শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫
মঙ্গলবার, ২২ জুলাই, ২০২৫
প্রচ্ছদ ঋণঃ- অভিষেক নন্দী
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
সূচীপত্র
প্রচ্ছদ
------------------
অভিষেক নন্দী
কবিতা ভিত্তিক
------------------
গোবিন্দ মোদক
পুণ্যব্রত মুখোপাধ্যায়
উদয় নারায়ণ বাগ
বন্যা ব্যানার্জী
চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী
অনীশ দাস
সম্মিলন
------------------
শামীম নওরোজ
স্মৃতির দুয়ারে
------------------
কেয়া নন্দী
আনুপূর্বিক
------------------
শংকর ব্রহ্ম
শম্পা গুপ্ত
বিধায়ক ভট্টাচার্য
মুক্তপদ্য
------------------
শম্পা সামন্ত
কবিতাভিত্তিক
বাউল বাউল
গোবিন্দ মোদক
ওরে বাউল –
বাউল গান আর বাউলিয়া এক জিনিস না।
ভেক ধরলে বাইরে বাউল অন্তরে তা না!
যত্র-তত্র ভোজন-ভাজন শয়ন হট্ট-মন্দিরে,
খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিয়ে মনের কোণের বন্দিরে!
তাকেই আবার খুঁজে ফেরা সে জে সহজ কাজ না,
বাউল বড় শক্ত কথা সহজ করার জিনিস না!!
জেনে রাখ –
বাউল ব্যাটা বাস করে সব মানুষের অন্তরে,
আটকে থাকে সুরা-নারী-টাকা-জমির মন্তরে।
জেনে-বুঝে সেই মন্তর জপে যায় অবিরাম,
ভুলে যায় বাউলটাকে ভোলে তার কাজ-কাম।
তবু দু-একজন ছিটকে এসে পড়ে পথের বাইরে,
বাউল মন সেই পেয়েছে জেনে রাখ ও ভাই রে!
সেই মানুষটা সহজ-সরল, সংসার তার কাজ না,
বাউল গান আর বাউল ভজন এক জিনিস না!!
নিজের মধ্যে নিজে আছি তবু নেই নিজেতে,
জলের মধ্যে বাস করে সে তবু নেই ভিজেতে;
এমন আশ্চর্য সে কাঠামো – কে যে তাকে রঙ করে,
বাউল আমার মনের মানুষ বাস করে সে বার ঘরে।
তাই বাউল বাউল বাউল বললেও
বাউল সোজা কাজ না,
বাউল বড় শক্ত কথা সহজ কথার ভাঁজ না।
বাউল-----তুমি
পুণ্যব্রত মুখোপাধ্যায়
মৃতদেহটা নিয়ে দেহতত্ত্বের একটা বাউলা বাঁধো দেখি।
ধূসর ছিন্নত্বকের নিচে কালো মৃত্যুরেখা।
তুমি তো অক্ষরে লেখা জানো,
জানো আকাশের কথা------
বাতাস যখন কাঁদে, বসন্তের কোকিল সাড়া দেয়।
মৃত্যু কাঁদছে তুমি সাড়া দাওনা কেন !
এ নদী, এ পাহাড়, এই যে পথের জনপদ,
ও বাউল! কেন হাঁটো না পথে!
নির্বাক মৃত্যুর সাথে তুমি কেন অবাক হলে?
লাশের শীতল প্রাণ বুকের ভিতর হাঁপায় যখন,
তুমি সেই সুরে গান বেঁধে জাগাও ঘুমন্ত সকাল।।
সাধনার একতারা
উদয় নারায়ণ বাগ
সাধনারই একতারাতে
বাজছে মধুর সুর,
যায় গো ছুটে ওই তো ওরা
কোন সে মধুপুর।
ভাবের ঘরে ভাব আছে তাই
ভাবনা তাই তো নাই রে নাই,
বৈরাগী ওই হাসছে শুধুই
শুনতে পাচ্ছে রাইয়ের রাই।
আঁধার ঘরে জ্বলল আলো
ঝিলমিলালো মনে ঘর,
একতারাটা সুর মিলাল
হরে হরো হরে হর।
বাউল বলে মন রে আমার
লোভ লালসা কর রে দূর,
মধুপুরে একতারাটা
শোনায় কেমন মধুর সুর।
সাধনারই একতারা সুর
করবে আঁধার বহুদূর
(তাই)সাধন-ভজন কর রে তোরা
যাবি যদি মধুপুর।।
ব্রহ্মানন্দ
বন্যা ব্যানার্জী
বুকের ভেতর আদিগন্ত বেদনা!
আমি আরো গভীরে ডুবে যাই ।
নিঃশব্দ! একাকার।
যেন অদৃশ্য এক নদী।তার শান্ত, স্নিগ্ধ অথচ গহীন মনে আমাকে ভাসিয়ে রেখেছে।ভেসে যাচ্ছে চরাচর।আমি খুঁজে পাচ্ছিনা আমার লেখার খাতা।কলমের ঠোঁটে একটুও কালির আশ্বাস নেই। শুধু সুর জেগে আছে।হারিয়ে যেতে যেতে একতারা টি ছুঁয়ে আসি বারবার। বাউল শুধু তোমার জন্যই আমি প্রতি সন্ধ্যায় সাক্ষিহীন জোনাকির মাঠ হই। তবু ভালোবাসার কথা টা উচ্চারিত হতে হতে তুমি পেরিয়ে যাও নিভৃত চাঁদের সমস্ত কলঙ্ক।যেখানে আমার স্বপ্ন হারাবার ভয় নেই।
একতারা হাতে
চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী
যদি সাধন জানো
এ দেহ এক প্রসিদ্ধ মন্দির
যার মূলে বসে আছে পরমপুরুষ।
তারই খোঁজে
ডুব রাখে
তুলে আনে অনন্ত সুখের ফুলেল কম্পন
প্রশান্তির অমৃতকলসে চুমু রেখে
মুছে ফেলে
রিপুর দুরন্ত পিড়ন।
প্রেম শুধু প্রেমকে বাঁধব বলে
হেঁটে যায় পায়ে পায়ে
এক তারাহাতে গেরুয়া বাউল
রাস্তায় ছড়িয়ে
"দেখা হবে কত দিনে মনের মানুষেরই সনে"
বাউল কথা
অনীশ দাস
মনের কথা বলি শোনো,
বাউলেরা সত্যই শুধায়
"দেহের মাঝেই আত্মা আছে
ঈশ্বরের ঠাঁই রয়েছে সেথায় "----
খুঁজে মরি এদিক-ওদিক
করি না পরোয়া মনরে আর!
তবু সুপ্ত হৃদয় কোণে
রয়েছে মোদের রচয়িতার আশ্রয়।
গান ভজনের মধ্যিখানে
ওনার নামের উচ্চারণ,
জীবন কথার শ্রবণ করেই
যাত্রাপথের অনুরণন।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে দুলছে
যে সব দিকবিদ্বিক,
তবু মনে বার্তা আসে
হৃদ-মাঝারে তিনিই আছেন,
বাউল তত্ত্ব সদাই ঠিক।
সম্মিলন
মরমি পাখির গান
শামীম নওরোজ
০১.
শরীরে মাটির গন্ধ
মনে আকাশের উদারতা
একটি জীবন
অসাম্প্রদায়িক
পরিস্ফুটিত শাপলার মতো
হাতে একতারা
মুখে উদাসী বাউল গান
লোকধর্মের মরমি পাখি
মানুষই সত্য ; আার সব মিথ্যা
ছেঁওড়িয়ার ছায়া ও রোদ্দুরে পূর্ণতিথি
হরিশপুরের বাতাসে ওড়ে সোনার মানুষ
তিনি হাঁটেন একা, নিজের মতো
বাউল গানের সুরে,
প্রেমে ও মুগ্ধতায়...
০২.
লোকগানের সুরেলা কোকিল। সুরে জলের ভাসান...
গ্রাম থেকে গ্রামে...; প্রেম থেকে প্রেমে...; ভক্তি থেকে ভক্তিতে ওড়ে বৈষ্ণব প্রেম...
রাধায় ব্যাকুল, কৃষ্ণতে মুগ্ধ।
হাসিয়েছেন কাঁদিয়েছেন প্রশ্ন করেছেন
উত্তরে পাখি বলে, " ভেবে দেখ রে মন। "
মানবিক চেতনার স্রোতে মানুষের পরিচয়।
দার্শনিক প্রত্যয়ে বলেন, সৃষ্টির বৈভব...
তাঁর কথা বাতাসের প্রেমজন্ম হয়ে উড়ে উড়ে বাসা বাঁধে প্রেমিকের মনে। প্রমিক পুরুষ। সুরের মাধুর্য, আর গানের কোকিল...
০৩.
রাজার সন্তান। অন্তরে গরিব। আলালের মরমি দুলাল। আত্মার ইশারায় মগ্ন হয়ে, রাজ্য ছেড়ে,
বিলাসের বসন ফেলে হয়ে গেলেন দরদী উদার। আত্মজিজ্ঞাসা ছিলো। ছিলো ভালোবাসার সুর, রহস্যের ধ্বনি...
" লোকে বলে, বলে রে, ঘরবসতি..."
তাঁর সুর বুকের ভেতরে ঘোরে। কথা বলে। কে? কোথায়? কেন? উত্তরের অপেক্ষা না করে হয়ে যান বনবাসী, প্রেমের দোতারা...
শুধুই গায়ক নন। একটি পথের দিশা। আত্মার দরদী গোলাপ...
০৪.
দোলমেলা শুরু। ধলমেলা থেকে ভেসে আসছে বাউল গানের সুর। সুনামগঞ্জ, দিরাই। উজানের ঢেউ ধবল হাওড়ে...
