। মেয়েটি অল্পবয়সী, চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। “সব ঠিক আছে, মা,” সে বলল, অথচ ভেতরে ভয় আর অনিশ্চয়তা। পাশের রাস্তা দিয়ে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজছিল। হঠাৎ একজন বৃদ্ধ তার কুকুরকে নিয়ে ঘুরতে এল। তারা চোখে চোখ রাখল—একটু শান্তি, এক মুহূর্তের নিঃশব্দ বন্ধুত্ব। শহরের হাহাকার, ব্যস্ততা আর আতঙ্কের মাঝেও কিছু মানুষের ছোট্ট সম্পর্কই যেন বাঁচিয়ে রাখে মানবতার আলো।
ছোটগল্প
গল্পের নাম - উমা
সমীর জানা
“ আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত....”
সবটাই কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। শরৎকালের কাশবন সাথে সাদা তুলোর মতো মেঘ এখন আর এমনি এমনিই চোখে পড়ে না বরং রীতিমতো চিরুনি তল্লাশি করে অতিকষ্টে খুঁজে বের করতে হয়। কেউ আর গলা জড়িয়ে ধরে বলে না– “দাদান, আজ আর পড়া নেই, এবার কিন্তু একটা গল্প তোমাকে বলতেই হবে ।” –এসব ভাবতে ভাবতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত শ্রীহট্ট গ্রামের সর্বাপেক্ষা পৌঢ় বৃদ্ধ ব্রজনাথ মন্ডল প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও মহালয়ার ভোর সাড়ে চারটায় রেডিওতে শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ন ভদ্রের এই কালজয়ী সৃষ্টি পুনরায় নতুনভাবে অধ্যয়ন শুরু করেছেন। তবে এবারে এই কালজয়ী সৃষ্টিখানি যে ব্রজবাবুর চিত্তে বিন্দুমাত্রও রসের সঞ্চার করতে পারছে না তা অতি স্পষ্টতই নজরে পড়ছে। তার কারণ হতে পারে নিজের একমাত্র ছেলে এখন চাকরি হারিয়ে বাড়িতে বসে আছে এবং এ নিয়ে ছেলে-বৌমার রোজকার অশান্তি। যাইহোক, কোনোমতে ভোরের আলো ফুটতেই ব্রজবাবু তড়িঘড়ি রওনা দিলেন পাড়ার মোড়ে নিতাইয়ের চায়ের দোকানের দিকে।
– আরে ব্রজবাবু যে, বেশ অনেকদিন পর দেখলাম আপনাকে, তা ভালো আছেন তো?
– হ্যাঁ, ওই আছি একরকম, না মরে কোনোমতে বেঁচে আছি মাত্র। জানি না হরি যে আরো কত কষ্ট লিখে রেখেছেন আমার এই পোড়া কপালে!
– কেন, হঠাৎ একথা বলছেন, আবার কি হলো না-কি?
– আর নতুন করে কি আর হবে, এই বুড়ো বয়সে ছেলে-বৌমার রোজকার এই অশান্তি আর ভালো লাগছে না। এর মধ্যে আবার একমাত্র নাতিটাও হয়ত এই অশান্তির কারণেই কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে। দে নিতাই দুটো চা দে। তা আপনার খবর কি?
এই শ্রীহট্ট গ্রামে নবাগত ভদ্রলোক উমানাথ সামন্তের সাথে কথোপকথনের মধ্যেই মোড়ের মাথার ওই প্রাচীন বটগাছটার কাছ থেকে একটা হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগলো।
– ও কীসের আওয়াজ বলুন তো, সামন্তবাবু ?
