বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০২৪

মুক্তপদ্য

(১)

ফুটপাত দখল হবে মধ্যরাতে
সোমা দত্ত



mukta gadya 1


এত আলো তবু অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে শহর। তলিয়ে যাচ্ছে শীতল রক্তের দূষিত মেঘ। আঙুলের ক্লিকে মৃত্যু আর তার নিদারুণ যন্ত্রণা ঘুরে চলেছে প্লেট থেকে প্লেটে। উচ্ছিষ্টভোগীর জিভ উপরে নেবে বলে ছুটে চলেছে মানুষ। হাতে পোস্টার, স্লোগান। মুখের কশ বেয়ে পড়ছে উত্তেজনা। একের পর এক রাত এসে হাত ধরছে মেয়েদের। এইসব জোয়ার ভাটা অতিক্রম করে একটি ক্ষতবিক্ষত লাশ হেঁটে চলেছে পরজন্মের দিকে। নতুন করে সহ্য করবে বলে। নতুন করে সহ্য করবে তার গতজন্মের পরিচয়, মৃত্যুর মুখাপেক্ষী যন্ত্রণাসমূহ। যে সত্য অদৃশ্য তার ক্ষমতা অসীম। যে সত্য অদৃশ্য তার একশ' আট নাম। যে সত্য অদৃশ্য তার দশটি মাথা, একান্নটি ধাম।
তবে আমাদের গন্তব্য কী? আমরা কি অন্ধবিন্দুর ভিতরে মিলিয়ে যাওয়ার জন্য জন্ম নিয়েছি?শুধুমাত্র তড়িতাধান যুক্ত কণা? বন্ধনে পেঁচিয়ে ওঠা জটিল অস্তিত্ব, দৃশ্যত যার কোন চূড়ান্ত স্থিতাবস্থা নেই? কোথায় আমাদের হাড়, মজ্জা, হিমোগ্লোবিনের উত্তাপ? শুধুই কি শীতল প্রতিবাদ? ভাঙচুর কি তৈরি করবে না নতুন বানান?
এইসব ভাবতে ভাবতে একদিন শ্রাবণ শেষ হয়ে গেল। বৃষ্টিপাত থামল না তবু। গতকালের পোশাক থেকে ঝরে পড়ছে প্রতিশ্রুতি। কথা দিয়েছিলাম। কথা দিয়েছিলাম বিনামূল্যে বিতরণ করব সত্য। শপথ নিয়েছিলাম বিশ্বাস করব আমার মনের জোর আর প্রাণের মায়া দু মুঠোয় পিষে এগিয়ে যাব তোমার জন্য। বুক চিতিয়ে গুলি খেয়ে যারা মরে গেল তাদের সঙ্গে তুলনা করবনা তাদের যারা পিঠ দেখিয়ে বেঁচে নিল পঙ্গু জীবন। এখনো শ্লোগানে গলা মেলাতে লজ্জা হয় কেন তিলোত্তমা। জানো আমরা আয়না দেখিনা। অথচ আয়না দেখে নেয় আমাদের। কথা রাখতে পারিনি আজও। শ্রাবণ চলে গেল অথচ বৃষ্টি থামল না।
এবং দেখ বিগত দিনগুলোতে তুমি এবং আমি ক্রমাগত কাঁদছি... কাঁদছি... যতিচিহ্ন আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। অথচ তখনো অজুহাতের মতো খুঁজে চলেছি মেরুদণ্ডের যন্ত্রণা, মাছের ঝোলের নুন আর মাসান্তের মাহিনা।
এইসব ভাত আর মাড়ের একান্ত পেটের টান ছিঁড়ে আমরা কি বলতে পারব না উল্টে দাও পাশার দান, বদলে ফেলো পোস্টারের ঠান্ডা ভাষা, ভেঙে দাও আঙুল থেকে ক্লিক করে সিঁড়িতে চড়ার বাসনা। এই ক্রম উত্তোরণের পথ থেকে ফিরে না আসতে পারলে আমাদের বিশ্বাস ভাঙবে না।