মৃত্যুর ভেতরে শুয়ে কবর খোঁড়ার শব্দ শোনে কেউ কেউ। মুরশিদ জানে, কোন বোধে ভক্তের অন্তরে বাজে প্রেমের নূপুর...
গ্রামত্যাগী বাউলের কণ্ঠ ঝরে পড়ে অন্য গ্রামে। কখনো রাখাল। কখনো চাল-চুলোহীন। নিরণ্ন পাখির ঠোঁটে মরমি মাতম...
জোসনায় আফতাবুন্নেছা। তার পাশে ভাটির বাউল..
আনুপূর্বিক
বাউল তত্ত্ব প্রসঙ্গে লালন-কথা
শংকর ব্রহ্ম
(এক).
বাউল একটি বিশেষ ধর্মমত ও লোকাচার।
এই বাংলার মাটিতেই এই মতের সৃষ্টি হয়েছে। লালন সাঁই(বাউলকূল শিরোমণি)-এর গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচিতি লাভ করে।
বাউল গান যেমন জীবন দর্শন সম্পর্কিত তেমনই সুরসমৃদ্ধ গান। বাউলরা সাদামাটা কৃচ্ছ্রসাধনার জীবন-যাপন করে আর একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়, গান শুনিয়ে সেদিনের চলার মতো গ্রাসাচ্ছাদন সংগ্রহ হলেই তাদের চলে যায়। একেই বলে ‘মাধুকরি’ করা। সাধারণ গৃহস্থের মতো আগামী কালের খাবার সংগ্রহে রাখা তাদের স্বভাব বিরুদ্ধ।
২০০৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের মাঝে বাউল গানকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে।
বাউল শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানামত প্রচলিত রয়েছে। বাউল শব্দের অর্থ অনেকে, অনেকে রকম করেছেন।
ক্ষিতিমোহন সেনের মতে, বাউল এসেছে ব্যাকুল শব্দ থেকে, কেননা বাউলরা আত্মানুসন্ধানের জন্য ব্যাকুল। তারা মুক্তপুরুষ, তাই সমাজের কোনও বাঁধন তাদের ধরে রাখতে পারে না। তারা সমাজের কোনও বাঁধনে ধরা দেন না।
এই কথার ধারণা মেনে নিয়ে একজন গবেষক আবার লিখেছেন বায়ু+ল= বাউল। আরেকজন বলেছেন, হিন্দি শব্দ বাউর থেকে বাংলায় বাউল শব্দটি এসেছে।
হরেন্দ্রচন্দ্র পাল ( আরবি-পারশি ভাষার পণ্ডিত) মনে করছেন ‘আউল’ ‘ওয়ালী’ শব্দ থেকে আউল বাউল শব্দের উৎপত্তি।
ফকির দুদ্দু শাহ্ বলছেন- ‘যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল।’ আবার কেউ বলছেন, বাউ+উল= বাউল; হচ্ছে বাতাস অনুসন্ধানকারী, বা সু বাতাসে যে চলে সেই বাউল।
অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে ‘ঈশ্বরপ্রেমে মাতাল, বস্তুজ্ঞানবর্জিত, উদাসীন ভক্ত’-এই অর্থে বাউল শব্দ একাধিক বার ব্যবহৃত হয়েছে।
অতিপ্রাচীনকাল থেকে বাউল শব্দটির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। আনুমানিক সপ্তদশ শতক থেকে বাউল নামের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়, চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের আদিলীলা অংশে এর ব্যবহার লক্ষ করা করা যায়, চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে মহাপ্রভু, রামানন্দ রায় ও সনাতন গোস্বামীর নিকট কৃষ্ণ বিরহ বিধুর নিজেকে মহাবাউল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই থেকে অনুমান করা হয়, বাউল শব্দের প্রচলনের কথা।
বাউলের মধ্যে রয়েছে নানাবিধ শাখাপ্রশাখা, একেক সম্প্রদায়ের বাউলেরা একেক মত অনুযায়ী চলে , সেগুলো তাদের সম্প্রদায় ভেদে ধর্মীয় উপাসনার একটি অংশ হিসাবে বিচার্য হয়।
বাউলরা উদার মানসিকতার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধর্মসাধক। তারা সর্বদা মানবতার বাণী প্রচার করে থাকেন। বাউল মতবাদের সঙ্গে বৈষ্ণবধর্ম এবং সূফীবাদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। বাউলরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় আত্মাকে। তাদের মতে আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। আত্মা দেহে বাস করে, তাই তারা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করে।
সাধারণত প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও, বাউলরা জীবনদর্শন সম্পর্কে অনেক গভীর বোধের কথা ভাবেন এবং তা প্রকাশ করেন তাতের গানের মধ্য দিয়ে।
বাউল সাধকদের শিরোমণি ফকির লালন সাঁই। লালন তার বিপুল সংখ্যক গানের মাধ্যমে বাউল মতের দর্শন এবং অসাম্প্রদায়িকতার প্রচার করেছিলেন। বাউল সমাজে তিনি "সাইজিঁ" ও তার গান "সাইজিঁর কালাম" হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও বাউল কবিদের মধ্যে জালাল খাঁ, রশিদ উদ্দিন, হাছন রাজা, রাধারমণ, সিরাজ সাঁই, পাঞ্জু সাঁই, পাগলা কানাই, শীতলং শাহ, দ্বিজদাস, হরিচরণ আচার্য, মহর্ষি মনোমোহন দত্ত, লাল মাসুদ, সুলা গাইন, বিজয় নারায়ণ আচার্য, দীন শরৎ (শরৎচন্দ্র নাথ), রামু মালি, রামগতি শীল, মুকুন্দ দাস, আরকুম শাহ্, সৈয়দ শাহ নূর, শাহ আব্দুল করিম, উকিল মুন্সী, চান খাঁ পাঠান, তৈয়ব আলী, মিরাজ আলী, দুলু খাঁ, আবেদ আলী, উমেদ আলী, আবদুল মজিদ তালুকদার, আবদুস সাত্তার, খেলু মিয়া, ইদ্রিস মিয়া, আলী হোসেন সরকার, চান মিয়া, জামসেদ উদ্দিন, গুল মাহমুদ, প্রভাত সূত্রধর, আবদুল হেকিম সরকার, আবুল কাসেম তালুকদার, বাউল সুনীল কর্মকার, ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমেদ, ফকির দুর্বিন শাহ, শেখ মদন, দুদ্দু সাঁই, কবি জয়দেব, কবিয়াল বিজয় সরকার, ভবা পাগলা, নীলকণ্ঠ, দ্বিজ মহিন, পূর্ণদাস বাউল, খোরশেদ মিয়া, মিরাজ উদ্দিন পাঠান, আব্দুল হাকিম, আলেয়া বেগম, দলিল উদ্দিন বয়াতি, মাতাল রাজ্জাক, হালিম বয়াতি, মালেক দেওয়ান, খালেক দেওয়ান ও আক্কাস দেওয়ান, মনির দেওয়ান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
(দুই).
সময়ের এই জটিল সন্ধিক্ষণে, যখন সারা পৃথিবী জুড়ে জাতিগত বিদ্বেষ সম্প্রসারণের পথে দ্রুত ধাবিত , তখন যার কথা খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, তার নাম মহাত্মা 'লালন ফকির'। তাঁর জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা ও ভাবনার সময় এসেছে আবার নতুন করে।
লালনের জন্মবৃত্তান্ত কুহেলিকাময়। তাঁর জীবন সম্পর্কে বিষদ কিছু জানা যায় না।
তিনি নিজেও জীবদ্দশায় এ'বিষয়ে আলোচনায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। শিষ্যরা এ'বিষয়ে তার কাছে বেশী কিছু জানতে পারেননি। তবে তাঁর সম্পর্কে যায় শোনা যায়, তিনি অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহ জেলার, হরিণাকুন্ড উপজেলার হবিশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।
কোন কোন লালন গবেষক মতে, কুষ্টিয়ার কুমীরখালি থানার চাপড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। লালনের জন্ম কেউ বলেন - ১৭৭২ সালে, আবার কেউ বলেন ১৭৭৪ সালে। তার মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর। আবার কেউ বলেন, ১৮৯১ সালের ১৭ই অক্টোবর।
লালন নিজে একজন স্বনাম ধন্য মানুষ ছিলেন। কবিগুরু তার গান ও নাম প্রচারের আলোয় আনেন। তিনি তার গানের মানবিক ভাব দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গান রচনা করেন। তিনি লালনের কথা বারবারই নানা আলোচনায় প্রকাশ করেছেন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ,সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের পরিচয় ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন। সেটা আজও রক্ষিত আছে। নন্দলাল পরবর্তীকালে লালনের একটি স্কেচ আঁকেন। সেটি বহুল প্রচারিত।
কেউ বলেন,তার পদবী দাস, কেউ বলেন সেন, কেউ বলেন কর, আবার কেউ বলেন তার পদবী শাহ ছিল। কেউ বলেন তিনি হিন্দু, কেউ আবার বলেন তিনি মুসলমান ছিলেন। লালন নিজে অবশ্য তাকে ফকির বলে পরিচয় দিতেন।
" সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে?
লালন বলে,জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে,
ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান,নারী লোকের হয় কি বিধান?
বামুন চিনি পৈতায় বামনী চিনি কি দেখে?