– ঠিক বুঝতে পারছি না, চলুন তো গিয়ে দেখি একবার।
নিমাইকে দুজনের চায়ের দাম দিয়ে ব্রজবাবু, উমানাথ সামন্তকে সাথে করে ওই হট্টগোলের দিকে এগিয়ে চললেন। একটি একুশ-বাইশ বছরের ক্ষ্যাপা তবে অত্যন্ত সুশ্রী এবং ভদ্রগোছের চেহারার স্ত্রীলোককে ঘিরে কয়েকটি তরুণ যুবক এই হট্টগোল শুরু করেছে। মেয়েটিকে অবশ্য দেখলে মনে হবে যেন কোনো ব্রহ্মময়ী দেবীমূর্তিতে কে যেন প্রহসনবশত একটি ক্ষ্যাপা পাগলিনীর বেশকে অত্যন্ত বলপূর্বক স্থাপন করিয়েছেন; আর মেয়েটিও যেন প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে এই অনাগত ক্ষ্যাপা রূপ পরিধান করেছে। মেয়েটির মাথার ঘন চুল অগোছালোভাবে সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরনে একটি ময়লা ও ছেঁড়া লাল রঙের কাপড়, যার আঁচল অবিন্যস্ত ভাবে রাস্তায় গড়াছে। কোথাও কোনো অলঙ্কারের চিহ্ন মাত্র নেই। মেয়েটির কথায় জড়তা স্পষ্ট এবং অসংলগ্ন ব্যবহার দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যহীন। যাইহোক, এই ক্ষ্যাপা মেয়েটিকে দেখে যুবকদের এই হট্টগোলের কারণটা দুজনের কেউই ঠিক বুঝতে পারলেন না।
কিন্তু উমানাথ সামন্ত, ব্রজবাবুর দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন। কারণ ব্রজবাবুর চোখ দুটো ইতিমধ্যেই স্থির ও বেশ বড়ো বড়ো লাগছে এবং অপলক দৃষ্টিতে তিনি কয়েক মুহূর্ত ধরেই ক্ষ্যাপা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠিক যেন কোনো পুরোনো ঝাপসা ইতিহাস হঠাৎ করেই তিনি চাক্ষুষ দেখতে পেয়েছেন।
– কী হলো ব্রজবাবু, আপনি চেনেন নাকি মেয়েটাকে?
ব্রজবাবু এই প্রশ্ন যেন শুনতেই পেলেন না। তিনি ঠিক পূর্বের ন্যায়-ই দাঁড়িয়ে থাকলেন। এবারে উমানাথ সামন্ত অল্প নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
– ও ব্রজবাবু? কৈ কিছু উত্তর দিলেন না যে, মেয়েটাকে চেনেন নাকি?
এই ঘোরের মধ্যে হালকা নাড়া পেয়েও ব্রজবাবু কেঁপে উঠলেন। তারপর বিষয়টা বুঝে নিজেকে সামলে নিলেন।
– ওহ্, হ্যাঁ, ওই একটা পুরোনো ঘটনা মনে পড়ে গিয়েছিল আরকি।
– হ্যাঁ সে তো আপনাকে দেখেই বুঝেছি। ত এই মেয়েটা কি আপনার পরিচিত?
– হ্যাঁ, পরিচিত মানে, খুব ভালো ভাবেই! চলুন তাহলে সব খুলে বলছি।
বড় অদ্ভুত এই ইতিহাস, বুঝলেন! আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগেকার কথা ।তখন অবশ্য এত ঘন জনবসতি গড়ে ওঠেনি। শুধু থাকার মধ্যে গোটা পঞ্চাশ খানা বাড়ি, আর এই পাকা রাস্তার বদলে ছিল মোরামের রাস্তা, এই নিতাইদের চায়ের দোকান আর ওই বটগাছের নিচে মোহন পটুয়ার দোকান।
এই মোহন পটুয়ার পুরো নাম হল মোহন সমাদ্দার। মোহনের ঠাকুরদা আর বাবা পদ্মলোচন সমাদ্দারও এই একই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। আর এই মোহন সমাদ্দারের স্ত্রী হল উমা সমাদ্দার।
– ও আচ্ছা, কিন্তু এই উমা সমাদ্দারের এরকম অবস্থা হল কী করে? আর এর পুরো পরিবারই বা গেলো কোথায়?
– হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনুন তবে, সেটাই বলছি!
মোহনরা আগে নাকি কৃষ্ণনগরে বসবাস করত। কিন্তু যখন মোহনের ঠাকুরদা ওই কৃষ্ণনগরে থাকাকালীন মারা যান তখন সবাই এই শ্রীহট্ট গ্রামে এসে বসবাস করতে শুরু করে– এ কথা মোহনের বাবার কাছ থেকেই শুনেছি আরকি। এবার পরবর্তীকালে তো মোহনের বাবা পদ্মলোচন সমাদ্দার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তারপর অনাথ মোহন তাদের এই ব্যবসার হাল ধরে।
– দাঁড়ান দাঁড়ান, অনাথ বলছেন কেন? ওর কি মা ছিল না?