শহরে খুন হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন অজস্র লাঞ্ছনা। তুমি আর আমি লুকিয়ে আছি জনসংখ্যার সমুদ্রে। আমাদের বুকে এখনো নম্বর লাগেনি। একটি চিহ্নিত নম্বর হওয়ার বিপদসীমা থেকে কিছুটা দূরে আমরা চিৎকার করছি একযোগে। আমাদের প্রতিবাদ ভিড়ে মেশে, বাড়িতে ফিরে হাঁফায়, গরম চা খোঁজে, কাগজ হাতড়ায়, সোশ্যাল মিডিয়া তরঙ্গে তরঙ্গে খুঁজে নেয় আমাদের চাওয়া পাওয়া। রহস্যভেদ হলে পরে, তুমি আর আমি গুগল হতে পারি একসাথে। স্ট্রিমিং চলবে জীবিত ও মৃত মানুষের। কারফিউ লাগবে শহরে।'ফুটপাত দখল হবে মধ্যরাতে'। মূর্তি ভাঙব আমরা বিস্ফোরণে। স্বৈরাচারের পতন হল বলে স্লোগান দেব। তারপর? কতদূর যাব আমরা? কতটা মাটি খুঁড়ে পুনর্বার আবিষ্কার করব স্নানাগার?
রাজার ঘরের ভিতর রয়েছে সহস্র রাজার ঘর। আমরা একে একে ভাঙছি আর দেখছি একটি নতুন ঘর ঘিরে ধরেছে আমাদের, কী বিপুল মহিমায়। তুমি দাবা খেল না কেন তিলোত্তমা। মেয়েদের খোলা বুক ছুঁয়ে বলছি চেকমেট দেবনা। খেলায় খেলায় ঢেকে রাখব তোমার রহস্য। মরতে ভয় পাই না অথচ মৃত্যুর পেশীবহুল হাতুড়ি দেখলে আমি বদলে ফেলি স্টেটমেন্ট। তোমার ডায়েরি আমি পড়ব না। আমি বেঁচে থাকব এই ধুমধামের পৃথিবীতে, বেঁচে থাকব ছবির পিক্সেলে, ওয়েব ভার্সনে। তোমাকে ট্যাগ করে টেনে নেব দলে। বলব তুমি আমার। একসঙ্গে ভার্চুয়াল জীবন বাঁচব আমরা, ভাইরাল হব, নিলামে দেব তোমার মৃত্যুযন্ত্রণা আর কানের উপরে গোঁজা হলুদ ফুল। তুমি হলুদ ফুলের পাপড়িতে কপিরাইট স্বীকৃত হয়ে প্রেসক্রিপশন লিখবে আমাদের সুস্থতার।
এবং এই নাতিদীর্ঘ ফ্রাস্ট্রেশনের পরে তুমি আমাকে একটি সুলভ বিয়োগ চিহ্ন দেবে সে আমি জানি। আসলে আমি হতাশা লিখছি হতাশাকে ছুরি মেরে। আমাদের ভিতরে যেসব ছোটখাটো দুর্নীতি, লোভের আকর, লাভের খিদে তার মুখ আমি দেখেছি। অপরাধকে দেখেছি ধীরে ধীরে গাঢ় হতে। আমরা কেন ডিনামাইটের মতো হতে পারছি না তিলোত্তমা? কেন রোজ খুন হয়ে যাচ্ছি না রাজার বাড়ির ফুটপাতে। কেন লাশের উপর লাশ, তার উপরে আরও নতুন লাশ পেরিয়ে যেতে যেতে একবার মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া লিখে দিতে পারছি না তার কালো কপালে। আর কতদিন পুরোনো গানের ধূলিকণা জড়ো করে শহীদের বাণী লিখে যাব আমরা? উৎসব কি ভাঙতে পারিনা আমরা? বলতে পারিনা এই শহরের বুকে আর কোনদিন আলো জ্বলবে না?
আমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলি দাও তিলোত্তমা। খণ্ড খণ্ড শরীরের সাথে মিশে যাক তোমার অনুচ্চারিত যন্ত্রণা।