কেউ মালা কেউ তসবির গলে, তাই দেখে জাত ভিন্ন বলে . . . "
শোনা যায়, তিনি একবার বাউল দাসের সঙ্গে তীর্থ ভ্রমণে বার হন, পথের মধ্যে তার গুটিবসন্ত রোগ হয়। মারত্মক আকার ধারণ করে, তার শ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন তার নাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে, সহ-তীর্থযাত্রীরা তখন তাঁকে মৃত ভেবে নদীতে ভাসিয়ে দেন। এবং তারা গ্রামে ফিরে এসে বলেন, পথের মধ্যে লালন বসন্ত রোগে মারা গেছেন।
অলৌকিক ভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
যখন তিনি নদীতে ভেসে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে দেখতে পান এক সাত্ত্বিক প্রকৃতির মহিলা (জাতে মুসলমান তাঁতী) নাম মতিজান। তিনি সন্তানহীনা ছিলেন। আল্লার কাছে প্রতিদিন সন্তানের কামনা করতেন। তিনি তাঁকে আল্লার দান মনে করলেন। তিনি যখন তাকে দেখেন,
তার দেহ পঁচাগলা অবস্থায় ছিল।তিনি তাঁকে তুলতে ভরসা পেলেন না। তিনি তার স্বামী মলম শাহকে ডেকে আনলেন, রমলম শাহ তাঁকে কলাপাতায় করে তুলে ঘরে নিয়ে এলেন। তিনি জড়িবুটির চিকিৎসা জানতেন। তার আর তার স্ত্রী মতিজানের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রাণপন সেবা যত্নে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্ত তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তাঁর নাম রাখার জন্য নাকি মলম শাহ কোরাণ হাদিস এনে জড়ো করলে, মতিজান বলেন, এ'সব দিয়ে কি হবে? মলম শাহ বললেন, নতুন অতিথির নাম রাখা হবে।
মতিজান বলল, আমি ওকে লালন পালন করেছি যখন, তখন ওর নাম হবে - লালন।
মতিজানদের পরিবারের গুরু ছিলেন সিরাজ সাঁই। সেখানেই তাঁর সাথে পরিচয় হয় লালনের।
সুস্থ হয়ে উঠে কিছুদিন সেখানে থাকার পর তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে চাইলে, মতিজান বলল,
হ্যাঁ বাপ, তুমি তোমার বাপ মায়ের কাছে ফিরে যাও।
দেখো তোমায় ফিরে পেয়ে তারা কত খুশি হবেন।
লালন সেইমত নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু তার মা পদ্মাবতী দেবী, (বুক ফেটে গেলেও) সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দায়ে, তাকে ঘরে তুলতে পারেননি। তার স্ত্রী তার সহগামী হতে চাইলেও সমাজপতীদের বাঁধায়, তা হতে পারেননি।নফলে, লালন মনে মনে ভীষণ আঘাত পান, পরে সন্যাসী হয়ে নানা স্থানে ঘুরতে ঘুরতে কালীগঙ্গার ধারে ছেঁউড়িয়া গ্রামে একটি বটগাছের নীচে অধিবেশন করেন। এই গ্রামের মলম শাহ একজন স্বাতিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন( সেই মলম শাহ,যিনি তার পঁচাগলা দেহ উদ্ধার করে তাতে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন)। তিনি সেই বটতলা থেকে তাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। স্বামী স্ত্রী দু'জনে মিলে ভক্তি ভরে তার সেবাযত্ন করেন। এমন কি নিজের জমিজমা তার নামে লিখে দেন। তারা নিজেরা তাঁর আশ্রমের বাসিন্দা হিসাবে সেখানে বসবাস শুরু করেন। সেখানে কালে কালে তার অনেক শিষ্য জুটে যায়।
লালনের আশ্রমে আম জাম কাঠালের গাছ ছিল।বালকেরা ইচ্ছে মতো সেই বাগানের ফলমূল খেতো, লালন কখনই তাতে বিরক্ত হতেন না। তার আশ্রমের জমি লাখোরাজ ছিল। ইহা রবীন্দ্রনাথের অবদান। পরবর্তী কালে প্রয়োজনে তার কিছুটা বিক্রি করে চার বিঘার উপর নতুন আশ্রমটি গড়ে তোলা হয়। এক মুসলমান তাঁতীকে বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু তাকে লোক চক্ষুর আড়ালে রাখতেন।
শোনা যায় তিনি খুব পান খেতেন, দিনে শতাধিক। তাঁর জন্য একজন শিষ্য সারারাত ধরে মিহি করে সুপারী কাটতেন। তাঁর জন্য নাকি একটা পানের বরোজ ছিল। সেখানে কখনও তিনি কাজ করতেন, কোন কাজে
তার হীনমন্যতা ছিল না।
তার আশ্রমে মণিরুদ্দীন নামে একজন পন্ডিতব্যক্তি পাঠশালা চালাতেন। আর লালন একটি জলচৌকিতে বসে গান করতেন। জলচৌকিটি এখনও আশ্রমে সংরক্ষিত আছে। মোট তিনি ২৮৮ টি গান রচনা করেছেন। সবগুলির সুর দিয়ে যেতে পারেননি। তিনি দেখতে সুপুরুষ ছিলেন।
তার একটি ঘোড়া ছিল। তিনি ঘোড়ায় চড়ে দূরের শিষ্যদের বাড়িতে যেতেন। পন্ডিত মণিরুদ্দীন এই ঘোড়ার সহিস ছিলেন।
লালনের গান রচনা শেষ হলে, তিনি পরের দিন সকালে তার শিষ্যদের তা ডেকে শেখাতেন। আবার সন্ধ্যাবেলা বসতেন সেই গান নিয়ে। শিষ্যদের কাছে তা শুনতে চাইতেন। কেউ কোন ভুলচুক করলে তাকে শংকর মাছের চাবুক দিয়ে নিষ্ঠুর ভাবে প্রহার করতেন, তাতে কারও কারও গা কেটে যেতো।
লালন নিজে বেশী দূর লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। কিন্তু তার গানে মেধা ও মননশীলতার কোন ঘাটতি ছিল না।
" তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়,
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।"
কিংবা,
" কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ
যে রে?
হারায়ে সেই মানুষে খুঁজে বেড়াই দেশ বিদেশ . . . "
এই ধরণের বহু জ্ঞানগর্ভ গান তিনি রচনা করেছেন।
তাঁর তেরোজন শিষ্য ছিল, তাদের মধ্যে প্রায় সকলেই ধনী ও শিক্ষিতব্যক্তি ছিলেন। তারা সকলেই সংসারী ছিলেন। স্ত্রী সহবাস করতেন, কিন্ত স্ত্রীগর্ভে বীজ বপন করেননি। তাদের মিলন উর্দ্ধগমী পদ্ধতিতে হতো। একসময় তারা সকলে ঘর বাড়ি ত্যাগ করে এসে আশ্রমে কঠোর অনুশাসনের মধ্যে কাটাতেন। তাদের মধ্যে মলম শাহ, ভোলা শাহ, মণিরুদ্দীন শাহ, ভাঙুরানী ফকিরানী উল্লেখযোগ্য।
লালনের গান ও দর্শনদ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, এলেন গীন্সবার্গ (আমেরিকান কবি), তিনি তাঁকে নিয়ে After Lalon নামে একটি কবিতা লেখেন।
১৯৬৩ সালে তার ছেউড়িয়া আখড়া ঘিরে 'লোক সাহিত্য কেন্দ্র ' প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে তার বিলুপ্তি ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় 'লালন একাডেমী'। তার মৃত্যুদিনে ১৭ই অক্টোবর ' লালন স্মরণ উৎসব' - এ দেশ বিদেশের ভক্তরা এসে উপস্থিত হন। এখন উৎসব চলে পাঁচদিন ব্যাপী।
লালনকে নিয়ে নাটক লেখা হয়েছে,
'উত্তর লালন চরিত', ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়ে খুব সুনাম অর্জন করেছিল। তাকে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে। রঞ্জিত কুমারের লেখা উপন্যাস,
'সেন বাউল রাজারাম', সুনীল গাঙ্গুলীর 'মনের মানুষ'। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উপন্যাস 'গোড়া'-র শুরু লালনের গান দিয়ে-' খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।'
সুনির্মল বসু ' লালন ফকিরের ভিটে ' নামে একটি ছোটগল্প লিখেছন। শওকত ওসমান লালনকে নিয়ে ছোটগল্প লিখেছেন, 'দুই মুসাফির'।
লালনকে নিয়ে সিনেমাও হয়েছে। ১৯৭২ সালে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন ' লালন ফকির'।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮৬ সালে ওই একই নামে একটি ডকুমেন্টারী ছবি করেন। তানভির মোকাম্মেল ১৯৯৬ সালে তথ্যচিত্র করেন 'লালন' নামে। এটি জাতীয় পুরস্কার পায়। ২০১০ সালে সুনীল গাঙ্গুলীর উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ নির্মান করেন, 'মনের মানুষ', যা ওই বছর ' জাতীয় সেরা পুরস্কার পায়। ২০১১ সালে মুক্তি পায় হাসিবুর রেজা কল্লোল পরিচালিত ' অন্ধ নিরাঙ্গম'।
গান্ধীজীর আগেই তিনি মহত্মা উপাধীতে ভূষিত হয়েছেন। তাকে বাউলদের জনক বলা হয়। উনিশ শতকে তিনি বাউল গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। অধিকাংশ বাউলরাই তাকে ভক্তি শ্রদ্ধার চোখে দেখেন।
তিনি ১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন। শেষদিকে তিনি চলাফেরা করতে পারতেন না। পেটের অসুখে আর বাতের ব্যথায় ভুগতেন। তার খাদ্য ছিল শুধু দুধ। তিনি সে সময় খুব মাছ খেতে চাইতেন।
তিনি ধর্ম ও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধী ছিলেন। ধর্ম ও ঈশ্বর নিয়ে তাঁর গানে,নানা প্রশ্ন তোলায়, ধার্মিকরা তাঁকে ঘৃণা করতেন, কাফের ভাবতেন। সাম্প্রদাযিক ধর্মবাদীরা তাকে অসাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করতেন।
তাই আজ লালন প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশী করে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে এই জটিল সময়ের প্রেক্ষাপটে।
লালনের মূল্যবান দশটি বাণী
—-----------------------------------
১। "এমন মানবজনম আর কি হবে!