– না, ওঁর মা ও যখন ছোট ছিল সেই থেকেই ওকে ছেড়ে চলে যান।
– ও, তারপর?
– তারপর আর কি, ধীরে ধীরে মোহনের নামডাক হতে শুরু করল। এই গ্রাম পেরিয়ে পাশের গ্রাম থেকে বায়না আসতে থাকল। মোহন সমাদ্দার ধীরে ধীরে মোহন পটুয়া নামে পরিচিত হল। আর সত্যি সত্যিই মশাই, ওর হাতে গড়া মূর্তিগুলো শুধু মূর্তি তো নয় যেন সাক্ষাৎ ভগবান এসে বিরাজ করছেন। সে যাইহোক, গন্ডগোল একটা হল আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে এক দুর্গামূর্তির গড়ন নিয়ে।
পূজোটা ছিল থিমের পূজো। থিমের নাম ‘নবরূপে’। আর গ্রামে এই প্রথম কোনো থিমের পূজো হচ্ছে বলে চারিদিকে একেবারে হৈ হৈ রবও উঠেছে।
– হ্যাঁ, এটা হওয়া তো স্বাভাবিক, কিন্তু তাতে সমস্যা টা কি ?
– সমস্যাটা ছিল মূর্তির গঠনে। ওই দুর্গামূর্তি প্রচলিত দুর্গা মূর্তির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ওই মূর্তিতে দশ হাতের বদলে দুটো হাত এবং সেটা মায়ের দুই কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতী একটি মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধছে। মায়ের ত্রিশূল আছে মহিষাসুরের হাতে, আর ত্রিশূল এর ফলা ঘোরানো আছে মায়ের দিকে। মায়ের দুই পুত্রের মধ্যে শ্রী গনেশ অসুরকে সমাদরে ফলমূল খাওয়াচ্ছেন আর কার্তিক অসুরের চরণ সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। প্রতিমার পুরো চালচিত্র জুড়ে সমাজের যত রকমের প্রসিদ্ধ-অপ্রসিদ্ধ কাজ আছে তার সবকটিই একেবারে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মূর্তির বেদিতে তুলনায় ছোট আকৃতির ওই খড় মাটি দিয়েই একদল যুবককে নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে কেউ কেউ বইয়ের উপর বসে নেশা আর তাসের আড্ডা বসিয়েছে; কেউ মদ্যপ অবস্থায় একটি মেয়ের সাথে কদর্য কাজে লিপ্ত; আবার কেউ এই সব কিছুর ভিডিও তৈরি করতে ব্যস্ত।
– আরে কি বলছেন মশাই! এর মানে কী?
– তবে আর বলছি কি, আর যদি মণ্ডপের ভেতরে আপনি যেতেন তবে মর্তে বসে নরক যে ঠিক কি ও কেমন হয়, তা আপনি পরিষ্কার বুঝতে পারতেন।
কারণ, ওই মণ্ডপের ভেতর থেকে স্বর্গীয় ধূপ-ধূনো, সুগন্ধি ফুল, ফলের গন্ধের বদলে আসছিল বিকট নেশাজাতীয় দ্রব্যের গন্ধের সাথে মেশানো অগণিত পচনগ্রস্ত শবদেহের অকল্পনীয় বিকট গন্ধ; যে দেহগুলো হয়ত কোনো মদ্যপ কর্তৃক নিগৃহীতা হয়েছিল অথবা কোনো প্রতিবাদী মিছিলে অংশগ্রহণকারী যুবক-যুবতী নতুবা বীরের মতো সত্য কথা ফাঁস করে দেওয়ার অপরাধে সাজানো কোনো যানবাহন দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তি।
– আহা, ব্রজবাবু যে হঠাৎ সাহিত্যিক হয়ে গেলেন দেখছি!
– ওই মাঝেমধ্যে একটু ঘোরে ডুবে যাই আরকি।
– ওহ্, সে ঠিক আছে, তারপর কি হল, বলুন?