(২)

এ লড়াই জিততে হবে
শর্মিষ্ঠা ঘোষ


 
mukta gadya 2


প্রতিবাদ ব্যাপারটাই আপেক্ষিক। আমরা কোন ঘটনায় উদ্বেলিত হব , কোন ঘটনায় চুপ করে থাকব সবকিছুই আমাদের পক্ষ অবলম্বনের উপর নির্ভর । তারপরও কখনো কখনো আমরা বাধ্য হই অন্তত সামনাসামনি স্বীকার করতে যে , যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি। এবার রইল সুবিচার পাবার জন্য আমি কি করছি, কি বলছি? অপরাধী আমার পক্ষের হলে আমি সেফ খেলব। আমি সুবিচার চাইবো নরম করে কিন্তু ভান করব এই অপরাধের পেছনে কি আছে তা আমার জানা নেই। আর যদি ক্ষমতাবান হই তো প্রশাসনকে ব‍্যবহার করব অপরাধ এবং অপরাধীকে আড়াল করতে। লোকে কি বলছে না বলছে কি ভাবছে না ভাবছে কি চাইছে না চাইছে আমি সেসব তোয়াক্কা করব না। আমি তখন তিন বাঁদর, কিছু বলি না শুনি না দেখি না। আর যদি বিরোধীপক্ষে থাকি তো তীব্র ভাষায় প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি চাইব নানারকম প্রশ্ন তুলব প্রশাসনের গাফিলতি থাকলে ল‍্যাক অব গভরনেন্সের জন‍্য মুখ্য প্রশাসকের বিচার পর্যন্ত চাইব কারণ দিনের শেষে দায়িত্ব তার। তার জন্য পদত্যাগ এসব কিছুই চাইবো। নিজের কর্ম ঢাকার জন্য প্রশাসক তখন নিজেও মুখ লুকোন জনতার বিচার চাওয়ার মিছিলে। বাধ্য হন অত্যাচারীতের জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করতে। কিছু মানুষ সেই ক্ষেত্রে কিছুদিন বিভ্রান্ত বোধ করে। কিন্তু কোন মিথ্যাই বেশিদিনের জন্য ময়দানে থাকতে পারে না। কারণ মিথ্যাচার এর অনেকগুলি মুখ। একটি ভার্সন ধরে রাখা মুশকিল অনেক মুখে। জনতার হুজুগে আন্দোলন এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মঞ্চ তৈরি না হলে বেশিদিন আন্দোলন এর রাশ হাতে রাখা যায় না। আঞ্চলিক প্রতিবাদগুলি সংহত করে সর্ব‍ব‍্যাপী গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়। সাহস এবং সত‍্য অবলম্বনে লেগে থাকতে হয় অভীষ্ট লক্ষ্যে স্হির। আমাদের তো দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে ঘুরে দাঁড়ানো হয় না সচরাচর। অনেক মূল্য চোকাতে হয় তারজন‍্য অনেক সময়ই। কথায় বলে আগুনে পুড়ে সোনা। আর মানুষ সুন্দর
প্রতিবাদে। সহমর্মিতায়। সহযোগিতায়। সুতরাং বলাই যায় এ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ লড়াই জিততে হবে। প্রতিবাদ মানুষ চেনায়। বন্ধু চেনায়। গুড সামারিটান তৈরি করে। তৈরি করে গুড সিটিজেন। দেশ কাল জাতির ইতিহাসে এদের কিঞ্চিৎ ভূমিকা রয়ে যায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  প্রচ্ছদ ঋণঃ-  অদিতি সেনগুপ্ত