মন যা করো তরায় করো এইভবে।"
২। "ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার।"
৩। "শুনি মরিলে পাব বেহেস্তখানা,
তা শুনে তো মন মানে না…
বাকির লোভে নগদ পাওনা,
কে ছাড়ে এই ভুবনে….।"
৪। "গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রমও তো গেল না ।"
৫। "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।"
৬। "জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না।"
৭। "মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।"
৮। "এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রীস্টানজাতি গোত্র নাহি রবে।"
৯। "ব্রাহ্মণ চন্ডাল চামার মুচি
একি জলেই সব হয় গো সুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না। ”
১০। "ও যার আপন খবর আপনার হয় না।
একবার আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে আচেনারে চেনা।"
------------------ ------------------ ------------------ ------------------
বাউল তত্ত্ব ও নারীবাদ: দেহতত্ত্বের রাজনীতি ও আত্মানুসন্ধানের দ্বন্দ্ব
শম্পা গুপ্ত
সূচনা:
বাউল দর্শন বাংলা মাটির ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক অনন্য মানবতাবাদী ধারা। এটি শুধু একটি সংগীতধারা নয়, বরং দার্শনিক চিন্তা, আধ্যাত্মিক সাধনা, এবং গভীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত একটি জীবনপ্রণালী। বাউলরা ঈশ্বর বা সত্যকে খোঁজে মানুষের মধ্যে, বিশেষত নিজের শরীর ও চেতনায়। এই দর্শনের কেন্দ্রে আছে “মানুষ”, “দেহ”, “প্রেম” এবং “অভ্যন্তরীণ যোগসাধনা”।
এই আত্মসন্ধানী পথের মধ্যে নারীকে কীভাবে দেখা হয়েছে? নারী কি এক স্বাধীন সাধক, না কি পুরুষের সাধনার “অবজেক্ট”? নারীর দেহ কি শুধুই এক “তন্ত্রসাধনার মাধ্যম”, না কি নিজের জন্য এক “মন্দির”? এই প্রশ্নগুলিই আমাদের নিয়ে যায় বাউলতত্ত্ব ও নারীবাদ নিয়ে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজনে।
বাউল দর্শনের মৌলিক পরিকাঠামো ও নারীর স্থান
বাউল দর্শন মূলত দেহতত্ত্ব ও আত্মসন্ধানের তন্ত্রচর্চাভিত্তিক। এর মধ্যে আছে:
· দেহমাধ্যমিকতা: ঈশ্বর বাহ্যিক নয়, দেহেই বিরাজমান।
· সহসাধনা: নারী ও পুরুষের মিলনে জন্ম নেয় আধ্যাত্মিক চেতনার উচ্চতর রূপ।
· স্বর, নাড়ি ও বিন্দু: শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করাই সাধনার মূল লক্ষ্য।
এখানে নারী শুধুই একজন “সহসাধিকা”। তাঁর দেহ পুরুষ সাধকের আত্মোন্নতির সিঁড়ি। নারী-পুরুষের মিলন বাউলের কাছে শুধুই কামনা নয়, বরং আত্মসাধনার উচ্চতর পদ্ধতি। কিন্তু এই ভাবনায় নারী কি নিজের ইচ্ছার অধিকারী? না কি তাঁর ভূমিকাটা একেবারে উপযোগকেন্দ্রিক?
নারীবাদী পাঠ: নারী ‘মাধ্যম’ না ‘সত্তা’?
নারীবাদ বলছে, নারীর দেহ নিজেই এক পরিপূর্ণ সত্তা, তাকে অন্যের মোক্ষ বা উপনিবেশ করার বস্তু নয়। কিন্তু বাউল গানে ও দর্শনে নারীকে প্রায়শই দেখানো হয়েছে:
· “আধাখানা শরীর”
· “রহস্যময়ী মায়া”
· “যন্ত্র” যার সাহায্যে সাধক মোক্ষ পায়
· “তন্ত্রের কৌশল”
লালন শাহ এক গানে বলেন:
“নারীর মধ্যে ভাই পুরুষ রহে,
তারে চিনে কেউ সাধক কেহে।”
এই বক্তব্যে নারী যেন এক 'পাত্র' যার ভেতরে পুরুষাত্মা ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন। নারী এখানে নিজের স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারছে না।
এভাবেই নারীর দেহকে রহস্যময়ীকরণ করা হয়, কিন্তু তার আত্মিক স্বরূপকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। নারীবাদী বিশ্লেষণে এটা এক ধরণের দেহ-ঔপনিবেশিকতা।
বাউল সংগীতে নারীর চিত্র:
শব্দ ও ভাষার ভিতর লুকোনো দমননীতি
বাউল গান প্রধানত পুরুষের মুখ থেকে উচ্চারিত। নারী-গান (যেমন: রাধার দৃষ্টিকোণ, মীরার গান) বিরল। বেশিরভাগ গানে নারীকে:
· প্রেমিকা বা যৌন সঙ্গী হিসাবে দেখা হয়
· ঈশ্বরপ্রাপ্তির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়
· সঙ্গিনী ও সেবিকা হিসেবে চিত্রিত করা হয়
কিন্তু কোথাও নারীর কণ্ঠস্বর নেই।
এই ভাষিক অনুপস্থিতি নারীর অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নারীবাদ বলে, “যেখানে কণ্ঠ নেই, সেখানে ক্ষমতা নেই।” বাউলতত্ত্ব যদি সত্যিই মানুষকেন্দ্রিক হয়, তবে নারী-মানুষের ভাষা কোথায়?
‘সংযম’ ও ‘যোগসাধনা’: এক পুরুষ-তন্ত্র?
বাউলরা ‘সংযম’-এর ওপর খুব গুরুত্ব দেন। কামনাকে দমন করে, যৌন শক্তিকে রূপান্তর করে “চেতনার উচ্চতর স্তরে” যাওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।
কিন্তু এই সংযমের প্রক্রিয়াটিও পুরুষ সাধকের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত। নারী এখানে “চালনা” বা “যোগযন্ত্র” মাত্র। তাঁর ইচ্ছা, কামনা, অনুভূতি কোথাও নেই।
তন্ত্রসাধনার অনেক শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “নারী দেহের ভেতর দিয়ে জাগে শক্তি”। অথচ সেই দেহকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে পুরুষের হাতে। নারীর শরীর-নির্ভর সাধনা তার নিজের থেকে তৈরি নয়—তা তৈরি হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক দর্শনের ছাঁচে।
নারী বাউলদের যাত্রা: প্রতিরোধ ও নির্মাণ
বাংলায় কিছু উল্লেখযোগ্য নারী বাউল এসেছেন, যাঁরা এই পুরুষতান্ত্রিক নির্মাণ ভেঙে নতুন বাউলতত্ত্ব নির্মাণ করেছেন। তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চল ঘুরে বাউল গান করেন। তাঁদের গান ও লেখায় নারীদেহ, নারী কামনা ও নারীর আধ্যাত্মিকতা সরাসরি প্রকাশিত।
নারী বাউল হিসাবে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা অতিক্রম করে মাঠে-ঘাটে গেয়েছেন নিজের কথা, দেহতত্ত্বের নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এঁরা শুধু গান করেন না, বরং নারী দেহ, দেহসাধনা ও ঈশ্বর চর্চাকে নিজস্ব ভাষায় প্রকাশ করেন। এই নারীরা বলেন—"আমরা কেবল কারো ‘সহচরী’ নই, আমরাও সাধক। আমরাও পথপ্রদর্শক।" তাঁদের কণ্ঠে দেহ এক প্রতিবাদ, এক আত্মঘোষণা।
আধুনিক নারীবাদ ও বাউলতত্ত্ব:
এক পুনর্মিলনের সম্ভাবনা
আধুনিক নারীবাদ আজ শুধু অধিকারের প্রশ্ন তোলে না, বরং চেতনা, দেহ-রাজনীতি, ভাষা-অধিকার, কামনা ও আধ্যাত্মিকতার ভিতরেও প্রশ্ন তোলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাউলতত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
. সাদামাটা উপসংহার যথেষ্ট নয়!
বাউলরা প্রগতিশীল, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই প্রগতিশীলতা সব ক্ষেত্রেই নারীর পক্ষে ছিল না।
. নারীর শরীরতত্ত্ব তার নিজের ভাষায় তৈরি হওয়া দরকার।
নারী যেন নিজের সাধনার পথে নিজেই দর্শনের নির্মাতা হন।
. নারী-গান, নারী-দর্শন, নারী-কামনা—এই তিনটি ঘরেই মুক্তি।
নারী যদি বাউলতত্ত্বের কেন্দ্রে সত্যিকারের স্থান পায়, তবে তা কেবল পুরুষের তন্ত্র-সাধনার এক শৃঙ্খলা না হয়ে, হবে এক বহুমাত্রিক, বহুস্বরময় মানবতাবাদ।
উপসংহার: এক নতুন পাঠ ও সম্ভাবনার দ্বার
বাউলতত্ত্ব এক গভীর, অভ্যন্তরীণ পথ। কিন্তু এই পথ নারীর জন্য এখনও কাঁটায় ভরা। অনেক সময় নারী শুধু পাত্র, দেহ, রহস্য কিংবা সহচরী হয়ে থেকেছেন—যেখানে তাঁর নিজের কণ্ঠ, আত্মা, ঈশ্বর যেন অনুপস্থিত।
নারীবাদ সেই অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করে। প্রশ্ন তোলে—নারী কি শুধুই সাধকের শরীরোপযোগী পাত্র, না কি নিজেও সাধক, দেহ-ঈশ্বরের সন্ধানী?