– তারপর আর কী, মা জগজ্জননী কে নিয়ে এরূপ প্রহসনে গোটা গ্রাম একেবারে তোলপাড় হয়ে গেল। রীতিমতো গ্রামে বৈঠকও বসলো এবং এই মূর্তি নির্মাতা মানে মোহন সমেত থিম উদ্যোক্তাদের ডাক পড়ল। আর জানেন তো মশাই– মানুষ বড়ই স্বার্থপর! যখন নিজের বিপদ দেখতে পায় তখন নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে এক মুহূর্তও দেরি করে না। আর ঠিক সেটাই হল। এই প্রসঙ্গে থিম উদ্যোক্তারাও বিপদ বুঝে এই দোষ মোহন পটুয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বলল– ‘এই যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা সব এই মোহন পটুয়ার।’
ব্যাস, সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে মোহন সমাদ্দারকে তার পরিবার নিয়ে শুধু এই গ্রাম নয় বরং এই জেলা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর সেইমতো নিজের এই ভিটেমাটি ছেড়ে নিজের একমাত্র স্ত্রী উমাকে নিয়ে মোহন পটুয়াও কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
– সে কি, মোহন বা আপনারা কেউ প্রতিবাদ করেননি?
– আরে মশাই, পাল্লা যেদিকে ভারী হয় চিরকাল বিচারও ঠিক সেদিকেই গড়ায়। আর তখন তো সবাই রাগে-ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যা বলছে তা বিচার করার সময় কারুরই ছিল না আর যাদের ছিল তাদের পাল্লাটা মোটেও ভারী ছিল না, মশাই!
– হ্যাঁ। সেও বা ঠিক; আচ্ছা, তাহলে উমা সমাদ্দারের এরকম ক্ষ্যাপা অবস্থা কীভাবে হল?
আর এই মোহন পটুয়াই বা কোথায়?
– সে আর আমি কী করে জানবো। তবে শুনেছি মেয়েটা নাকি ছোটোবেলা বাবা মাকে হারিয়েছে। খুব দুঃখ- কষ্টে নিজের ঠাকুমার কাছে মানুষ হয়েছিল। যাইহোক, আসছি সামন্তবাবু, শুভ মহালয়া!
ভাগ্যের ফের
অর্পিতা দাস
বেলা প্রায় গড়িয়ে এল। সুভাষিণী ইতস্তত হয়ে এদিক ওদিক তাকায়। না, যত দূর চোখ পড়ে ঐ মুখ কোথাও নেই। কীজানি বাপু, বলে গেলে এই যাবো আর আসবো,পথ ভুলে যায়নি তো?পেটের ভিতরটা চু চু করছে।
ঝালমুড়ি ঝালমুড়ি বলতে বলতে লোকটা সুভাষিণীর গা ঘেঁষে চলে যায়। বিরক্ত হয়ে সুভাষিণী,আ মোলো যা, চোখের মাথা খেয়েচ নাকি?
সুভাষিণী আরেকটু আঁটোসাটো হয়ে বসে। প্ল্যাটফর্মের ব্যস্ততার মাঝে নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই যাদের কাজ তাদের এতো কিছু দেখার বা ভাবার সময় কই। কিন্তু গগন কোথায়?একবার কী এগিয়ে... হুইস্যাল মেরে মেরে ট্রেন ছুটে চলেছে। কিন্তু কোথায় খুঁজবো? এতো লোকজনের মধ্যে কোন পথেই বা যাওয়া যায়। বসে বসে কোমরটাও ব্যথা হয়ে গেল, গগন তো সবই জানে। সে ছেলেটাকে পেটে ধরেনি বটে,তবে পেটে ধরার থেকে কম কিছু করেনি।