আধুনিক সময়ে নারীবাদী বাউল পাঠ আমাদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়—যেখানে নারী শুধু গান গায় না, দর্শন গড়ে তোলে। যেখানে বাউলতত্ত্ব এক পুরুষ-কেন্দ্রিক তন্ত্র নয়, বরং এক সমবায়িক আধ্যাত্মিক চর্চা হয়ে ওঠে।
------------------ ------------------ ------------------ ------------------
বাউল
বিধায়ক ভট্টাচার্য
সতেরো শতকেরও আগে এই বাংলাদেশের মাটিতে বাউল মতের উদ্ভব হয়। বাউল কোনো ধর্ম নয় বাউল একটি মতবাদ মাত্র। কোন কোন পন্ডিতদের মতে সতেরো শতকের দ্বিতীয় পাদ থেকেই বাউল মতের উন্মেষ। মুসলমান মাধব বিবি ও আউলাচাঁদই এই মতের প্রবর্তক বলে তাঁদের ধারণা। মাধব বিবির শিষ্য নিত্যানন্দ পুত্র বীরভদ্রই বাউল মত জনপ্রিয় করেন আর উনিশ শতকে লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমেই এর পরিপূর্ণ বিকাশ হয়।
বাউল মতের উদ্ভব নিয়ে ডক্টর আনোয়ারুল করিমের মত প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, '.... ''বাউল' শব্দের উৎপত্তিমূল নির্ণয় এবং কবে কখন থেকে বাউল মতবাদের উদ্ভব হয়েছে এ সম্পর্কে তাই একটি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া প্রয়োজন।
আমি দীর্ঘ ৪০ বছরের অধিককাল এই মতবাদের অনুসারীদের সাথে মিশে বেড়িয়েছি, কিন্তু তারাও তেমন কিছু হদিস জানাতে সক্ষম হননি।... এদের সকলের ধারণা বাউল ধর্ম চিশতিয়া সূফী ধর্মের একটি শাখা এবং তারা সবাই চিশতিয়া ফকির। এই ধর্ম বাতেনি ধর্ম এবং তাদের সাধনা গুহ্য সাধনা। এরা কোরান শরীফে বিশ্বাস করে, তবে সে কোরান লিখিত নয়। তারা বলেন কোরান রয়েছে তাদের ছিনায় ছিনায়। একে তারা 'দেল কোরান' নামে অভিহিত করেছে। এদের নামাজ সন্ধ্যায়। এরা সেবাদাসীকে 'জায়নামাজ' নামে অভিহিত করে। এদের সাধনা দেহবাদী। বাউল শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এরা বলে 'বায়ু+উল'। দেহের অভ্যন্তরে যে প্রাণবায়ু, যার কারণে সজীবতা এবং জীবন, তার বিনাশে মরণ। এর 'উল' বা সন্ধানই তাদের লক্ষ্য।''
ঐতিহাসিকের মতে ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে এই বাউল মত ও পথের জন্ম হয়েছে। কোন কোন ঐতিহাসিক এর মতে ১৬২৫ থেকে ১৯২৫ এই ৩০০ বছর এই বাউল মতের উৎপত্তি ও বিকাশ। কারো কারো মতে, খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর আগে এই বাউল মত কখনোই বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়নি। ঈশ্বরপুরী(১৫০১ খ্রী ...), চৈতন্যদেব ১৪৮৩-১৫৩৩ খ্রী.), অদ্বৈতাচার্য (১৪৩৪-১৫৫৭ খ্রী )প্রভৃতি যারাই বাউল মতের গুরু বলে পরিচিত, তাঁদের কার্যকাল ষোড়শ শতাব্দীর পরে । সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে কথা বলা যায় যে, খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতেই বাংলাদেশে বাউল মতের উদ্ভব হয়। এই প্রসঙ্গে ডক্টর মোহাম্মদ এনামুল হক এর মতানুসারে বলা যায়, এই বাংলাদেশে বৈষ্ণব মতবাদের উদ্ভবের আগে আউল, বাউল, কর্তাভজা, সাঁই,ন্যাড়া, ফকির, জিকির, এরকম কোন মতবাদেরই প্রচলন ছিল না। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য 'খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কালে অন্তত ৩৫ টি প্রত্নলেখতে বৈষ্ণবীয় অনুসঙ্গ দেখা যায়, বগুড়া জেলায় অবস্থিত পাহাড়পুরের প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিগাত্রে কৃষ্ণ লীলার বিভিন্ন ঘটনা উৎকীর্ণ হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত কালসীমায় রাঢ়বঙ্গে বৈষ্ণবধর্ম ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের বৃহৎ ঐতিহ্যের একটি বিশিষ্ট মাত্রার রূপে প্রচলিত ছিল।' এই মত ব্যক্ত করেছেন রমাকান্ত চক্রবর্তী তার 'বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম' বইতে। বৈষ্ণব ধর্মের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে রমাকান্ত চক্রবর্তীর মন্তব্য থেকে আমাদের ধারণাটা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। যাইহোক, এদেশে ইসলাম আসা এবং সুফিদের আস্তানা স্থাপিত হবার পর, সাধারণ ভাবে সুফিদের মধ্যসূত্রতায় প্রাপ্ত যে ঐস্লামিক পারিপার্শ্বিকতার সৃষ্টি হল, তারই প্রভাবে এদেশে ভাব জাগরণ দেখা দিল, তারই প্রথম ফল গৌড়ীয় বৈষ্ণব-মতবাদ। এই শতাব্দীতেই ঐস্লামিক পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে থেকে বৈষ্ণব ও সূফী প্রভাবে নিরক্ষর শ্রেণীর ভেতর যে মর্মমুখী চিন্তা বিকশিত হল সেটাই হলো "বাউল-মত"।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে বিদ্বজনের সভায় 'হিবার্ট' বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের বাউল এর কথা তিনি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন।
তিনি বলছেন, " আমাদের বাংলাদেশের বাউল বলেছে,
' মনের মানুষ মনের মাঝে করো অন্বেষণ
একবার দিব্য চক্ষু খুলে গেলে দেখতে পাবি সর্বঠাঁই'
সেই মনের মানুষ সকল মনের মানুষ, আপন মনের মধ্যে তাঁকে দেখতে পেলে সকলের মধ্যেই তাঁকে পাওয়া হয়।"
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বাউল সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির কথা বিশ্বের দরবারে এইভাবেই রেখেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথের 'গীতাঞ্জলি'র যে বাণী, যে প্রকাশ, যা রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রবাহমান তার উৎস কোথায়? ডক্টর আনোয়ারুল করিম এর মতে, 'এ প্রশ্নের উত্তরে বলা চলে, রবীন্দ্রনাথ বাউলদের মধ্যেই তা পেয়েছিলেন। এই বাউলীরা ছিলেন ইরানিও বাতেনী, সুফিভাবধারা পুষ্ট একশ্রেণীর সাধকের উত্তরসূরী। রবীন্দ্রনাথ খুব ছেলেবেলা থেকে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে ইরানি ও কবি হাফিজ এবং ওমর খৈয়ামের কাব্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন'।
বাউল আর শান্তিনিকেতন একে অপরের পরিপূরক, সুদীর্ঘ যুগলবন্দী। বিশিষ্ট বাউল শিল্পী পুণ্যচন্দ্র দাসের পিতা নবনীদাস প্রায়ই আসতেন গুরুদেব কে গান শোনাতে। কখনো কখনো কিছুদিন সেখানে থেকেও যেতেন। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ীভাবে তিনি সেখানে থাকেন নি যেহেতু বাউলরা কখনো কোথাও স্থিতু হন না। সনাতন দাস বাউল বিখ্যাত একজন বাউল শিল্পী স্বীকার করেছেন যে, ' শান্তিনিকেতন থেকে কণিকা ব্যানার্জি, শান্তিদেব ঘোষ এঁরা আমাকে ডাকলেন, যে, খাঁটি বাউল গান গাইতে হবে লন্ডনে-সনাতন, তুমি পারবে? তা যদি আপনারা যোগাযোগ ঠিকমতো করতে পারেন আমি যেতে পারি। ওটা হল চুরাশি। তার আগে ঘুরে আসে পুণ্য ( পুণ্যদাস বাউল) আরো সব লোকজন নিয়ে।'
সুকুমার সেন তাঁর 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থে লিখছেন, " বাউল গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় প্রায় কিশোর কাল হইতে। একটি আধুনিক বাউল গানের সংকলন গ্রন্থ উপলক্ষ করিয়া রবীন্দ্রনাথ কৈশোরে 'বাউলের গান' প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। ইহার অনেককাল আগে, শৈশবে, এক গানের চরণ- 'তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে'- তাঁহার চিত্তে গভীর রেখাপাত করিয়াছিল। কিন্তু সেটি যে বাউল-গানের কলি তা তিনি পরে জানিতে পারিয়াছিলেন। বাউল-গানের সাদাসিদা ভাষা ও সরল গভীর ভাব বাঙ্গালা সাহিত্যে অন্যত্র নাই বলিয়া রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করিয়াছিল। তখনও তাহার কবিতায় পাক ধরিতে অনেক দেরি। রবীন্দ্রনাথ বাউল-গানের মধ্যে যে প্রেমগভীরতা অনুভব করিয়াছিলেন তাহা আধ্যাত্মিক অর্থেও প্রেম। বাউল গান রবীন্দ্রনাথকে প্রীত করিয়াছিল কেননা তিনি তাহার মধ্যে নিজের মনের মিল পাইয়াছিলেন।
বাংলার বাউল কবিদের মধ্যে লালন হচ্ছে খুব বিখ্যাত একটি ব্যক্তিত্ব।
তার সমকক্ষ বাউল কবি কি হিন্দু কি মুসলমান কোন সম্প্রদায়ের মধ্যেই দেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ এই লালন সম্পর্কে খুবই উৎসাহী এক সময় হয়েছিলেন। তিনি লালন কে শ্রেষ্ঠ বাউল কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি লালন কে সারা বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের মতো না হলেও নজরুলের সাহিত্য জীবনের খুব অল্প পরিমান হলেও বাউল চিন্তাধারা প্রকাশ পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যের সাহিত্যে বাউল চেতনাকে যেমন মিশিয়ে নিয়েছিলেন। নজরুল হয়তো সেটি পারেননি বা করেননি কিন্তু নজরুল বাউল ভাবনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি। শৈশবে লোটোর দলে থেকে দেহতত্ত্বভিত্তিক কিছু গান তিনি রচনা করেছিলেন,
চাষ কর দেহ জমিতে
হবেনা ফসল এতে
নামাজে জমি উগালে
রোজাতে জমি শাঁসালে
কলেমায় জমিতে মই দিলে
চিন্তা কি হে এই ভবেতে।।
নজরুল তার অনেক গানে বাউল এর সুর গ্রহণ করেছেন। জীবনের প্রথম থেকে নাহলেও নজরুল পরের দিকে কয়েকটি গান বাউল এর আঙ্গিতে লিখেছেন বলা যায় বাউল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
আমি ভাই খ্যাপা বাউল আমার দেউল
আমারি এই আপন দেহ
আমার এই প্রাণের ঠাকুর নহে সুদূর
অন্তরে মন্দির গেহ....।।
আরেকটি অপ্রকাশিত গান এখানে উল্লেখযোগ্য:
বাউল হলাম ধুলির পথে
লয়ে তোমার নাম
আমার একতারাতে বাজে শুধু তোমারি গান শ্যাম
নিবিয়ে এলাম ঘরের বাতি
এখন তুমিই সাথের সাথী
যেখানে যাই সেই সে এখন
আমার ব্রজধাম....।
কোন বিশিষ্ট চিন্তা-নায়ক এই বাউল মতের প্রচলন করেননি। তাই যদি হতো, তবে নিঃসন্দেহে সেই নাম এই দেবতার দেশে, পীরের দেশে, দেবত্ব বা পীরত্বে পরিণত হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবিক তা হয়নি। বাউলেরা জানে না কে তাদের মতের প্রচারক বা প্রতিষ্ঠাতা। পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে এবং ঐতিহাসিক সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করে আমাদের ধারণা জন্মেছে যে নদীয়া জেলাই বাউল মতের উদ্ভবের স্থান। তখনকার এই নদীয়া জেলা এখনকার মতো এত ছোট ছিল না। ১৮৭১ সালে নদীয়ার এলাকা ছিল ৩,৪১৪ বর্গমাইল ( এখন ১৫১৪. ৯ বর্গমাইল)। আগেকার অখন্ড নদীয়া, দেশ বিভাগের আগে ২, ৮০০ বর্গমাইল ছাড়া বর্ধমান, চব্বিশ পরগনা মুর্শিদাবাদ, হুগলি ও যশোহরের কিছু অংশ ছিল। এই জনপদের বড় একটা অংশ ছিল ধর্মান্তরিত মুসলমান, এছাড়াও ছিল ব্রাহ্মণ্য ও শূদ্র সংস্কৃতি, ছিল বৈষ্ণব পরিমন্ডল এবং তান্ত্রিক পরম্পরা, শৈব ও বৌদ্ধ সহজিয়াদের অবশেষ। প্রথম প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টমন্ডলী গড়ে উঠেছিল আনুমানিক ১৮৩৮ সালেই এই নদীয়াতেই। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকে শূদ্র জাতি গুলির উপর ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দমনপীড়ন একটানা চলতে চলতে সেটা চরমে ওঠে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বর্ণাশ্রমের কট্টর সমর্থক। অন্যদিকে কুষ্টিয়া-যশোর সন্নিহিত অঞ্চলে ইসলামী মোল্লাতন্ত্রের ধর্মান্ধতা বেড়ে ওঠে ঠিক এই সময়েই ওইসব অঞ্চলে সুফি প্রচারকরা আসতে থাকেন। প্রধানত চিশতিয়া এবং কাদেরিয়া গোষ্ঠীর প্রচারকরা এসেছিলেন। এদের প্রচার মুসলমানদের নিম্নবর্গের মনে হয়তো এক ধরনের উজ্জীবন এনেছিল। এই সময় নদিয়ায় অনেক গৌণধর্ম এবং তাদের প্রচারকের নাম পরিচয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে চারটি গৌণ ধর্মের কথা যাদের উৎস মূলে চারজন শূদ্র বা নিম্নবর্গের মানুষ আছেন।
১৮-১৯ শতক দুটিতে, হিন্দু ধর্মের বর্ণপ্রথা ও ইসলামী ওয়াহাবি মৌলবাদীদের নিপীড়নের কারণে, বাংলার নিম্ন বর্ণের বঞ্চিত মানুষেরা তাদের নিজেদের মতো করে নানারকম গুরুমুখী উপধর্ম বা লোকধর্ম গড়ে তুলেছিলেন- 'কর্তাভজা' 'বলরামভজা' 'সাহেব ধনী' 'ভগবানী' ইত্যাদি।
কর্তাভজা: ১৮ শতকে বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদ থেকে উদ্ভূত একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়। এর গুরু ছিলেন আউলচাঁদ (আঃ ১৬৯৪-১৭৭০)। তিনি ছিলেন মুসলমান। তিনি নদীয়ায় বাস করতেন। এ কথা জানা যায় যে, আউলচাঁদের নানা জাতি বর্ণের ২২ জন শিষ্য ছিলো। তাই তাদের সংক্ষেপে বাইশ ফকির বলা হতো। এই আউল মহাপ্রভুকে 'কর্তা' বলতেন, ঈশ্বর বা খোদা নয়। সংগীত ছিল তার সাধনার প্রধান মাধ্যম। তিনি তার অনুসারীদের বলতেন ঈশ্বর বা খোদাজ্ঞানে 'কর্তা'র উপাসনা করতে। তৎকালীন লোকেরা তাই একে কর্তাভজা বলতেন। তার অনুসারীদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু এবং তারা তাকে 'চৈতন্যদেবের অবতার' মনে পুজো করতেন। অনুমান করা হয় ১৭৫৬ সাল নাগাদ এই আউলচাঁদ কল্যাণীর অন্তর্গত ঘোষপাড়ায় আসেন এবং সেখানকার সদগোপ জাতীয় রাম শরণ পাল কে দীক্ষিত করেন। রামশরণ পাল হলেন প্রথম কর্তাবাবা। তার মৃত্যুর পর পুত্র দুলাল চাঁদ পরবর্তী কর্তা বাবা হন। 'ভাব গীত' নামে তিনি সাধন সংগীতের একটি বইও লেখেন। রামশরণ পালের স্ত্রী সতীমা এই ধর্মের অন্যতম গুরু হিসেবে স্বীকৃত। উনিশ শতকে এই মতবাদ কলকাতা, চব্বিশ পরগণা, হাওড়া হুগলি নদিয়া মুর্শিদাবাদ এবং বাংলাদেশের কোন কোন অংশে আজও কর্তাভজাদের মণ্ডলী আছে। তবে ডঃ আনোয়ারুল করিম এর মতে, বাংলাদেশে কর্তাভজা দের কোন আখড়া নেই। বাউল ফকিরদের অনুষ্ঠানে কর্তাভজা'রা ভারত থেকে বাংলাদেশে যেত। এই মতবাদ শহর ও উচ্চ বর্গকেও ছুঁয়েছিল। এরা কোন বিগ্রহ পূজা করতেন না।
সাহেবধনী : এটি একটি সহজিয়া ভিত্তিক উপধর্ম। এর প্রবর্তক হিসেবে এক উদাসীন এর কথা জানা যায়। এই সম্পর্কে অক্ষয় কুমার দত্ত লিখছেন, ' এরূপ প্রবাদ আছে যে, কৃষ্ণনগর জেলার অন্তর্গত শালগ্রাম দোগাছিয়া প্রভৃতি কয়েক গ্রামের বনে একজন উদাসীন বাস করত। ঈশ্বর আরাধনা ও পরোপকার সাধনে তাহার বিশেষ রূপে অনুরাগ ছিল। বাগাড়ে নিবাসী রঘুনাথ দাস, দোগাছিয়া নিবাসী দু:খীরাম পাল এবং হিন্দু মতাবলম্বী অপর কয়েক ব্যক্তি ও একজন মুসলমান তাহার শিষ্য হয়। ওই উদাসীন এর নাম সাহেবধনী বলিয়া এই সম্প্রদায়ের নামও সাহেবধনী হইয়াছে।' এই ধর্মের প্রধান সংগঠক চরণ পাল হিন্দু গোয়ালা সম্প্রদায়ের মানুষ। খ্রিস্টীয় আঠার শতকের শেষ দিকে এই ধরনের বেশ কিছু উপধর্ম নিম্নবর্গীয় মানুষদের কাছে টেনে নিয়েছিল। এদের মধ্যে যেমন ছিল গরিব হিন্দু সম্প্রদায় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। হিন্দু ধর্মের জাতি ভেদের কঠোরতা থেকে মুক্ত হতে এরা এই উপধর্মে শামিল হয়েছিলেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে এই উপধর্মের মানুষজন 'ধর্মত্যাগী' বলে পরিচিত। নদীয়া জেলার বর্তমান নাকাশিপাড়া থানার শালিগ্রাম- দোগাছিয়া গ্রামের সাহেবধনী মতে সূচনা বলে জানা যায়। তাদের উপাস্য দীনদয়াল। সাহেবধনী সম্প্রদায়ের মধ্যেও হিন্দু মুসলমান উভয়ের সম্প্রদায়ের মানুষই আছেন। কেউ কেউ মত পোষণ করেছেন এইভাবে যে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার বৃত্তিহুদা গ্রামে রয়েছে সাহেব ধনী সম্প্রদায়ের আসন। স্থানটি কৃষ্ণনগর থেকে ১৬ মাইল উত্তর পূর্বে অবস্থিত। দুখিরাম পালের ছেলে চরণ পাল এই বৃত্তিহুদা গ্রামে একসময় আসেন। এখানেই গড়ে ওঠে সাহেবধনী সম্প্রদায়ের সাধন ক্ষেত্র। চরণপালের প্রধান তিন শিষ্যর মধ্যে কুবির গোঁসাই অন্যতম। তার সহস্রাধিক গান আছে। এই গ্রামেই রয়েছে কুবির গোঁসাই এর সমাধি।