দুধের শিশু রেখে মা মারা গেলে। বাপ মনের দুঃখে দেশান্তরী হলে। একরত্তিকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে সে। না না গগন এরকম ছেলেই নয়। গরীবের ঘরে দু'বেলা ঠিকঠাক খাবারই জোটে না, জমানো পয়সা তো স্বপ্ন। এই খা খা রোদ্দুরে ছেলেটা দু'টো পয়সার জোগাড় করতে গেলে। যাওয়ার সময় বারবার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল,অচেনা অজানা জায়গায় পিসিমাকে একা রেখে যাচ্ছে - এ যুগের হয়েও ছেলেটা বড্ড সরল।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে চলল। সুভাষিণীর পাশের যাত্রীরা সবাই গন্তব্যের দিকে ছুট লাগিয়েছে। কোন ভোর বেলা এসেছে স্টেশনে। না পেটের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে,নানা রকম খাবারের গন্ধ ভেসে আসছে কিন্তু হাতে তো কোনো পয়সাকড়ি নেই। খালি পেটে আর কতক্ষণই বা থাকা। রুটি তরকারির ছেলেটাকে একবার... না, থাক বাপু,যদি না করে দেয়। যতই হোক বামুনের ঘরের বিধবা, কিন্তু পেটাটাও তো বাগ মানছে না। উঁকিঝুঁকি মেরে দেখে নেয়। না,গগনের ছায়াটুকু দেখা যাচ্ছে না।
মাইজি, কাহাকে খুঁইজছ্যান? প্রশ্ন শুনে গুটিসুটি হয়ে বসে সুভাষিণী, হ্যাঁ বাবা, আমার ছেলেই বলতে পারো।
আমি সুবোধ মাইজি। ছেলেটি মৃদু হেসে, তার আশা আপনি ইক্কেবারে ছ্যাড়ে দ্যান মাইজি।
চোখ বড় বড় করে সুভাষিণী, এই ভর সন্ধ্যা বেলা ও কী অলক্ষুণে কথা কইচ তুমি?
কইছি কী আর সাদে। এই চোখ তো কত্ত কী দেখিছে। চক্ষের আর কাম কী মাইজি? যা দ্যাখে তাই সে মনে গ্যাঁথে লয়।
আপনি সাদাসিধা আছেন, তাই ইতক্ষণ অপেক্ষা কইরছেন।
তুমি কী বলতে চাও?
কিচ্ছুই লয় ।
এই সুবোধ ব্যাপারী কুড়ি বছর ধইরে টেরেনে হকারি কইরছে,আপনার মত কত্ত মাইজিকে দেখিছে,প্যাটের সন্তানেরা প্যালাটফরমে ফেলি গেইচে । শ্যাষে রেলপুলিশের সাহাইয্যে কুথাও মাথা গুজার ঠাঁই হইছে।
তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আমার গগন এই রকম কিছুতেই করবে না।
না কইরলেই ভাল। নিশ্চয় সারাদিন কিচ্ছু খাওয়া হয় লাই ?
বালতি থেকে দু'টো রুটি বের করে দেয়।
হাতে নিয়ে সুভাষিণী, খিদের পেটে লজ্জা কী বল?তাছাড়া তুমিও আমার গগনের মতোই।
মুচকি হেসে সুবোধ চলে যায়।
সমস্ত প্ল্যাটফর্মে আলোর বন্যা বইছে। দূরপাল্লার ট্রেনগুলি হুইশ্যাল দিতে দিতে বুকের পাঁজর কাঁপিয়ে ছুটে চলেছে। অনেকে মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে পড়েছে। পা দুটি টনটন করছে, শুয়ে পড়বার জো নেই। গগন যদি এসে এই ভিড়ের মধ্যে খুঁজে না পায়।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। যাত্রীর ওঠানামা একই রকম। শুধু সুভাষিণীই চিরকাল সংসারের ঘানি টেনেও অচল হয়েই রইল। সুবোধ ব্যাপারীর কথাটা এখনও তার বিশ্বাস হতে চায় না। যতই হোক...