বলরামী: বাংলাদেশের কুষ্টিয়া এবং মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা পশ্চিম বাংলার নদিয়া এবং তৎসন্নিহিত অঞ্চলে 'বলরামী' সম্প্রদায়ে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা বলরাম হাড়ি। অধুনা বাংলাদেশের মেহেরপুর অন্ত্যজ হাড়ি বংশে বলরাম হাড়ির জন্ম আনুমানিক ১৭৮০ সালে। মৃত্যু ১৮৪৫। এই মেহেরপুর গ্রামে মল্লিক বাবু দের বাড়িতে বলরাম চৌকিদারের কাজ করতো। সেই বাড়িতে আনন্দ বিহারী নামে এক বিগ্রহ আছে ওই বিগ্রহের সোনার অলংকার চুরি যাওয়ার ফলে বাবুরা বলরাম কেই সন্দেহ করে। এবং তাকে মারধরও করে। সেই অপমান ও লজ্জায় সে সেই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এই ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর বলরাম জটাজুটধারী বৈরাগীর বেশে ফিরে আসেন । এবং ধর্ম প্রচারে মন দেন। মূলত নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে প্রতিবাদী ধর্ম সংগঠন করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। মৃত্যুকালে বলরাম সম্প্রদায়ের ২০০০০ শিষ্য ছিল বলে জানা গেছে। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিভেদ প্রচলিত নেই। মৃত্যুর পর এরা শবদেহ দাহ করে না। মাটি ও দেয় না। কোন প্রকার অন্তষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানও করে না।
ভগবানী: এটিও একটি সহজিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত গৌণ ধর্ম। এর অনুসারীরা বাংলাদেশের যশোর খুলনা কুষ্টিয়া এবং পাবনা অঞ্চলে বসবাস করে। 'ভগবানী' নামের অর্থ হিসেবে তারা ব্যাখ্যা করে, আদিতেক 'ভগ' নামে জনৈক দেবতা ছিলেন। যার বৈশিষ্ট্য ছিল ঐশ্বর্য বিতরণ। এই ঐশ্বর্যই পরবর্তীকালে স্ত্রী জননাঙ্গকেই প্রতীক হিসেবে গণ্য করে । ভগবানী সম্প্রদায় স্ত্রী জননাঙ্গকে পার্থিব ঐশ্বর্যের উৎস বলে মনে করে। তান্ত্রিকদের সাথে এই মনোভাবের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। 'ভগবানী' সম্প্রদায় বর্তমানে গৃহী। এরা এদের সাধনা অন্যকে বলে না, এদের কোন শাস্ত্র নেই, এরা জাতিভেদ প্রথা মানে না। গুরুবাদি এদের ধর্ম। রতিনিরোধ-সাধনায় বিশ্বাসী। স্বামী স্ত্রী হিসেবে বসবাস করে। অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যায় না, নিজেদের ধর্মীয় মতে চিকিৎসা করে। সতীমা'কে এরা গুরু বলে জানে। লালন ফকিরের গানও তাদের সাধনার অঙ্গ। এরা মৃতদেহ কবর দিয়ে রাখে। নিরামিশাষী হলেও এরা মাঝে মাঝে মাছ খায়।
তবে যুগের সঙ্গে সঙ্গে বাউলিয়াদের মধ্যে চিন্তাভাবনা এবং জীবনধারাতে অনেক পরিবর্তন এসে গেছে। কোনো কোনো বাউলিয়ার মধ্যে ভোগ সর্বস্ব জীবনধারা প্রবেশ করেছে। নিরন্তর প্রচারের আলোয় টিকে থাকবার জন্য মরিয়া চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ভাবনা তাদের বাউল চিন্তাধারার মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত করেছে। কোন কোন বাউল সম্মেলনে দেখা যায় তিন তিনটে মঞ্চ- লোকমঞ্চ গণমঞ্চ মুক্তমঞ্চ। তবুও বাউল গায়কের স্রোতকে সামাল দেওয়া যায় না। সবাই বাউল, সবাই গেরুয়া, সবাই গায়ক। একবার শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় পৌষ মাসের তীব্র শীতে খড় ও কম্বলের শয্যায় বসে, সরকারি 'লালন' পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত বাউল শিল্পী, যিনি চাইলেই অন্যান্য ভি.আই.পি.দের সঙ্গে 'রতন কুঠি'তেই থাকতে পারতেন, এক প্রশ্নের উত্তরে হেসে বলছেন, ' আমরা তো মাটিরই মানুষ, গলায় মেঠো সুর। মরলে এই মাটিতেই হবে সমাধি। এখানে সবাই সমান বাবা।'
*****
গ্রন্থ ঋণ: বাউল ফকির কথা, সুধীর চক্রবর্তী। বাংলাদেশের বাউল সমাজ সাহিত্য ও সংগীত, ডঃ আনোয়ারুল করীম। রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী) দশম খন্ড। লালন সমগ্র, সম্পাদনার আবুল আহসান চৌধুরী, পাঠক সমাবেশ বাংলাদেশ। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, সুকুমার সেন চতুর্থ খন্ড। নজরুল রচনা সমগ্র, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, সপ্তম খন্ড।
------------------ ------------------ ------------------ ------------------
স্মৃতির দুয়ারে
মৈষাল বন্ধু
কেয়া নন্দী
স্নাতকোত্তরের দু ' বছর পর প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়ে পেলাম এক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ' র পদ। নিয়মিত দু ' বেলা বর্ধমান কর্ড লাইন ধরে যাওয়া - আসা।লোকাল গাড়ি বলে ভিড় হলেও বসার সিট পাওয়া যেতো।দেখতাম ঠাসাঠাসি ভিড়েও ঠেলেঠুলে হকার - রা ঠিকই এপ্রান্ত - ওপ্রান্ত করে ফেলতো।যেতে যেতে এদের সকলের মুখ মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।চা - ঝালমুড়ি - পাঁপড় - ঠাণ্ডা কোলার পাশে বেশ কয়েকজন খঞ্জনী হাতে গেরুয়া বসনের মানুষও উঠতো। কৃষ্ণভজনা শুনিয়ে পয়সা দিলে তবেই গন্তব্যস্থলে চলে যেতো। সকলের মাঝে আমায় মুগ্ধ করতো দোতরা কাঁধের এক ব্যতিক্রমী মানুষকে।অন্যরা যেখানে ' খাঁচার ভেতর অচিন পাখি ' বা ' গুরু না ভজি মুই ' এই দুই গানে আবদ্ধ থাকতো সেখানে ইনি অন্য মাত্রার গান উপহার দিতেন।মানুষের জীবনযাত্রার ,পারিবারিক নানা ঘটনাবলী, প্রেম - বিয়োগের আকূতি তাঁর সুর মূর্ছনায় প্রাণ পেতো। যাত্রীদের গান শোনালেও কারোর কাছে হাত পাততেন না,কেউ স্বেচ্ছায় পয়সা দিলে নিতেন কিন্তু না দিলেও কণ্ঠ থামাতেন না! যতক্ষণ থাকতেন একের পর এক গেয়ে চলতেন। অচেনা গান হলে কি হবে তার রেশটা সারাদিন থাকতো।প্রতিদিন শুনতে শুনতে কবে যেনো, ' ও কি গাড়িয়াল ভাই ' এবং 'মৈষাল বন্ধু রে ' গান দুটো মনে গেঁথে গিয়েছিল। কথার আকূতি তে হৃদয় কেঁপে উঠতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা একটা সম্পর্ক তখন ভাঙনের পথে তাই হয়তো হৃদয়ে শ্রাবণের ধারাপাত ! মানুষটার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করতো কিন্তু বহু জনমাঝে দমন করে রাখতাম।যদিও সুযোগ একদিন এলো। এক বর্ষার দিনে কামরায় রাশ কম দেখে যেচে পড়ে আলাপ করেছিলাম। জেনেছিলাম তিনি মূলত ' ভাওয়াইয়া ' শিল্পী। উত্তরবঙ্গের এই গানের অনেক তত্ত্ব - তথা সেদিন বলেছিলেন যা আমার অজ্ঞাত ছিল। গুণী মানুষটার কথাবার্তায় বুঝেছিলাম রোজগার নয় কোথাও একটা আক্ষেপ - বিয়োগব্যথা বেরিয়ে আসে তাঁর সুরের মধ্যে দিয়ে।সঙ্গীতের তথা পেলেও ব্যক্তি - বাউলের তথ্য তিনি গোপন রেখেছিলেন। নিজের নামটাও বলেননি বাসা তো দূর অস্ত।
এরপর হঠাৎ - ই একদিন মানুষটা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। একদিন - দুদিন করতে করতে বছর ঘুরে গিয়েছিল। নিত্যশ্রুত কন্ঠটা এমন কানে বসে গিয়েছিল যে,প্রথম প্রথম অস্থির হয়ে উঠতাম। তারপর যা হয় কিছুদিন পর না শোনার অভ্যাসেও অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।
বহুবছর হয়ে গেলো তাকে আর দেখি না ঠিক - ই কিন্তু বিস্মরণ ঘটে নি। আজও সে আমার
' মৈষাল বন্ধু ' ই আছে এবং এখনও মাঝে মাঝে বিড়বিড় করি ' তোমার কথা মনে হইলে মোর কেমন করে রে ..... '।
মুক্তপদ্য
কা আ তরুবর: দেহতত্ত্ব: সহজিয়া বাউল সাধনা।
শম্পা সামন্ত
চর্যাপদ বাউল এবং সহজিয়া বাংলাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।চর্যা হল সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।বৌদ্ধ সহজ সাধনার কথাই এখানে লিপিবদ্ধ আছে।বাউল গানেও এই দেহবাদের প্রসঙ্গ এসেছে।
লোকায়ত এক সম্প্রদায়ের নামই হল বাউল।ঈশ্বরের নামে যারা বাতুল অর্থাৎ পাগল। তারাই বাউল।সহজ(দেহ বাদ) উপায়ে ঈশ্বরলাভের উপায় বা কায়া সাধনা যেমন চর্যার মূল লক্ষ্য তেমনই বাউল সম্প্রদায়ের সাধকগনও এই কায়া সাধনার কথা বলেছেন।
চর্যা এক বহু পুরাতন নিদর্শন যা খৃষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে এই গানগুলি রচিত হয়েছিল।বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মতত্ত্বের সাধনপথ অবলম্বনকারীগন এক গোপন ভাষায় দেহ সাধনার কথা গানের মাধ্যমে লিখে রাখেন।এই অন্ধকার মিশ্রিত ভাষাগুলিকে তাই সান্ধ্যভাষা বলা হত।
তাদের মতে ঈশ্বর,(পরমাত্মা, নৈরামনি) লাভ করার জন্য যে পথ অবলম্বন করা উচিত তা দেহের মধ্যেই সঞ্চিত।দেহ একটি বৃক্ষ স্বরূপ।তার পাঁচটি ডাল।ইড়া পিঙ্গলা, সুষুম্না কাণ্ডের মধ্যে সহস্রাধার থেকে হৃদয়ের জ্ঞানপদ্মে প্রবাহিতই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।দেহকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেও নরনারীর যৌন কামকে আধ্যাত্মিক উন্নতির উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।একটি পদের মাধ্যমে ব্যাপারটি বোঝানো যেতে পারে—
চর্যাকবি লুইপাদের পদ।
কা আ তরুবর পঞ্চবী ডাল
চঞ্চল চী এ পইঠ কাল।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমান।
লুই ভনই গুরু পুচ্ছিঅ জান।
অর্থাৎ দেহ বৃক্ষের সমান।তার পাঁচটি ডাল।চঞ্চল মনের মধ্যে কাল প্রবেশ করছে।দৃঢ় করিয়া মহাসুখ পরিমান করো।লুই বলেন গুরুকে জিজ্ঞাসা করিয়া লও।
এই সাধনা সম্পূর্ণ রূপে সহজ সাধনা( দেহ সাধনা) ও গুরুমুখী।চিত্তানন্দ,সহজানন্দ,নিবৃত্তিমূলক শূন্যতা এসবের শিক্ষা একমাত্র গুরুর কাছেই পাওয়া যেতে পারে।
সুফিসাধনা—বাংলায় অষ্টম শতাব্দি থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এক মতবাদ গড়ে ওঠে। তা হল সুফিবাদ।সুফিসাধনা হল ইসলামের রহস্যবাদী একটি দিক।যা আধ্যাত্মিকতা ও আত্ম অনুসন্ধান।( self realisation)এর উপর জোর দেয়।এর মূল লক্ষ্য হল আল্লাহর সাথে গভীরভাবে সম্পর্ক স্থাপন ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ে তাঁর কাছাকাছি পৌঁছানো।আপন নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া,জীবাত্মাকে পরমাত্মার অধীনস্ত করা,আল্লাপাকের দেওয়া শয়তানের সঙ্গে জিহাদ করে ইহ জগত থেকে মুক্তি পাওয়া।
বাংলায় ষোঢ়শ শতকে মাঝামাঝি সময়ে আরো এক মুসলমান কবিদের পরিচয় পাওয়া যায় যাঁরা বাংলা ভাষায় একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন। সহজিয়া আন্দোলনের পর পরই এদেশের সমাজ ও সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে আর একটি ধারা তা হল সহজিয়া বাউল ও ফকির সম্প্রদায়।
সাধারণত চৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের সময় থেকেই বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে।এই সুফি, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মত গ্রহন বর্জনের মধ্য দিয়ে বাউল সম্প্রদায়ের সৃষ্টি।বাউলরা সহজ মানুষ বলতে দেহের ভিতরের রসিক ময়ানুষেরই অনুসন্ধান করেছেন।সাধারণত অভেদ, নাড়ানাড়ি সম্প্রদায় এর উত্তরসুরী।বৌদ্ধ সাধনা সহজ সাধনার মাধ্যমে বাউলসাধনার উৎপত্তি।
ফকিররা যেমন সুফিবাদের আচার নিষ্ঠাকে বর্জন করেন তেমনি সহজিয়া বৈষ্ণবদের ভিতরে থেকেও কিছু রসিক বৈষ্ণব আচার পরিত্যাগ করেন এবং হৃদয়ের মর্ম সাধনাকে প্রধান করে তোলেন।রসিক বৈষ্ণবেরা ফকির দরবেশের অনেক কাছাকাছি চলে আসেন।
ফকির দরবেশ বা বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে বৌদ্ধতন্র,দেহাত্মবাদ ও বৈষ্ণববাদ নিহিত আছে।
এই বাউল ফকিররা তাদের ভাবকে বিশেষ ভাষায় প্রয়োগ করে থাকেন সাধারণত যা চিরকাল কায়াসাধনার অঙ্গ হয়ে আসছে।
চর্যায় একটি গাছ তার পাঁচটি ডাল, পাহাড়ের উপর ডোম্বীর বাস।
বৈষ্ণব সহজিয়াদের মধ্যেও মনের মানুষ, সহজ মানুষ,রূপ, অরূপ, বাঁকানদী,স্রোতের উজান,চাঁদের গায়ে চাঁদ,সদানন্দপুর ইত্যাদি।
সুফিদের একইভাবে ভাবগতি,আল্লা, মুর্শিদ,লা শরিফ,মোকাম মঞ্জিল, শারিয়ত মরিকত অচিন পাখি ইত্যাদি ব্যঞ্জনাময় ভাষা দেখতে পাই।
বাউল ফকিরদের পদাবলি ভাষার রূপক প্রতীকী পরিভাষাগুলি সঞ্চরণশীল।সাধনার আত্মীকরন পদ্ধতি, ভাবের জগত সাঁই সন্ত আমাদের হৃদয়কে সঞ্চারিত করে।আর বাউল ফকিরার এই রসিক ভাষার ভাব গ্রহন করতে একমাত্র রসিক মানুষই পারবেন।
বর্তমানে বাউলরা সেই সব সাধন তত্ত্ব থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছেন এবং লোকসংস্কৃতির সঙ্গীতের একটি ধারা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাউল সাধন তত্ত্ব ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে।তবু তারা বিভিন্ন লোকউৎসবে, আখড়ায় গান গাইতে ও নিজেদের সংস্কৃতিকে অনবদ্য স্থানে পৌঁছে দিতে পেরেছেন।বহু সংস্থা আজ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।এই বাউল সাধকেরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, মানুষের সমাগমে,কিছু কিছু বৈষ্ণব আখড়ায়, জয়দেব কেঁদুলীর মেলায়,শান্তিনিকেতনের মেলায়,সরকারী মেলাগুলিতে বাউল বাউলানির ভিড় জমায়।
নবীন বাউল শিল্পীদের কাছে আমরা দেহতত্ত্ব বা সহজিয়া সাধনার কথা শুনি।তবে বর্তমান দর্শন কতখানি সঠিক সেই সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়।সহিজিয়া সাধনা এখন শুধু রতিধারনের পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।অথচ প্রাচীনবাউল সাধনার সঙ্গে চর্যার যে এক অঙ্গাঙ্গী মিল আছে তা অনেকের অজানা।
বাউলদের আসল দর্শনই হল সব জাতি ধর্ম নির্বিশেষে একটি গোষ্টি।যাদের মতে এই মন্দির স্বরূপ দেহে ঈশ্বরের বাস।আধ্যাত্মিক মুক্তি বা মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় হল মনের মানুষের অনুসন্ধান।
"আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষটিরে"।
কিংবা " আমি হদমাঝারে রাখব ছাড়ে দেবনা"।
লালন সাঁই এর কথায়
" সপ্ততোলা ভেদ করিলে হাওয়ার ঘরে যাওয়া যায়
হাওয়ার ঘরে গেলে পরে অধর মানুষ পাওয়া যায়।"
সাধন সঙ্গিনী বাউল সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।রতি সাধনার মাধ্যম।কিন্তু আধুনিক যুগে এই সম্প্রদায় একে যৌনমিলনের মাধ্যম করে ফেলেছে।বর্তমনে বাউল সমাজে বাউলরা নিত্য নতুন সঙ্গিনীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে নিজেদের বাউল বলে পরিচিতি দিচ্ছে।রতি সাধনাই কাম নিয়ন্ত্রণের খেলা।যা মনকে শান্ত করে।সেখানেই ঈশ্বরের বাস।লোকসমাজে বাউলবেশ ধারী কিছু লোক অনাচারের মাধ্যমে বাউলের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করছে।বাউল প্রকৃতই একটি দর্শন, একটা সাধনা।পরম ব্রহ্মকে পাওয়ার সাধনা।অজানা রসিকের সঙ্গে জীবাত্মার রহস্যময় সত্তাকে ভুলে গেলে চলবেনা।
কোন রসে কোন রতির খেলা
জানতে হয় রে এইবেলা।
সাড়ে তিন রতি বটে।
লেখা যায় শাস্ত্রপাটে।
সাধের মূল তিন রস ঘটে।
তিনশ ষাট রসের বালা।
রবিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৫
প্রচ্ছদ ঋণঃ- অদিতি সেনগুপ্ত