চোখের জল মুছে ফেলে সুভাষিণী , তাতে যে সন্তানের অকল্যাণ হয়।
আনুপূর্বিক
দেবব্রত বিশ্বাস: জীবন, প্রেম ও রবীন্দ্রসঙ্গীত
ভাস্কর সিনহা
রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে দেবব্রত বিশ্বাস একটি অপরাজেয় কিংবদন্তি নাম। তিনি শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরকে নয়, বরং এই সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত ভাব ও আবেগকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে উঠেছিল স্বপ্নের মতো মায়াবী, হৃদয়স্পর্শী ও অন্তরঙ্গ। দেবব্রত বিশ্বাস শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রেমের গভীর অনুভূতির ধারক, ব্যথা-বেদনার নীরব সাধক এবং রবীন্দ্রনাথের গানের একনিষ্ঠ পূজারী। তাঁর ব্যক্তিজীবন, বিশ্বাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দিয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব।
১৯১১ সালের বরিশালের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অসাধারণ মানুষটি জীবনের প্রথম প্রহর থেকেই রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। সেই আকর্ষণ তাঁকে টেনে নিয়ে আসে শান্তিনিকেতনের ছায়াতলে। বিশ্বভারতীতে তিনি পেয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ও স্নেহময় দিকনির্দেশনা, যা তাঁর সঙ্গীতজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করেছিল। বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতনের দিনগুলোতে দেবব্রত বিশ্বাস নিজের কণ্ঠে এমন এক সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য ধারণ করেছিলেন, যা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে দিয়েছিল এক অভিনব ও গভীর মাত্রা।
দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি আজও শ্রোতার হৃদয়ে গভীরভাবে অনুরণিত হয়। তাঁর কণ্ঠের গভীর আবেগ, সূক্ষ্ম অনুভূতি, নিখুঁত উচ্চারণ এবং অন্তর্নিহিত ভাবনার স্বচ্ছতা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অমৃতধারাকে আরও হৃদয়গ্রাহী ও অর্থবহ করেছে। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন নিজস্ব শিল্পবোধের মাধ্যমে। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান যেন শ্রোতার হৃদয়ে এক অপার্থিব আবেশ সৃষ্টি করে।
দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন যেমন সুরেলা ছিল, তেমনি ছিল প্রেমময়, মায়াবী ও রহস্যময়। তাঁর প্রেমিক হৃদয়ে ছিল গভীর সংবেদনশীলতা ও মর্মবেদনা। যদিও তিনি সারাজীবন অবিবাহিত থেকে গিয়েছিলেন, তবুও প্রেমের অনুভূতিগুলো তাঁকে স্পর্শ করেছিল গভীরভাবে। তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে প্রেমের অনুভূতি যেন এক মায়াবী মূর্তি হয়ে বিরাজ করত। সেসব অনুভূতি কখনো প্রকাশ্য রূপ নেয়নি, বরং নীরবতার গভীরে থেকে তাঁর গানে প্রাণ দিয়েছে। তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন যেন একটি গভীর কবিতা, যেখানে বিরহ ও প্রেম একাকার হয়ে গিয়েছিল এক অসীম নৈঃশব্দ্যে।
দেবব্রত বিশ্বাসের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও ছিল এক অনন্য সমন্বয়। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চেতনার ধারক হিসেবে তিনি ছিলেন সমাজের প্রতি গভীরভাবে দায়বদ্ধ। তিনি শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে যেতেন না, সমাজের জন্য গণসঙ্গীতেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। তিনি গান দিয়ে সমাজের মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সমাজের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল তাঁর গান।
বিংশ শতকের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেও ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্ব ও শিল্পসম্মত সমঝোতা। ঋত্বিক ঘটকের বহু চলচ্চিত্রে দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া গান ব্যবহৃত হয়েছে, যা চলচ্চিত্রের অন্তর্নিহিত বার্তা ও আবেগকে আরও গভীর ও অর্থবহ করেছে। ঋত্বিক ও দেবব্রতর সৃজনশীল সম্পর্ক বাংলা সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন ও সঙ্গীত আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক ও মানসিক জগতের অপরিহার্য অংশ। তাঁর জীবনের গভীর প্রেম, নিঃসঙ্গতা, সুরের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও সামাজিক সচেতনতা তাঁকে করে তুলেছে সত্যিকার অর্থেই ‘এক অনন্য, বিরল ও অতুলনীয় শিল্পী’। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে দেবব্রত বিশ্বাস শুধু একটি নাম নয়, তিনি এক গভীর আবেগ, নিঃসঙ্গ প্রেম ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে বাঙালি সংস্কৃতির হৃদয়ে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।
বিশ্বভারতী দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনে ছিল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তাঁর সত্তার গভীরে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নের প্রতীক, এক আলোর অভিমুখ। শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথের নিজ হাতে গড়া এই বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে দেবব্রত বিশ্বাস অনুভব করেছিলেন এক আধ্যাত্মিকতার সংস্পর্শ, যা তাঁকে জীবনের বাকি পথেও পথ দেখিয়েছে। তাঁর সঙ্গীতের হাতেখড়ি এই প্রতিষ্ঠানেই। বিশ্বকবির আশীর্বাদমাখা মাটিতে তাঁর কণ্ঠে ধীরে ধীরে ফুটে উঠেছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতের অপার্থিব সৌন্দর্য। শান্তিনিকেতনে কাটানো দিনগুলো ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়, যেখানে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন শিল্প ও মানবতার অনন্য এক মেলবন্ধন।
তরুণ দেবব্রতের চোখে তখন উজ্জ্বল স্বপ্নের আলো, তাঁর কণ্ঠে তখন নবীন দিনের উচ্ছ্বাস। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে তিনি কেবল সুরের দীক্ষাই পাননি, পেয়েছিলেন এক গভীর জীবনের পাঠ। শিল্প ও মানবতার মেলবন্ধন যেন এক মোহময় আবেশে ঘিরে ফেলেছিল তাঁকে। প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা ছিল তাঁর কাছে নতুন আলোর অভিষেক। সেখানেই তিনি শিখেছিলেন, শিল্পী হওয়া মানেই শুধু শিল্পকে ভালোবাসা নয়, বরং মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বুকে ধারণ করা। শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণে বসে, দেবদারু গাছের নীচে বসে তিনি অনুভব করেছিলেন এক অসীম প্রশান্তি, যা তাঁর কণ্ঠে এনে দিয়েছিল অমৃতময় মাধুর্য।
কিন্তু জীবনের পথ কখনও সরলরেখায় চলে না; তার থাকে বাঁক, থাকে বেদনার গভীর খাঁজ। দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনেও এসেছিল সেই বাঁক। বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর কিছু মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, যা ছিল তাঁর জন্য গভীর বেদনার। এই বিরোধ তাঁর হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল গভীর ক্ষত। সেই যন্ত্রণা তাঁর কণ্ঠে যেন যোগ করেছিল নতুন মাত্রার আবেগ ও গভীরতা। তাঁর গান তখন হয়ে উঠেছিল আরও বেশি সংবেদনশীল, আরও বেশি মর্মস্পর্শী। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে সেই প্রিয় আশ্রমকে তিনি কখনও ভুলতে পারেননি। সেই অনির্বচনীয় মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে ছিলেন তিনি সারাজীবন। বিশ্বভারতী তাঁর কাছে ছিল মাতৃস্বরূপ, তার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চিরন্তন ছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি শান্তিনিকেতনকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন গভীর প্রেম ও শ্রদ্ধায়।
চল্লিশের দশকের বাংলায় যখন অগ্নিঝরা দিনগুলি প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন দেবব্রত বিশ্বাস হয়ে উঠেছিলেন এক সুরের সৈনিক। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী আদর্শকে সঙ্গী করে তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল সমাজ-সংস্কারের হাতিয়ার। তাঁর গান ছিল শুধু সুরের সমাহার নয়, সমাজের নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ের ভাষা। 'আগুনের পরশমণি' বা 'ও আমার দেশের মাটি'—এমন গানগুলোর মধ্য দিয়ে দেবব্রত বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন মুক্তি ও ন্যায়বিচারের বাণী। গণসঙ্গীত আন্দোলনের মঞ্চে তাঁর গান ছিল প্রতিবাদের, পরিবর্তনের ও নতুন আলোর বার্তা।
দেবব্রতের কণ্ঠে ছিল এমন এক অনুরণন, যা মানুষের বুকের গভীরে গিয়ে স্পন্দিত হতো। তাঁর গানে শোনা যেত নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। সমাজের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা তাঁকে দিয়েছিল সঙ্গীতের নতুন এক ভাষা, যা ছিল কবিতা ও বাস্তবতার এক অসাধারণ সমন্বয়। তিনি যখন গাইতেন, তখন মনে হতো যেন মানুষের হৃদয় থেকে উঠে আসা কান্না ও আশার শব্দ ফুটে উঠেছে তাঁর কণ্ঠে। তাঁর গানের প্রত্যেকটি শব্দ ছিল মানুষের জন্য, মানবতার জন্য, সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠার জন্য।
সেই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন শুধু কণ্ঠ দিয়ে নয়, হৃদয়ের সম্পূর্ণ আবেগ দিয়ে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁর কণ্ঠকে দিয়েছিল আরও গভীরতা, আরও শক্তি। তাঁর গাওয়া গান শুনলে আজও অনুভব করা যায়, কেমন করে তাঁর কণ্ঠ সমাজের বুক চিরে গভীর আবেগে প্রবাহিত হয়ে যেত। মানুষের হৃদয়ে সেই গান বেঁচে আছে আজও, চির অম্লান, চির অমর।
দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন ছিল শুধু তাঁর একার নয়, বহু বিশিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর ছিল এক বিশেষ সখ্য, শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক ছিল মধুর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গণসঙ্গীত আন্দোলনের মঞ্চে একটি যুগান্তকারী মেলবন্ধন। উৎপল দত্ত, সলিল চৌধুরীসহ বহু গুণী মানুষের সঙ্গেও তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই সকল সম্পর্ক তাঁর শিল্পীজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
এই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার এক বিরল উদাহরণ। এই সম্পর্কের মাধ্যমেই তিনি সমাজের প্রতি তাঁর অঙ্গীকারকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন, নিজের শিল্পীসত্তাকে আরও গভীর ও তাৎপর্যময় করে তুলেছিলেন।
দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী নন, তিনি ছিলেন মানবতার কণ্ঠস্বর, প্রেম ও সৌন্দর্যের এক বিরল সাধক। তাঁর জীবনের গভীর প্রেম, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিঃসঙ্গতার গভীর উপলব্ধি এবং শিল্পের প্রতি তাঁর অমোঘ ভালোবাসা তাঁকে করেছে অমর। তিনি বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছেন তাঁর গানের মাধ্যমে, তাঁর আদর্শের মাধ্যমে। দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠ যেন আজও আমাদের বলে যায়, ভালোবাসা, মানবতা ও সৌন্দর্যের চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে পথ চলার বার্তা। তিনি বাঙালির সংস্কৃতির এক চিরভাস্বর নক্ষত্র, যার আলো আজও অম্লান, আজও আলোকিত।
মুক্তগদ্য
আঁকা
সায়ন চক্রবর্তী
শহরে কারফিউ নেমে এলে পা-দুটো আপনা থেকেই তোমার বাড়ির দিকে যেতে শুরু করে।
চারদিকে দিনবদলের কথা বলে গেছে এদল-ওদল-সকলেই। কালীপুজোর আগের দিন ছাদে
তাততে দেওয়া বাজির মতো তপ্ত শহর। এমন দিনে কেউ দাঁড়িয়ে তারা গোনেনা, গোনেনা
গঙ্গার ওপর জীবনের মতো দুলতে থাকা নৌকো; শুধু নিচু গলায় খোঁজ নেয় আজকের
শেষ লঞ্চটা চলে গেছে কিনা। তারপর বাড়ি ফেরার সময় আর পথের হিসেব কষে বাড়িমুখো
মানুষের ভীড়।
সকলেই বাড়ি ফিরতে চায়। তেমন করে যারা সেকথা জানেনা, তারাও একদিন হঠাৎ মৃত্যুর অবয়ব দেখতে পেলে সেকথা বুঝতে পারে। কারফিউ নেমে এলে শহর জুড়ে যখন মরুভূমির মতো
পড়ে থাকে ফুটপাত আর পরিত্যক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের মতো শুয়ে থাকে রাজপথ, আমি তখন তোমার বাড়ি যেতে চাই, তোমার কোলে মাথা রেখে কাটিয়ে দিতে চাই দুঃস্বপ্নের মতো রাত। যে শরীরের গন্ধ আমার
পৌরুষের প্রতি অলিন্দে লেগে আছে, তার মধ্যে ডুবে ভালোবাসার বীজ বুনতে চাই ইরা। এই কারফিউয়ের
শহরে ঘেন্নার যে ফসল এদল-ওদল-সেদল ঘরে নিয়ে যেতে চায় রোজ, তার থেকে বহুদূরে-
আমরা একটা সবুজ শহরে হলুদ বিকেলে, নীল আর গোলাপির মিশে যাওয়ার ছবি আঁকব।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন